গীতবিতান-GITABITAN
স্বামী, তুমি এসো আজ অন্ধকার হৃদয়মাঝ-

Certificate

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৯৩ (১৮৮৭)
কবির বয়স: ২৫
প্রকাশ: ১৮৯৩ , গানের বহি (ব্রহ্ম)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-বিবিধ; ৪১৪/১৬৯
রাগ / তাল: বেহাগ / চৌতাল
স্বরলিপি: ব্রহ্মসঙ্গীত ৬; স্বরবিতান ২৭
স্বরলিপিকার: কাঙালীচরণ সেন; ঐ
পাদটিকা:
হিন্দি-ভাঙা গান (ধ্রুপদ), 'সাঁই তো ন আওয়ে আজ (বেহাগড়া)', মূল গীতি/সুরকার-তানসেন, প্রাপ্তিস্থান - গীতসূত্রসার ১।
পাঠভেদ:
অন্ধকার হৃদয়মাঝে  --[ গীবিন ] ১ম সং (১৩৩৮)।  
[ র-ত্রি ];[ র-ভা ]  

আলোচনা

আদর্শ গান:

    বেহাগ/চৌতাল

সাঁই তো ন আবে আজ অঁধিরাত মাঝ মাঝ,
সিংহিনী জগাবে সিংহ কানন পুকার॥
চন্দন ঘসত ঘস, ঘস গই নখ মেরা
বাসনা ন পুরত মারগকী নেহার॥
ধিক ধিক জনম ঔর জগমে জীবন মেরা,
জবতক ন আবে নাথ পকড়ি বেণু বারবার॥
জো নয়নকো অঞ্জন মেরী, বিন তাকো বহে বারি,
তানসেন অন্তর বাণী ধুরপদ পুকার॥
  -- তানসেন  
     --গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, গীত প্রবেশিকা  



আমার অনেকদিন থেকেই ইচ্ছে ছিল রবীন্দ্রনাথ গানের ক্ষেত্রেও কিরকম পরকে আপন করে নিতে পেরেছেন -- চলিত কথায় যাকে আমরা তাঁর গান ভাঙা বলি -- তার পরিধি কত বিস্তৃত, এবং তাতেও কিরকম অপরূপ কারিগরি দেখিয়েছেন, তার একটি স-দৃষ্টান্ত আলোচনা করি।

গান ভাঙা দুরকমে হতে পারে-- এক, পরের সুরে নিজের কথা বসানো। এ ক্ষেত্রে পরের সুরে নিজের কথা বসাবার দৃষ্টান্তই বেশি পাওয়া যায়। পরের কথায় সুর দেবার দৃষ্টান্ত অতি বিরল; যদিও একেবারে নেই, তা নয়। এই প্রথম শ্রেণীকে আমি সুবিধার্থে দুই ভাগে বিভক্ত করেছি: এক, অ-বাংলা ভাষার গান ভাঙা; দুই, বাংলা ভাষার গান ভাঙা।

আদিব্রাহ্মসমাজের ব্রহ্মসংগীতগুলির কথার সম্পদ বাদ দিয়ে শুধু সুরের দিক থেকে আলোচনা করলেও আমাদের হিন্দুসংগীতের একটি বিপুল রত্নভাণ্ডারের পরিচয় ও ইতিহাস পাওয়া যাবে। আজ যে ভাঙা গানের আলোচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছি, তারও অধিকাংশ এই ভাণ্ডারেই সঞ্চিত। কবি নিজে যেখানে ভালো সুরটি শুনেছেন, অথবা অন্য লোকে দেশ-বিদেশ থেকে যে-সব গান আহরণ করে তাঁকে এনে দিয়েছেন, তার প্রায় সবগুলিই তিনি পূজার বেদীতে নিবেদন করেছেন, এ বললে অত্যুক্তি হয় না। মাঘোৎসবে নতুন নতুন গান সরবরাহের তাগিদ তার অন্যতম কারণ হতে পারে।  
     --ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, রবীন্দ্রসংগীতের ত্রিবেণীসংগম, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলিকাতা, ১৩৯৮  


বেহাগ। রবীন্দ্রনাথ বেহাগের সুরে যত সুন্দর-সুন্দর সুরনির্মাণ করেছেন, আর কোনো রাগ সম্ভবত তার পাশে দাঁড়াতে পারে না। সংখ্যায় না হলেও গুণে বুঝি বেহাগই কবির প্রিয়তম, আমাদের কাছে বেহাগই বুঝি সবচেয়ে বেশি নম্বর পাবে। গানের তালিকায় না গিয়ে আমরা বরং বেহাগের রাবীন্দ্রিকতার খোঁজেই যাই। রবীন্দ্র-বেহাগে খাম্বাজ প্রায়ই চুপিসাড়ে ঢুকে পড়ে এবং তাকে আর ধরাই যায় না, কিন্তু বেহাগত্ব থাকে অক্ষুণ্ণ। এটা বাংলা বেহাগেরই একটা চরিত্র। শুধু একটিমাত্র স্বরের স্থান পরিবর্তনে এটি ঘটে যায় -- অবরোহতে প্রধানত শুদ্ধ নিষাদের স্থানে কোমল নিষাদ, এতে সুরের আবেদনে মরমিত্বের মাত্রা এসে যায়। রবীন্দ্রনাথের বেহাগের পর বেহাগে এই ব্যাপারটা ঘটে থাকে। এই কোমল নিষাদ হাজির হয় গানের অন্তরা বা সঞ্চারীতে। ...  অনেকে এই সুরকারুটিকে বিহাগড়া বলতে পারেন।  
     --সুধীর চন্দ, বহুরূপী রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, ২০০৫  


 

 

৪১৪

  স্বামী, তুমি এসো আজ অন্ধকার হৃদয়মাঝ--
  পাপে ম্লান পাই লাজ, ডাকি হে তোমারে॥
ক্রন্দন উঠিছে প্রাণে,   মন শান্তি নাহি মানে,
  পথ তবু নাহি জানে আপন আঁধারে॥
ধিক ধিক জনম মম,   বিফল বিষয়শ্রম--
  বিফল ক্ষণিক প্রেম টুটিয়া যায় বারবার।
সন্তাপে হৃদয় দহে,   নয়নে অশ্রুবারি বহে,
  বাড়িছে বিষয়পিপাসা বিষম বিষবিকারে॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৮৭ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের গানে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে পাঁচশো টাকার চেক দিয়ে পুরস্কৃত করেন। হিন্দু সমাজে বালবিবাহ প্রথার সমালোচনা করে প্রবন্ধ পাঠ ও চন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে বিতর্ক। সপরিবারে দার্জিলিং গিয়ে 'মায়ার খেলা' লেখা শুরু। প্রকাশিত বই: রাজর্ষি, চিঠিপত্র

বহির্বিশ্বে: বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বভাষা এস্‌পারেণ্টোর উদ্ভাবন। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: সরস্বতীচন্দ্র(গুজরাটি ঔপন্যাসিক ত্রিপাঠী), এ স্টাডি ইন স্কারলেট (ডয়েল), দি ফাদার্স (স্ট্রিণ্ডবার্গ), পোয়েসিজ (মালার্মে)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



(ধ্রুপদ) জিনিসটা এত ভালোবেসেছিলেন বলেই বোধ হয় একের পর এক এত আশ্চর্য সব ধ্রুপদাঙ্গ গান রচনা করে ব্রহ্মসঙ্গীতকে তিনি সমৃদ্ধ করতে পেরেছিলেন। ধ্রুপদের বাণী যেভাবে ভাবপ্রকাশে সহায়তা করে, সেটা স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথকে আকর্ষণ করেছিল। বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে তাঁর রচিত ধ্রুপদ গানের মতো সর্বগুণসম্পন্ন রচনা কমই আছে। এর অনেকগুলিতেই অবশ্য তিনি হিন্দির ছাঁচ অবিকল বজায় রেখে কেবলমাত্র তাতে হিন্দির জায়গায় বাংলা কথা বসিয়েছেন। কিন্তু সেখানেও তিনি যে শুধু কাব্যগুণেই মূল রচনাকে অতিক্রম করে গেছেন তা নয়। ভাবের সঙ্গে শব্দের হ্রস্বদীর্ঘ স্বরব্যঞ্জনের সুনিপুণ প্রয়োগে সাঙ্গীতিক ধ্বনিবিচারেও হিন্দিকে অনায়াসে ছাড়িয়ে গেছেন।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।  


এই সময় [১৮৮৬] তাঁর গানও শুনেছি। কণ্ঠস্বরের এতাদৃশ ঐশ্বর্য আমি পূর্বে কখনও শুনিনি। বিলেতি বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে দুটি যন্ত্র আমাকে মুগ্ধ করত। একটি 'cornet', অপরটি 'cello'; তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল 'cornet--জাতীয়, 'cello'-জাতীয় নয়। প্রাণের উচ্ছ্বাস এ কণ্ঠস্বরের বিশেষত্ব ছিল। তিনি একটি হিন্দি গান গেয়েছিলেন, যা আমার আজও মনে আছে। তার প্রথম কথাগুলি "জন ছুঁইয়া মোরি বঁইয়া নাগরওয়া"। এ গানটির সুর বোধহয় তোড়ী, নয়ত সেই ঘরের। এ রাগে গলা খোলবার ও তোলবার যথেষ্ট অবসর আছে। আর তাঁর সুর তারার পঞ্চম পর্যন্ত অবলীলাক্রমে উঠে যেত। কিন্তু সে-সময়ে লক্ষ্য করি যে, তিনি তানের পক্ষপাতী ছিলেন না, খেয়ালের বে-পরোয়া তানের ও টপ্পার অবিশ্রান্ত কম্পনের সাধনা তিনি করেননি। সঙ্গীতের এ দুই কাজ বাঙ্গালীদের কোনকালেই শ্রোত্র-রসায়ন নয়, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কানে এ জাতীয় টপ্পাখেয়াল শ্রুতিকটু। সুর যখন কথার সঙ্গে সন্ধিবিচ্ছেদ করে' যন্ত্র-সঙ্গীতের বৃথা নকল করে, কবির কানে তা গ্রাহ্য হয় না। আমি বুঝলুম যে, ধ্রুপদ অঙ্গের গানেই তাঁর কান অভ্যস্ত।  
     রবীন্দ্রনাথের স্বরচিত গানের বিশেষত্বও এই। তাঁর অন্তরের অদম্য প্রাণশক্তি সঙ্গীতশাস্ত্রের বিধিনিষেধ অতিক্রম করতে বাধ্য।  
     --প্রমথ চৌধুরী, রবীন্দ্র-পরিচয়, কবিতা রবীন্দ্র সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৪৮,  সম্পাদক: বুদ্ধদেব বসু (পুনর্মুদ্রণ ১৪০৯)  


আগে বেহাগে কোমল 'নি' ব্যবহার করা হত আরোহণ ও অবরোহণে, হালে হচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথ বেহাগ সুরে বাঁধা তাঁর অনেক গানেই কোমল 'নি' ব্যবহার করেছেন। যেমন প্রথম বয়সের রচনা ' ওগো শোনো কে বাজায় ' গানটিতে। আবার শুদ্ধ নিখাদ দিয়ে তৈরি করেছেন অনেক গান, যেমন ' মেঘ বলেছে যাবো যাবো ', ' আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে ' প্রভৃতি গান। বেহাগের প্রচলিত স্বরবিন্যাস হচ্ছে পা হ্মা গা মা গা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেহাগ সুরের গানে এটি একেবারে পাওয়া যায় না। অনেক গানে কড়িমধ্যম সম্পূর্ণ বর্জিত, যেমন ' স্বামী তুমি এসো আজ ' গানটিতে। কোনো কোনো গানে কড়িমধ্যম নেই কিন্তু শুদ্ধ 'নি'-র সঙ্গে কোমল 'নি'র ব্যবহার আছে। বেহাগ সুরের কিছু গানে রবীন্দ্রনাথ বেহাগ সুরের সঙ্গে খাম্বাজ মিশিয়েছেন, যেমন, ' [আজি তোমায়] আবার চাই শুনাবারে ' গানটিতে। (৪৭)  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬