গীতবিতান-GITABITAN
আমাদের শান্তিনিকেতন আমাদের সব হতে আপন।

Certificate

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  আষাঢ়, ১৩১৮ (১৯১১)
কবির বয়স: ৫০
প্রকাশ: ১৯১৪ , গান |
Collected Poems and Plays
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): বিচিত্র-বিচিত্র; ৪১/৫৬২
রাগ / তাল: ইমন / দাদরা
স্বরলিপি: বিশ্বভারতী পত্রিকা (১৩৪৯); স্বরবিতান ৫৫
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার; ঐ
পাদটিকা:
শান্তিনিকেতনের বর্তমান আশ্রমসঙ্গীত।
সীতা দেবী লিখছেন ১৩১৮ আশ্বিনে রচিত ও সেই সময়েই শান্তিনিকেতনে শারদোৎসব অভিনয়কালে প্রথম গীত [নীচে 'আলোচনা' দ্রষ্টব্য]। কিন্তু রবীন্দ্র রচনাবলী মতে রচনাকাল ১৩১৬ আশ্বিন।  

আলোচনা

  [শান্তিনিকেতনের] হাসপাতালের কাছে একঘর মেথর থাকতো। তার মধ্যে একজনের নাম ছিল মতি মেথর। সে মাঝে মাঝে মদ খেয়ে মাতলামি করতো। কালীমোহনবাবু [কালীমোহন ঘোষ, শান্তিদেবের পিতা] এই অবস্থায় তাকে দেখে বললেন, ব্যাটা আবার মদ খেয়েছিস? আর এমন হলে তোকে তাড়িয়ে দেবো।

সে তখন গদ্‌গদ ভাবে বলল, বাবুমশাই, কার কথা শুনবো। আপনি বলছো মদ খেলে তাড়িয়ে দেবে, আর ওদিকে যে গুরুদেববাবু গান বেঁধেছেন, মদের শান্তিনিকেতন [আমাদের শান্তিনিকেতন]। আমি এখন কার কথা শুনবো?-- বলে সে কালীমোহনবাবুর পা জড়িয়ে ধরতে উদ্যত হলে, পশ্চাদপসরণ ছাড়া কালীমোহনবাবুর আর কোনো উপায় রইলো না।  
     --প্রমথনাথ বিশী, পুরনো সেই দিনের কথা, মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা, ২০০৫
  



[১৯১১ সালে শান্তিনিকেতনে] সন্ধ্যার সময় ফিরিয়া আসিয়া, খাওয়া দাওয়া সারিয়া, 'শারদোৎসব' অভিনয় দেখিতে চলিলাম। গিয়া পৌঁছিবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই অভিনয় আরম্ভ হইল। অভিনয় তখনকার দিনে সর্বাঙ্গসুন্দর বলিয়া বোধ হইত, কোনো ত্রুটি তো চোখে পড়িত না। বালকদের গান ও নৃত্য এত সুন্দর লাগিয়াছিল যে ত্রিশ বৎসর পরেও উহা যেন চোখের সম্মুখে দেখিতে পাই। দুইটি গানের কথা বিশেষ করিয়া মনে পড়ে, ' আমার নয়ন-ভুলানো এলে ', এবং ' আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ '। রবীন্দ্রনাথ সন্ন্যাসীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন, সুতরাং এবারেও [অন্যবার 'রাজা' অভিনয়] তাঁহাকে তাঁহার সাধারণ বেশের বিশেষ কিছু পরিবর্তন করিতে হয় নাই, শুধু মাথায় একটি গেরুয়া রঙের পাগড়ি পরিয়া আসিয়াছিলেন।

এইবার লালচে কাগজের উপর ছাপা একটি প্রোগ্রাম পাইলাম। এটি এখনও আমার কাছে আছে। নূতন তিনটি গান রচিত হইয়াছে [উপরের পাদটিকা পশ্য], তাহা উহাতেই প্রথম দেখিলাম। একটি ' ওগো শেফালিবনের কামনা ', দ্বিতীয় ' আজ প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি ', তৃতীয়, ' আমাদের শান্তিনিকেতন '।  [এই তিনটি গানের কোনোটিই বর্তমান রবীন্দ্ররচনাবলীর 'শারদোৎসব' নাটকে নেই।] প্রোগ্রামটি কলিকাতার আদি ব্রাহ্মসমাজ প্রেসে ছাপানো, ইহাতে নাটকের পাত্রদের নামও ছাপা হইয়াছিল। ঠাকুরদা সাজিয়াছিলেন অজিতকুমার চক্রবর্তী, লক্ষেশ্বর শ্রীযুক্ত তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় [দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র]। প্রমথনাথ বিশী [খ্যাতনামা সাহিত্যিক] সাজিয়াছিলেন ধনপতি। বালকদের ভিতরেও অনেকে এখন জনসমাজে সুপরিচিত। (২৮)  

[১৯১৭ সালের কথায় লিখছেন] প্রথম বার অচলায়তন যেমন দেখিয়াছিলাম [১৯১৪ সালের এপ্রিল মাসে], এবার ঠিক সেরকম বোধ হইল না। অদীনপুণ্য ও পঞ্চকের ভূমিকা আগের মত রবীন্দ্রনাথ ও দিনেন্দ্রনাথই গ্রহণ করিয়াছিলেন। দাদাঠাকুর সাজিয়াছিেল্ন জগদানন্দ রায় মহাশয়। রবীন্দ্রনাথ আগের বার যেরকম পোষাক [একটি সাদা চাদরের নতুন কায়দায় ব্যবহার] করিয়াছিলেন, এবার আর তাহা করেন নাই, শুধু গেরুয়া রঙের আলখাল্লা পরিয়াই রঙ্গমঞ্চে আসিলেন। দর্ভকদের গান এবার তেমন জমিতেছে না দেখিয়া তিনি পিছন হইতে " ও অকূলের কূল, ও অগতির গতি ", গানটিতে যোগ দিলেন। দর্শকরা সচকিত হইয়া উঠিলেন। হঠাৎ যেন অদৃশ্য স্বর্ণবীণার ঝঙ্কারে অভিনয়ক্ষেত্র পূর্ণ হইয়া গেল। নূতন আগন্তুকরা বিস্মিতভাবে এদিকে-ওদিকে তাকাইতে লাগিলেন। অভিনয় শেষ হইল " আমাদের শান্তিনিকেতন " গানটি হইয়া। (৮৯)  
     --সীতা দেবী, পুণ্যস্মৃতি, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৩৯০  


[১৯৪১ সালের জুলাই মাসে অপারেশন করার জন্য কবিকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়] সকাল সাড়ে আটটায় স্টেশনে যাবেন। বাসে আধশোয়া অবস্থায় বসেছেন, নাতনী নন্দিতা পাখা দিয়ে হাওয়া করছে। গাড়ী চলতে আরম্ভ করল। উত্তরায়ণ প্রাঙ্গণে দুপাশে সারিবদ্ধ ভাবে ছাত্রছাত্রীরা গাওয়া শুরু করল 'আমাদের শান্তিনিকেতন'। রান্নাঘর আর গৌর প্রাঙ্গণের কাছে চৌমাথার কাছে গাড়ী পৌঁছল। সামনে কতগুলো নতুন আলোকস্তম্ভ লাগানোর ব্যবস্থা হচ্ছে। কবি নাতনীকে জিজ্ঞেস করলেন, "হ্যাঁরে এগুলো কি হচ্ছে?" নন্দিতা উত্তর দিল "আমাদের নতুন আলো আসছে"। কবি ম্লান হেসে বললেন "ও তোদের পুরানো আলো চলল বুঝি?"  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, যখন প্রিয়তম বলি... সাক্ষাৎকার, রবীন্দ্র ভাবনা, জানুয়ারি-জুন ২০০০ যুগ্মসংখ্যা, টেগোর রিসার্চ ইন্‌স্টিটিউট, কলকাতা  


 

 

৪১

আমাদের      শান্তিনিকেতন  আমাদের  সব হতে আপন।
তার    আকাশ-ভরা কোলে  মোদের  দোলে হৃদয় দোলে,
মোরা    বারে বারে দেখি তারে নিত্যই নূতন॥
মোদের   তরুমূলের মেলা,  মোদের  খোলা মাঠের খেলা,
মোদের   নীল গগনের সোহাগ-মাখা সকাল-সন্ধ্যাবেলা।
মোদের   শালের ছায়াবীথি  বাজায়  বনের কলগীতি,
সদাই    পাতার নাচে মেতে আছে আম্‌লকি-কানন॥
আমরা    যেথায় মরি ঘুরে  সে যে  যায় না কভু দূরে,
মোদের    মনের মাঝে প্রেমের সেতার বাঁধা যে তার সুরে।
মোদের    প্রাণের সঙ্গে প্রাণে,  সে যে  মিলিয়েছে এক তানে,
মোদের    ভাইয়ের সঙ্গে ভাইকে সে যে করেছে এক-মন॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

S

S  HE is our own, the darling of our hearts, Santiniketan.
    Our dreams are rocked in her arms.
Her face is a fresh wonder of love every time we see her,
    for she is our own, the darling of our hearts.

In the shadows of her trees we meet
    in the freedom of her open sky.
Her mornings come and her evenings
bringing down heaven's kisses,
    making us feel anew that she is our own, the darling of our hearts.

The stillness of her shades is stirred by the woodland whisper;
    her amlaki groves are aquiver with the rapture of leaves.

She dwells in us and around us, however far we may wander.
She weaves our hearts in a song, making us one in music,
tuning our strings of love with her own fingers;
    and we ever remember that she is our own, the darling of our hearts.

  
     --Rabindranath Tagore, Collected Poems and Plays, Macmillan, London 1936  



১৯১১ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  শান্তিনিকেতনে পঞ্চাশতম জন্মোৎসব। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার (এখন থেকে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের মুখপত্র) সম্পাদনার ভার গ্রহণ। 'অচলায়তন' ও 'ডাকঘর' রচনা। 'জীবনস্মৃতি'র ধারাবাহিক প্রকাশ শুরু। প্রকাশ: শান্তিনিকেতন ১২-১৩, ছোটগল্প (ছোটদের উপযোগী)।

বহির্বিশ্বে: ১২ই ডিসেম্বর পঞ্চম জর্জের অভিষেক এবং সেই উপলক্ষ্যে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। ২৭শে ডিসেম্বর কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে 'জনগণমন" গীত। মোহনবাগান আই. এফ. এ শীল্ড জিতলো ব্রিটিশ দলকে হারিয়ে। মাঞ্চু রাজবংশের পতন ও সান-ইয়াৎ-সেনের উদ্যোগে চীনে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। হলিউডে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত। বাইশ খণ্ড বিশ্বকোষ সমাপ্ত। ভগিনী নিবেদিতার মৃত্যু।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


ধ্রুপদ খেয়াল ঠুংরি টপ্পা কীর্তন লোকসঙ্গীত -- এর প্রত্যেকটিই রবীন্দ্রনাথকে কমবেশী প্রভাবিত করেছিল, এবং সবকটিরই স্পষ্ট আভাস রবীন্দ্রসঙ্গীতে পাওয়া যায়। এ ছাড়া কিছু বিদেশী, কিছু কর্ণাটকী, আর ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের কিছু গানের প্রতিরূপও তাঁর গানে দেখি। এর বাইরে যা আছে, সেগুলিকে একেবারে নতুন জিনিস বলা চলে। তাতে রাগরাগিণীর বা অন্য কোনো প্রচলিত রীতির আমেজ থাকতে পারে, কিন্তু তাতে তার মৌলিকত্ব কমে না। কোনো প্রচলিত রীতি যখন রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছেন তখনও তার কথায় বা সুরে বা ছন্দে কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য এনেছেন। ফলে সেগুলিকে অনুকরণ না বলে নবীকরণ বলা চলতে পারে। বাংলা তথা ভারতীয় গানের এই নবীকৃত রূপই হল রবীন্দ্রসঙ্গীত।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।