গীতবিতান-GITABITAN
স্বপন-পারের ডাক শুনেছি, জেগে তাই তো ভাবি-

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ৯ বৈশাখ, ১৩৩৫ (২২ এপ্রিল,১৯২৮)
কবির বয়স: ৬৬
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
প্রকাশ: জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৫ , বিচিত্রা-স্বপ্ন
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): বিচিত্র-বিচিত্র; ২২/৫৫৩
রাগ / তাল: কীর্তন / দাদরা
স্বরলিপি: বিশ্বভারতী পত্রিকা (১৩৬৪); পাণ্ডুলিপি; স্বরবিতান ৫৬
স্বরলিপিকার: অনাদিকুমার দস্তিদার; ঐ; ঐ

আলোচনা

[রবীন্দ্রনাথ] "সুরের রাজ্য এক পৃথক রাজ্য, সে দূরের জগৎ অন্য স্তর। সে স্তরে আমরা সর্বদা থাকিনে। আমরা যে-জগতে ছোটোখাটো সুখদুঃখে দোদুল্যমান হয়ে রয়েছি, সুর আমাদের নিয়ে যায় সে বন্ধন থেকে মুক্ত করে ঊর্ধলোকে, অন্য জগতে। তার সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের আবেষ্টন একেবারে পৃথক। আমরা অনুভব করি হৃদয়ে সেই অনির্বচনীয় স্পর্শ, কিন্তু আমরা তো সেখানকার নয়, তাই বোধহয় এই অনির্দিষ্ট বেদনা। সুর যেখানে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, মন সেখানে নিরবলম্বন হয়ে চ্যুত হবার জন্যই যেন রয়েছে। যেমন সমুদ্রের ঢেউ ছুটে এসে ক্ষণিকের জন্য তীরকে অতিক্রম করে, আবার ফিরে যায় তার বন্ধনের মধ্যে, আমাদের মনও তেমনি নিজের এবং চারপাশের বন্ধন অতিক্রম করে ভেসে যায় সুরধ্বনিতে, কিন্তু সেখানে তার স্থান নয়। আবার ফিরে আসতে হবে তাকে নিম্নভূমিতে। সৌন্দর্যের জগতে ক্ষণকালের এই প্রবেশ, তার সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ মিলিয়ে নিতে তো মন পারে না-- ভালো লাগে, বেদনা মেশানো ভালো লাগা। "  (প ১৫২)  
     --মৈত্রেয়ী দেবী, মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, প্রাইমা পাবলিকেশনস্‌, কলকাতা, ১৯৪৩  



পর্শুদিন অমনি বোটের জানলার কাছে চুপ করে বসে আছি, একটা জেলেডিঙিতে একজন মাঝি গান গাইতে গাইতে চলে গেল-- খুব যে সুস্বর তা নয়-- হঠাৎ মনে পড়ে গেল বহুকাল হল ছেলেবেলায় বাবামশায়ের সঙ্গে বোটে করে পদ্মায় আসছিলুম।-- একদিন রাত্তির প্রায় দুটোর সময় ঘুম ভেঙে যেতেই বোটের জানলাটা তুলে ধরে মুখ বাড়িয়ে দেখলুম নিস্তরঙ্গ নদীর উপরে ফুট্‌ফুটে জ্যোৎস্না হয়েছে, একটি ছোট্ট ডিঙিতে একজন ছোকরা একা একলা দাঁড় বেয়ে চলেছে, এমনি মিষ্টি গলায় গান ধরেছে-- গান তার পূর্বে তেমন মিষ্টি কখনো শুনি নি। হঠাৎ মনে হল আবার যদি জীবনটা ঠিক সেইদিন থেকে ফিরে পাই! আর একবার পরীক্ষা করে দেখা যায়। এবার তাকে আর তৃষিত শুষ্ক অপরিতৃপ্ত করে ফেলে রেখে দিই নে-- কবির গান গলায় নিয়ে একটি ছিপ্‌ছিপে ডিঙিতে জোয়ারের বেলায় পৃথিবীতে ভেসে পড়ি, গান গাই এবং বশ করি এবং দেখে আসি পৃথিবীতে কোথায় কী আছে; আপনাকেও একবার জানান দিই, অন্যকেও একবার জানি; জীবনে যৌবনে উচ্ছ্বসিত হয়ে বাতাসের মতো একবার হু হু করে বেড়িয়ে আসি, তার পরে ঘরে ফিরে এসে পরিপূর্ণ প্রফুল্ল বার্ধক্য কবির মতো কাটাই।
  --শিলাইদহ, মঙ্গলবার, ২০ আশ্বিন ১২৯৮;৬.১০.১৮৯১ #৩২  

মনে হয় যদি এই চরাচরব্যাপ্ত পূর্ণনীরবতা আপনাকে আর ধারণ করতে না পারে, সহসা তার অনাদি ভাষা যদি বিদীর্ণ হয়ে প্রকাশ পায়, তা হলে কী-একটা গভীর গম্ভীর শান্ত সুন্দর সকরুণ সংগীত পৃথিবী থেকে নক্ষত্রলোক পর্যন্ত বেজে ওঠে। আসলে তাই হচ্ছে। কেননা, জগতের যে কম্পন আমাদের চক্ষে এসে আঘাত করছে তাই আলোক, আর যে কম্পন কানে আঘাত করছে তাই শব্দ। আমরা একটু নিবিষ্টচিত্তে স্থির হয়ে চেষ্টা করলে জগতের সমস্ত সম্মিলিত আলোক এবং বর্ণের বৃহৎ হারমনিকে মনে মনে একটি বিপুল সংগীতে খানিকটা তর্জমা করে নিতে পারি।... আমি নিত্য নতুন করে অনুভব করি কিন্তু নিত্য নতুন করে কি প্রকাশ করতে পারি!
  --নাটোর, ২ ডিসেম্বর ১৮৯২; ১৮.৮.১২৯৯ #৭৩  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


বাংলা পড়িবার সময় অনেক পাঠক অধিকাংশ স্বরবর্ণকে দীর্ঘ করিয়া টানিয়া পড়েন। ... বাংলা শব্দের মধ্যে এই ধ্বনির অভাব-বশত বাংলায় পদ্যের অপেক্ষা গীতের প্রচলনই অধিক। কারণ, গীত সুরের সাহায্যে প্রত্যেক কথাটিকে মনের মধ্যে সম্পূর্ণ নিবিষ্ট করিয়া দেয়। কথায় যে অভাব আছে সুরে তাহা পূর্ণ হয়। এবং গানে এক কথা বার-বার ফিরিয়া গাহিলে ক্ষতি হয় না। যতক্ষণ চিত্ত না জাগিয়া উঠে ততক্ষণ সঙ্গীত ছাড়ে না। এইজন্য প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যে গান ছাড়া কবিতা নাই বলিলে হয়।  
     --রবীন্দ্রনাথ, বাংলা শব্দ ও ছন্দ, শ্রাবণ ১২৯৯ (২১৮)।  


 

 

২২

স্বপন-পারের ডাক শুনেছি, জেগে তাই তো ভাবি--
কেউ কখনো খুঁজে কি পায় স্বপ্নলোকের চাবি॥
নয় তো সেথায় যাবার তরে,   নয় কিছু তো পাবার তরে,
            নাই কিছু তার দাবি--
    বিশ্ব হতে হারিয়ে গেছে স্বপ্নলোকের চাবি॥
চাওয়া-পাওয়ার বুকের ভিতর না-পাওয়া ফুল ফোটে,
    দিশাহারা গন্ধে তারি আকাশ ভরে ওঠে।
খুঁজে যারে বেড়াই গানে,   প্রাণের গভীর অতল-পানে
           যে জন গেছে নাবি,
    সেই নিয়েছে চুরি করে স্বপ্নলোকের চাবি॥

Bust

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

A    CALL from the land of dreams
    I do hear-
of this Land - shadow all over
  can anyone find the key ever?
  Nothing to gain, nothing to lose there -
Dreams are dreams always
    no demands, no claims,
    they would ever raise,
From our world
    the key is lost forever -
  So do I think, remaining awake here -
we have desires, some are met,
  Though in their midst
  pains from loss we do suffer yet-
We cannot have all we desire
  with what we miss, our heart is tinged all over-
whom do I search, whom do I look for ?
    in my songs-
  he has touched deep my heart's core -
  of the land of dreams,
    he has stolen the key -
while awake
  Such thoughts would come to me.
  
     --Chitra Marjit, Songs to Remember : English Version of Selected Songs of Rabindranath Tagore, Biswa-Jnan, Calcutta  



১৯২৮ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  'মহুয়া' আর 'শেষের কবিতা' লিখলেন। পণ্ডিচেরীতে শ্রীঅরবিন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ। সিংহল ভ্রমণ (দ্বিতীয়বার) প্রকাশ: শেষরক্ষা (প্রহসন),Fireflies, Lectures and Addresses, Letters to a Friend, A Poet's School, The Tagore Birthday Book, Fifteen Poems.

বহির্বিশ্বে: ফেব্রুয়ারিতে কালো পতাকা দেখিয়ে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন। ১লা মার্চ বিদেশী দ্রব্য বয়কট আবার শুরু। ইস্ট ইণ্ডিয়া রেলপথ ও জামশেদপুরে টাটা কারখানায় শ্রমিক ধর্মঘট। ভগৎ  সিং হিন্দুস্থান সোস্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন গঠন করলেন। চীনে গৃহযুদ্ধ শুরু। সোভিয়েট রাশিয়ার প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। প্রথম রঙীন টিভি ও ইস্টম্যান প্রদর্শিত প্রথম রঙীন চলচ্চিত্র। পুলিশের লাঠিতে আহত লালা লাজপৎ রাইয়ের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: মারিয়ানা পিনেডা (লোর্কা), স্ট্রেঞ্জ ইণ্টারলুড (ওনীল), পয়েণ্ট কাউণ্টারপয়েণ্ট (হাক্সলি), লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার (লরেন্স), অ্যাণ্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দি ডন (শোলোকভ), দি টাওয়ার (ইয়েট্‌স), সিলেক্টেড পোয়েম্‌স (পাউণ্ড), মাই অটোবায়োগ্রাফি (মুসোলিনি)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


অবশ্য একটা কথা প্রায়ই শোনা যায় যে রবীন্দ্রনাথের গান একঘেয়ে। এর মত ভুল কথা আর নেই। সাধারণ লোকের এরকম ধারণা হবার কারণ রবীন্দ্রনাথের গানের অফুরন্ত সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। যিনি প্রায় দু'হাজার গান লিখেছেন তাঁর কিছু-কিছু গান এক ঢংয়ের হতে বাধ্য; গায়ক-গায়িকারা অনেক সময় পর-পর অনুরূপ ঢংয়ের গান করেন ব'লে শ্রোতাদের মনে এই রকম ভ্রান্ত ধারণা জন্মায় যে রবীন্দ্রনাথের গান একঘেয়ে। আসলে তাঁর গানে সুরের বৈচিত্র্য যত বেশী কোনো ভারতীয় সুরকারের রচনায় আজ পর্যন্ত ততটা দেখা যায়নি; তাঁর বিভিন্ন গানগুলোর সুর বিশ্লেষণ ক'রে দেখলেই একথা স্পষ্ট হবে।  
     --হিমাংশুকুমার দত্ত, সুরকার রবীন্দ্রনাথ, কবিতা রবীন্দ্র সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৪৮,  সম্পাদক: বুদ্ধদেব বসু (পুনর্মুদ্রণ ১৪০৯)