গীতবিতান-GITABITAN
আজি শুভদিনে পিতার ভবনে অমৃতসদনে চলো যাই

Monogram

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৮৯ ( ১৮৮৩)
কবির বয়স: ২১
প্রকাশ: ফাল্গুন, ১২৮৯ , তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা |
রবিচ্ছায়া(ব্রহ্ম)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা ও প্রার্থনা-রবিচ্ছায়া; ৯/৮৩০
রাগ / তাল: খাম্বাজ / একতাল-ত্রিতাল
স্বরলিপি: বালক পত্রিকা;অনান্দসঙ্গীত পত্রিকা (১৩২১); স্বরবিতান ৪৫
স্বরলিপিকার: প্রতিভা দেবী; ঐ; ঐ
পাদটিকা:
দক্ষিণী-ভাঙা গান, "পূর্ণ চন্দ্রাননে চিন্মন হরণে' -কানাড়ী, প্রাপ্তিস্থান-ইন্দিরা দেবী। মাঘোৎসবে গীত। কর্ণাটি খাম্বাজ, তালফেরতা, দ্রুত লয় [ স্বর ]।  

আলোচনা

আদর্শ গান:

পূর্ণ চন্দ্রাননে চিন্মনহরণে
      মন্মথমোহনে মোহিনী
নাকলোক কলোনিলে।
আশা ভঙ্গ মরণবিতরণ
পঞ্চবাণ নানে যানে॥
সা সা সা সা, নি সা রে সা নিধা পা
সা নি ধা পা সা নি ধা পা॥  



[মাঘোৎসবের গানের প্রসঙ্গে] বৈষ্ণব ভক্তদের কীর্তন ভাবেতে মজে দশাপ্রাপ্ত হয়ে ধূলায় অবলুণ্ঠন প্রধান, আর ১১ই মাঘের সঙ্গীত ভাবেতে উড্ডীন হয়ে মর্ত হতে স্বর্গে আরোহণ প্রধান। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর ভ্রাতাদেরসহ ১১ই মাঘের সঙ্গীতের আসরে নামলেন তখন ব্রহ্মের উপাসনায় হৃদয়ের কোণে কোণে যেখানে যত নদী খাল বিল শুকনো ছিল সব ভরে উঠল। আর "মনে কর শেষের সেদিন কি ভয়ঙ্কর" নয়, শুধু "তুমি অগম্য অপার" ইত্যাদি বর্ণনামূলক নির্গুণ ব্রহ্মের স্তুতি নয়। এখন হল সমস্ত বাহ্য বা অন্তর-প্রকৃতিতে প্রতিভাত সগুণ ঈশ্বরের আবাহন। বৈষ্ণবদের লক্ষ্মী বিষ্ণু বা শাক্তদের শিব কালীর স্থলে খ্রিস্টানদের Personal God-এর অবতারণা--

     বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে
    আজ আনন্দে প্রেমচন্দ্রে নেহারো [?]
হল--
     তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না
হল--
     অনেক দিয়েছ নাথ

Personal God-এর অনুভূতি নিরাকারত্বে হয় না। যিনি চক্ষুষঃ চক্ষুঃ শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং তাঁকে চক্ষুকর্ণবান চরণহস্তবান বলে কল্পনায় না আনলে অন্তরে তাঁকে অঙ্গবান করে না দেখলে তাঁকে পাওয়াই হয় না। তাই রামমোহন যুগের পরবর্তী ব্রহ্মোৎসবের রবীন্দ্রের ব্রহ্ম বা ঈশ্বর 'অপাণিপাদ' নন, তিনি 'সর্বতো অক্ষি' 'সর্বত্র শিরোমুখ'। তাই তাঁর পরিচালিত ১১ই মাঘে পরপর গাওয়া হয়েছে--
     বড় আশা করে এসেছি গো ;   আজি শুভদিনে পিতার ভবনে ;   সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে ;   হেরি তব বিমল মুখভাতি ;   এস হে গৃহদেবতা ; তব প্রেম-আঁখি সতত জাগে [তোমারি ইচ্ছা হউক পূর্ণ]     
হল--
     এ কি অন্ধকার ভারতভূমি

...ভাবের ও ভাষার পার্থক্য দেখলে চিনতে পারা যাবে রামমোহন রায়ের সময়কার নিরাকার ব্রহ্ম কেমন করে ভাবের ঘরে একদম সাকার হয়ে নেমে ব্রহ্মবাদীদের আকার-নিরাকার অভেদ জ্ঞানের ভিত্তিই পুনঃস্থাপিত করলেন। অথচ ভাবের ছবির চৌকাঠ পেরিয়ে গেলেই-- মাটি-খড়ে, ধাতু-প্রস্তরে, বর্ণে-চিত্রে ভাবের উপলক্ষ্য ভগবানকে পূর্ণ লক্ষ্য করে মূর্ত করে আঁকড়ে ধরলেই রবীন্দ্রনাথ উত্যক্ত বিচলিত হয়ে উঠতেন। তাঁর আজন্ম 'নিরাকার' পূজার সংস্কারে ঘা লাগত।  (৬৭)  
     --সরলা দেবী চৌধুরানী, জীবনের ঝরাপাতা, রূপা, কলকাতা, ১৯৮২  


চৈত্র ১৩২১ আনন্দসঙ্গীত পত্রিকায় "আজি শুভদিনে" গানটির সঙ্গে ছাপা রয়েছে: "সুর, স্বরলিপি ও স্বরসন্ধি-- শ্রীমতী প্রতিভা দেবী"। আগাগোড়া বাণীর ওপরে আর নীচে দুরকম স্বরমালা লেখা দু-সুরী বিন্যাস। এ গানের সুর প্রতিভা দেবীর বলবার কারণ সম্ভবত এই যে, তিনিই রবীন্দ্রনাথের এই ভাঙা গানটির মূল সুর সংগ্রহ করেছিলেন। সংগ্রহ-করা সুরটি অবশ্য রবীন্দ্রনাথের না হোক, প্রতিভা দেবীর নিজের রচনাও হতে পারে না অবশ্য। যা হোক, ভাঙা গানের ক্ষেত্রে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্বরলিপি-গীতিমালাতেও সুরকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথের নাম দেওয়া হত না।  
     --সন্‌জীদা খাতুন, "রবীন্দ্রসংগীতে স্বরলিপির কথা", রবীন্দ্রনাথের গান:সঙ্গ অনুষঙ্গ, প্যাপিরাস, ২০০১  


আমার অনেকদিন থেকেই ইচ্ছে ছিল রবীন্দ্রনাথ গানের ক্ষেত্রেও কিরকম পরকে আপন করে নিতে পেরেছেন -- চলিত কথায় যাকে আমরা তাঁর গান ভাঙা বলি -- তার পরিধি কত বিস্তৃত, এবং তাতেও কিরকম অপরূপ কারিগরি দেখিয়েছেন, তার একটি স-দৃষ্টান্ত আলোচনা করি।

গান ভাঙা দুরকমে হতে পারে-- এক, পরের সুরে নিজের কথা বসানো। এ ক্ষেত্রে পরের সুরে নিজের কথা বসাবার দৃষ্টান্তই বেশি পাওয়া যায়। পরের কথায় সুর দেবার দৃষ্টান্ত অতি বিরল; যদিও একেবারে নেই, তা নয়। এই প্রথম শ্রেণীকে আমি সুবিধার্থে দুই ভাগে বিভক্ত করেছি: এক, অ-বাংলা ভাষার গান ভাঙা; দুই, বাংলা ভাষার গান ভাঙা।

আদিব্রাহ্মসমাজের ব্রহ্মসংগীতগুলির কথার সম্পদ বাদ দিয়ে শুধু সুরের দিক থেকে আলোচনা করলেও আমাদের হিন্দুসংগীতের একটি বিপুল রত্নভাণ্ডারের পরিচয় ও ইতিহাস পাওয়া যাবে। আজ যে ভাঙা গানের আলোচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছি, তারও অধিকাংশ এই ভাণ্ডারেই সঞ্চিত। কবি নিজে যেখানে ভালো সুরটি শুনেছেন, অথবা অন্য লোকে দেশ-বিদেশ থেকে যে-সব গান আহরণ করে তাঁকে এনে দিয়েছেন, তার প্রায় সবগুলিই তিনি পূজার বেদীতে নিবেদন করেছেন, এ বললে অত্যুক্তি হয় না। মাঘোৎসবে নতুন নতুন গান সরবরাহের তাগিদ তার অন্যতম কারণ হতে পারে।  
     --ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, রবীন্দ্রসংগীতের ত্রিবেণীসংগম, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলিকাতা, ১৩৯৮  


 

 

আজি শুভদিনে পিতার ভবনে     অমৃতসদনে চলো যাই,
              চলো চলো, চলো ভাই॥
না জানি সেথা কত সুখ মিলিবে,     আনন্দের নিকেতনে--
              চলো চলো, চলো যাই।
মহোৎসবে ত্রিভুবন মাতিল,        কী আনন্দ উথলিল--
              চলো চলো, চলো ভাই॥
দেবলোকে উঠিয়াছে জয়গান,       গাহো সবে একতান--
              বলো সবে জয়-জয়॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৮৩ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে পশ্চিম ভারতের সমুদ্রতীরে কারোয়ার শহরে বাস ও 'প্রকৃতির প্রতিশোধ' রচনা। ৯ই ডিসেম্বর মৃণালিনী (ভবতারিণী) দেবীর সঙ্গে বিবাহ। প্রকাশিত বই: বৌঠাকুরানীর হাট, প্রভাতসংগীত, বিবিধ প্রসঙ্গ।

বহির্বিশ্বে: জাতীয় কংগ্রেসের অগ্রদূত ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত। ইলবার্ট বিল (ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গ অপরাধী বিচারের অধিকার সম্পর্কিত) নিয়ে আন্দোলন। বেঙ্গলি পত্রিকার সম্পাদক সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারাবরণ। ব্রিটেন মিশর অধিকার করলো। শিবনাথ শাস্ত্রীর কিশোর মাসিক 'মুকুল' আর শিবনাথ শাস্ত্রী ও অন্যান্যদের সম্পাদনায় 'সঞ্জীবনী' পত্রিকার প্রথম প্রকাশ। মৃত্যু: যদুভট্ট, তুর্গেনিভ, কার্ল মার্ক্‌স্‌ ; চিত্রশিল্পী মানে। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ট্রেজার আইল্যাণ্ড (স্টিভেনসন), দাস স্পেক জরথুস্ত্র (নীট্‌শে)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



রবীন্দ্রনাথের দুশো একটি (কিছু অপ্রকাশিত)গান সঙ্কলন করে 'রবিচ্ছায়া' বইটি প্রকাশিত হয় দোসরা জুন ১৮৮৫ (২৯শে জ্যৈষ্ঠ। বইটির আখ্যাপত্র: 'রবিচ্ছায়া।/(সঙ্গীত)/শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত।/শ্রী যোগেন্দ্রনারায়ণ মিত্র কর্তৃক/ প্রকাশিত।/ কলিকাতা।/৮৫ নং বেনেটোলা লেনে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে/ শ্রী গিরিশচন্দ্র ঘোষ দ্বারা মুদ্রিত।/ বৈশাখ ১২৯২।

সঞ্জীবনী পত্রিকায় 'রবিচ্ছায়া'-র প্রথম বিজ্ঞাপনটি বেরোয় ২০শে বৈশাখ, ১২৯২: 'রবিচ্ছায়া। রবিচ্ছায়া।/ বাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গীত সমূহ একত্রে মুদ্রিত। মূল্য বারো আনা; ডাক মাশুল এক আনা। /  ইহাতে প্রণয় সঙ্গীত, স্বভাব সঙ্গীত, ধর্ম সঙ্গীত, জাতীয় সঙ্গীত প্রচুর পরিমাণে সন্নিবদ্ধ হইয়াছে। বর্তমান দুর্ভিক্ষ উপলক্ষে রবীবাবু [ যল্লিখিতং] যে শোক সঙ্গীত রচনা করিয়াছেন তাহাও ইহাতে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। অর্থাৎ তিনি বিগত চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত যতগুলি সঙ্গীত রচনা করিয়াছেন তাহার প্রায় সকলগুলিই ইহাতে প্রকাশিত হইয়াছে। ইহার বহুসংখ্যক গান পূর্ব্বে কখনও প্রকাশিত হয় নাই। ...'

'রবিচ্ছায়া'র 'রচয়িতার নিবেদন'-এ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন:

'অনেক কারণে গান ছাপা নিষ্ফল বোধ হয়। সুর সঙ্গে না থাকিলে গানের কথাগুলি নিতান্ত অসম্পূর্ণ। তা ছাড়া গানের কবিতা সকল সময়ে পাঠ্য হয় না, কারণ সুরে ও কথায় মিলিয়া তবে গানের কবিতা গঠিত হয়। এইজন্য সুর ছাড়া গান ছাপার অক্ষরে পড়িতে অনেকস্থলে অত্যন্ত খাপছাড়া ঠেকে। ...

'বর্তমান গ্রন্থে মুদ্রিত অধিকাংশ গান সাধারণের নিকট প্রকাশ করিতে আমার ইচ্ছা ছিল না। ইহাতে অনেক গানই বিস্মৃত বাল্যকালের মুহূর্ত-স্থায়ী সুখদুঃখের সহিত দুই দণ্ড খেলা করিয়া কে কোথায় ঝরিয়া পড়িয়াছিল -- সেই সকল শুষ্কপত্র চারিদিক হইতে জড় করিয়া বইয়ের পাতার মধ্যে তাহাদিগকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করিলে গ্রন্থকার ছাড়া আর কাহারও তাহাতে কোন আনন্দ নাই। আমার এইরূপ মনের ভাব। এই জন্য এ গানগুলি আজ সাত আট বৎসর [অর্থাৎ ১২৮৪-৮৫ অবধি] ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়া আছে, আমি ছাপাইতে চেষ্টা করি নাই। ...

প্রশান্তকুমার পাল জানাচ্ছেন: 'দুঃখের বিষয়, [রবিচ্ছায়া] গ্রন্থটি জনপ্রিয় হয়নি, ফলে অগ্রহায়ণ মাস (প্রকাশ জ্যৈষ্ঠ) থেকে এটিকে হ্রাসমূল্যে (আট আনায়) বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। ... তবে থিয়েটারি চটুল গানের পাশে 'রবিবাবুর গান' যথোপযুক্ত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক সময় নিয়েছে, একথা মানতেই হবে। '  
     --প্রশান্ত কুমার পাল, রবিজীবনী, ১-৯ খণ্ড,  আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৮২ - ২০০৪