গীতবিতান-GITABITAN
সভায় তোমার থাকি সবার শাসনে

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২ ফাল্গুন ১৩২০ (১৯১৪)
কবির বয়স: ৫২
রচনাস্থান: শিলাইদহ
প্রকাশ: গীতিমাল্য র-র ১১ |
Presidency College Magazine, March 1925.
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-বন্ধু; ৮৮/৪১
রাগ / তাল: কাফি / দাদরা
স্বরলিপি: গীতলেখা ১; স্বরবিতান ৩৯
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ

আলোচনা

অজিতকুমার [চক্রবর্তী] লিখেছেন: "ইংলণ্ডে গুণীসমাজ কবির গলায় যে প্রশংসার মালা পরাইয়া দিয়ছিলেন সে সম্বন্ধে একটিমাত্র গান গীতিমাল্যে আছে-- '   এ মণিহার আমায় নাহি সাজে '।" একটি মাত্র গান? প্রত্যক্ষত হয়তো তাই; কিন্তু একটু ভিতরদিক থেকে দেখলে মনে হবে যে 'গীতিমাল্য'র উত্তরাংশের একটা বড়ো আবেগই আসছে বাইরের মত্ততা থেকে নিজের কেন্দ্রকে বাঁচিয়ে রাখবার এক সতর্ক বোধ থেকে। এভাবে দেখলে বোঝা যায় যে এ গানটি কোনো বিচ্ছিন্ন গান নয়, তার ঠিক ছ-মাস পরে লেখা এসব গানেও আছে ওই একই অনুভব:' সভায় তোমার থাকি সবার শাসনে '।

সভা আর ঘরের এই বিরোধে, সবার আর একার এই বিরোধে যে 'গীতিমাল্য'র অনেকগুলি গান ভরে আছে, তা একেবারে আকস্মিক নয় নিশ্চয়। 'এ মণিহার' গানটির পরদিনই কবি লিখবেন "মনে হল আকাশ যেন কইল কথা কানে কানে" ['   ভোরের বেলা কখন এসে ']। সেই নিভৃত ভোরের সংলাপ থেকে তিনি অর্জন করে নিতে চাইবেন তাঁর জীবনীশক্তি, ঘরকে তিনি করে তুলবেন তাঁর আত্মস্থতার মুদ্রা। তাই জ্যোৎস্নারাতে সবাই যখন বনে চলে যায় তখনো তাঁকে বহু যত্নে সাজিয়ে রাখতে হবে তাঁর নিরালার ঘরখানি, যেন কোনো প্রেরণার মুহূর্তের প্রতীক্ষায়, "যদি আমায় পড়ে তাহার মনে" ['   আজ জ্যোৎস্নারাতে   ']।  একেবারে ভিন্ন দেশের এক আধুনিক কবি জাঁ কক্‌তো, তাঁর সৃষ্টিপ্রেরণার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে কবি আছেন তাঁর রাত্রির অধিকারে, কোনো এক গহন আবির্ভাবের জন্য তাঁকে ধুয়ে মুছে রাখতে হয় ঘর। অমলেরও সামনে এসে রাজকবিরাজ বলেছিলেন: "এই ঘরটি রাজার আগমনের জন্যে পরিষ্কার করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখো।" এ হলো তবে সেইসব ঘর, যেখানে দাঁড়িয়ে জীব্নকে আর সুন্দরকে তার অন্তঃস্বরূপে দেখতে পাওয়া যায়। এই দেখা থেকে জেগে ওঠে মৃত্যু, মৃত্যুর ভূমিকায় জীবন, এই দেখা থেকেই জেগে ওঠে শিল্প। মৃত্যু আর শিল্প এইভাবে কখনো এক জায়গায় এসে মিলে যায়। আত্মসৃষ্টির সঙ্গে 'গীতিমাল্য'-র গানগুলি সেই শিল্পসৃষ্টিরও নেপথ্য্ঘর। তাই এত বেশি গানের গান ছড়িয়ে আছে এই বইটিতে, তাই এখানে এমন করে তিনি বলতে পারেন যে '   প্রাণে গান নাই ' বা "প্রকাশ করি, আপনি মরি" ['   সে দিনে আপদ আমার ']। (৪৮)  
     --শঙ্খ ঘোষ, এ আমির আবরণ, প্যাপিরাস, ১৯৮২  



 

 

৮৮

          সভায় তোমার থাকি সবার শাসনে,
আমার     কণ্ঠে সেথায় সুর কেঁপে যায় ত্রাসনে॥
          তাকায় সকল লোকে,
তখন      দেখতে না পাই চোখে
কোথায়    অভয় হাসি হাসো আপন আসনে॥
          কবে আমার এ লজ্জাভয় খসাবে,
তোমার     একলা ঘরের নিরালাতে বসাবে।
          যা শোনাবার আছে
গাব       ওই চরণের কাছে,
দ্বারের     আড়াল হতে শোনে বা কেউ না-শোনে॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯১৪ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  'বলাকা' রচনা। 'বিচিত্রা সভা' প্রতিষ্ঠা। 'অচলায়তন' অভিনয়, গুরুর ভূমিকায় কবি। সপরিবারে রামগড়ে সময় কাটালেন কিছুদিন। প্রকাশ: উৎসর্গ, স্মরণ, গীতিমাল্য, গান, ধর্মসঙ্গীত, গীতালি, The King of the Dark Chamber, One Hundred Poems of Kabir, The Post Office.  

বহির্বিশ্বে: আমেরিকার সান্‌ ফ্রান্‌সিস্কো শহরে স্থাপিত গদর সমিতির এক অভিযান ও সরকারের সঙ্গে সঙ্ঘর্ষে ১৭ জনের মৃত্যু। কলকাতায় অস্ত্রব্যবসায়ী রডা কোম্পানী লুট করে বিপ্লবীরা অনেক অস্ত্র সংগ্রহ করেন। ভারত ও চীনের সীমান্ত নির্দেশক ম্যাকমোহন লাইন প্রস্তাবিত। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে ইণ্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের সূচনা। প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় মাসিক 'সবুজপত্র'-এর প্রকাশ। পানামা ক্যানাল খুললো। ৪ঠা অগাস্ট ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো -- প্রথম মহাযুদ্ধের শুরু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: গ্রোথ অফ দি সয়েল (হামসুন), ডাবলিনার্স (জয়েস), দি কাপ অফ লাইফ (বুনিন)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



শুধু একটি আবেগ বহন করে, শুধু বিশেষ একটি ব্যাকুলতা মনে জাগায়, এ গানগুলি এই জাতের রচনা। কিছু বলে না, অথচ সবই বলে। এমন বিশুদ্ধ আবেগ যে ভাষায় সম্ভব তা কি আমরা কখনো জানতুম। সংগীতের কাজ করিয়ে নিয়েছেন ভাষাকে দিয়ে, এত বড়ো শিল্পী তিনি। আমরা জানি সংগীতেরই ক্ষমতা আছে আমাদের মনের সেই প্রদেশ স্পর্শ করবার, যা সব চেয়ে ঘন, নিভৃত ও দুর্গম, গদ্যের যা অনধিগম্য, কাব্য যার প্রান্তটুকু মাত্র কখনো ছোঁয় কখনো ছোঁয় না; যে কথা হঠাৎ মনে প'ড়ে হারিয়ে যায়, ঘুম আর জেগে-ওঠার মধ্যে উজ্জ্বল অলীক সেতু রচনা করে, যে কথা মনে হয় যেন কতকাল আগে কোথায় শুনেছিলাম, যা ছায়াময়, সূক্ষ্ম-বিসর্পিত, অস্পষ্ট-স্মৃতি-বিজড়িত, সে-কথা এক সংগীতই আমাদের শোনাতে পারে -- এ কথা আমরা জানি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ভাষায় শুনিয়েছেন সে-কথা: কাব্যের স্বাদে যে অভ্যস্ত, তার কাছে রবীন্দ্রনাথের গান শোনা যতখানি রোমাঞ্চকর, তাঁর গান পড়া তার চেয়ে কম নয়; তাঁর গান পড়তে-পড়তেও সেই রহস্যময় জগতের দুয়ার খুলে যায় যা আমাদের প্রত্যেকের মনের মধ্যেই আছে, অথচ দৈনন্দিন জীবনে যাকে প্রায়ই ভুলে থাকি। আমার নিজের কথা বলতে পারি, রবীন্দ্রনাথের তিন-চারটির বেশি গান আমি এক সঙ্গে পড়তে পারিনে, হৃৎস্পন্দন  অত্যন্ত দ্রুত হয়, গলা যেন আটকে আসে।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১১