গীতবিতান-GITABITAN
গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে

Diploma

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৭৯ ( ১৮৭৩)
কবির বয়স: ১৩
প্রকাশ: ফাল্গুন, ১২৮১ , তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা |
সঙ্গীত কল্পতরু (স্বামী বিবেকানন্দ সম্পাদিত)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা ও প্রার্থনা-পূজা ও প্রার্থনা; ১/৮২৭
রাগ / তাল: দেশ / ঝাঁপতাল
স্বরলিপি: ব্রহ্মসঙ্গীত ২; স্বরবিতান ৬৪
স্বরলিপিকার: কাঙালীচরণ সেন; ঐ
পাদটিকা:
অন্য-ভাঙা গান, 'গগনময় থাল্‌, রবি চন্দ্র দীপক বনে', গুরু নানকের বিখ্যাত পাঞ্জাবী (শিখ) ভজনের প্রথমাংশের অনুবাদ ( জয়জয়ন্তী, তেওরা)।  ঝাঁপতাল [ স্বর ৬৪]
রচয়িতা নিয়ে মতভেদ আছে, বিশদতর বিবরণ "আলোচনা" স্তম্ভে [স্বর ৬৪] থেকে উদ্ধৃত হোলো। সেখানে কিছু পাঠান্তর সহ মূল গানটির দুটি স্বরলিপিও দেওয়া হয়েছে।  

আলোচনা

আদর্শ গান:

    দেশ/ঝাঁপতাল

গগনময় থাল, রবি চন্দ্র দীপক বনি,
তারকা-মণ্ডলা জনক মোতি।
ধূপ মলয়ানিলো, পবন চঁবরো করে,
সকল বনরাই ফুলন্ত জ্যোতি।
ক্যায়্‌সী আরতি হোরে ভবখণ্ডনা তেরী আরতি,
অনাহত শব্দে বাজন্ত ভেরী।

    --প্রচলিত শিখ ভজন (আরতি গান)
উন্দেফিনেদ
    -- তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, ১২৮১
[অন্য সংকলনে ঈষৎ ভিন্ন পাঠ, স্বরলিপি এবং পরের ছত্রসমূহও পাওয়া যায়]  
     --গ্রন্থপরিচয়, গীতবিতান  



'গগনের থালে রবি চন্দ্র' গানটি কলকাতায় ১২৮১ বঙ্গাব্দের ১১ মাঘ (২৫শে জানুয়ারি ১৮৭৫) আদি ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে ৪৫তম সাম্বৎসরিক মাঘোৎসবে সন্ধ্যাবেলায় গীত হয়। ফাল্গুন মাসে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় গানটি মুদ্রিত হয়। আদি ব্রাহ্মসমাজ থেকে প্রকাশিত 'ব্রহ্মসঙ্গীত-স্বরলিপি' দ্বিতীয় ভাগ গ্রন্থে এই গানটি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের রচনা হিসেবে উল্লিখিত। বিশ্বভারতী পত্রিকার ১৩৫৬ বঙ্গাব্দের তৃতীয় সংখ্যায় ইন্দিরাদেবী লিখেছেন:

"জ্যোতিরিন্দ্রনাথ একেবারে প্রায় অক্ষরে অক্ষরে অনুবাদ করেছেন।... কেউ কেউ ভুল করে ভাবেন এটি রবীন্দ্রনাথের। "

গানটি শিখ ভজন, গুরু নানকের ভজনের প্রথমাংশের অনুবাদ। অনূদিত গানের রচয়িতা সম্পর্কে সংশয় থাকলেও রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথের রচনা হিসেবে স্বীকৃত। শনিবারের চিঠি পত্রিকার ১৩৪৬ মাঘ সংখ্যায় এ-বিষয়ে লেখা হয়:

"আদি ব্রাহ্মসমাজ হইতে প্রকাশিত ব্রহ্মসঙ্গীত স্বরলিপি (দ্বিতীয় ভাগ) পুস্তকে ইহা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নামে বাহির হইয়াছে। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, এটি তাঁহার রচনা। "

যেহেতু রবীন্দ্রনাথ মনে করেছিলেন যে, এটি তাঁরই রচনা সেজন্য রবীন্দ্র-রচিত গান হিসেবেই গৃহীত হয়েছে।  
     --গ্রন্থপরিচয়, স্বরবিতান ৬৪, বিশ্বভারতী ১৪১০  


আমাদের অনুমান, পদ্যানুবাদটি রবীন্দ্রনাথেরই কৃত। ফাল্গুন সংখ্যায় অনুবাদ-সহ মূল রচনাটি প্রকাশিত হবার কয়েকদিন পরেই রবীন্দ্রনাথ পিতার সঙ্গে বোলপুর হয়ে অমৃতসরে আসেন। খুবই সম্ভব যেন তিনি তত্ত্ববোধিনী  মারফত রচনাটির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। অমৃতসরে পিতার সঙ্গে যখন গুরু-দরবারে উপস্থিত থাকতেন তখন অন্যান্য শিখ-ভজনের সঙ্গে এই গানটিও তিনি শুনেছিলেন, এমন সম্ভাবনার কথা সহজেই ভাবা যেতে পারে। আর এই যোগাযোগের অভিঘাতে রবীন্দ্রনাথ ভজনটির বঙ্গানুবাদ করেন।  
     --[ রবি-জী ১]  


আমার অনেকদিন থেকেই ইচ্ছে ছিল রবীন্দ্রনাথ গানের ক্ষেত্রেও কিরকম পরকে আপন করে নিতে পেরেছেন -- চলিত কথায় যাকে আমরা তাঁর গান ভাঙা বলি -- তার পরিধি কত বিস্তৃত, এবং তাতেও কিরকম অপরূপ কারিগরি দেখিয়েছেন, তার একটি স-দৃষ্টান্ত আলোচনা করি।

গান ভাঙা দুরকমে হতে পারে-- এক, পরের সুরে নিজের কথা বসানো। এ ক্ষেত্রে পরের সুরে নিজের কথা বসাবার দৃষ্টান্তই বেশি পাওয়া যায়। পরের কথায় সুর দেবার দৃষ্টান্ত অতি বিরল; যদিও একেবারে নেই, তা নয়। এই প্রথম শ্রেণীকে আমি সুবিধার্থে দুই ভাগে বিভক্ত করেছি: এক, অ-বাংলা ভাষার গান ভাঙা; দুই, বাংলা ভাষার গান ভাঙা।

আদিব্রাহ্মসমাজের ব্রহ্মসংগীতগুলির কথার সম্পদ বাদ দিয়ে শুধু সুরের দিক থেকে আলোচনা করলেও আমাদের হিন্দুসংগীতের একটি বিপুল রত্নভাণ্ডারের পরিচয় ও ইতিহাস পাওয়া যাবে। আজ যে ভাঙা গানের আলোচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছি, তারও অধিকাংশ এই ভাণ্ডারেই সঞ্চিত। কবি নিজে যেখানে ভালো সুরটি শুনেছেন, অথবা অন্য লোকে দেশ-বিদেশ থেকে যে-সব গান আহরণ করে তাঁকে এনে দিয়েছেন, তার প্রায় সবগুলিই তিনি পূজার বেদীতে নিবেদন করেছেন, এ বললে অত্যুক্তি হয় না। মাঘোৎসবে নতুন নতুন গান সরবরাহের তাগিদ তার অন্যতম কারণ হতে পারে।  
     --ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, রবীন্দ্রসংগীতের ত্রিবেণীসংগম, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলিকাতা, ১৩৯৮  


 

 

গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে,
   তারকামণ্ডল চমকে মোতি রে॥
ধূপ মলয়ানিল, পবন চামর করে,
   সকল বনরাজি ফুলন্ত জ্যোতি রে॥
কেমন আরতি, হে ভবখণ্ডন, তব আরতি--
   অনাহত শব্দ বাজন্ত ভেরী রে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৭৫ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: হিন্দু মেলায় রবীন্দ্রনাথের কবিতাপাঠ।  ১০ই মার্চ জননীর মৃত্যু। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে শিলাইদহ গেলেন। বিদ্বজ্জন সভায় 'প্রকৃতির খেদ' কবিতা পাঠ। 'জ্ঞানাঙ্কুর ও প্রতিবিম্ব'-এ ধারাবাহিকভাবে 'বনফুল' রচনা প্রকাশ।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



রবীন্দ্রসঙ্গীতের যা শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, সেখানে রবীন্দ্রনাথের রচনা তাঁর সেরা ছবির মতোই সতেজ, সাবলীল ও অননুকরণীয়। এখানে রাগরাগিণীর প্রশ্ন আসে না, বাউল-কীর্তনের প্রশ্ন আসে না, বাদী-সম্বাদীর প্রশ্ন আসে না। এখানে সবটাই আছে, আবার সবই যেন নতুন। এমনকি এখানে কথা ও সুরের সামঞ্জস্যের বিচারটাও অবান্তর বলে মনে হয়, কারণ সব শ্রেষ্ঠ শিল্পরচনার মতোই এ গানও বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে। এসব গানের আদর্শগীতরূপ আজ স্বপ্নের বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।  


১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন প্রথম অমৃতসর যান, তখন গুরুদ্বারে গিয়ে নানকের রচিত এই ভজনটি শুনেছিলেন। তার বর্ণনা দিয়েছেন 'আত্মজীবনী'-তে:

    "আমি আবার সন্ধ্যার সময় মন্দিরে গেলাম। দেখি যে, তখন আরতি হইতেছে। এক জন শিখ পঞ্চপ্রদীপ লইয়া গ্রন্থের সম্মুখে দাঁড়াইয়া আরতি করিতেছে। অন্য সকল শিখেরা দাঁড়াইয়া জোড় করে তাহার সঙ্গে গম্ভীর স্বরে পড়িতেছে-- 'গগনমৈ থাল, রবি চন্দ্র দীপক বনে ..."

উপনয়নের পরে যখন রবীন্দ্রনাথ পিতার সঙ্গে অমৃতসর গেলেন (১৮৭৩), তখন তিনি নিশ্চয়ই স্বর্ণমন্দিরে এই গানটি শুনেছিলেন, এবং হয়তো তখনই তিনি এটির বঙ্গানুবাদ করেন। মূল ভজনটির অনুসরণে সুরটি সম্ভবত আরোপ করেন দেবেন্দ্রনাথ নিজেই-- তিনি সুকণ্ঠ ছিলেন, গানের চর্চাও করেছিলেন,তাঁর পক্ষে এ কাজ খুব কঠিন ছিল না। গানটি গাওয়া হল ১৮৭৫ খৃষ্টাব্দের মাঘোৎসবে, জোড়াসাঁকোর বাড়িতে। ... 'তত্ত্ববোধিনী'-র প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই, কিন্তু আমরা ধরে নিতে পারি সুকণ্ঠ বালক রবীন্দ্রনাথ এই অনুষ্ঠানে গানটি গেয়েও থাকবেন।  
     --সমীর সেনগুপ্ত, গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, কলকাতা, ২০০৮