গীতবিতান-GITABITAN
এই তো ভালো লেগেছিল আলোর নাচন পাতায় পাতায়।

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ২৬ চৈত্র, ১৩২২ (৮ এপ্রিল,১৯১৬)
কবির বয়স: ৫৪
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
প্রকাশ: বৈশাখ, ১৩২৪ , ভারতী |
প্রবাসী;প্রবাহিণী (গীতগান)।
Sheaves
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): বিচিত্র-বিচিত্র; ১৫/৫৪৯
রাগ / তাল: বাউল / কাহারবা
স্বরলিপি: প্রবাসী;গীতপঞ্চাশিকা (১৩২৫); স্বরবিতান ১৬ (গীতপঞ্চাশিকা)
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ; ঐ

আলোচনা

"গুরুদেব কখনো কখনো ঘরে তৈরি মিষ্টি রেকাবিতে সাজিয়ে নিজের হাতে নিয়ে এসে আমার সন্তানদের দিতেন। এই নতুন বাড়িতে [শান্তিনিকেতন গৃহ?] থাকাকালীন তিনি "এই তো ভালো লেগেছিল" গানটি রচনা করেন।  গানটি গেয়ে শোনাবার সময় আমায় [ক্ষিতিমোহন সেনের স্ত্রী কিরণবালা সেন, অমিতা সেনের মা] হেসে বলেছিলেন-- 'তোমার অমিতা আমার বাড়ির সামনে কাঁকরের উপর পা ছড়িয়ে বসে একটি কৌটাতে কাঁকর ভরছে আর নিজের মাথায় ঢালছে। তাই দেখেই আমি লিখলাম-- ছোটো মেয়ে ধুলায় বসে খেলার সাজি আপনি সাজায়। ' আমার ছোট মেয়ে অমিতার বয়স তখন আড়াই। " (১৭)
সমীর সেনগুপ্ত জানাচ্ছেন [গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ]: "পরবর্তী কালে, বর্ষীয়সী অমিতা সেনকে নিয়ে যখনই কোনো উৎসব হয়েছে শান্তিনিকেতনে, সেখানে এই গানটি গাওয়া রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর পুত্র অমর্ত্য সেন নোবেল পুরস্কার পেলে তাঁর সংবর্ধনার সময়ও আম্রকুঞ্জের অনুষ্ঠানে গানটি গাওয়া হয়েছিল। " (১২৯)  
     --অমিতা সেন, শান্তিনিকেতনে আশ্রমকন্যা  



একবার সুকুমার রায় [শিশুসাহিত্যিক] ওরফে 'তাতা' এসেছেন গুরুদেবের কাছে কদিনের নিমন্ত্রণে। একদিন বলে বসলেন, "রোজই তো আপনার কাছে ভালোমন্দ খাচ্ছি প্রতিমা বউদির পাকশালায়। আজ ঠিক করেছি দুপুরে খাব ছাত্রদের সঙ্গে কিচেনে। " রবীন্দ্রনাথ শুনে মৃদু হাসলেন, বললেন "বেশ তো। " সন্ধেবেলা সুকুমার দেখা করতে এসে প্রণাম করে বসলেন তাঁর পায়ের কাছে। গুরুদেব ডেকচেয়ারে আসীন। জিগ্যেস করলেন, "তাতা আজ কেমন খেলে ছাত্রদের কিচেনে?"

তাতা উত্তরে গান গেয়ে দিলেন,  

      এই তো ভালো লেগেছিল
      আলুর নাচন হাতায় হাতায়। (২৬)  
     --সুধীর চক্রবর্তী, শামুক ঝিনুক, দীপ প্রকাশন, ২০০৯  


রবীন্দ্রনাথের এক ব্যতিক্রমী গান ... এর গঠনটা অনেকটা ব্যালাডের মতো--জীবনপ্রবাহের চলচ্ছবি। গানের ধুয়োটা খুব মজার। কেবল মাঝে মাঝে বলা 'এই তো'-- যেন বলার কথাটা হল এইরকমই তো জীবন। চলমান কত রকম দৃশ্য দৃশ্যান্তর চোখে সত্যি বীণা বাজায়। সবাই এই গানটা স্বচ্ছন্দে গাইতে পারে না। এর চালটা একেবারে গুরুগম্ভীর নয়-- স্বতশ্চল। এই গানে রবীন্দ্রগানের নিজস্ব গড়ন অর্থাৎ আস্থায়ী-অন্তরা-সঞ্চারী-আভোগের বিন্যাসটা নেই বলেই বেশি উপভোগ্য। চলার আনন্দে আর দেখন সুখে কি অত নিরূপিত গানের কাঠামোর বজায় রাখা যায়? ... এত প্রসন্নতার গান বাংলায় বেশি নেই। (৪)  
     --সুধীর চক্রবর্তী, রবীন্দ্রনাথ অনেকান্ত, পত্রলেখা, ২০১২  


 

 

১৫

এই তো ভালো লেগেছিল আলোর নাচন পাতায় পাতায়।
শালের বনে খ্যাপা হাওয়া, এই তো আমার মনকে মাতায়।
রাঙা মাটির রাস্তা বেয়ে   হাটের পথিক চলে ধেয়ে,
ছোটো মেয়ে ধুলায় বসে খেলার ডালি একলা সাজায়--
সামনে চেয়ে এই যা দেখি চোখে আমার বীণা বাজায়॥

      আমার এ যে বাঁশের বাঁশি, মাঠের সুরে আমার সাধন।
      আমার মনকে বেঁধেছে রে এই ধরণীর মাটির বাঁধন।
      নীল আকাশের আলোর ধারা   পান করেছে নতুন যারা
      সেই ছেলেদের চোখের চাওয়া নিয়েছি মোর দু চোখ পূরে--
      আমার বীণায় সুর বেঁধেছি ওদের কচি গলার সুরে॥

দূরে যাবার খেয়াল হলে সবাই মোরে ঘিরে থামায়--
গাঁয়ের আকাশ সজনে ফুলের হাতছানিতে ডাকে আমায়।
ফুরায় নি ভাই, কাছের সুধা,   নাই যে রে তাই দূরের ক্ষুধা--
এই-যে এ-সব ছোটোখাটো  পাই নি এদের কূলকিনারা।
তুচ্ছ দিনের গানের পালা আজও আমার হয় নি সারা॥

      লাগলো ভালো, মন ভোলালো, এই কথাটাই গেয়ে বেড়াই--
      দিনে রাতে সময় কোথা, কাজের কথা তাই তো এড়াই।
      মজেছে মন, মজল আঁখি-- মিথ্যে আমায় ডাকাডাকি--
      ওদের আছে অনেক আশা, ওরা করুক অনেক জড়ো--
      আমি কেবল গেয়ে বেড়াই, চাই নে হতে আরো বড়ো॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

Inspiration

I LOVE the light dancing on the leaves,
    The wild wind in the sal forest intoxicates me;
  Along the red earth of the road
    The good man hurries to the market,
  The lonely little girl plays in the dust.
    What I see in front of me
  Is like a harp playing in my eyes.
    My reed is but a bamboo pipe,
  And I play the tunes of the fields.
    The children that have drunk
  Of the new light of the blue sky--
I have filled my eyes with their glances
  And I have attuned my harp
  To,the music of their young voices.

[sal = tree with hard-grained wood used as timber]
  
     --Nagendranath Gupta, Sheaves, Indian Press, Allahabad, 1929  



Another version:

H ERE, the leaves dance in the sun,
    which is what I love.
Here, the wind rages through the Sal grove
  which is what excites me so.
Nor have I been able to plumb
  the mystery of the small trifles,
  nor finished singing
  about the common humdrum every day.
Here, along the red red road
  the wayfarer goes to the country-market.
Here, in the red dust the lone girl sits
  arranging her play-things in the wicker basket.
Here, whatever lies before me
  sings like music to my eyes.

My reed is but a bamboo pipe--
  attuned to simple rustic airs.
The loving arms of the soil
  hold me a willing captive.
I feast my eyes with
  the fresh vision of the children,
  who drink at the fount of light--
  streaming down the blue sky.
And the music in my heart
  echoes the music of their young voices.

Here, all that surrounds me would not let me go
  when a far voyage takes my fancy.
The blossoms on the tree-top,
  over the sky-line of the village,
  are like a hand that beckons to me.
The near-by is still so sweet
  that it gets the better
  of my hunger for the far-away.
Nor have I been able to plumb
  the mystery of small trifles, nor finished singing
  about the common humdrum every day.

I have liked it all and loved it--
  that is what I never tire of singing.
And my days and nights are so full of songs
  that I have hardly the time
  to answer to the call of duty.
My heart is drunk with joy
  and drunk are my eyes.
Let those that wish to achieve and to acquire,
  gather and accumulate piles of things,
  but let them leave me alone
  if 1 do not care to be any greater
  than to be able to wander about,
   singing my songs.
  
     --Anon., Anthology  



১৯১৬ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  'ফাল্গুনী' ও 'বৈরাগ্যসাধন' অভিনয় -- যথাক্রমে অন্ধ বাউল ও কবিশেখরের ভূমিকায়। জমিদারীতে পল্লী-উন্নয়নের কাজ শুরু করলেন। প্রথম জাপান যাত্রা, সেখানে সাম্রাজ্যবাদ নীতির সমালোচনা করায় জাপান সরকার অসন্তুষ্ট। দ্বিতীয়বার আমেরিকা যাত্রা ও বক্তৃতা সফর। প্রকাশ: শান্তিনিকেতন ১৫-১৭, ফাল্গুনী, ঘরে বাইরে, সঞ্চয়, পরিচয়, বলাকা, চতুরঙ্গ, গল্পসপ্তক, Fruit-Gathering, Hungry Stones and Other Stories, Stray Birds.  

বহির্বিশ্বে: কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও থ্যাকার্সে ভারতীয় মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ভারতে প্রথম মহিলা বিদ্যালয়) উদ্বোধন। ১লা অগাস্ট দাদাভাই নৌরজীর সভাপতিত্বে হোমরুল লীগ প্রতিষ্ঠা করলেন অ্যানি বেসান্ত। 'হাজার বছরের পুরান বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা' -- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' -- বসন্তরঞ্জন রায়, প্রকাশিত। কবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রিয়নাথ সেনের মৃত্যু। প্রথম জন্মনিয়ন্ত্রণ ক্লিনিকের উদ্বোধন। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ডেমোক্রেসি অ্যাণ্ড এডুকেশন (ডিউই), দি ব্যাকবোন ফ্লুট (মায়াকোভস্কি), সনেট্‌স অ্যাণ্ড পোয়েম্‌স (মেসফিল্ড)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮