গীতবিতান-GITABITAN
সকাতরে ঐ কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা।

Portrait

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৯০ ( ১৮৮৩)
কবির বয়স: ২২
প্রকাশ: ফাল্গুন, ১২৯০ , তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা |
রবিচ্ছায়া(ব্রহ্ম)
Rabeendra Beeksa - Misc. Sources
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা ও প্রার্থনা-রবিচ্ছায়া; ১৮/৮৩৪
রাগ / তাল: কর্ণাটী ভজন / একতাল
স্বরলিপি: ভারতী (১৩০১); স্বরবিতান ৮
স্বরলিপিকার: সরলা দেবী; ইন্দিরা দেবী; ঐ
পাদটিকা:
দক্ষিণী-ভাঙা  গান, 'চারি বর্ষা পর্যন্ত' -কানাড়ী ভজন, প্রাপ্তিস্থান-ইন্দিরা দেবী। আদি ব্রাহ্মসমাজ মাঘোৎসবে গীত।  

আলোচনা

সরলা দেবী [দিদি স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা] লিখছেন: "তখন আমার বয়স বার বৎসর। হঠাৎ সেই জন্মদিনের সকালে রবিমামা এলেন কাশিয়াবাগানে হাতে একখানি য়ুরোপীয় music score manuscript খাতা নিয়ে। তার উপর সুন্দর করে বড় বড় অক্ষরে লেখা 'Socatore-- Composed by Sarola'

''সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে'   বলে রবিমামার একটি ব্রহ্মসংগীতকে আমি রীতিমত একটি ইংরেজী বাজনার piece এ পরিণত করেছিলাম। পুরোদস্তুর ইংরেজী piece, পিয়ানোতে বা ব্যাণ্ডে বাজাবার  মতো। না জানলে কেউ চিনতে পারবে না এর ভিতরটা দিশী গান, জানলে-- তারা উদারা মুদারা তিনটে গ্রামে ছড়ানো কর্ডের বহুস্বরের বৈচিত্র্যের ভিতর থেকে আসল সুরটির উঁকিঝুঁকি ধরে ফেলে বিস্ময়ামোদিত হবে।

ইংরেজী বিধানে সপ্তাঙ্গে সম্পূর্ণ সেই বাজনা আমার মাথায় স্তরে স্তরে লেখা ছিল। কাউকে শোনাতে গেলেই সবটা মনের থেকে বেরিয়ে এসে বাজত। রবিমামা খাতাখানি দিয়ে বললেন-- 'এইতে লিখে রাখ্‌, ভুলে যাবি'।"
    --জীবনের ঝরাপাতা।

এই গানটির মতো আরো দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীতকে হার্মনাইজ করা হয়-- দ্রষ্টব্য   'শান্ত হরে মম চিত্ত নিরাকুল' ও   'পথহারা তুমি পথিক যেন গো' -- জানাচ্ছেন সমীর সেনগুপ্ত। ইন্দিরা দেবী 'সংগীতস্মৃতি'তে লিখেছেন যে রবীন্দ্রনাথ একসময়ে তাঁকে, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ও সরলা দেবীকে 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ' কবিতার উপর একটি পিয়ানোর গৎ তৈরি করতে বলেছিলেন। সমীর সেনগুপ্তের মতে এর থেকে বোঝা যায় যে হার্মনিরচনায় রবীন্দ্রনাথের নিজেরও উৎসাহ ছিল। (৪৫)  
     --সমীর সেনগুপ্ত, গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, ২০০৮  



শুধু ধর্মসঙ্গীতে নয়, এখন থেকে কত ভাবের কত গানে বাড়ি সদ্যগুঞ্জরিত হতে থাকল। বাড়িতে শেখা দিশী গানবাজনায় আমাদের উৎসাহদাতা ছিলেন রবিমামা। বাড়িতে শেখা দিশী গানবাজনায় শুধু নয়, মেমেদের কাছে শেখা য়ুরোপীয় সঙ্গীতের চর্চায়ও আমাদের উৎসাহদাতা ছিলেন রবিমামা।

আমার একটা নৈসর্গিক কুশলতা বেরিয়ে পড়ল-- বাঙ্গলা গানে ইংরিজী রকম কর্ড দিয়ে ইংরিজী 'piece' রচনা করা। একবার রবিমামা আমাদের একটা 'task' দিলেন-- তাঁর 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ" কবিতাকে পিয়ানোতে প্রকাশ করা। একমাত্র আমিই সেটা করলুম। মনে পড়ে তাতে কি অভিনিবেশ শিক্ষা দিলেন। কি গভীর ভাবে কাব্যের অর্থবোধ ও সঙ্গে সঙ্গে সুরে তালে তাকে দেহদান করার অপূর্ব গহন আনন্দকূপে আমায় ডুব দেওয়ালেন। (৩১)  
     --সরলা দেবী চৌধুরানী, জীবনের ঝরাপাতা, রূপা, কলকাতা, ১৯৮২  


[মাঘোৎসবের গানের প্রসঙ্গে] বৈষ্ণব ভক্তদের কীর্তন ভাবেতে মজে দশাপ্রাপ্ত হয়ে ধূলায় অবলুণ্ঠন প্রধান, আর ১১ই মাঘের সঙ্গীত ভাবেতে উড্ডীন হয়ে মর্ত হতে স্বর্গে আরোহণ প্রধান। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর ভ্রাতাদেরসহ ১১ই মাঘের সঙ্গীতের আসরে নামলেন তখন ব্রহ্মের উপাসনায় হৃদয়ের কোণে কোণে যেখানে যত নদী খাল বিল শুকনো ছিল সব ভরে উঠল। আর "মনে কর শেষের সেদিন কি ভয়ঙ্কর" নয়, শুধু "তুমি অগম্য অপার" ইত্যাদি বর্ণনামূলক নির্গুণ ব্রহ্মের স্তুতি নয়। এখন হল সমস্ত বাহ্য বা অন্তর-প্রকৃতিতে প্রতিভাত সগুণ ঈশ্বরের আবাহন। বৈষ্ণবদের লক্ষ্মী বিষ্ণু বা শাক্তদের শিব কালীর স্থলে খ্রিস্টানদের Personal God-এর অবতারণা--

     বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে
    আজ আনন্দে প্রেমচন্দ্রে নেহারো [?]
হল--
     তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না
হল--
     অনেক দিয়েছ নাথ

Personal God-এর অনুভূতি নিরাকারত্বে হয় না। যিনি চক্ষুষঃ চক্ষুঃ শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং তাঁকে চক্ষুকর্ণবান চরণহস্তবান বলে কল্পনায় না আনলে অন্তরে তাঁকে অঙ্গবান করে না দেখলে তাঁকে পাওয়াই হয় না। তাই রামমোহন যুগের পরবর্তী ব্রহ্মোৎসবের রবীন্দ্রের ব্রহ্ম বা ঈশ্বর 'অপাণিপাদ' নন, তিনি 'সর্বতো অক্ষি' 'সর্বত্র শিরোমুখ'। তাই তাঁর পরিচালিত ১১ই মাঘে পরপর গাওয়া হয়েছে--
     বড় আশা করে এসেছি গো ;   আজি শুভদিনে পিতার ভবনে ;   সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে ;   হেরি তব বিমল মুখভাতি ;   এস হে গৃহদেবতা ; তব প্রেম-আঁখি সতত জাগে [তোমারি ইচ্ছা হউক পূর্ণ]     
হল--
     এ কি অন্ধকার ভারতভূমি

...ভাবের ও ভাষার পার্থক্য দেখলে চিনতে পারা যাবে রামমোহন রায়ের সময়কার নিরাকার ব্রহ্ম কেমন করে ভাবের ঘরে একদম সাকার হয়ে নেমে ব্রহ্মবাদীদের আকার-নিরাকার অভেদ জ্ঞানের ভিত্তিই পুনঃস্থাপিত করলেন। অথচ ভাবের ছবির চৌকাঠ পেরিয়ে গেলেই-- মাটি-খড়ে, ধাতু-প্রস্তরে, বর্ণে-চিত্রে ভাবের উপলক্ষ্য ভগবানকে পূর্ণ লক্ষ্য করে মূর্ত করে আঁকড়ে ধরলেই রবীন্দ্রনাথ উত্যক্ত বিচলিত হয়ে উঠতেন। তাঁর আজন্ম 'নিরাকার' পূজার সংস্কারে ঘা লাগত।  (৬৭)  
     --সরলা দেবী চৌধুরানী, জীবনের ঝরাপাতা, রূপা, কলকাতা, ১৯৮২  


আমার অনেকদিন থেকেই ইচ্ছে ছিল রবীন্দ্রনাথ গানের ক্ষেত্রেও কিরকম পরকে আপন করে নিতে পেরেছেন -- চলিত কথায় যাকে আমরা তাঁর গান ভাঙা বলি -- তার পরিধি কত বিস্তৃত, এবং তাতেও কিরকম অপরূপ কারিগরি দেখিয়েছেন, তার একটি স-দৃষ্টান্ত আলোচনা করি।

গান ভাঙা দুরকমে হতে পারে-- এক, পরের সুরে নিজের কথা বসানো। এ ক্ষেত্রে পরের সুরে নিজের কথা বসাবার দৃষ্টান্তই বেশি পাওয়া যায়। পরের কথায় সুর দেবার দৃষ্টান্ত অতি বিরল; যদিও একেবারে নেই, তা নয়। এই প্রথম শ্রেণীকে আমি সুবিধার্থে দুই ভাগে বিভক্ত করেছি: এক, অ-বাংলা ভাষার গান ভাঙা; দুই, বাংলা ভাষার গান ভাঙা।

আদিব্রাহ্মসমাজের ব্রহ্মসংগীতগুলির কথার সম্পদ বাদ দিয়ে শুধু সুরের দিক থেকে আলোচনা করলেও আমাদের হিন্দুসংগীতের একটি বিপুল রত্নভাণ্ডারের পরিচয় ও ইতিহাস পাওয়া যাবে। আজ যে ভাঙা গানের আলোচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছি, তারও অধিকাংশ এই ভাণ্ডারেই সঞ্চিত। কবি নিজে যেখানে ভালো সুরটি শুনেছেন, অথবা অন্য লোকে দেশ-বিদেশ থেকে যে-সব গান আহরণ করে তাঁকে এনে দিয়েছেন, তার প্রায় সবগুলিই তিনি পূজার বেদীতে নিবেদন করেছেন, এ বললে অত্যুক্তি হয় না। মাঘোৎসবে নতুন নতুন গান সরবরাহের তাগিদ তার অন্যতম কারণ হতে পারে।  
     --ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, রবীন্দ্রসংগীতের ত্রিবেণীসংগম, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলিকাতা, ১৩৯৮  


 

 

১৮

সকাতরে ঐ কাঁদিছে সকলে,   শোনো শোনো পিতা।
কহো কানে কানে, শুনাও প্রাণে প্রাণে   মঙ্গলবারতা॥
ক্ষুদ্র আশা নিয়ে রয়েছে বাঁচিয়ে,  সদাই ভাবনা।
যা-কিছু পায় হারায়ে যায়,   না মানে সান্ত্বনা॥
সুখ-আশে দিশে দিশে  বেড়ায় কাতরে--
মরীচিকা ধরিতে চায়   এ মরুপ্রান্তরে॥
ফুরায় বেলা, ফুরায় খেলা,   সন্ধ্যা হয়ে আসে--
কাঁদে তখন আকুল-মন,  কাঁপে তরাসে॥
কী হবে গতি, বিশ্বপতি,   শান্তি কোথা আছে--
তোমারে দাও, আশা পূরাও,   তুমি এসো কাছে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

L ISTEN to the cry of your children, father ! Speak to them.
  They nourish doomed hopes in their anxious hearts, they clasp things that crumble in their eager hands and they  know not consolation. Speak to them.
  They pursue shadows in the desert waste and when the day wanes they wring their empty hands ; they look before them and
see nothing. Speak to them.
  

[Rabindranath's own translations of a number of his poems and songs during his 1912-13 stay in America were collected and later turned over to the Rabindra-Bhavan by his American friends. Like many others, these are his transcreations that do not always follow the original.]  
     --Rabindranath Tagore, "Ingareji Rupantar", Rabindra Beeksaa, vol. 17, Rabindra-Bhavan, Aug 1987  



১৮৮৩ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে পশ্চিম ভারতের সমুদ্রতীরে কারোয়ার শহরে বাস ও 'প্রকৃতির প্রতিশোধ' রচনা। ৯ই ডিসেম্বর মৃণালিনী (ভবতারিণী) দেবীর সঙ্গে বিবাহ। প্রকাশিত বই: বৌঠাকুরানীর হাট, প্রভাতসংগীত, বিবিধ প্রসঙ্গ।

বহির্বিশ্বে: জাতীয় কংগ্রেসের অগ্রদূত ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত। ইলবার্ট বিল (ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গ অপরাধী বিচারের অধিকার সম্পর্কিত) নিয়ে আন্দোলন। বেঙ্গলি পত্রিকার সম্পাদক সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারাবরণ। ব্রিটেন মিশর অধিকার করলো। শিবনাথ শাস্ত্রীর কিশোর মাসিক 'মুকুল' আর শিবনাথ শাস্ত্রী ও অন্যান্যদের সম্পাদনায় 'সঞ্জীবনী' পত্রিকার প্রথম প্রকাশ। মৃত্যু: যদুভট্ট, তুর্গেনিভ, কার্ল মার্ক্‌স্‌ ; চিত্রশিল্পী মানে। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ট্রেজার আইল্যাণ্ড (স্টিভেনসন), দাস স্পেক জরথুস্ত্র (নীট্‌শে)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


রবীন্দ্রনাথের দুশো একটি (কিছু অপ্রকাশিত)গান সঙ্কলন করে 'রবিচ্ছায়া' বইটি প্রকাশিত হয় দোসরা জুন ১৮৮৫ (২৯শে জ্যৈষ্ঠ। বইটির আখ্যাপত্র: 'রবিচ্ছায়া।/(সঙ্গীত)/শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত।/শ্রী যোগেন্দ্রনারায়ণ মিত্র কর্ত্তৃক/ প্রকাশিত।/ কলিকাতা।/৮৫ নং বেনেটোলা লেনে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে/ শ্রী গিরিশচন্দ্র ঘোষ দ্বারা মুদ্রিত।/ বৈশাখ ১২৯২।

সঞ্জীবনী পত্রিকায় 'রবিচ্ছায়া'-র প্রথম বিজ্ঞাপনটি বেরোয় ২০শে বৈশাখ, ১২৯২: 'রবিচ্ছায়া। রবিচ্ছায়া।/ বাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গীত সমূহ একত্রে মুদ্রিত। মূল্য বারো আনা; ডাক মাশুল এক আনা। /  ইহাতে প্রণয় সঙ্গীত, স্বভাব সঙ্গীত, ধর্ম সঙ্গীত, জাতীয় সঙ্গীত প্রচুর পরিমাণে সন্নিবদ্ধ হইয়াছে। বর্তমান দুর্ভিক্ষ উপলক্ষে রবীবাবু [ যল্লিখিতং] যে শোক সঙ্গীত রচনা করিয়াছেন তাহাও ইহাতে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। অর্থাৎ তিনি বিগত চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত যতগুলি সঙ্গীত রচনা করিয়াছেন তাহার প্রায় সকলগুলিই ইহাতে প্রকাশিত হইয়াছে। ইহার বহুসংখ্যক গান পূর্ব্বে কখনও প্রকাশিত হয় নাই। ...'

'রবিচ্ছায়া'র 'রচয়িতার নিবেদন'-এ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন:

'অনেক কারণে গান ছাপা নিষ্ফল বোধ হয়। সুর সঙ্গে না থাকিলে গানের কথাগুলি নিতান্ত অসম্পূর্ণ। তা ছাড়া গানের কবিতা সকল সময়ে পাঠ্য হয় না, কারণ সুরে ও কথায় মিলিয়া তবে গানের কবিতা গঠিত হয়। এইজন্য সুর ছাড়া গান ছাপার অক্ষরে পড়িতে অনেকস্থলে অত্যন্ত খাপছাড়া ঠেকে। ...

'বর্তমান গ্রন্থে মুদ্রিত অধিকাংশ গান সাধারণের নিকট প্রকাশ করিতে আমার ইচ্ছা ছিল না। ইহাতে অনেক গানই বিস্মৃত বাল্যকালের মুহূর্ত-স্থায়ী সুখদুঃখের সহিত দুই দণ্ড খেলা করিয়া কে কোথায় ঝরিয়া পড়িয়াছিল -- সেই সকল শুষ্কপত্র চারিদিক হইতে জড় করিয়া বইয়ের পাতার মধ্যে তাহাদিগকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করিলে গ্রন্থকার ছাড়া আর কাহারও তাহাতে কোন আনন্দ নাই। আমার এইরূপ মনের ভাব। এই জন্য এ গানগুলি আজ সাত আট বৎসর [অর্থাৎ ১২৮৪-৮৫ অবধি] ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়া আছে, আমি ছাপাইতে চেষ্টা করি নাই। ...

প্রশান্তকুমার পাল জানাচ্ছেন: 'দুঃখের বিষয়, [রবিচ্ছায়া] গ্রন্থটি জনপ্রিয় হয়নি, ফলে অগ্রহায়ণ মাস (প্রকাশ জ্যৈষ্ঠ) থেকে এটিকে হ্রাসমূল্যে (আট আনায়) বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। ... তবে থিয়েটারি চটুল গানের পাশে 'রবিবাবুর গান' যথোপযুক্ত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক সময় নিয়েছে, একথা মানতেই হবে।'  
     --প্রশান্ত কুমার পাল, রবিজীবনী, ১-৯ খণ্ড,  আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৮২ - ২০০৪  



গান সম্বন্ধে যে-মতামত তিনি তাঁর প্রথম জীবনেই ব্যক্ত করেছিলেন সেটা প্রায় শেষ জীবন পর্যন্ত অটুট ছিল। বিশ বছর বয়সের একটা লেখায় তিনি বলেছিলেন: '(ওস্তাদেরা) গানের কথার উপর সুর দাঁড় করাইতে চান, আমি গানের কথাগুলিকে সুরের উপর দাঁড় করাইতে চাই। তাঁহার কথা বসাইয়া যান সুর বাহির করিবার জন্য, আমি সুর বসাইয়া যাই কথা বাহির করিবার জন্য।' এই একই কথা -- অর্থাৎ বাণী ও সুরের অর্ধনারীশ্বর সম্পর্ক -- তিনি বহুবার বহুভাবে বলেছেন।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।  


রবীন্দ্রনাথ বরাবরই তাঁর গানের সুরে কর্ড প্রয়োগ এবং হার্মোনাইজেশনের কাজে উৎসাহ দিতেন। এই সব উদ্যমের পাকা দলিল এখন অবশ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। ১৮৮৪তে সরলা দেবী " সকাতরে ওই কাঁদিছে " গানে কর্ড প্রয়োগের যে চেষ্টা করেন, রবীন্দ্রসংগীতকে হার্মনাইজ করবার সেটা সম্ভবত সর্বপ্রথম নিদর্শন [গানের তথ্য পশ্য]। আর একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন আছে ১৩০১ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের 'সাধনা' পত্রিকায়। এটি পূর্বোক্ত দৃষ্টান্তের মতন অপরিণত হাতের কাজ নয়। ঠাকুরবাড়ির পাশ্চাত্য সংগীতশিক্ষক সিঁয়োর মন্‌জাতো 'মায়ার খেলার'র অন্তর্গত " পথহারা তুমি পথিক যেন গো " গানটির স্বরসন্ধি রচনা করেন। সাধনা পত্রিকায় তার পূর্ণাঙ্গ স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছে এবং ভূমিকায় বলা হয়েছে:

    "কেহ কেহ আপত্তি করেন, মিশ্রমিল আমাদের সংগীতের অনুপযোগী, উহার দ্বারা আমাদের রাগরাগিণীর রূপ রক্ষা করা কঠিন। অলংকারের অতিপ্রাচুর্যে রূপের স্ফূর্তিহানি হয় বটে কিন্তু যথাযোগ্য্রূপে স্বল্প অলংকার প্রয়োগ করিলে কি তাদের রূপ আরও ফুটিয়া উঠে না?"

১৯২১-২২ সালের আনন্দসঙ্গীত পত্রিকায় এই জাতেয় কয়েকটি প্রয়াসের নিদর্শন পাওয়া যায় [বন্ধনীতে স্বরলিপিকার]: " আমি চিনি গো চিনি " (ইন্দিরা দেবী); "সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং" (সরলা দেবী) [অন্যান্য তথ্য বিভাগে 'মন্ত্রগান' পৃষ্ঠা পশ্য]; " বড়ো আশা করে " (অশোকা দেবী), " তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে "-- প্রভৃতি মুদ্রিত ও প্রকাশিত স্বরলিপিগুলিতে নিঃসন্দেহে এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কৌতূহল এবং সমর্থনের দ্যোতনা পাওয়া যায়। (৩৭)  
     --ভাস্কর মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ও পাশ্চাত্য সংগীত, রবীন্দ্রসংগীতায়ন ২, সুচিত্রা মিত্র ও সুভাষ চৌধুরী সম্পাদিত, প্যাপিরাস ১৯৯০