গীতবিতান-GITABITAN
আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন-ভরা

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  আষাঢ়, ১৩১৮ (১৯১১)
কবির বয়স: ৫০
রচনাস্থান: শিলাইদহ
প্রকাশ: ১৯১২ , প্রবাসী-অচলায়তন নাটক |
অচলায়তন র-র ১১;
Gitanjali 57
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): বিচিত্র-বিচিত্র; ৪৬/৫৬৪
রাগ / তাল: ইমন / দাদরা
স্বরলিপি: সঙ্গীত গীতাঞ্জলি; স্বরবিতান ৫২
স্বরলিপিকার: ভীমরাও শাস্ত্রী; ঐ
পাদটিকা:
বালকদের গান।  

আলোচনা

[১৯১১ সালের জুলাই মাসে] 'অচলায়তন' নাটকটি এই সময় রচিত হয়। তাহা শুনিবার জন্য সকলেই অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। জুলাই মাসের গোড়াতে রবীন্দ্রনাথ কলিকাতায় আসিলেন। শুনিলাম নাটকটি প্রশান্তচন্দ্রের [মহলানবিশ] বাড়িতেই পড়িয়া শোনানো হইবে। ...  

সেদিন রবিবার ছিল। বিকাল হইতেই আমরা কয়েকজন বারান্দায় দাঁড়াইয়া অপেক্ষা করিতেছিলাম, কতক্ষণে তিনি আসিবেন। প্রশান্তচন্দ্রের বাড়ি ইহারই মধ্যে অনেকে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। ঘণ্টাখানিক পরে রবীন্দ্রনাথ আসিলেন, সঙ্গে তাঁহার জ্যেষ্ঠা কন্যা মাধুরীলতা দেবী। ...

পাঠের ব্যবস্থা যে জায়গায় হইয়াছিল, লোক তাহার তুলনায় একটু অতিরিক্তই হইয়া গিয়াছিল। ক্রমাগতই একজনের পর একজন নূতন শ্রোতা আসিতেছেন এবং রবীন্দ্রনাথ আবার গোড়া হইতে আরম্ভ করিতেছেন। 'অচলায়তনে' অনেক গান, সবগুলি তিনি একাই গাহিয়া গেলেন, তবে গলা একটু ভার থাকায় নিচু গলায়ই গাহিলেন। (২২)  
     --সীতা দেবী, পুণ্যস্মৃতি, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৩৯০  



 

 

৪৬

আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন-ভরা,
আলো নয়ন-ধোওয়া  আমার, আলো হৃদয়-হরা॥
      নাচে আলো নাচে, ও ভাই,    আমার প্রাণের কাছে--
      বাজে আলো বাজে, ও ভাই,    হৃদয়বীণার মাঝে--
      জাগে আকাশ, ছোটে বাতাস, হাসে সকল ধরা॥
আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি।
আলোর ঢেউয়ে উঠল নেচে মল্লিকা মালতী।
      মেঘে মেঘে সোনা, ও ভাই,    যায় না মানিক গোনা--
      পাতায় পাতায় হাসি, ও ভাই,      পুলক রাশি রাশি--
      সুরনদীর কূল ডুবেছে সুধা-নিঝর-ঝরা॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

ইংরেজী গীতাঞ্জলির ৫৭-নং গান:

LVII

L IGHT, my light, the world-filling light, the eye-kissing light, heart-sweetening light!
Ah, the light dances, my darling, at the centre of my life; the light strikes, my darling, the chords of my love; the sky opens, the wind runs wild, laughter passes over the earth.
The butterflies spread their sails on the sea of light. Lilies and jasmines surge up on the crest of the waves of light.
The light is shattered into gold on every cloud, my darling, and it scatters gems in profusion.
Mirth spreads from leaf to leaf, my darling, and gladness without measure. The heaven's river has drowned its banks and the flood of joy is abroad.

  
     --Gitanjali (Song Offerings) by Rabindranath Tagore

A Collection of Prose Translations made by the Author from the Original Bengali, MacMillan, London March, 1913

  


১৯১১ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  শান্তিনিকেতনে পঞ্চাশতম জন্মোৎসব। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার (এখন থেকে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের মুখপত্র) সম্পাদনার ভার গ্রহণ। 'অচলায়তন' ও 'ডাকঘর' রচনা। 'জীবনস্মৃতি'র ধারাবাহিক প্রকাশ শুরু। প্রকাশ: শান্তিনিকেতন ১২-১৩, ছোটগল্প (ছোটদের উপযোগী)।

বহির্বিশ্বে: ১২ই ডিসেম্বর পঞ্চম জর্জের অভিষেক এবং সেই উপলক্ষ্যে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। ২৭শে ডিসেম্বর কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে 'জনগণমন" গীত। মোহনবাগান আই. এফ. এ শীল্ড জিতলো ব্রিটিশ দলকে হারিয়ে। মাঞ্চু রাজবংশের পতন ও সান-ইয়াৎ-সেনের উদ্যোগে চীনে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। হলিউডে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত। বাইশ খণ্ড বিশ্বকোষ সমাপ্ত। ভগিনী নিবেদিতার মৃত্যু।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


একথা বলা যায় যে রবীন্দ্রনাথই প্রথম ভারতীয় composer. সদারঙ  প্রভৃতি প্রাচীন সুরকারদের ইওরোপীয় আদর্শে ঠিক composer বলবার উপায় নেই, কারণ তাঁরা তাঁদের সৃষ্টিগুলো নির্দিষ্টভাবে বেঁধে যেতে পারেননি। এখন আমাদের হাতে যা প্রমাণ আছে তা থেকে তার যথার্থ মূল্য নির্ধারণ করা অসম্ভব। তাঁদের রচিত সুরগুলি এত বিভিন্ন ও বিকৃতভাবে পাই যে তা থেকে তাদের মূল রূপ সম্বন্ধে কোনো ধারণাই করা যায় না, এবং এই বিকৃতির জন্য দায়ী আমাদের দেশের 'গায়কী' পদ্ধতি। রবীন্দ্রনাথই প্রথম এই 'গায়কী' পদ্ধতির পরিবর্তন করেন -- আমাদের দেশে তিনিই প্রথম জোর দিয়ে বলেন যে সুরকারের সৃষ্টি নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়, তার ওপর একচুল অদল-বদল করবার অধিকার কোনো গায়কের নেই। সুরের এই নির্দিষ্ট রূপের ওপর জোর দেয়াটাই composer-এর প্রথম লক্ষণ। কবির রচিত কবিতা যেমন একটি সম্পূর্ণ ও অপরিবর্তনীয় জিনিস, অতি বড় পাঠকেরও অধিকার নেই নিজের পছন্দমত কবিতার কথা বদ্‌লে নেবার, তেমনি গানের সুরও যে সুরকারের নির্দিষ্ট একটি সৃষ্টি তাতে কোনো রকম অদল-বদলই চলে না এ ধারণা আমাদের দেশে একেবারেই ছিল না, একথা রবীন্দ্রনাথই প্রথম আমাদের মাথায় ঢুকিয়েছেন। দশ পনেরো বছর আগে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান 'আমার মাথা নত ক'রে দাও হে তোমার' ইমনকল্যাণ থেকে ভৈরবীতে পরিবর্তিত হয়ে রেকর্ডে প্রকাশিত হয় এবং 'একদা তুমি প্রিয়ে'র ঝাঁপতাল থেকে দাদরায় পরিবর্তন ঘটে -- সেও রেকর্ড। কিন্তু আজ রেকর্ড কোম্পানীগুলো রবীন্দ্রনাথের নিজের অনুমোদন ব্যতীত তাঁর কোনো সুর প্রকাশ করতে সাহস পায় না; সুরকারকে এতখানি স্বীকার করা রবীন্দ্রনাথের বিরাট ব্যক্তিত্বের ফলেই সম্ভব হয়েছে, এবং এ বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে ভবিষ্যতের সুরকারদের পথ তিনিই সুগম করেছেন।  
     --হিমাংশুকুমার দত্ত, সুরকার রবীন্দ্রনাথ, কবিতা রবীন্দ্র সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৪৮,  সম্পাদক: বুদ্ধদেব বসু (পুনর্মুদ্রণ ১৪০৯)