গীতবিতান-GITABITAN
আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে॥

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ভাদ্র ১৩২২ (সেপ্টেম্বর,১৯১৫)
কবির বয়স: ৫৪
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
প্রকাশ: ১৯২৫ , প্রবাহিণী (গীতগান) |
Mother India, Pondicherry, 1961
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রেম-প্রেমবৈচিত্র্য; ২৯৪/৩৮৮
রাগ / তাল: ভৈরবী / দাদরা
স্বরলিপি: গীতপঞ্চাশিকা (১৩২৫); স্বরবিতান ১৬ (গীতপঞ্চাশিকা)
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
গীতপঞ্চাশিকায় (১৩২৫) সা-কে গা ধরে স্বরলিপি দেওয়া আছে।  

আলোচনা

বিখ্যাত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কতগুলো নতুন রাগ রচনা করেছেন। তার মধ্যে হেমন্তরাগ খুব প্রসিদ্ধ।... সোহিনী রাগের সহিত রিখাব ও পঞ্চম (অবরোহণে) যোগ ক'রে ওস্তাদ এই রাগের সৃষ্টি করেছেন এবং এই রিখাব ও পঞ্চমের ব্যবহার অতি স্বাভাবিক ও সুন্দর হযেছে, এজন্যে এই নতুন রাগের সৃষ্টি সার্থক। যাঁরা রবীন্দ্রনাথের ' আধেক ঘুমে নয়ন চুমে ' গানটি শুনেছেন তাঁরা সুরটি বিশ্লেষণ করলে দেখবেন এতে সেই হেমন্ত রাগই রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় নিজস্ব ভঙ্গীতে প্রকাশ পেয়েছে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ রাগ, রাগিণী, মেল, জাতি, আরোহ, অবরোহ, বাদী, সম্বাদী বিচার ক'রে যা সৃষ্টি  করেছেন রবীন্দ্রনাথ শুধু সহজ সৌন্দর্যানুভূতি থেকে তাই সৃষ্টি করেছেন। ইওরোপীয় সংগীতে D Major Keyতে দু'টি sharp ব্যবহার হয়। আমাদের ভারতীয় সংগীতে কল্যাণ ঠাটে একটি কড়ি (sharp) ব্যবহার হয়। একাধিক  কড়ির ব্যবহার নেই। রবীন্দ্রনাথের ' আমার একটি কথা ' এই গানটিতে তিনি পাশাপাশি দুই রিখাব লাগিয়েছেন। এই দুই রিখাবের কোমল রিখাবটি আর কিছু নয়, D Major Key-র C sharp (কড়ি স)। ইওরোপীয় সংগীতপদ্ধতির এই প্রয়োগ এখানে খুবই নিপুণ। অবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত বাউল ঢংয়ের সুর ' কবে তুমি আসবে ব'লে ' এবং বিখ্যাত ভাটিয়ালি সুরের গান ' গ্রাম-ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ ' এই দুটি গানেই আ--আ--আ ব'লে যে টান আছে তাতে স্বরোচ্চারণ সম্পূর্ণ ইওরোপীয় পদ্ধতি অনুযায়ী। অনেকে বলতে পারেন বাউল ভাটিয়ালির সঙ্গে ইওরোপীয় ঢংয়ের সংমিশ্রণ হাস্যকর, কিন্তু গান দু'টি মন দিয়ে শুনলে বোঝা যাবে যে এক্ষেত্রে তা তো হয়ইনি, বরং এই মিশ্রণের ফল অতি সুন্দর হয়েছে। এতে বোঝা যায় যে বড় প্রতিভার নিপুণ হাতে বিভিন্ন আপাতবিরোধী জিনিষেরও মিশ্রণের ফলে নতুন সৌন্দর্য জন্ম নেয়।  
     --হিমাংশুকুমার দত্ত, সুরকার রবীন্দ্রনাথ, কবিতা রবীন্দ্র সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৪৮,  সম্পাদক: বুদ্ধদেব বসু (পুনর্মুদ্রণ ১৪০৯)  



ভৈরবী সুরের মোচড়গুলো কানে এলে জগতের প্রতি এক রকম বিচিত্র ভাবের উদয় হয়... মনে হয় একটা নিয়মের হস্ত অবিশ্রাম আর্গিন যন্ত্রের হাতা ঘোরাচ্ছে এবং সেই ঘর্ষণবেদনায় সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মর্মস্থল হতে একটা গম্ভীর কাতর করুণ রাগিণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে-- সকাল বেলাকার সূর্যের সমস্ত আলো ম্লান হয়ে এসেছে, গাছপালারা নিস্তব্ধ হয়ে কী যেন শুনছে এবং আকাশ একটা বিশ্বব্যাপী অশ্রুর বাষ্পে যেন আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে-- অর্থাৎ, দূর আকাশের দিকে চাইলে মনে হয় যেন একটা অনিমেষ নীল চোখ কেবল ছল্‌ছল্‌ করে চেয়ে আছে।
    কলকাতা, জুন ১৮৮৯  #৩  

অ[বন?] ও বাড়িতে তাদের এক তলার ঘরে বসে এস্‌রাজে ভৈরবী আলাপ করছে, আমি তেতলার কোণের ঘরে বসে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। তোর চিঠিতেও তুই মাটাঙ্গের ভৈরবী আলাপের কথা লিখেছিস। আজকাল সকালে দেখতে দেখতে বেলা দশটা এগারোটা দুপুর হয়ে যায়-- দিনটা যতই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে মনটাও ততই এক রকম উদাসীন হয়ে আসে; তার উপর কানে যখন বারম্বার ভৈরবীর অত্যন্ত করুণ মিনতির খোঁচ লাগতে থাকে তখন আকাশের মধ্যে, রৌদ্রের মধ্যে, একটা প্রকাণ্ড বৈরাগ্য ব্যাপ্ত হয়ে যায়। কর্মক্লিষ্ট সন্দেহপীড়িত বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটিকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে-একটি নিত্যশোক নিত্যভয় নিত্যমিনতির ভাব আছে, আমাদের হৃদয় উদ্‌ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদ্‌ব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। সত্যিই তো আমাদের কিছুই স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রকৃতি কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেই কথাটিই আমাদের সর্বদা ভুলিয়ে রেখেছে-সেইজন্যেই আমরা উৎসাহের সহিত সংসারের কাজ করতে পারি। ভৈরবীতে সেই চিরসত্য সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে; আমাদের এই কথা বলে দেয় যে, আমরা যা-কিছু জানি তার কিছুই থাকবে না এবং যা চিরকাল থাকবে তার আমরা কিছুই জানি নে।
  --কলকাতা, ২১ নভেম্বর ১৮৯৪; ৬.৮.১৩০১ #১৭৭  

[কিন্তু] আজ সকালে একটা সানাইয়েতে ভৈরবী বাজাচ্ছিল, এমনি অতিরিক্ত মিষ্টি লাগছিল যে সে আর কী বলব-- আমার চোখের সামনেকার শূন্য আকাশ এবং বাতাস পর্যন্ত একটা অন্তরা্‌নিরুদ্ধ ক্রন্দনের আবেগে যেন স্ফীত হয়ে উঠছিল-- বড়ো কাতর কিন্তু বড়ো সুন্দর-- সেই সুরটাই গলায় কেন যে তেমন করে আসে না বুঝতে পারি নে। মানুষের গলার চেয়ে কাঁসার নলের ভিতরে কেন এত বেশি ভাব প্রকাশ করে! এখন আবার তারা মুলতান বাজাচ্ছে-- মনটা বড়োই উদাস করে দিয়েছে-- পৃথিবীর এই সমস্ত সবুজ দৃশ্যের উপরে একটি অশ্রুবাষ্পের আবরণ টেনে দিয়েছে-- একপর্দা মুলতান রাগিণীর ভিতর দিয়ে সমস্ত জগৎ দেখা যাচ্ছে। যদি সব সময়েই এইরকম এক-একটা রাগিণীর ভিতর দিয়ে জগৎ দেখা যেত তা হলে বেশ হত। আমার আজকাল ভারী গান শিখতে ইচ্ছে করে-- বেশ অনেকগুলো ভূপালী ... এবং করুণ বর্ষার সুর-- অনেক বেশ ভালো ভালো হিন্দুস্থানী গান-- গান প্রায় কিচ্ছুই জানি নে বললেই হয়।
    সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯২; ২২.৩.১২৯৯ #৬৬  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  


 

 

২৯৪

     আমার   একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে॥
          ভরে রইল বুকের তলা,   কারো কাছে হয় নি বলা,
          কেবল বলে গেলেম বাঁশির কানে কানে॥
আমার চোখে ঘুম ছিল না গভীর রাতে,
চেয়ে ছিলেম চেয়ে-থাকা তারা সাথে।
              এমনি গেল সারা রাতি,   পাই নি আমার জাগার সাথি--
              বাঁশিটিরে জাগিয়ে গেলেম গানে গানে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯১৫ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  শিলাইদহে নৌকাবাস। শান্তিনিকেতনে এলেন গান্ধীজী ও কস্তুরবা। 'ফাল্গুনী' রচনা ও অভিনয়, রবীন্দ্রনাথ অন্ধ বাউলের ভূমিকায়। সম্রাটের জন্মদিনে 'সার' উপাধি লাভ। কাশ্মীর ভ্রমণ। প্রকাশ: বিচিত্র পাঠ, শান্তিনিকেতন, কাব্যগ্রন্থ ১-৬, The Maharani of Arakan.  

বহির্বিশ্বে: সরকারের কাছে গান্ধীজী কাইজার-এ-হিন্দ স্বর্ণপদক পেলেন  (পরে ফেরৎ দেন) ও প্রথম শান্তিনিকেতনে এলেন। সবরমতী আশ্রম চালু। ফাইটার প্লেন ও ট্র্যাক্টরের উদ্ভাবন। গোপালকৃষ্ণ গোখলের মৃত্যু। ১৮ মার্চ ভারতরক্ষা আইন পাস। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: অফ হিউম্যান বণ্ডেজ (মম্‌), জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি (আইনস্টাইন)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



... বাংলা গান বাণীপ্রধান, আপনি যতই সুরজ্ঞ হন, বাংলা গান শুনতে হ'লে কথার দিকে কিছু মন না দিয়ে উপায় নেই, এবং কথা খারাপ হ'লে উপভোগে কিছু অন্তত ব্যাঘাত যার না হয় বলতেই হবে তার অনুভূতিগুলি সম্পূর্ণ বিকশিত নয়। সেই জন্যে বাংলা গানের ভালো কবিতা হওয়া দরকার। বাংলা গান এমন হওয়া উচিত যা ছাপার অক্ষরে প'ড়েও ভালো লাগে। এ রকম কিছু গান লিখেছেন দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ, নজরুল ইসলাম -- তাঁদের সুখ্যাতি নিশ্চয় করবো; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ গানের ছলে কাব্যের যে চোখ-ধাঁধানো, প্রাণ-কাড়ানো হিসেব-হারানো ঐশ্বর্য আমাদের ঘরের আঙিনায় ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার কথা আমরা কী বলবো? এ-গানগুলি শ্রেষ্ঠ কবিতা, রবীন্দ্রকাব্যের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ। আশ্চর্য এই যে দেড় হাজার দু'হাজার গানের মধ্যে প্রায় প্রতিটিই কবিতা হিসেবে সার্থক, বেশির ভাগই অনিন্দ্য। এ থেকে এটুকু বোঝা যায় যে তিনি নিজের মনে তাঁর গানে ও গীতিকবিতায় জাতের কোনো তফাৎ মানেন না, যদিও এখন পর্যন্ত তাঁর নিজের কোনো কাব্যসংকলনেই এমন কোনো রচনা স্থান পায়নি যা নিছক গান।

... সমালোচককে মুখ খোলবার কোনো সুযোগই দেবে না রবীন্দ্রনাথের গান। গানগুলি যে-কোনো অর্থেই নিখুঁত। এমন একান্ত সরল, ঋজু, জাদুকর ভাষা রবীন্দ্রনাথ আর কোথাও ব্যবহার করেন নি। এত বিচিত্র ছন্দ, এমন চমক-লাগান অভিনব মিল, এমন ললিত মধুর অনুপ্রাস তাঁর কবিতায় নেই। অথচ পড়বার সময় কখনো এমন মনে হয় না যে এগুলো কবির কারিগরি, মনে  হয় সবই সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত, মনে হয় ছন্দ মিল অনুপ্রাস সব নিয়ে সম্পূর্ণ রচনা একটি সম্পূর্ণ ফুলের মতো আপনিই ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের সব গানেই এই একটি আত্মজ ভাব ধরা পড়ে, ওরা যেন একটা জৈব পদার্থ, কারো রচিত নয়; জীবজগত উদ্ভিদজগতের অফুরান বিচিত্রতার মতো ওরা শুধু আছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই, ব্যাখ্যার প্রয়োজনও নেই। কলাকৌশল এত ও এতরকমের যে গুনে শেষ হয় না। মিল, মধ্য-মিল, অর্ধ-মিল, স্বর-মিল -- সদ্যোজাত অপূর্ব সে সব মিল -- শুধু মিলের আলোচনাতেই এক দীর্ঘ প্রবন্ধ দাঁড়িয়ে যায়। আবার মিল নেই এমন গানও অছে; সংস্কৃত-বহুল গাম্ভীর্য থেকে একেবারে মুখের ভাষার স্বচ্ছ সরলতা পর্যন্ত বাংলা ভাষায় সম্ভব এমন-কোনো আলো-ছায়ার খেলা নেই, যা ধরা না পড়েছে তাঁর গানে; চায়ের গানের মতো যেন বাজী ধ'রে লেখা স্রেফ কারিগরির রচনাও আছে, যদিও সংখ্যায় নগণ্য; 'মেঘের পরে মেঘ জমেছে'-র মতো তরল শিশু-ভাষা থেকে 'অহো এ কী নিদারুণ স্পর্ধা, অর্জুনে যে করে অশ্রদ্ধা!'-র মতো অসম্ভব যুক্তাক্ষর পর্যন্ত সব রকম কথা, সব রকম ধ্বনিবিন্যাস অনায়াসে বসেছে। ছন্দের বৈচিত্র্যের তো শেষ নেই। যে-তিনমাত্রার ছন্দ রবীন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্য তার নানারকম রূপের ব্যবহার গানে পৌনঃ-পুনিক, আছে ছড়ার ছন্দ, আছে পয়ার, আছে ছন্দের নানা নতুন ঢং। ... মনে হয় বাংলা ভাষায় পদ্যের ছন্দে যত রকম আওয়াজ যত রকম সুর বের করা সম্ভব সব তিনি নিঃশেষ করে দিয়েছেন তাঁর গানে। কলাকৌশল বিস্ময়কর, কিন্তু চায়ের গানের মতো দু'একটি ঈষৎ লঘু রসের রচনা ছাড়া কোথাও মনে হয় না কোনো কৌশল আছে, মনে হয় এরা আপনিই হয়েছে, বিশ্বপ্রকৃতির বিভিন্ন ভঙ্গির মতো একটি আদিম অনির্বচনীয়তা নিয়ে এরা কাছে এসে দাঁড়ায়। আমার মনে হয় এখানেই কবিতার উপর গানের জিৎ। কবিতা যত ভালোই হোক তার কলাকৌশল দেখতে পাই, কলকব্জাগুলোর নামও জানি, কবি কী করতে চেয়েছেন ও কী করেছেন তা বুঝতে পেরে তাঁর দক্ষতার তারিফ করি শত মুখে, কিন্তু গানে -- রবীন্দ্রনাথের গানের মতো গানে -- সমগ্র জিনিষটি এক ধাক্কায় এক সঙ্গে হৃদয়ে এসে ঢোকে, ব্যাপারটা কী হলো তা বোঝবার সময় পাওয়া যায় না। বিশুদ্ধ কবিতা ব'লে কিছু যদি থাকে তা এই গান।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১০  


সবুজ সভার সভ্যগণ হপ্তায় একদিন করে আমাদের কাছে বিকেলে আসতেন। কিঞ্চিৎ জলযোগের পর কখনো সাহিত্যালোচনা কখনো সংগীতচর্চা হত। শুনতে পাই যে শ্রী সত্যেন্দ্রনাথ বসু [বৈজ্ঞানিক] এসরাজ বাজাতেন, কিন্তু আমি তাঁর এসরাজ কখনও শুনিনি। মণ্টু [দিলীপ কুমার রায়] যখন আসত, সে গান করত। বাড়ির মেয়েরাও কখনো কখনো করত। আমরা বাড়ির মেয়েরা, বলা বাহুল্য, সাধারণত রবিকাকার গানই করতুম। রমার [রমা কর] মুখে 'এই  যে কালো মাটির বাসা' আর 'আমার একটি কথা বাঁশিই জানে', অপুর [অপর্ণা চৌধুরী, প্রমথ চৌধুরীর ভাইঝি] মুখে 'যদি প্রেম দিলে না প্রাণে' আর 'দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার' গানগুলি শুনতে লোকের খুবই ভালো লাগত। নাটোরের মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ এই রকম এক আসরে 'শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে' গানটি শুনে বলেছিলেন, 'রবিবাবু গীতাঞ্জলির জন্য একবার নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন, এই গানটির জন্য তাঁকে আর একবার প্রাইজ দেওয়া উচিত।' (৩৫)  
     --ইন্দিরা দেবী, স্মৃতিসম্পুট ৩য় খণ্ড, বিশ্বভারতী, ২০০১  


রবীন্দ্রনাথ নানান সুরে গান বেঁধেছেন, কিন্তু তাঁর সেই সহস্র সহস্র গানগুলির মধ্যে যদি কোনো একটি রাগের সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় তো সেটি হচ্ছে ভৈরবী। সুরসৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ভৈরবী-সিদ্ধ ছিলেন। তিনি প্রাচীন ভৈরবী রাগের অনুভূতি রেখে এক নব রাগ সৃষ্টি করলেন; রাগকর্তার নাম জড়িয়ে রাগের নাম-- যথা মিয়াকি তোড়ি, সুরদাসী মল্লার-- দেবার প্রথা অনুসরণ করে তার নাম দিয়েছি "রাবীন্দ্রী-ভৈরবী"। রবীন্দ্রনাথের সুরমিশ্রণ যেমন ভাবধর্মী, রাগধর্মী নয়, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীও তেমনি ভাব প্রকাশের তাগিদে সৃষ্টি হয়েছে।

রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে আশাবরী, ধানশ্রী ও টোড়ি -- এই তিনটি রাগের আসা যাওয়া কানে বাজে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবী একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাগ, এটি রবীন্দ্রনাথের অভিনব সৃষ্টি। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীর বিশেষত্বগুলি একটু তলিয়ে দেখতে পারলেই ধরা পড়ে যায়। প্রথমত, গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে, ভৈরবীতে এটি হয় না। আর গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে বলে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে কানাড়ার ছায়া পড়েছে, তবে সেটি কিন্তু শুদ্ধ কানাড়ার, দরবারী কানাড়ার নয়। দ্বিতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে যে 'ধা'টি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি হচ্ছে ভৈঁরোর 'ধা'। ভৈরবীর 'ধা'র সঙ্গে তার শ্রুতির পার্থক্য আছে। উদাহরণ স্বরূপ ' হে চিরনূতন ' গানটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। 'চিরনূতন'-এর 'চিরনূ' পর্যন্ত ভৈরোঁর 'ধা'-এ বাঁধা। তৃতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে নিরঙ্কুশ 'রে', 'গা', 'ধা' ও 'নি' পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় একমাত্র রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীত পর্যায়ের গানগুলিতে। চতুর্থত, এই স্বরব্যবস্থাকে বিকৃত পর্দার উদাহরণ বলে পার পাওয়ার উপায় নেই কেন না, বিকৃত পর্দার একটা সীমা আছে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে এই ধরনের পর্দা অনেক বেশি আছে।  এছাড়া রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে শুদ্ধ 'রে', শুদ্ধ 'গা' আর কড়ি 'মা'র ব্যবহার সহজেই ধরা পড়ে।

রবীন্দ্রনাথের প্রায় তিন হাজার [?] গানের মধ্যে এই নতুন রাগে বাঁধা প্রায় তিনশো গান আছে। [এইখানে সৌম্যেন্দ্রনাথ ৫০টি গানের তালিকা দিয়েছেন; আমরা এই আলোচনা খণ্ডটি সব ভৈরবী গানেই প্রয়োগ করলাম]
  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬