গীতবিতান-GITABITAN
ওগো, তোরা কে যাবি পারে।

Portrait

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩০০ (১৮৯৩)
কবির বয়স: ৩২
প্রকাশ: বৈশাখ, ১৩৩০ , গানের বহি (বিবিধ) |
চিরকুমার সভা র-র ১৬
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): বিচিত্র-বিচিত্র; ৭০/৫৭৪
রাগ / তাল: বেহাগ-খাম্বাজ / ত্রিতাল
স্বরলিপি: গীতিমালা; স্বরবিতান ৩২
স্বরলিপিকার: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
রাগ মিশ্র/ তাল কাওয়ালি [গীতিমালা]।  

আলোচনা

ভারতবর্ষের যেমন বাধাহীন পরিষ্কার আকাশ, বহুদূরবিস্তৃত সমতলভূমি আছে, এমন য়ুরোপের কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। এইজন্যে আমাদের জাতি যেন বৃহৎ পৃথিবীর সেই অসীম ঔদাস্য আবিষ্কার করতে পেরেছে। এইজন্যে আমাদের পূরবীতে কিংবা টোড়িতে সমস্ত বিশাল জগতের অন্তরের হাহাধ্বনি যেন ব্যক্ত করছে, কারও ঘরের কথা নয়। পৃথিবীর একটা অংশ আছে যেটা কর্মপটু, স্নেহশীল, সীমাবদ্ধ, তার ভাবটা আমাদের মনে তেমন প্রভাব বিস্তার করবার অবসর পায় নি। পৃথিবীর যে ভাবটা নির্জন, বিরল, অসীম, সেই আমাদের উদাসীন করে দিয়েছে। তাই সেতারে যখন ভৈরবীর মিড় টানে, আমাদের ভারতবর্ষীয় হৃদয়ে একটা টান পড়ে।
  --পতিসর কাছারি, রবিবার ৬ মাঘ ১২৯৭; ১৮.১.১৮৯১ #১০  

একটা লম্বা নৌকোয় অনেকগুলো ছোকরা ঝপ্‌ ঝপ্‌ করে দাঁড় ফেলছিল এবং সেই তালে গান গাচ্ছিল--

   যোবতী ক্যান্‌ বা কর মন ভারী?
     পাবনা থাক্যে আন্যে দেব
       ট্যাকা দামের মোটরি। '

স্থানীয় কবিটি যে ভাব অবলম্বন করে সংগীত রচনা করেছেন-- আমরাও ও ভাবের ঢের লিখেছি, কিন্তু কিছু ইতর-বিশেষ আছে। আমাদের যুবতী মন ভারী করলে তৎক্ষণাৎ জীবনটা দিতে কিম্বা নন্দনকানন থেকে পারিজাত এনে দিতে প্রস্তুত হই, কিন্তু এ অঞ্চলের লোক খুব সুখে আছে বলতে হবে-- অল্প ত্যাগস্বীকারেই যুবতীর মন পায়। মোটরি জিনিষটা কী তা বলা আমার সাধ্য নয়, কিন্তু তার দামটাও নাকি পার্শ্বেই উল্লেখ করা আছে-- তাতেই বোঝা যাচ্ছে খুব বেশি দুর্‌মূল্য নয় এবং নিতান্ত অগম্য স্থান থেকেও আনতে হয় না। গানটা শুনে বেশ মজার লাগল। যুবতীর মন ভারী হলে জগতে যে আন্দোলন উপস্থিত হয়, এই বিলের প্রান্তেও তার একটা সংবাদ পাওয়া গেল। এ গানটি কেবল অস্থানেই হাস্যজনক, কিন্তু দেশকালপাত্র-বিশেষে এর যথেষ্ট সৌন্দর্য আছে। আমার অজ্ঞাতনামা গ্রাম্য কবিভ্রাতার রচনাগুলিও এই গ্রামের লোকের সুখদুঃখের পক্ষে নিতান্ত আবশ্যক, আমার গানগুলি সেখানে কম হাস্যজনক নয়।
  --পতিসর, ১১ অগস্ট্‌, ১৮৯৩; ২৭.৪.১৩০০ #১০৮  

আসলে হয়েছে কী, এতক্ষণ কোনো কাজ না থাকাতে নদীর দিকে চেযে গুন্‌ গুন্‌ স্বরে ভৈরবী টোড়ি রামকেলি মিশিয়ে একটা প্রভাতী রাগিণী সৃজন-পূর্বক আপন মনে আলাপ করছিলুম, [কত কথা তারে ছিল বলিতে?] তাতে অকস্মাৎ মনের ভিতরে এমন একটা সুতীব্র অথচ সুমধুর চাঞ্চল্য জেগে উঠল, এমন একটা অনির্বচনীয় ভাবের এবং বাসনার আবেগ উপস্থিত হল, এক মুহূর্তের মধ্যেই আমার এই বাস্তবিক জীবন এবং বাস্তবিক জগৎ আগাগোড়া এমন একটা মূর্তিপরিবর্তন করে দেখা দিলে, অস্তিত্বের সমস্ত দুরূহ সমস্যার এমন একটা সংগীতময় ভাবময় অথচ ভাষাহীন অর্থহীন অনির্দেশ্য উত্তর কানে এসে বাজতে লাগল, এবং সেই সুরের ছিদ্র দিয়ে নদীর উপর জলের তরল পতনশব্দ অবিশ্রাম ধ্বনিত হয়ে এমন একটা পুলক সঞ্চার করতে লাগল--জগতের প্রান্তবর্তী এই সঙ্গীহীন একটিমাত্র প্রাণীকে ঘিরে আষাঢ়ের অশ্রুসজল ঘনঘোর শ্যামল মেঘের মতো 'সুখমিতি বা দুঃখমিতি বা' এমনি স্তরে স্তরে ঘনিয়ে এল, যে একসময়ে বলে উঠতে হল যে, 'থাক আর কাজ নেই। '
  --শিলাইদহ, ২৬ জুন, ১৮৯৪; ১৩.৩.১৩০১ #১২২  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  



গানের কাগজে রাগরাগিণীর নাম-নির্দেশ না থাকাই ভালো। নামের মধ্যে তর্কের হেতু থাকে, রূপের মধ্যে না। কোন্‌ রাগিণী গাওয়া হচ্ছে বলবার কোনো দরকার নেই। কী গাওয়া হচ্ছে সেইটেই মুখ্য কথা, কেননা তার সত্যতা তার মধ্যেই চরম। নামের সত্যতা দশের মুখে, সেই দশের মধ্যে মতের মিল না থাকতে পারে। কলিযুগে শুনেছি নামেই মুক্তি, কিন্তু গান চিরকালই সত্যযুগে।  
     --রবীন্দ্রনাথ, ইন্দিরাদেবীকে লিখিত চিঠি ১৩ জানুয়ারি ১৯৩৫।  


 

 

৭০

              ওগো,  তোরা কে যাবি পারে।
আমি  তরী নিয়ে বসে আছি নদীকিনারে॥
              ও পারেতে উপবনে
              কত খেলা কত জনে,
       এ পারেতে ধূ ধূ মরু বারি বিনা রে॥
       এই বেলা বেলা আছে, আয় কে যাবি।
       মিছে কেন কাটে কাল কত কী ভাবি।
             সূর্য পাটে যাবে নেমে,
             সুবাতাস যাবে থেমে,
       খেয়া বন্ধ হয়ে যাবে সন্ধ্যা-আঁধারে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৯৩ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: জমিদারির কাজে উড়িষ্যায়, সেখানে অনেক ভ্রমণ-- প্রথমবার পুরী ও কোনারকে এলেন। মে মাসে উত্তরবঙ্গে আর অক্টোবরে কারমাটার ও সিমলায়। রচনা: 'পঞ্চভূতের ডায়ারি', 'ইংরেজ ও ভারতবাসী' (সভায় পঠিত), 'বিদায় অভিশাপ'। প্রকাশ: গানের বহি, বাল্মীকি প্রতিভা, য়ুরোপ যাত্রীর ডায়ারি (দ্বিতীয় খণ্ড)।

বহির্বিশ্বে: ২৩শে জুলাই 'বেঙ্গল অ্যাকাডেমি অফ লিটারেচার' (পরে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ) স্থাপিত হোলো। সেপ্টেম্বর মাসে স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্ম মহাসম্মেলনে বিখ্যাত ভাষণ দিলেন। নভেম্বরে অ্যানি বেসান্ত ভারতে এলেন (প্রথমে থিওসফি, পরে স্বাধীনতা সংগ্রাম, কংগ্রেসের প্রেসিডেণ্ট, সেণ্ট্রাল হিন্দু কলেজ ও ইণ্ডিয়ান হোমে রুল লীগের প্রতিষ্ঠাত্রী)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



গীতবিতানের বিষয়সূচী:
ভূমিকা, পূজা, প্রেম, স্বদেশ, বিচিত্র, প্রকৃতি, আনুষ্ঠানিক, গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য, ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী, নাট্যগীতি, জাতীয় সঙ্গীত, পূজা ও প্রার্থনা, আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত, প্রেম ও প্রকৃতি, পরিশিষ্ট  


রবীন্দ্র-সম্পাদিত দ্বিতীয় সংস্করণ গীতবিতানের বিষয়বিন্যাস (বন্ধনীর মধ্যে গীতসংখ্যা):  
ভূমিকা (১)
পূজা পর্যায়: গান (৩২), বন্ধু (৫৯), প্রার্থনা (৩৬), বিরহ (৪৭), সাধনা ও সংকল্প (১৭), দুঃখ (৪৯), আশ্বাস (১২), অন্তর্মুখে (৬), আত্মবিধান (৫), জাগরণ (২৬), নিঃসংশয় (১০), সাধক (২), উৎসব (৭), আনন্দ (২৫), বিশ্ব (৩৯), বিবিধ (১৪৩, একটি গান দ্বিজেন্দ্রনাথ-রচিত বিবেচনায় বাদ দেওয়া হয়), সুন্দর (৩০), বাউল (১৩), পথ (২৫), শেষ (৩৪), পরিণয় (৯, তৃতীয়োত্তর সংস্করণ গীতবিতানে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ের প্রথমাংশে গ্রথিত)
স্বদেশ (৮৬)
প্রেম: গান (২৭), প্রেমবৈচিত্র্য (৩৬৮)
প্রকৃতি: সাধারণ (৯), গ্রীষ্ম (১৬), বর্ষা (১১৫), শরৎ (৩০), হেমন্ত (৫), শীত (১২), বসন্ত (৯৬)
বিচিত্র (১৩৮)
আনুষ্ঠানিক (৯)
পরিশিষ্ট (২, মুদ্রণকার্যের তাগিদায় ২য় সংস্করণে এই বিভাগটিকে বাধ্য হয়ে যোগ করতে হয়, পরের সংস্করণে গানগুলি যথোচিত স্থানে বিন্যস্ত করা হয়)

রবীন্দ্রনাথের নির্দেশমতোই এই বিষয়বিন্যাস মূল গীতবিতানে না দিয়ে তাঁর লেখা একটি বিজ্ঞাপন হিসাবে গ্রথিত হয়। তৃতীয়োত্তর সংস্করণে এই তালিকা গ্রন্থপরিচয়ে পাওয়া যায়।