গীতবিতান-GITABITAN
গ্রামছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায় রে।

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩১৬ (১৯০৯)
কবির বয়স: ৪৮
প্রকাশ: বৈশাখ, ১৩১৬ , প্রায়শ্চিত্ত নাটক র-র ৯ |
গান (বিবিধ);পরিত্রাণ (১৩৩৬) র-র ২০
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): বিচিত্র-বিচিত্র; ১৪/৫৪৯
রাগ / তাল: বাউল / কাহারবা
স্বরলিপি: প্রবাসী;প্রায়শ্চিত্ত, বিশেষ সংস্করণ; স্বরবিতান ৯ (প্রায়শ্চিত্ত)
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর;সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
পাদটিকা:
ধনঞ্জয়ের গান ৫/৪। প্রচলিত ও প্রায়শ্চিত্ত স্বরলিপির ১ম সংস্করণে (১৩১৬) সুরভেদ ( জংলা/কাহারবা [স্বর ৯]) আছে।  
পাঠভেদ:
(ও) কোন্‌ বাঁকে কী ধন দেখাবে - প্রায়শ্চিত্ত স্বরলিপি (১৩১৬)।  

আলোচনা

... মনে পড়ে তাঁর 'ডাকঘর'-এর কথা; ১৯১২ সনে রচিত এই নাটিকার দিকে নটগুরু রবীন্দ্রনাথের বিশেষ দৃষ্টি পড়ে ১৯১৭ সনে; যখন তিনি 'বিচিত্রা' ভবনের ছোট্ট ঘরখানিতে নট-শ্রেষ্ঠ শিল্পী গগনেন্দ্র ও অবনীন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে এবং নন্দলাল বসুর সাহায্যে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অপূর্ব প্রয়োগ-বিজ্ঞান দেখিয়েছিলেন। সেবার কলকাতা-কংগ্রেসের পর ঐ 'ডাকঘর' অভিনয় দেখতে 'বিচিত্রা'-ভবনে এলেন সভানেত্রী Annie Besant, মহাত্মা গান্ধী, সরোজিনী নাইডু, মদনমোহন মালব্য প্রভৃতি এবং তাঁদের সঙ্গে শিশিরকুমার ভাদুড়ী, বিপিনচন্দ্র পালের মতো সমঝদারগণ।  'ডাকঘর'-এ গান ছিল না, কিন্তু গান হ'লে নাটকের প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছানোয় সুবিধা হবে জেনেই প্রযোজক রবীন্দ্রনাথ নিজের কবিতায় সুর বসিয়ে গাওয়ালেন, " আমি চঞ্চল হে আমি সুদূরের পিয়াসী "। ভৈরবীর উদাস করা সুরের পর ঠাকুর্দা পথে বেরিয়ে ধরলেন মেঠো সুর :--
     " গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ   আমার  মন ভুলায় রে। "

দেখলাম সে সময়ে গান্ধিজীও মুগ্ধ হয়ে গুরুদেবের সংগীত ও অভিনয় দেখছেন। শেষে মুমূর্ষু বালক অমলের কণ্ঠ নীরব হবার একটু আগে নেপথ্য-সঙ্গীতে বেহালার করুণ আলাপের সঙ্গে মাতৃকণ্ঠ সবাইকে আকুল করল শেষ গান :-- :--
       " জীবনে যত পূজা হল না সারা ...   "

পটক্ষেপের পর মহাত্মাজি, শ্রীমতী বেশান্ত, সরোজিনী দেবী এসে নটরাজ রবীন্দ্রনাথের হাত দু'খানি ধরে তাঁদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানালেন, মনে আছে।  
     --কালিদাস নাগ, সুরের গুরু রবীন্দ্রনাথ ও গুরুদেবের পত্রাবলি, প্যাপিরাস, কলকাতা, ১৩৯৩।  



১০ই অক্টোবর বিচিত্রায় 'ডাকঘর' অভিনয় দেখিতে গেলাম। জায়গার পক্ষে ভিড় হইয়াছিল অসম্ভব রকম। ... ' আমি চঞ্চল হে , আমি সুদূরের পিয়াসি' এতদিন কবিতায়ই পড়িয়াছিলাম, সেদিন প্রথম সুরসংযোগে গীত হইতে শুনিলাম। ইন্দিরা দেবীর নেতৃত্বে কয়েকজন তরুণী গানটি গাহিলেন।

গগনেন্দ্রনাথ মাধব দত্ত সাজিয়াছিলেন, অবনীবাবু কবিরাজ ও মোড়ল দুই ভূমিকাতেই অভিনয় করিয়াছিলেন। অসিতকুমার হালদার দইওয়ালা এবং রবীন্দ্রনাথ রাজকবিরাজ সাজিয়াছিলেন। অবনীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠা কন্যা সুরূপা 'সুধা' সাজিয়াছিল, মেয়েটিকে ভারি সুন্দর দেখাইয়াছিল। ...

রঙ্গমঞ্চের চন্দ্রতারকাখচিত আকাশ ও চাঁদের আলো যেন সত্যকার আকাশ ও চাঁদকেও সৌন্দর্যে হার মানাইয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ সাজসজ্জা কিছুই করেন নাই, মাথায় শুধু গেরুয়া রঙের পাগড়ি। আলোকের মুকুটের মত যে কুঞ্চিত কেশদাম তাঁহার মুখের সৌন্দর্য দ্বিগুণিত করিত, তাহা পাগড়ির আড়ালে চাপা দেওয়াতে আমরা সকলেই মনে মনে আপত্তি অনুভব করিতেছিলাম। নাটকে গান কোথাও নাই, তবু একবার বাউল সাজিয়া, ' গ্রাম-ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায় রে', গাহিয়া, নৃত্য করিতে করিতে মাধব দত্তের ঘরের পাশ দিয়া চলিয়া গেলেন। আর-একবার যবনিকার অন্তরাল হইতে গাহিয়া উঠিলেন, ' বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে। শূন্যঘাটে একা আমি, পার ক'রে লও খেয়ার নেয়ে।' (১১০)  
     --সীতা দেবী, পুণ্যস্মৃতি, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৩৮৭  


শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্য আশ্রমের প্রাক্তন বিদ্যার্থী নৃপেন্দ্রকুমার বসু, 'প্রায়শ্চিত্ত' নাটকে [১৯০৯ সালে শান্তিনিকেতনে প্রথম মঞ্চস্থ ] রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা [ধনঞ্জয় বৈরাগী] নিয়ে লিখছেন: "গেরুয়া আলখাল্লা-পরা মাথায় পাগড়ি-জড়ানো শালশিশুর মতো তাঁর সুদীর্ঘ দেহ এখনও স্পষ্ট চোখের সামনে ভেসে ওঠে। 'ওরে আগুন আমার ভাই', 'বল ভাই ধন্য হরি' [বাঁচান বাঁচি], 'আমারে পাড়ায় পাড়ায় খেপিয়ে বেড়ায়'-- এই তিনখানা গানে কবি মনোহরণ ভাবচঞ্চল তাণ্ডব দেখিয়ে দর্শকপ্রাণে পুলক-শিহরণ জাগিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর অপ্সরালাঞ্ছিত কণ্ঠে 'গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ' এখনো হৃৎকন্দরে প্রতিধ্বনি তোলে। ... কোথাও রাঙামাটির পথ দেখলে তার দূরতম প্রান্তসীমায় ধনঞ্জয়রূপী কবিগুরুর ছায়ামূর্তি যেন দেখতে পাই।" (৪৫)  
     --পার্থ বসু, "গায়ক রবীন্দ্রনাথ", আনন্দ - ১৩৯৩-তে উদ্ধৃত  


বিখ্যাত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কতগুলো নতুন রাগ রচনা করেছেন। তার মধ্যে হেমন্তরাগ খুব প্রসিদ্ধ।... সোহিনী রাগের সহিত রিখাব ও পঞ্চম (অবরোহণে) যোগ ক'রে ওস্তাদ এই রাগের সৃষ্টি করেছেন এবং এই রিখাব ও পঞ্চমের ব্যবহার অতি স্বাভাবিক ও সুন্দর হযেছে, এজন্যে এই নতুন রাগের সৃষ্টি সার্থক। যাঁরা রবীন্দ্রনাথের ' আধেক ঘুমে নয়ন চুমে ' গানটি শুনেছেন তাঁরা সুরটি বিশ্লেষণ করলে দেখবেন এতে সেই হেমন্ত রাগই রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় নিজস্ব ভঙ্গীতে প্রকাশ পেয়েছে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ রাগ, রাগিণী, মেল, জাতি, আরোহ, অবরোহ, বাদী, সম্বাদী বিচার ক'রে যা সৃষ্টি  করেছেন রবীন্দ্রনাথ শুধু সহজ সৌন্দর্যানুভূতি থেকে তাই সৃষ্টি করেছেন। ইওরোপীয় সংগীতে D Major Keyতে দু'টি sharp ব্যবহার হয়। আমাদের ভারতীয় সংগীতে কল্যাণ ঠাটে একটি কড়ি (sharp) ব্যবহার হয়। একাধিক  কড়ির ব্যবহার নেই। রবীন্দ্রনাথের ' আমার একটি কথা ' এই গানটিতে তিনি পাশাপাশি দুই রিখাব লাগিয়েছেন। এই দুই রিখাবের কোমল রিখাবটি আর কিছু নয়, D Major Key-র C sharp (কড়ি স)। ইওরোপীয় সংগীতপদ্ধতির এই প্রয়োগ এখানে খুবই নিপুণ। অবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত বাউল ঢংয়ের সুর ' কবে তুমি আসবে ব'লে ' এবং বিখ্যাত ভাটিয়ালি সুরের গান ' গ্রাম-ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ ' এই দুটি গানেই আ--আ--আ ব'লে যে টান আছে তাতে স্বরোচ্চারণ সম্পূর্ণ ইওরোপীয় পদ্ধতি অনুযায়ী। অনেকে বলতে পারেন বাউল ভাটিয়ালির সঙ্গে ইওরোপীয় ঢংয়ের সংমিশ্রণ হাস্যকর, কিন্তু গান দু'টি মন দিয়ে শুনলে বোঝা যাবে যে এক্ষেত্রে তা তো হয়ইনি, বরং এই মিশ্রণের ফল অতি সুন্দর হয়েছে। এতে বোঝা যায় যে বড় প্রতিভার নিপুণ হাতে বিভিন্ন আপাতবিরোধী জিনিষেরও মিশ্রণের ফলে নতুন সৌন্দর্য জন্ম নেয়।  
     --হিমাংশুকুমার দত্ত, সুরকার রবীন্দ্রনাথ, কবিতা রবীন্দ্র সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৪৮,  সম্পাদক: বুদ্ধদেব বসু (পুনর্মুদ্রণ ১৪০৯)  


 

 

১৪

      গ্রামছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ  আমার   মন ভুলায় রে।
ওরে   কার পানে মন হাত বাড়িয়ে  লুটিয়ে যায় ধুলায় রে॥
   ও যে    আমায় ঘরের বাহির করে,   পায়ে-পায়ে পায়ে ধরে--
   ও যে    কেড়ে আমায় নিয়ে যায় রে  যায় রে কোন্‌ চুলায় রে।
ও যে  কোন্‌ বাঁকে কী ধন দেখাবে,   কোন্‌খানে কী দায় ঠেকাবে--
        কোথায় গিয়ে শেষ মেলে যে  ভেবেই না কুলায় রে॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

63

M   Y King's road that lies still before my house makes my heart wistful.
  It stretches its beckoning hand towards me; its silence calls me out of my home; with dumb entreaties it kisses my feet at every step.
  It leads me on I know not to what abandonment, to what sudden gain or surprises of distress.
  I know not where its windings end—
  But my King's road that lies still before my house makes my heart wistful.
  

Crossing: Published together with Lover's Gift. Many of the translations are transcreations and paraphrases of the original. Poems have been sourced from Naivedya, Kheya, Gitanjali, Gitimalya and Gitali.[Notes, "The English Writings of Rabindranath Tagore" - vol 1]  
     --Rabindranath Tagore, Lover's Gift and Crossing, Macmillan, London, 1918.  



Another version:

A   H, the red red road,
  the run-away road of the village,
  lures my mind away.
It stretches its arms out to the far distance,
  and my heart rolls away with its red dust.
Out of the home it seduces me.
It solicits me, alas, at every lagging step.
It runs away with me and leads me on to where,
  I do not know.
What treasure it has to show around the corner,
  I do not know.
What hazards it will save me from,
  what perils resist and where,
  I do not know.
Nor do I know at all at what point and when,
  the road and I will reach our journey's end.
  
     --Anon., Anthology.  



১৯০৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  মে মাসে কালকাভ্রমণে গিয়ে 'প্রায়শ্চিত্ত' রচনা। এছাড়া গীতাঞ্জলির কিছু গান, 'তপোবন' প্রবন্ধ (ওভারটুন হলে পাঠ)। শান্তিনিকেতনের বার্ষিক উৎসবে প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাষণ। রথীন্দ্রনাথ আমেরিকা থেকে ফিরলেন। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় সচিত্র 'চয়নিকা' প্রকাশ, চিত্রশিল্পী তরুণ নন্দলাল বসু। অধ্যাপক রবি দত্ত প্রণীত ইস্ট-ওয়েস্ট কাব্য সঙ্কলনে প্রথম কবির কবিতাগুচ্ছের ইংরেজি অনুবাদ গ্রথিত হোলো। প্রকাশ: শব্দতত্ত্ব, ধর্ম, শান্তিনিকেতন ১-৮ (গদ্যগ্রন্থাবলীর বিভিন্ন খণ্ড হিসাবে), প্রায়শ্চিত্ত, চয়নিকা, ছুটির পড়া, গান, বিদ্যাসাগর চরিত, ইংরেজি পাঠ, শিশু।

বহির্বিশ্বে: আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় দুজনের ফাঁসি ও সাতজনের দ্বীপান্তরের রায় দেওয়া হোলো। ১৫ নভেম্বর কাউন্সিল অফ ইণ্ডিয়া বিধিবদ্ধ। মর্লে-মিণ্টো শাসনসংস্কার প্রস্তাব গৃহীত হোলো -- দেশের শাসন ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিত্বের প্রবেশ হোলো। লর্ড সত্যপ্রসন্ন সিংহ ভারতের শাসন পরিষদে প্রথম ভারতীয় নির্বাচিত হলেন। রবার্ট পিয়েরি দ্বারা উত্তর মেরু আবিষ্কার। জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার ছাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত হোলো। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: দি ব্লু বার্ড (মেটারলিঙ্ক), দি ইন্‌টারপ্রিটেশন অফ ড্রিম্‌স (ফ্রয়েড)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮