গীতবিতান-GITABITAN
দিনের বেলায় বাঁশি তোমার বাজিয়েছিলে অনেক সুরে-

Signature

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩ কার্তিক ১৩৩৩ (৩০ অক্টোবর,১৯২৬)
কবির বয়স: ৬৫
রচনাস্থান: বুডাপেস্ট
প্রকাশ: পৌষ ১৩৩৮ , বৈকালী (১৩৮১)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-শেষ; ৬০৩/২৩৭
রাগ / তাল: বেহাগ / কাহারবা
স্বরলিপি: সঙ্গীতবিজ্ঞান প্রবেশিকা; স্বরবিতান ৫৬
স্বরলিপিকার: অনাদিকুমার দস্তিদার; ঐ

আলোচনা

রবীন্দ্রনাথ নিজে আমাদের তিনটি গান শিখিয়েছিলেন -- ' নূপুর বেজে যায় ', ' দিনের বেলায় বাঁশি তোমার ', আর ' আধেক ঘুমে নয়ন চুমে '। ... তখন ভাবিনি ভবিষ্যতে এই গান শেখা আমার জীবনে অবাধ হয়ে দেখা দেবে।

সেবার তাঁর সঙ্গে নাতনী বুড়ী (নন্দিতা) ছিল। বুড়ী তখন বেশ ছোট। রবীন্দ্রনাথ চলে গেলে নিজের মনেই বলছিল -- দাদামশায়ের গানের কথা বোঝা ভার। নয়নে আবার চুমো খায় নাকি কেউ?  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, যাত্রাপথের আনন্দগান, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৮৫  



বেহাগ। রবীন্দ্রনাথ বেহাগের সুরে যত সুন্দর-সুন্দর সুরনির্মাণ করেছেন, আর কোনো রাগ সম্ভবত তার পাশে দাঁড়াতে পারে না। সংখ্যায় না হলেও গুণে বুঝি বেহাগই কবির প্রিয়তম, আমাদের কাছে বেহাগই বুঝি সবচেয়ে বেশি নম্বর পাবে। গানের তালিকায় না গিয়ে আমরা বরং বেহাগের রাবীন্দ্রিকতার খোঁজেই যাই। রবীন্দ্র-বেহাগে খাম্বাজ প্রায়ই চুপিসাড়ে ঢুকে পড়ে এবং তাকে আর ধরাই যায় না, কিন্তু বেহাগত্ব থাকে অক্ষুণ্ণ। এটা বাংলা বেহাগেরই একটা চরিত্র। শুধু একটিমাত্র স্বরের স্থান পরিবর্তনে এটি ঘটে যায় -- অবরোহতে প্রধানত শুদ্ধ নিষাদের স্থানে কোমল নিষাদ, এতে সুরের আবেদনে মরমিত্বের মাত্রা এসে যায়। রবীন্দ্রনাথের বেহাগের পর বেহাগে এই ব্যাপারটা ঘটে থাকে। এই কোমল নিষাদ হাজির হয় গানের অন্তরা বা সঞ্চারীতে। ...  অনেকে এই সুরকারুটিকে বিহাগড়া বলতে পারেন।  
     --সুধীর চন্দ, বহুরূপী রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, ২০০৫  


 

 

৬০৩

দিনের বেলায় বাঁশি তোমার বাজিয়েছিলে অনেক সুরে--
গানের পরশ প্রাণে এল, আপনি তুমি রইলে দূরে॥
    শুধাই যত পথের লোকে 'এই বাঁশিটি বাজালো কে'--
    নানান নামে ভোলায় তারা, নানান দ্বারে বেড়াই ঘুরে॥
এখন আকাশ ম্লান হল, ক্লান্ত দিবা চক্ষু বোজে--
পথে পথে ফেরাও যদি মরব তবে মিথ্যা খোঁজে।
    বাহির ছেড়ে ভিতরেতে   আপনি লহো আসন পেতে--
        তোমার বাঁশি বাজাও আসি
        আমার প্রাণের অন্তঃপুরে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯২৬ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  বড়ো দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথের মৃত্যু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ঢাকা গেলেন, বক্তৃতা দিলেন। ইউরোপ ভ্রমণ -- ইটালি, ইংল্যাণ্ড, ডেনমার্ক, সুইজারল্যাণ্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, যুগোশ্লাভিয়া, মিশর। 'লেখন' রচনা। প্রকাশ: চিরকুমার সভা (নাটক), শোধবোধ (নাটক), নটীর পূজা (নাটক), রক্তকরবী (নাটক), ঋতু-উৎসব (গানের সংকলন), গীতমালিকা ১(গীত সংগ্রহ), বৈকালী।

বহির্বিশ্বে: কলকাতায় তিনবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ট্রেড ইউনিয়ন আইন বিধিবদ্ধ। লেবাননে প্রজাতন্ত্র। ট্রটস্কিকে মস্কো থেকে বিতাড়ন। কোডাক কোম্পানি ১৬ মিমি চলচ্চিত্রের ফিল্ম তৈরি করে। তুরস্কে বিবিধ সংস্কার ও রোমান লিপির প্রচলন। সরোজিনী নাইডুর উদ্যোগে নিখিল ভারতীয় মহিলা সমিতি ও রাসবিহারী বসুর চেষ্টায় জাপানে ইণ্ডিয়ান ইণ্ডিপেন্‌ডেন্স লীগের সূচনা। হিরোহিতো জাপানের সম্রাট। জার্মান কবি রিল্‌কের মৃত্যু।  উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: দি অরিজিন অ্যাণ্ড ডেভেলপমেণ্ট অফ বেঙ্গলি ল্যাঙ্গোয়েজ (সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়), দি সেভেন পিলার্স অফ উইজ্‌ডম (লরেন্স), অ্যারোস্মিথ (লুইস), দি প্লাও অ্যাণ্ড দি স্টার্স (ওকেসি), সিলেক্টেড পোয়েম্‌স (স্যাণ্ডবার্গ), লীভ্‌স অফ গ্রাস (হুইটম্যান)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



১৩৩৮ (ইংরেজী ১৯৩১) সালে আশ্বিন মাসে "গীত-বিতান" প্রকাশিত হোলো দুখণ্ডে, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ২১০ কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, কলকাতা থেকে। প্রকাশক জগদানন্দ রায়, ছাপা শান্তিনিকেতন প্রেস। বাইশশো কপি ছাপা হয়। সংকলন হোলো কালানুক্রমিক -- ১৩০৩ সালে প্রকাশিত 'কৈশোরক' থেকে শুরু করে ১৩৩০ সালের 'বসন্ত' অবধি। বইটিতে কোনো লিখিত ভূমিকা ছিলোনা, সংগ্রাহক সুধীরচন্দ্র কর একটি সংক্ষিপ্ত 'পাঠ-পরিচয়' -এ লিখলেন "মোট ১১২৮টি গান লইয়া গীত-বিতান ১ম ও ২য় খণ্ড প্রকাশিত হইল। কবির নির্দেশমতো এই সংগ্রহ হইতে ১৪৮টি গান বাদ পড়িল।" তৃতীয় খণ্ডের প্রকাশ ১৩৩৯ শ্রাবণে, ঐ একই প্রকাশন, প্রকাশক ও ছাপার সংখ্যা নিয়ে। এটিরও বিন্যাস কালানুক্রমিক -- ১৩৩২ সালের প্রবাহিণী থেকে ১৩৩৮-এর গীতোৎসব পর্যন্ত। গানের সংখ্যা ৩৫৭। অর্থাৎ সবশুদ্ধ ১৪৮৫টি গান গীত-বিতানের তিন খণ্ডে সংগৃহীত হোলো।

প্রথম সংস্করণের পর থেকেই কবি বইটির "ব্যবহারযোগ্যতা" নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তার নমুনা পাওয়া যায় প্রথম সংস্করণের সূচীপত্রের মার্জিনে যেখানে তিনি স্বহস্তে গানের পাশেপাশে সম্ভাব্য বিষয় চিহ্নিত করেছেন। দ্বিতীয় সংস্করণের ছাপার কাজ শুরু হয় ১৩৪৫ (ইংরেজী ১৯৩৮) সালে। রবীন্দ্রনাথ এবারে নিজে হাল ধরেছেন, বিষয়বিন্যাস থেকে, গানের মার্জনা, প্রুফ দেখা কিছুই বাদ নেই। ২৩শে বৈশাখ, ১৩৪৫-এ সুধীরচন্দ্র করকে এক চিঠিতে লিখছেন, "গীতবিতানের প্রুফ দেখে দিলুম। ছাপাটায় যথাসম্ভব ঠাস বুনুনির দরকার, কারণ গানের বই সহজে বহন করবার যোগ্য হওয়া চাই, অকারণ ফাঁক বর্জনীয়। প্রত্যেক পর্যায়ের গান সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত করতে বলেছি। ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের শিরোনামা দেওয়া সম্ভব হয়নি, অথচ ইঙ্গিতে তাদের ভিন্নতা রক্ষিত হয়েছে। সংখ্যা পরিবর্তনে পর্যায়ের পরিবর্তন নীরবে নির্দিষ্ট হতে পারবে -- ভাবুক লোকের পক্ষে সেই যথেষ্ট।...

একটা কথা বলে রাখি, অন্য সকল বইয়ের মধ্যে 'গীতবিতানে'র দিকের [?] আমার মনটা সবচেয়ে বেশি তাড়া লাগাচ্ছে -- নতুন ধারায় ও একটা নতুন সৃষ্টিরূপেই প্রকাশ পাবে।"  

গীতবিতানের প্রথম আর দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণের মুদ্রণ শেষ হলে কবিকে মুদ্রিত গ্রন্থের এক খণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকাশ হয় ১৩৪৮ সালের মাঘ মাসে, অর্থাৎ কবির মৃত্যুর ছমাস পরে। তৃতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ হতে আরো অনেকদিন লাগলো -- ১৩৫৭ সালের আশ্বিন পর্যন্ত। ১ম ও ২য় সংস্করণের 'বিজ্ঞপ্তি'-তে জানানো হযেছিল যে "গীত-বিতান দুই খণ্ড মুদ্রিত হইয়া যাওয়ার পর কবি আরও অনেকগুলি গান রচনা করিয়াছিলেন, এই সকল গান তৃতীয় খণ্ডে শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে।" তৃতীয় খণ্ডের সম্পাদনা করলেন কানাই সামন্ত। নানান ভাবে বিন্যস্ত হয়ে তৃতীয় খণ্ডটির আরো তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।