গীতবিতান-GITABITAN
দুজনে দেখা হল মধুযামিনী রে

Portrait

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৯১ ( ১৮৮৫)
কবির বয়স: ২৩
প্রকাশ: বৈশাখ, ১২৯২ , ভারতী (১২৮৭) |
রবিচ্ছায়া(বিবিধ)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রেম ও প্রকৃতি-রবিচ্ছায়া; ৩২/৮৮৪
রাগ / তাল: বেহাগ-খাম্বাজ-কীর্তন / দাদরা
স্বরলিপি: গীতিমালা; শতগান; স্বরবিতান ৩২
স্বরলিপিকার: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর; সরলা দেবী; জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাদটিকা:
বেহাগ/আড়খেম্টা   [ স্বর ]।  

আলোচনা

দুর্নীতি কাব্যে সংক্রামক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহার উচ্ছেদ করিতে হইবে, যাঁহারা ধর্ম ও নীতির দিকে তাঁহারা আমার সহায় হউন।

... উদাহরণ দিতে হইবে? রবীন্দ্রবাবুর প্রেমের গানগুলি নিন,' সে আসে ধীরে ', ' সে[ও]কেন চুরি করে চায় ', ' দুজনে দেখা হল ' ইত্যাদি বহুতর খ্যাত গান-- সবই ইংরাজি কোর্টশিপের গান। তাঁহার ' তুমি যেও না এখনি ' , ' কেন যামিনী না যেতে জাগালে না ' ইত্যাদি গান লম্পট বা অভিসারিকার গান। ... আশ্চর্যের বিষয় এই যে এরূপ গানে মৌলিকতাও নেই। শয়ন রচনা করা, মালা গাঁথা, দীপ জ্বালা, এ সকল ব্যাপার বৈষ্ণব কবিদিগের কবিতা হইতে অপহরণ। স্থানে স্থানে পঙ্‌ক্তিকে পঙ্‌ক্তি উক্তরূপে গৃহীত। তবে রবিবাবুর সঙ্গে বৈষ্ণব কবিদিগের এই প্রভেদ যে, রবিবাবুর কবিতায় বৈষ্ণব কবিদিগের ভক্তিটুকু নাই, লালসাটুকু বেশ আছে। (১৪১)  
     --দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, কাব্যে নীতি, সাহিত্য মাসিক পত্রিকা, জ্যৈষ্ঠ ১৩১৬  



ভৈরবী সুরের মোচড়গুলো কানে এলে জগতের প্রতি এক রকম বিচিত্র ভাবের উদয় হয় ... মনে হয় একটা নিয়মের হস্ত অবিশ্রাম আর্গিন যন্ত্রের হাতা ঘোরাচ্ছে এবং সেই ঘর্ষণবেদনায় সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মর্মস্থল হতে একটা গম্ভীর কাতর করুণ রাগিণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে -- সকাল বেলাকার সূর্যের সমস্ত আলো ম্লান হয়ে এসেছে, গাছপালারা নিস্তব্ধ হয়ে কী যেন শুনছে, এবং আকাশ একটা বিশ্বব্যাপী অশ্রুর বাষ্পে যেন আচ্ছ্ন্ন হয়ে রয়েছে -- অর্থাৎ দূর আকাশের দিকে চাইলে মনে হয় যেন একটা অনিমেষ নীল চোখ কেবল ছল্‌ছল্‌ করে চেয়ে আছে।
  --কলকাতা জুন ১৮৮৯  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


 

 

৩২

দুজনে দেখা হল   মধুযামিনী রে--
কেন কথা কহিল না,   চলিয়া গেল ধীরে॥
নিকুঞ্জে দখিনাবায়    করিছে হায়-হায়,
লতাপাতা দুলে দুলে    ডাকিছে ফিরে ফিরে॥
দুজনের আঁখিবারি    গোপনে গেল বয়ে,
দুজনের প্রাণের কথা    প্রাণেতে গেল রয়ে।
আর তো হল না দেখা,  জগতে দোঁহে একা--
চিরদিন ছাড়াছাড়ি    যমুনাতীরে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৮৫ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: জ্ঞানদানন্দিনী সম্পাদিত 'বালক' পত্রিকার দায়িত্ব নিলেন। বহু রচনা, বিশেষ করে গান, প্রকাশিত হয় এই পত্রিকায়। ভ্রমণ করলেন হাজারিবাগ, শোলাপুর আর বোম্বাই। বৈষ্ণব কবিতার সংকলন 'পদরত্নাবলী' প্রকাশ করলেন, শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে যুগ্ম সম্পাদনায়। যোগেন্দ্রনারায়ণ মিত্র প্রথম গানের বই 'রবিচ্ছায়া' সংকলন করলেন। প্রকাশিত বই: রামমোহন রায়, আলোচনা, রবিচ্ছায়া।

বহির্বিশ্বে: তৃতীয় ইঙ্গ-ব্রহ্ম যুদ্ধ শুরু। ২৮শে ডিসেম্বর বোম্বাই শহরে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন হোলো, সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম চললো লিভারপুলে । জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসা উদ্ভাবন করলেন লুই পাস্তুর। মৃত্যু হোলো ভিক্টর হুগোর। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: বিষাদসিন্ধু (মীর মশারা্‌রফ হোসেন মরহুম), অ্যারেবিয়ান নাইট্‌স্‌ (বার্টন), দাস ক্যাপিটাল (মার্ক্‌স্‌), মিকাডো (গিলবার্ট ও সুলিভান, অপেরা)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



রবীন্দ্রনাথের দুশো একটি (কিছু অপ্রকাশিত)গান সঙ্কলন করে 'রবিচ্ছায়া' বইটি প্রকাশিত হয় দোসরা জুন ১৮৮৫ (২৯শে জ্যৈষ্ঠ। বইটির আখ্যাপত্র: 'রবিচ্ছায়া।/(সঙ্গীত)/শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত।/শ্রী যোগেন্দ্রনারায়ণ মিত্র কর্ত্তৃক/ প্রকাশিত।/ কলিকাতা।/৮৫ নং বেনেটোলা লেনে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে/ শ্রী গিরিশচন্দ্র ঘোষ দ্বারা মুদ্রিত।/ বৈশাখ ১২৯২।

সঞ্জীবনী পত্রিকায় 'রবিচ্ছায়া'-র প্রথম বিজ্ঞাপনটি বেরোয় ২০শে বৈশাখ, ১২৯২: 'রবিচ্ছায়া। রবিচ্ছায়া।/ বাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গীত সমূহ একত্রে মুদ্রিত। মূল্য বারো আনা; ডাক মাশুল এক আনা। /  ইহাতে প্রণয় সঙ্গীত, স্বভাব সঙ্গীত, ধর্ম সঙ্গীত, জাতীয় সঙ্গীত প্রচুর পরিমাণে সন্নিবদ্ধ হইয়াছে। বর্তমান দুর্ভিক্ষ উপলক্ষে রবীবাবু [ যল্লিখিতং] যে শোক সঙ্গীত রচনা করিয়াছেন তাহাও ইহাতে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। অর্থাৎ তিনি বিগত চৈত্র মাসের শেষদিন পর্যন্ত যতগুলি সঙ্গীত রচনা করিয়াছেন তাহার প্রায় সকলগুলিই ইহাতে প্রকাশিত হইয়াছে। ইহার বহুসংখ্যক গান পূর্ব্বে কখনও প্রকাশিত হয় নাই। ...'

'রবিচ্ছায়া'র 'রচয়িতার নিবেদন'-এ রবীন্দ্রনাথ লিখছেন:

'অনেক কারণে গান ছাপা নিষ্ফল বোধ হয়। সুর সঙ্গে না থাকিলে গানের কথাগুলি নিতান্ত অসম্পূর্ণ। তা ছাড়া গানের কবিতা সকল সময়ে পাঠ্য হয় না, কারণ সুরে ও কথায় মিলিয়া তবে গানের কবিতা গঠিত হয়। এইজন্য সুর ছাড়া গান ছাপার অক্ষরে পড়িতে অনেকস্থলে অত্যন্ত খাপছাড়া ঠেকে। ...

'বর্তমান গ্রন্থে মুদ্রিত অধিকাংশ গান সাধারণের নিকট প্রকাশ করিতে আমার ইচ্ছা ছিল না। ইহাতে অনেক গানই বিস্মৃত বাল্যকালের মুহূর্ত-স্থায়ী সুখদুঃখের সহিত দুই দণ্ড খেলা করিয়া কে কোথায় ঝরিয়া পড়িয়াছিল -- সেই সকল শুষ্কপত্র চারিদিক হইতে জড় করিয়া বইয়ের পাতার মধ্যে তাহাদিগকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করিলে গ্রন্থকার ছাড়া আর কাহারও তাহাতে কোন আনন্দ নাই। আমার এইরূপ মনের ভাব। এই জন্য এ গানগুলি আজ সাত আট বৎসর [অর্থাৎ ১২৮৪-৮৫ অবধি] ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়া আছে, আমি ছাপাইতে চেষ্টা করি নাই। ...

প্রশান্তকুমার পাল জানাচ্ছেন: 'দুঃখের বিষয়, [রবিচ্ছায়া] গ্রন্থটি জনপ্রিয় হয়নি, ফলে অগ্রহায়ণ মাস (প্রকাশ জ্যৈষ্ঠ) থেকে এটিকে হ্রাসমূল্যে (আট আনায়) বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। ... তবে থিয়েটারি চটুল গানের পাশে 'রবিবাবুর গান' যথোপযুক্ত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক সময় নিয়েছে, একথা মানতেই হবে।'  
     --প্রশান্ত কুমার পাল, রবিজীবনী, ১-৯ খণ্ড,  আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৮২ - ২০০৪