গীতবিতান-GITABITAN
তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে, তুমি ধন্য ধন্য হে।

null

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩০৬ (১৮৯৯)
কবির বয়স: ৩৮
প্রকাশ: ফাল্গুন ১৩০৬ , তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা |
কাব্যগ্রন্থ ৮ (ব্রহ্ম)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-বিবিধ; ৫০০/১৯৮
রাগ / তাল: খাম্বাজ / একতাল
স্বরলিপি: ব্রহ্মসঙ্গীত ১; স্বরবিতান ৪
স্বরলিপিকার: কাঙালীচরণ সেন; ঐ
পাদটিকা:
হিন্দি-ভাঙা গান (খেয়াল), 'আজ শ্যাম মোহলিয়ে', মূল গীতি/সুরকার- সুরদাস, প্রাপ্তিস্থান - গীতপরিচয় (অশুদ্ধ পাঠ)।  
পাঠভেদ:
তুমিই ধন্য ধন্য হে - [ গীবিন ] ১ম সং (১৩৩৮)।  
[ র-ত্রি ];[ র-ভা ]  

আলোচনা

আদর্শ গান:

   খাম্বাজ/  একতাল (মধ্যলয়)

আজ শ্যাম মোহ লগি বাঁসরী বজায় কে
বাঁসুরী বজায় কাহ্না মুরলী বজায় কে॥
    হরি হরি সব করত জাত
    গাগরি শির ধরত জাত
    নীর নার ভরণ গয়ি
    সুখ ন রহি সরীর কে॥

    -- সুরদাস

[সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের "গীত পরিচয়"-তে সামান্য পাঠভেদ আছে: মোহ লিয়ে, হর হর, শরীর কী।]  
     --সুরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী, সঙ্গীত প্রবেশ-১  



রবীন্দ্রনাথ বরাবরই তাঁর গানের সুরে কর্ড প্রয়োগ এবং হার্মোনাইজেশনের কাজে উৎসাহ দিতেন। এই সব উদ্যমের পাকা দলিল এখন অবশ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। ১৮৮৪তে সরলা দেবী " সকাতরে ওই কাঁদিছে " গানে কর্ড প্রয়োগের যে চেষ্টা করেন, রবীন্দ্রসংগীতকে হার্মনাইজ করবার সেটা সম্ভবত সর্বপ্রথম নিদর্শন [গানের তথ্য পশ্য]। আর একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন আছে ১৩০১ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের 'সাধনা' পত্রিকায়। এটি পূর্বোক্ত দৃষ্টান্তের মতন অপরিণত হাতের কাজ নয়। ঠাকুরবাড়ির পাশ্চাত্য সংগীতশিক্ষক সিঁয়োর মন্‌জাতো 'মায়ার খেলার'র অন্তর্গত " পথহারা তুমি পথিক যেন গো " গানটির স্বরসন্ধি রচনা করেন। সাধনা পত্রিকায় তার পূর্ণাঙ্গ স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছে এবং ভূমিকায় বলা হয়েছে:

    "কেহ কেহ আপত্তি করেন, মিশ্রমিল আমাদের সংগীতের অনুপযোগী, উহার দ্বারা আমাদের রাগরাগিণীর রূপ রক্ষা করা কঠিন। অলংকারের অতিপ্রাচুর্যে রূপের স্ফূর্তিহানি হয় বটে কিন্তু যথাযোগ্য্রূপে স্বল্প অলংকার প্রয়োগ করিলে কি তাদের রূপ আরও ফুটিয়া উঠে না?"

১৯২১-২২ সালের আনন্দসঙ্গীত পত্রিকায় এই জাতেয় কয়েকটি প্রয়াসের নিদর্শন পাওয়া যায় [বন্ধনীতে স্বরলিপিকার]: " আমি চিনি গো চিনি " (ইন্দিরা দেবী); "সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং" (সরলা দেবী) [অন্যান্য তথ্য বিভাগে 'মন্ত্রগান' পৃষ্ঠা পশ্য]; " বড়ো আশা করে " (অশোকা দেবী), " তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে "-- প্রভৃতি মুদ্রিত ও প্রকাশিত স্বরলিপিগুলিতে নিঃসন্দেহে এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কৌতূহল এবং সমর্থনের দ্যোতনা পাওয়া যায়। (৩৭)  
     --ভাস্কর মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ও পাশ্চাত্য সংগীত, রবীন্দ্রসংগীতায়ন ২, সুচিত্রা মিত্র ও সুভাষ চৌধুরী সম্পাদিত, প্যাপিরাস ১৯৯০  


আমার অনেকদিন থেকেই ইচ্ছে ছিল রবীন্দ্রনাথ গানের ক্ষেত্রেও কিরকম পরকে আপন করে নিতে পেরেছেন -- চলিত কথায় যাকে আমরা তাঁর গান ভাঙা বলি -- তার পরিধি কত বিস্তৃত, এবং তাতেও কিরকম অপরূপ কারিগরি দেখিয়েছেন, তার একটি স-দৃষ্টান্ত আলোচনা করি।

গান ভাঙা দুরকমে হতে পারে-- এক, পরের সুরে নিজের কথা বসানো। এ ক্ষেত্রে পরের সুরে নিজের কথা বসাবার দৃষ্টান্তই বেশি পাওয়া যায়। পরের কথায় সুর দেবার দৃষ্টান্ত অতি বিরল; যদিও একেবারে নেই, তা নয়। এই প্রথম শ্রেণীকে আমি সুবিধার্থে দুই ভাগে বিভক্ত করেছি: এক, অ-বাংলা ভাষার গান ভাঙা; দুই, বাংলা ভাষার গান ভাঙা।

আদিব্রাহ্মসমাজের ব্রহ্মসংগীতগুলির কথার সম্পদ বাদ দিয়ে শুধু সুরের দিক থেকে আলোচনা করলেও আমাদের হিন্দুসংগীতের একটি বিপুল রত্নভাণ্ডারের পরিচয় ও ইতিহাস পাওয়া যাবে। আজ যে ভাঙা গানের আলোচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছি, তারও অধিকাংশ এই ভাণ্ডারেই সঞ্চিত। কবি নিজে যেখানে ভালো সুরটি শুনেছেন, অথবা অন্য লোকে দেশ-বিদেশ থেকে যে-সব গান আহরণ করে তাঁকে এনে দিয়েছেন, তার প্রায় সবগুলিই তিনি পূজার বেদীতে নিবেদন করেছেন, এ বললে অত্যুক্তি হয় না। মাঘোৎসবে নতুন নতুন গান সরবরাহের তাগিদ তার অন্যতম কারণ হতে পারে।  
     --ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, রবীন্দ্রসংগীতের ত্রিবেণীসংগম, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলিকাতা, ১৩৯৮  


 

 

৫০০

  তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে, তুমি ধন্য ধন্য হে।
  আমার প্রাণ তোমারি দান, তুমি ধন্য ধন্য হে॥
পিতার বক্ষে রেখেছ মোরে,   জনম দিয়েছ জননীক্রোড়ে,
  বেঁধেছ সখার প্রণয়ডোরে, তুমি ধন্য ধন্য হে॥
তোমার বিশাল বিপুল ভুবন   করেছ আমার নয়নলোভন--
  নদী গিরি বন সরসশোভন, তুমি ধন্য ধন্য হে॥
হৃদয়ে-বাহিরে স্বদেশে-বিদেশে   যুগে-যুগান্তে নিমেষে-নিমেষে
  জনমে-মরণে শোকে-আনন্দে তুমি ধন্য ধন্য হে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৯৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: ২২ অগাস্ট বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু। শিলাইদহে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য পারিবারিক বিদ্যালয় শুরু করলেন। শান্তিনিকেতনে ৭ই পৌষের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রথম আচার্য হয়ে ভাষণ দিলেন রবীন্দ্রনাথ । অন্ধ কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেন। কুষ্টিয়াতে যে ব্যবসা শুরু করেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথকে নিয়ে, বলেন্দ্রনাথের মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে ম্যানেজার তহবিল তছরূপ করে, রবীন্দ্রনাথ জড়িয়ে পড়লেন ঋণজালে। 'ভারতী'র সম্পাদক পদ ছেড়ে দিলেন। প্রকাশ: কণিকা।

বহির্বিশ্বে: বেলুড় মঠ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা। লর্ড কার্জন এলেন ভারতের বড়লাট হয়ে। কলকাতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হোলো। বুয়র যুদ্ধ শুরু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম: দি রেজারেকশন (টলস্টয়), লিরিক্‌স অ্যাণ্ড রিদম্‌স (কার্দুচ্চি)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



রবীন্দ্রসঙ্গীতের যা শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, সেখানে রবীন্দ্রনাথের রচনা তাঁর সেরা ছবির মতোই সতেজ, সাবলীল ও অননুকরণীয়। এখানে রাগরাগিণীর প্রশ্ন আসে না, বাউল-কীর্তনের প্রশ্ন আসে না, বাদী-সম্বাদীর প্রশ্ন আসে না। এখানে সবটাই আছে, আবার সবই যেন নতুন। এমনকি এখানে কথা ও সুরের সামঞ্জস্যের বিচারটাও অবান্তর বলে মনে হয়, কারণ সব শ্রেষ্ঠ শিল্পরচনার মতোই এ গানও বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে। এসব গানের আদর্শগীতরূপ আজ স্বপ্নের বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।