গীতবিতান-GITABITAN
দিন যদি হল অবসান

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ৬ মাঘ ১৩৩৪ (২০ জানুয়ারি,১৯২৮)
কবির বয়স: ৬৬
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
প্রকাশ: পৌষ ১৩৩৪ , মাসিক বসুমতী-ঋতুরঙ্গ |
ঋতুরঙ্গ র-র ১৮
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-শেষ; ৬০১/২৩৬
রাগ / তাল: মুলতান / কাহারবা
স্বরলিপি: স্বরবিতান ১
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাদটিকা:
প্রচলিত ও [ স্বর ১] ১ম সং-এর (১৩৪২)  মধ্যে সুরভেদ আছে।  

আলোচনা

" আমি চিনি গো চিনি " গানটিতে লিপ দিতে গিয়ে কিশোরকুমার যে কত বড়ো গাইয়ে টের পেয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, জানিয়েছিলেন সৌমিত্রবাবু 'সারেগা' পত্রিকার ১৪০৮ শারদ সংখ্যায়। তিনি কিশোরকুমারের গলায় শোনা আর একটি গানের কথা উল্লেখ করেছেন, " দিন যদি হল অবসান "। এই গানটি সৌমিত্রবাবু যতজনের গলায় শুনেছেন, সবসময়েই মনে হয়েছে এটি ব্যথাতুর গান। অথচ গানটির বাণী অন্য কথা বলে। গানের ভিতরকার এই আনন্দের ভাবটি তিনি কিশোরকুমারের গলাতেই প্রথম পেলেন। সৌমিত্রবাবু অবশ্য জানান নি, যে মেম্সাহেবের ফটো দেখিয়ে, নেচে নেচে, এবং শেষ পর্যন্ত 'বৌঠাকুরাণী'র নাম নিয়ে "আমি চিনি গো চিনি" গানটির ভাব ওই গানের বাণীতে ছিল কি না।

প্রমথনাথ বিশী শান্তিনিকেতনে ছাত্রাবস্থায় শুনেছিলেন, তাঁর এক অবাঙালি অধ্যাপক উত্তেজিত হয়ে গানটি [আমি চিনি গো চিনি] গাইছিলেন এবং ভাবছিলেন গুরুদেব চিনির ওপর গান লিখেছেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা বিলিতি চিনি। (১০৩)  
     --নিত্যপ্রিয় ঘোষ, রবীন্দ্রসংগীতের শ্রোতা, রবীন্দ্রনাথের গান:সঙ্গ অনুষঙ্গ, আলপনা রায় সম্পাদিত, প্যাপিরাস, ২০০২  



আমাদের মুলতান রাগিণীটা এই চারটে-পাঁচটা বেলাকার রাগিণী, তার ঠিক ভাবখানা হচ্ছে-- 'আজকের দিনটা কিচ্ছুই করা হয় নি'। বোধ হয় দুপুরবেলায় ঘুমিয়ে উঠে কোনো ওস্তাদ ঐ রাগিণীর সৃষ্টি করেছিল। আজ আমি এই অপরাহ্নের ঝিক্‌মিকি আলোতে জলে স্থলে শূন্যে সব জায়গাতেই সেই মুলতান রাগিণীটাকে তার করুণ চড়া অন্তরা-সুদ্ধ প্রত্যক্ষ দেখতে পাচ্ছি-- না সুখ, না দুঃখ, কেবল আলস্যের অবসাদ এবং তার ভিতরকার একটা মর্মগত বেদনা। দুঃখের একরকম ব্যথা আছে, কিন্তু তার ভিতরেও একটু রস থাকে। আর, এক রকম দুঃখহীন অনুভূতিহীন অসাড়তার অন্তঃশীলা ব্যথা আছে-- সেটা ভারে নীরস, তার ভিতরে একটা উদারতা এবং কল্পনার সৌন্দর্য নেই।
  --শিলাইদহ, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৫; ১১.১১.১৩০১ #১৯১  

[কিন্তু] আজ সকালে একটা সানাইয়েতে ভৈরবী বাজাচ্ছিল, এমনি অতিরিক্ত মিষ্টি লাগছিল যে সে আর কী বলব-- আমার চোখের সামনেকার শূন্য আকাশ এবং বাতাস পর্যন্ত একটা অন্তরা্‌নিরুদ্ধ ক্রন্দনের আবেগে যেন স্ফীত হয়ে উঠছিল-- বড়ো কাতর কিন্তু বড়ো সুন্দর-- সেই সুরটাই গলায় কেন যে তেমন করে আসে না বুঝতে পারি নে। মানুষের গলার চেয়ে কাঁসার নলের ভিতরে কেন এত বেশি ভাব প্রকাশ করে! এখন আবার তারা মুলতান বাজাচ্ছে-- মনটা বড়োই উদাস করে দিয়েছে-- পৃথিবীর এই সমস্ত সবুজ দৃশ্যের উপরে একটি অশ্রুবাষ্পের আবরণ টেনে দিয়েছে-- একপর্দা মুলতান রাগিণীর ভিতর দিয়ে সমস্ত জগৎ দেখা যাচ্ছে। যদি সব সময়েই এইরকম এক-একটা রাগিণীর ভিতর দিয়ে জগৎ দেখা যেত তা হলে বেশ হত। আমার আজকাল ভারী গান শিখতে ইচ্ছে করে-- বেশ অনেকগুলো ভূপালী ... এবং করুণ বর্ষার সুর-- অনেক বেশ ভালো ভালো হিন্দুস্থানী গান-- গান প্রায় কিচ্ছুই জানি নে বললেই হয়।
    সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯২; ২২.৩.১২৯৯ #৬৬  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  


 

 

৬০১

              দিন যদি হল অবসান
      নিখিলের অন্তরমন্দিরপ্রাঙ্গণে
               ওই তব এল আহ্বান॥
চেয়ে দেখো মঙ্গলরাতি   জ্বালি দিল উৎসববাতি,
   স্তব্ধ এ সংসারপ্রান্তে     ধরো      ধরো তব বন্দনগান॥
       কর্মের-কলরব-ক্লান্ত,
              করো তব অন্তর শান্ত
  চিত্ত-আসন দাও মেলে,   নাই যদি দর্শন পেলে
       আঁধারে মিলিবে তাঁর স্পর্শ--
            হর্ষে জাগায়ে দিবে প্রাণ॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯২৮ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  'মহুয়া' আর 'শেষের কবিতা' লিখলেন। পণ্ডিচেরীতে শ্রীঅরবিন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ। সিংহল ভ্রমণ (দ্বিতীয়বার) প্রকাশ: শেষরক্ষা (প্রহসন),Fireflies, Lectures and Addresses, Letters to a Friend, A Poet's School, The Tagore Birthday Book, Fifteen Poems.

বহির্বিশ্বে: ফেব্রুয়ারিতে কালো পতাকা দেখিয়ে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন। ১লা মার্চ বিদেশী দ্রব্য বয়কট আবার শুরু। ইস্ট ইণ্ডিয়া রেলপথ ও জামশেদপুরে টাটা কারখানায় শ্রমিক ধর্মঘট। ভগৎ  সিং হিন্দুস্থান সোস্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন গঠন করলেন। চীনে গৃহযুদ্ধ শুরু। সোভিয়েট রাশিয়ার প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। প্রথম রঙীন টিভি ও ইস্টম্যান প্রদর্শিত প্রথম রঙীন চলচ্চিত্র। পুলিশের লাঠিতে আহত লালা লাজপৎ রাইয়ের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: মারিয়ানা পিনেডা (লোর্কা), স্ট্রেঞ্জ ইণ্টারলুড (ওনীল), পয়েণ্ট কাউণ্টারপয়েণ্ট (হাক্সলি), লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার (লরেন্স), অ্যাণ্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দি ডন (শোলোকভ), দি টাওয়ার (ইয়েট্‌স), সিলেক্টেড পোয়েম্‌স (পাউণ্ড), মাই অটোবায়োগ্রাফি (মুসোলিনি)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



১৩৩৮ (ইংরেজী ১৯৩১) সালে আশ্বিন মাসে "গীত-বিতান" প্রকাশিত হোলো দুখণ্ডে, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ২১০ কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, কলকাতা থেকে। প্রকাশক জগদানন্দ রায়, ছাপা শান্তিনিকেতন প্রেস। বাইশশো কপি ছাপা হয়। সংকলন হোলো কালানুক্রমিক -- ১৩০৩ সালে প্রকাশিত 'কৈশোরক' থেকে শুরু করে ১৩৩০ সালের 'বসন্ত' অবধি। বইটিতে কোনো লিখিত ভূমিকা ছিলোনা, সংগ্রাহক সুধীরচন্দ্র কর একটি সংক্ষিপ্ত 'পাঠ-পরিচয়' -এ লিখলেন "মোট ১১২৮টি গান লইয়া গীত-বিতান ১ম ও ২য় খণ্ড প্রকাশিত হইল। কবির নির্দেশমতো এই সংগ্রহ হইতে ১৪৮টি গান বাদ পড়িল।" তৃতীয় খণ্ডের প্রকাশ ১৩৩৯ শ্রাবণে, ঐ একই প্রকাশন, প্রকাশক ও ছাপার সংখ্যা নিয়ে। এটিরও বিন্যাস কালানুক্রমিক -- ১৩৩২ সালের প্রবাহিণী থেকে ১৩৩৮-এর গীতোৎসব পর্যন্ত। গানের সংখ্যা ৩৫৭। অর্থাৎ সবশুদ্ধ ১৪৮৫টি গান গীত-বিতানের তিন খণ্ডে সংগৃহীত হোলো।

প্রথম সংস্করণের পর থেকেই কবি বইটির "ব্যবহারযোগ্যতা" নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তার নমুনা পাওয়া যায় প্রথম সংস্করণের সূচীপত্রের মার্জিনে যেখানে তিনি স্বহস্তে গানের পাশেপাশে সম্ভাব্য বিষয় চিহ্নিত করেছেন। দ্বিতীয় সংস্করণের ছাপার কাজ শুরু হয় ১৩৪৫ (ইংরেজী ১৯৩৮) সালে। রবীন্দ্রনাথ এবারে নিজে হাল ধরেছেন, বিষয়বিন্যাস থেকে, গানের মার্জনা, প্রুফ দেখা কিছুই বাদ নেই। ২৩শে বৈশাখ, ১৩৪৫-এ সুধীরচন্দ্র করকে এক চিঠিতে লিখছেন, "গীতবিতানের প্রুফ দেখে দিলুম। ছাপাটায় যথাসম্ভব ঠাস বুনুনির দরকার, কারণ গানের বই সহজে বহন করবার যোগ্য হওয়া চাই, অকারণ ফাঁক বর্জনীয়। প্রত্যেক পর্যায়ের গান সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত করতে বলেছি। ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের শিরোনামা দেওয়া সম্ভব হয়নি, অথচ ইঙ্গিতে তাদের ভিন্নতা রক্ষিত হয়েছে। সংখ্যা পরিবর্তনে পর্যায়ের পরিবর্তন নীরবে নির্দিষ্ট হতে পারবে -- ভাবুক লোকের পক্ষে সেই যথেষ্ট।...

একটা কথা বলে রাখি, অন্য সকল বইয়ের মধ্যে 'গীতবিতানে'র দিকের [?] আমার মনটা সবচেয়ে বেশি তাড়া লাগাচ্ছে -- নতুন ধারায় ও একটা নতুন সৃষ্টিরূপেই প্রকাশ পাবে।"  

গীতবিতানের প্রথম আর দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণের মুদ্রণ শেষ হলে কবিকে মুদ্রিত গ্রন্থের এক খণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকাশ হয় ১৩৪৮ সালের মাঘ মাসে, অর্থাৎ কবির মৃত্যুর ছমাস পরে। তৃতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ হতে আরো অনেকদিন লাগলো -- ১৩৫৭ সালের আশ্বিন পর্যন্ত। ১ম ও ২য় সংস্করণের 'বিজ্ঞপ্তি'-তে জানানো হযেছিল যে "গীত-বিতান দুই খণ্ড মুদ্রিত হইয়া যাওয়ার পর কবি আরও অনেকগুলি গান রচনা করিয়াছিলেন, এই সকল গান তৃতীয় খণ্ডে শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে।" তৃতীয় খণ্ডের সম্পাদনা করলেন কানাই সামন্ত। নানান ভাবে বিন্যস্ত হয়ে তৃতীয় খণ্ডটির আরো তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।