গীতবিতান-GITABITAN
বলি ও আমার গোলাপ বালা বলি ও আমার গোলাপ বালা

Certificate

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৮৫ ( ১৮৭৮)
কবির বয়স: ১৭
প্রকাশ: অগ্রহায়ণ, ১২৮৭ , ভারতী-গোলাপবালা (গোলাপের প্রতি বুলবুল) |
শৈশবসঙ্গীত (১২৯১) র-র অচ-১; রবিচ্ছায়া (বিবিধ);কাব্যগ্রন্থাবলী (১৩০৩)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রেম ও প্রকৃতি-রবিচ্ছায়া; ৫/৮৭২
রাগ / তাল: বেহাগ / খেমটা
স্বরলিপি: গীতিমালা; স্বরবিতান ২০
স্বরলিপিকার: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
গীতিমালার সঙ্গে সামান্য সুরভেদ আছে। রবিচ্ছায়া, [ গীবিন ] (১৩৩৮) ও গীতিমালার মধ্যে বহু ছোট ছোট পাঠভেদ।  

আলোচনা

এ শাহিবাগ-প্রাসাদের চূড়ার উপরকার একটি ছোটো ঘরে আমার আশ্রয় ছিল। কেবল একটি চাকভরা বোলতার দল আমার এই ঘরের অংশী। রাত্রে আমি সেই নির্জন ঘরে শুইতাম এক-একদিন অন্ধকারে দুই-একটা বোলতা চাক হইতে আমার বিছানায় উপর আসিয়া পড়িত যখন পাশ ফিরিতাম তখন তাহারাও প্রীত হইত না এবং আমার পক্ষেও তাহা তীক্ষ্ণভাবে অপ্রীতিকর হইত। শুক্লপক্ষের গভীর রাত্রে সেই নদীর দিকের প্রকাণ্ড ছাদটাতে একলা ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়ানো আমার আর-একটা উপসর্গ ছিল। এই ছাদের উপর নিশাচর্য করিবার সময়ই আমার নিজের সুর দেওয়া সর্বপ্রথম গানগুলি রচনা করিয়াছিলাম। [সর্বপ্রথম গান:   নীরব রজনী দেখো ]  তাহার মধ্যে ' বলি ও আমার গোলাপবালা ' গানটি এখনো আমার কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আসন রাখিয়াছে। (৩৫৭)  
     --রবীন্দ্রনাথ, "স্বাদেশিকতা" - জীবনস্মৃতি, র-র ১৭  



বেহাগ। রবীন্দ্রনাথ বেহাগের সুরে যত সুন্দর-সুন্দর সুরনির্মাণ করেছেন, আর কোনো রাগ সম্ভবত তার পাশে দাঁড়াতে পারে না। সংখ্যায় না হলেও গুণে বুঝি বেহাগই কবির প্রিয়তম, আমাদের কাছে বেহাগই বুঝি সবচেয়ে বেশি নম্বর পাবে। গানের তালিকায় না গিয়ে আমরা বরং বেহাগের রাবীন্দ্রিকতার খোঁজেই যাই। রবীন্দ্র-বেহাগে খাম্বাজ প্রায়ই চুপিসাড়ে ঢুকে পড়ে এবং তাকে আর ধরাই যায় না, কিন্তু বেহাগত্ব থাকে অক্ষুণ্ণ। এটা বাংলা বেহাগেরই একটা চরিত্র। শুধু একটিমাত্র স্বরের স্থান পরিবর্তনে এটি ঘটে যায় -- অবরোহতে প্রধানত শুদ্ধ নিষাদের স্থানে কোমল নিষাদ, এতে সুরের আবেদনে মরমিত্বের মাত্রা এসে যায়। রবীন্দ্রনাথের বেহাগের পর বেহাগে এই ব্যাপারটা ঘটে থাকে। এই কোমল নিষাদ হাজির হয় গানের অন্তরা বা সঞ্চারীতে। ...  অনেকে এই সুরকারুটিকে বিহাগড়া বলতে পারেন।  
     --সুধীর চন্দ, বহুরূপী রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, ২০০৫  


 

 

বলি, ও আমার গোলাপ-বালা,    বলি, ও আমার গোলাপ-বালা--
তোলো মুখানি, তোলো মুখানি-- কুসুমকুঞ্জ করো আলা।
বলি,  কিসের শরম এত !   সখী,   কিসের শরম এত !
সখী,   পাতার মাঝারে লুকায়ে মুখানি কিসের শরম এত।
বালা,   ঘুমায়ে পড়েছে ধরা।   সখী,   ঘুমায় চন্দ্রতারা।
প্রিয়ে,   ঘুমায় দিক্‌বালারা    সবে--    ঘুমায় জগৎ যত।
      বলিতে মনের কথা,   সখী,   এমন সময় কোথা।
প্রিয়ে,  তোলো মুখানি, আছে গো আমার প্রাণের কথা কত।
আমি   এমন সুধীর স্বরে,   সখী,   কহিব তোমার কানে--
প্রিয়ে,  স্বপনের মতো সে কথা আসিয়ে পশিবে তোমার প্রাণে।
তবে   মুখানি তুলিয়ে চাও,  সুধীরে   মুখানি তুলিয়ে চাও।
সখী,   একটি চুম্বন দাও-- গোপনে   একটি চুম্বন চাও॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৭৮ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: ভারতী পত্রিকায় 'কবিকাহিনী'-র ধারাবাহিক প্রকাশ। ব্যারিস্টারি পড়তে ইংল্যাণ্ড যাবার আগে আমেদাবাদে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গেলেন, তারপর ডাঃ আত্মারাম পাণ্ডুরঙের বাড়ি, গৃহস্বামীর কন্যা আন্নাতরখড় ভার পেলেন রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজি শেখাবার। সেখানে পরস্পরের মধ্যে হৃদ্যতা হয়। কবি তাঁর নাম দিয়েছিলেন নলিনী এবং পরবর্তী কালের রচনায় নলিনীর উল্লেখ আছে। ২৮শে জুন দ্বিজেন্দ্র্নাথের স্ত্রী সর্বসুন্দরীর মৃত্যু। ২০শে সেপ্টেম্বর সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে বিলেতযাত্রা, অক্টোবরে ব্রাইটন স্কুলে ভর্তি। প্রকাশিত বই: কবিকাহিনী (বন্ধু প্রবোধচন্দ্র ঘোষের উৎসাহে)

বহির্বিশ্বে: দেশীয় সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক 'ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট' চালু। ভারতীয় জাদুঘর সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হোলো। কেশবচন্দ্র সেনের অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিবাহ উপলক্ষ্যে ব্রাহ্মসমাজে প্রবল আন্দোলন। শিবনাথ শাস্ত্রী ও আনন্দমোহন বসু 'সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ'-এর সূচনা করলেন। মাদ্রাজের বিখ্যাত হিন্দু সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্ম। রুশ-তুরস্ক যুদ্ধবিরতি চুক্তি। মাইক্রোফোনের প্রথম ব্যবহার ও লণ্ডনের রাস্তায় প্রথম বিদ্যুতের আলো।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



রবীন্দ্রনাথের দুশো একটি (কিছু অপ্রকাশিত)গান সঙ্কলন করে 'রবিচ্ছায়া' বইটি প্রকাশিত হয় দোসরা জুন ১৮৮৫ (২৯শে জ্যৈষ্ঠ। বইটির আখ্যাপত্র: 'রবিচ্ছায়া।/(সঙ্গীত)/শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত।/শ্রী যোগেন্দ্রনারায়ণ মিত্র কর্ত্তৃক/ প্রকাশিত।/ কলিকাতা।/৮৫ নং বেনেটোলা লেনে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে/ শ্রী গিরিশচন্দ্র ঘোষ দ্বারা মুদ্রিত।/ বৈশাখ ১২৯২।

সঞ্জীবনী পত্রিকায় 'রবিচ্ছায়া'-র প্রথম বিজ্ঞাপনটি বেরোয় ২০শে বৈশাখ, ১২৯২: 'রবিচ্ছায়া। রবিচ্ছায়া।/ বাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গীত সমূহ একত্রে মুদ্রিত। মূল্য বারো আনা; ডাক মাশুল এক আনা। /  ইহাতে প্রণয় সঙ্গীত, স্বভাব সঙ্গীত, ধর্ম সঙ্গীত, জাতীয় সঙ্গীত প্রচুর পরিমাণে সন্নিবদ্ধ হইয়াছে। বর্তমান দুর্ভিক্ষ উপলক্ষে রবীবাবু [ যল্লিখিতং] যে শোক সঙ্গীত রচনা করিয়াছেন তাহাও ইহাতে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। অর্থাৎ তিনি বিগত চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত যতগুলি সঙ্গীত রচনা করিয়াছেন তাহার প্রায় সকলগুলিই ইহাতে প্রকাশিত হইয়াছে। ইহার বহুসংখ্যক গান পূর্ব্বে কখনও প্রকাশিত হয় নাই। ...'

'রবিচ্ছায়া'র 'রচয়িতার নিবেদন'-এ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন:

'অনেক কারণে গান ছাপা নিষ্ফল বোধ হয়। সুর সঙ্গে না থাকিলে গানের কথাগুলি নিতান্ত অসম্পূর্ণ। তা ছাড়া গানের কবিতা সকল সময়ে পাঠ্য হয় না, কারণ সুরে ও কথায় মিলিয়া তবে গানের কবিতা গঠিত হয়। এইজন্য সুর ছাড়া গান ছাপার অক্ষরে পড়িতে অনেকস্থলে অত্যন্ত খাপছাড়া ঠেকে। ...

'বর্তমান গ্রন্থে মুদ্রিত অধিকাংশ গান সাধারণের নিকট প্রকাশ করিতে আমার ইচ্ছা ছিল না। ইহাতে অনেক গানই বিস্মৃত বাল্যকালের মুহূর্ত-স্থায়ী সুখদুঃখের সহিত দুই দণ্ড খেলা করিয়া কে কোথায় ঝরিয়া পড়িয়াছিল -- সেই সকল শুষ্কপত্র চারিদিক হইতে জড় করিয়া বইয়ের পাতার মধ্যে তাহাদিগকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করিলে গ্রন্থকার ছাড়া আর কাহারও তাহাতে কোন আনন্দ নাই। আমার এইরূপ মনের ভাব। এই জন্য এ গানগুলি আজ সাত আট বৎসর [অর্থাৎ ১২৮৪-৮৫ অবধি] ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়া আছে, আমি ছাপাইতে চেষ্টা করি নাই। ...

প্রশান্তকুমার পাল জানাচ্ছেন: 'দুঃখের বিষয়, [রবিচ্ছায়া] গ্রন্থটি জনপ্রিয় হয়নি, ফলে অগ্রহায়ণ মাস (প্রকাশ জ্যৈষ্ঠ) থেকে এটিকে হ্রাসমূল্যে (আট আনায়) বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। ... তবে থিয়েটারি চটুল গানের পাশে 'রবিবাবুর গান' যথোপযুক্ত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক সময় নিয়েছে, একথা মানতেই হবে।'  
     --প্রশান্ত কুমার পাল, রবিজীবনী, ১-৯ খণ্ড,  আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৮২ - ২০০৪