গীতবিতান-GITABITAN
ভয় হতে তব অভয়মাঝে নূতন জনম দাও হে॥

Diploma

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩০৬ (১৮৯৯)
কবির বয়স: ৩৮
প্রকাশ: বৈশাখ ১৩০৭ , কল্পনা-জন্মদিমের গান র-র ৭ |
কাব্যগ্রন্থ ৮;গান (ব্রহ্ম); র-র ৭
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-প্রার্থনা; ১২৪/৫৭
রাগ / তাল: বেহাগ / চৌতাল
স্বরলিপি: ব্রহ্মসঙ্গীত ২; স্বরবিতান ২২
স্বরলিপিকার: কাঙালীচরণ সেন; ঐ
পাদটিকা:
অনুমান জ্যৈষ্ঠ মাসে শিালাইদহে সকালে জন্মদিন স্মরণে রচিত। হিন্দি-ভাঙা গান (ধ্রুপদ), সূত্র অজ্ঞাত।  
[ কা-সূ ]; [ র-ভা ]  

আলোচনা

পরের দিন সকালে তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, "আপনি নিজের জন্মদিন উপলক্ষে কবিতা লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, অথচ একটা গান রচনা করলেন না, এটা ঠিক মনে হয় না। এবারের পঁচিশে বৈশাখে সমস্ত দেশ আপনার জন্মোৎসব করবে, এই দিনকে উপলক্ষ করে একটা গান রচনা না হলে জন্মদিনে অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হয় না।"

শুনে বললেন, "তুই আবার এক অদ্ভুত ফরমাশ এনে হাজির করলি। আমি নিজের জন্মদিনের গান নিজে রচনা করব, লোকে আমাকে বলবে কি। দেশের লোক এত নির্বোধ নয়, ঠিক ধরে ফেলবে যে, আমি নিজেকে নিজেই প্রচার করছি। তুই চেষ্টা কর এখানে যাঁরা বড়ো বড়ো কবি আছেন, তাঁদের দিয়ে গান লেখাতে।" বলেই তাঁদের নাম বলতে শুরু করলেন। আমি হাসতে লাগলাম, তিনি বললেন, "কেন তাঁরা কি কবিতা লিখতে পারেন না মনে করিস?" উত্তরে বললাম, "আপনি থাকতে থাকতে অন্যদের কাছে চাইবার কি প্রয়োজন-- যখন জন্মদিনের কবিতা লিখেছিলেন, তখন কি কেউ আপনাকে দোষী করেছিল?" রাজী হয়ে জন্মদিনের কবিতাগুলি সব খুঁজে আনতে বললেন দপ্তর থেকে। 'পঁচিশে বৈশাখ' কবিতাটির [পূরবী র-র ১৪] '   হে নূতন দেখা দিক আরবার ' অংশটি একটু অদলবদল করে সুর যোজনা করলেন। সেদিন ২৩শে বৈশাখ। পরের দিন সকালে পুনরায় গানটি আমার গলায় শুনে বললেন, "হাঁ, এবার হয়েছে।"  

সেদিন একথা ঘুণাক্ষরেও মনে হয়নি এই তাঁর জীবনের সর্বশেষ গান। (২৬৭)

[নিজের জন্মদিন উপলক্ষে রচিত প্রথম গান ১৩০৬ সালে, আটত্রিশ বছর বয়সে, "   ভয় হতে তব অভয়মাঝে "]  
     --শান্তিদেব ঘোষ, রবীন্দ্রসংগীত, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৮  



বেহাগ। রবীন্দ্রনাথ বেহাগের সুরে যত সুন্দর-সুন্দর সুরনির্মাণ করেছেন, আর কোনো রাগ সম্ভবত তার পাশে দাঁড়াতে পারে না। সংখ্যায় না হলেও গুণে বুঝি বেহাগই কবির প্রিয়তম, আমাদের কাছে বেহাগই বুঝি সবচেয়ে বেশি নম্বর পাবে। গানের তালিকায় না গিয়ে আমরা বরং বেহাগের রাবীন্দ্রিকতার খোঁজেই যাই। রবীন্দ্র-বেহাগে খাম্বাজ প্রায়ই চুপিসাড়ে ঢুকে পড়ে এবং তাকে আর ধরাই যায় না, কিন্তু বেহাগত্ব থাকে অক্ষুণ্ণ। এটা বাংলা বেহাগেরই একটা চরিত্র। শুধু একটিমাত্র স্বরের স্থান পরিবর্তনে এটি ঘটে যায় -- অবরোহতে প্রধানত শুদ্ধ নিষাদের স্থানে কোমল নিষাদ, এতে সুরের আবেদনে মরমিত্বের মাত্রা এসে যায়। রবীন্দ্রনাথের বেহাগের পর বেহাগে এই ব্যাপারটা ঘটে থাকে। এই কোমল নিষাদ হাজির হয় গানের অন্তরা বা সঞ্চারীতে। ...  অনেকে এই সুরকারুটিকে বিহাগড়া বলতে পারেন।  
     --সুধীর চন্দ, বহুরূপী রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, ২০০৫  


 

 

১২৪

ভয় হতে তব অভয়মাঝে   নূতন জনম দাও হে॥
দীনতা হতে অক্ষয় ধনে,   সংশয় হতে সত্যসদনে,
জড়তা হতে নবীন জীবনে   নূতন জনম দাও হে॥
আমার ইচ্ছা হইতে, প্রভু,  তোমার ইচ্ছামাঝে--
আমার স্বার্থ হইতে, প্রভু,  তব মঙ্গলকাজে--
অনেক হইতে একের ডোরে,  সুখদুখ হতে শান্তিক্রোড়ে--
আমা হতে, নাথ, তোমাতে      মোরে নূতন জনম দাও হে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৯৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: ২২ অগাস্ট বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু। শিলাইদহে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য পারিবারিক বিদ্যালয় শুরু করলেন। শান্তিনিকেতনে ৭ই পৌষের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রথম আচার্য হয়ে ভাষণ দিলেন রবীন্দ্রনাথ । অন্ধ কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করেন। কুষ্টিয়াতে যে ব্যবসা শুরু করেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথকে নিয়ে, বলেন্দ্রনাথের মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে ম্যানেজার তহবিল তছরূপ করে, রবীন্দ্রনাথ জড়িয়ে পড়লেন ঋণজালে। 'ভারতী'র সম্পাদক পদ ছেড়ে দিলেন। প্রকাশ: কণিকা।

বহির্বিশ্বে: বেলুড় মঠ ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা। লর্ড কার্জন এলেন ভারতের বড়লাট হয়ে। কলকাতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হোলো। বুয়র যুদ্ধ শুরু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম: দি রেজারেকশন (টলস্টয়), লিরিক্‌স অ্যাণ্ড রিদম্‌স (কার্দুচ্চি)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



(ধ্রুপদ) জিনিসটা এত ভালোবেসেছিলেন বলেই বোধ হয় একের পর এক এত আশ্চর্য সব ধ্রুপদাঙ্গ গান রচনা করে ব্রহ্মসঙ্গীতকে তিনি সমৃদ্ধ করতে পেরেছিলেন। ধ্রুপদের বাণী যেভাবে ভাবপ্রকাশে সহায়তা করে, সেটা স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথকে আকর্ষণ করেছিল। বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে তাঁর রচিত ধ্রুপদ গানের মতো সর্বগুণসম্পন্ন রচনা কমই আছে। এর অনেকগুলিতেই অবশ্য তিনি হিন্দির ছাঁচ অবিকল বজায় রেখে কেবলমাত্র তাতে হিন্দির জায়গায় বাংলা কথা বসিয়েছেন। কিন্তু সেখানেও তিনি যে শুধু কাব্যগুণেই মূল রচনাকে অতিক্রম করে গেছেন তা নয়। ভাবের সঙ্গে শব্দের হ্রস্বদীর্ঘ স্বরব্যঞ্জনের সুনিপুণ প্রয়োগে সাঙ্গীতিক ধ্বনিবিচারেও হিন্দিকে অনায়াসে ছাড়িয়ে গেছেন।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।  


এই সময় [১৮৮৬] তাঁর গানও শুনেছি। কণ্ঠস্বরের এতাদৃশ ঐশ্বর্য আমি পূর্বে কখনও শুনিনি। বিলেতি বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে দুটি যন্ত্র আমাকে মুগ্ধ করত। একটি 'cornet', অপরটি 'cello'; তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল 'cornet--জাতীয়, 'cello'-জাতীয় নয়। প্রাণের উচ্ছ্বাস এ কণ্ঠস্বরের বিশেষত্ব ছিল। তিনি একটি হিন্দি গান গেয়েছিলেন, যা আমার আজও মনে আছে। তার প্রথম কথাগুলি "জন ছুঁইয়া মোরি বঁইয়া নাগরওয়া"। এ গানটির সুর বোধহয় তোড়ী, নয়ত সেই ঘরের। এ রাগে গলা খোলবার ও তোলবার যথেষ্ট অবসর আছে। আর তাঁর সুর তারার পঞ্চম পর্যন্ত অবলীলাক্রমে উঠে যেত। কিন্তু সে-সময়ে লক্ষ্য করি যে, তিনি তানের পক্ষপাতী ছিলেন না, খেয়ালের বে-পরোয়া তানের ও টপ্পার অবিশ্রান্ত কম্পনের সাধনা তিনি করেননি। সঙ্গীতের এ দুই কাজ বাঙ্গালীদের কোনকালেই শ্রোত্র-রসায়ন নয়, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কানে এ জাতীয় টপ্পাখেয়াল শ্রুতিকটু। সুর যখন কথার সঙ্গে সন্ধিবিচ্ছেদ করে' যন্ত্র-সঙ্গীতের বৃথা নকল করে, কবির কানে তা গ্রাহ্য হয় না। আমি বুঝলুম যে, ধ্রুপদ অঙ্গের গানেই তাঁর কান অভ্যস্ত।  
     রবীন্দ্রনাথের স্বরচিত গানের বিশেষত্বও এই। তাঁর অন্তরের অদম্য প্রাণশক্তি সঙ্গীতশাস্ত্রের বিধিনিষেধ অতিক্রম করতে বাধ্য।  
     --প্রমথ চৌধুরী, রবীন্দ্র-পরিচয়, কবিতা রবীন্দ্র সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৪৮,  সম্পাদক: বুদ্ধদেব বসু (পুনর্মুদ্রণ ১৪০৯)