গীতবিতান-GITABITAN
কবে তুমি আসবে ব'লে রইব না বসে, আমি চলব বাহিরে।

Book Cover

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  আষাঢ় ১৩১৮ (১৯১১)
কবির বয়স: ৫০
প্রকাশ: সুপ্রভাত পত্রিকা |
পরিচয় (১৩৪৮)।
Poems 62
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রেম-প্রেমবৈচিত্র্য; ২৯০/৩৮৬
রাগ / তাল: কীর্তন / দাদরা
স্বরলিপি: গীতপঞ্চাশিকা (১৩২৫); স্বরবিতান ১৬ (গীতপঞ্চাশিকা)
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
সম্ভবত শিলাইদহে রচিত। কিন্তু প্রবাসীতে পাঠানো পাণ্ডুলিপিতে বর্জিত।  
প্রচলিত ও গীতপঞ্চাশিকার (১৩২৫) মধ্যে সুরভেদ আছে।  
'পুণ্যস্মৃতি' -সীতা দেবী  

আলোচনা

'অচলায়তন' প্রথমে প্রবাসীতে ছাপা হয়। পাণ্ডুলিপিখানি যখন বাবার [প্রবাসী সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপধ্যায়] কাছে আসিল তখন দেখিলাম কবি দুইটি গান কাটিয়া দিয়াছেন। একটি গান, ' কবে তুমি আসবে ব'লে রইব না ব'সে, আমি চলব বাহিরে '। ইহা পরে অধুনালুপ্ত 'সুপ্র্ভাত' মাসিকপত্রে আবার দিবালোক দেখিয়াছিল এবং প্রচুর সমাদর লাভ করিয়াছিল। দ্বিতীয়টি আর কোথাও কোনোদিন দেখি নাই।  গানটি এই--

       বাজে রে বাজে রে ঐ রুদ্র তালে বজ্রভেরী

[গানটি গীতবিতান তৃতীয় খণ্ডে নাট্যগীতি পর্যায়ে অচলায়তন উপপর্যায়ে সংগৃহীত। গ্রন্থপরিচয়ে সীতাদেবীর এই বর্ণনার উল্লেখের পর বলা হয়েছে যে "পাণ্ডুলিপি দেখিয়া অভ্রান্ত পাঠ-নির্ণয় সম্ভবপর হওয়ায়, গানটি এখন গীতবিতানের যথোচিত স্থানে সন্নিবিষ্ট হইল। এই গান রবীন্দ্রসদনের আর-এক পাণ্ডুলিপিতেও পাওয়া যায়; কোনো পাণ্ডুলিপিতেই বর্জন-চিহ্নিত নয়; ইহার স্থান অচলায়তন নাটকে দ্বিতীয় দৃশ্যের শেষে।" ] (২৩)  
     --সীতা দেবী, পুণ্যস্মৃতি, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৩৮৫  



বিখ্যাত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কতগুলো নতুন রাগ রচনা করেছেন। তার মধ্যে হেমন্তরাগ খুব প্রসিদ্ধ।... সোহিনী রাগের সহিত রিখাব ও পঞ্চম (অবরোহণে) যোগ ক'রে ওস্তাদ এই রাগের সৃষ্টি করেছেন এবং এই রিখাব ও পঞ্চমের ব্যবহার অতি স্বাভাবিক ও সুন্দর হযেছে, এজন্যে এই নতুন রাগের সৃষ্টি সার্থক। যাঁরা রবীন্দ্রনাথের ' আধেক ঘুমে নয়ন চুমে ' গানটি শুনেছেন তাঁরা সুরটি বিশ্লেষণ করলে দেখবেন এতে সেই হেমন্ত রাগই রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় নিজস্ব ভঙ্গীতে প্রকাশ পেয়েছে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ রাগ, রাগিণী, মেল, জাতি, আরোহ, অবরোহ, বাদী, সম্বাদী বিচার ক'রে যা সৃষ্টি  করেছেন রবীন্দ্রনাথ শুধু সহজ সৌন্দর্যানুভূতি থেকে তাই সৃষ্টি করেছেন। ইওরোপীয় সংগীতে D Major Keyতে দু'টি sharp ব্যবহার হয়। আমাদের ভারতীয় সংগীতে কল্যাণ ঠাটে একটি কড়ি (sharp) ব্যবহার হয়। একাধিক  কড়ির ব্যবহার নেই। রবীন্দ্রনাথের ' আমার একটি কথা ' এই গানটিতে তিনি পাশাপাশি দুই রিখাব লাগিয়েছেন। এই দুই রিখাবের কোমল রিখাবটি আর কিছু নয়, D Major Key-র C sharp (কড়ি স)। ইওরোপীয় সংগীতপদ্ধতির এই প্রয়োগ এখানে খুবই নিপুণ। অবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত বাউল ঢংয়ের সুর ' কবে তুমি আসবে ব'লে ' এবং বিখ্যাত ভাটিয়ালি সুরের গান ' গ্রাম-ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ ' এই দুটি গানেই আ--আ--আ ব'লে যে টান আছে তাতে স্বরোচ্চারণ সম্পূর্ণ ইওরোপীয় পদ্ধতি অনুযায়ী। অনেকে বলতে পারেন বাউল ভাটিয়ালির সঙ্গে ইওরোপীয় ঢংয়ের সংমিশ্রণ হাস্যকর, কিন্তু গান দু'টি মন দিয়ে শুনলে বোঝা যাবে যে এক্ষেত্রে তা তো হয়ইনি, বরং এই মিশ্রণের ফল অতি সুন্দর হয়েছে। এতে বোঝা যায় যে বড় প্রতিভার নিপুণ হাতে বিভিন্ন আপাতবিরোধী জিনিষেরও মিশ্রণের ফলে নতুন সৌন্দর্য জন্ম নেয়।  
     --হিমাংশুকুমার দত্ত, সুরকার রবীন্দ্রনাথ, কবিতা রবীন্দ্র সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৪৮,  সম্পাদক: বুদ্ধদেব বসু (পুনর্মুদ্রণ ১৪০৯)  


টমাস মানের মতো শ্রেষ্ঠ একজন আধুনিককেও বলতে হয় তাই: জীবনের প্রধান তিনটি বাণীর একটি হচ্ছে এই যে, মানুষ যখন সত্যি-সত্যি নিজেকে জানে তখনই সে হয়ে ওঠে আরেকজন মানুষ। প্রতিদিনের মাঝখানে বসে আমরা সেই আরেকজন মানুষ হতে পারি না অবশ্য। হতে পারি না, কিন্তু হতে চাই। এক-একটা মুহূর্ত আমরা পেতে চাই যেখানে আমরা নিজের মধ্যেই দেখতে পাবো এই আরেকজন মানুষকে। ইনি কোনো ঈশ্বর নন, ইনি কোনো অতিমানব নন, এ হলো আমার আমিরই মূল কেন্দ্র। সেই আমির দিকে আমার যেতে চাওয়ার এই বেদনা রবীন্দ্রনাথ জাগিয়ে তোলেন তাঁর কত গানে। তাই তাঁর এত প্রতীক্ষা, এত যাওয়া-আসা; এর কোনো ক্ষান্তি নেই, এর কোনো প্রাপ্তি নেই: 'কবে তুমি আসবে বলে' বসে থাকা নেই আর, আছে কেবল প্র্তিশ্রুতি: 'আমি চলব বাহিরে'। (১৯)  
     --শঙ্খ গোষ, এ আমির আবরণ, প্যাপিরাস, ১৯৮২  


 

 

২৯০

কবে তুমি আসবে ব'লে রইব না বসে,   আমি চলব বাহিরে।
শুকনো ফুলের পাতাগুলি পড়তেছে, খসে,   আর   সময় নাহি রে॥
                বাতাস দিল দোল্‌, দিল দোল্‌;
        ও তুই   ঘাটের বাঁধন খোল্‌, ও তুই খোল্‌।
     মাঝ-নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে তরী বাহি রে॥
আজ   শুক্লা একাদশী,   হেরো   নিদ্রাহারা শশী
ওই   স্বপ্নপারাবারের খেয়া একলা চালায় বসি।
       তোর   পথ জানা নাই, নাইবা জানা নাই--
       ও তোর   নাই মানা নাই, মনের মানা নাই--
    সবার সাথে চলবি রাতে সামনে চাহি রে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

62

I   SHALL not wait and watch in the house
     for thy coming,
but will go forth into the open,
for the petals fall from the drooping flowers
     and time flies to its end.
The wind is up, the water is ruffled.
Be swift and cut the rope,
let the boat drift in the midstream,
     for the time flies to its end.

The night is pale, the lonely.moon is plying
     its ferry of dreams across the sky.
The path is unknown, but I heed it not.
My mind has the wings of freedom
and I know that I shall cross the dark.
Let me but start on my journey, for the
     time flies to its end.
  

Poems: a collection of one hundred and thirty poems, all but fifteen of which have been translated by the Poet himself. Edited by Krishna Kripalani, Amiya Chakrabarty and others.  
     --Rabindranath Tagore, Poems, Visva-Bharati, 1942  



১৯১১ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  শান্তিনিকেতনে পঞ্চাশতম জন্মোৎসব। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার (এখন থেকে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের মুখপত্র) সম্পাদনার ভার গ্রহণ। 'অচলায়তন' ও 'ডাকঘর' রচনা। 'জীবনস্মৃতি'র ধারাবাহিক প্রকাশ শুরু। প্রকাশ: শান্তিনিকেতন ১২-১৩, ছোটগল্প (ছোটদের উপযোগী)।

বহির্বিশ্বে: ১২ই ডিসেম্বর পঞ্চম জর্জের অভিষেক এবং সেই উপলক্ষ্যে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। ২৭শে ডিসেম্বর কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে 'জনগণমন" গীত। মোহনবাগান আই. এফ. এ শীল্ড জিতলো ব্রিটিশ দলকে হারিয়ে। মাঞ্চু রাজবংশের পতন ও সান-ইয়াৎ-সেনের উদ্যোগে চীনে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। হলিউডে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত। বাইশ খণ্ড বিশ্বকোষ সমাপ্ত। ভগিনী নিবেদিতার মৃত্যু।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


হাস্যরসিক ও গায়ক নলিনীকান্ত সরকার একবার নাট্য্কার কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের বাড়ি ঘরোয়া আসরে গান গাইতে এসেছেন। কালীপ্রসন্ন প্রথমেই বলে উঠলেন, দেখ নলিনী, তুমি বাপু আবার ওই রবি ঠাকুর-টবি ঠাকুরের গান গাইতে বোসো না যেন। ও যে কি মাথামুণ্ডু লেখে তা বুঝিনে। ও গান চলিবে না এখানে। নলিনদা কয়েকটি নানা রকমের গান গেয়ে ধরলেন, '... আজ শুক্লা একাদশী...' [কবে তুমি আসবে বলে]।

গান শুনে কালীপ্রসন্ন বলে উঠলেন, আহা চমৎকার চমৎকার। এই হচ্ছে আসল গান। এমন গান তোমাদের রবি ঠাকুরের মাথায় আসবে। তা এটি কার গান গাইলে নলিনী? নলিনীবাবুর উত্তর, আজ্ঞে এটি রবীন্দ্রনাথেরই গান।

বৃদ্ধ নাট্যকার খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন, তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন, নলিনী তুমি ওর আর কোনও গান জানো?  
     --সুধীর চন্দ, রবীন্দ্রসংগীত: গ্রহণ, বর্জন ও ভাঙন, দেশ পত্রিকা, ২রা মে, ২০১১