গীতবিতান-GITABITAN
রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৯ ভাদ্র ১৩৪৬ (৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯)
কবির বয়স: ৭৮
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রেম ও প্রকৃতি-প্রেম ও প্রকৃতি; ৯৩/৯০৯
রাগ / তাল: ইমন‌কল্যাণ‌ / ২ + ২ ছন্দ
স্বরলিপি: স্বরবিতান ৫৮
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার

আলোচনা

আমার মনে হয় দিনের জগৎটা য়ুরোপীয় সংগীত, সুরে-বেসুরে খণ্ডে-অংশে মিলে একটা গতিশীল প্রকাণ্ড হার্মনির জটলা-- আর, রাত্রের জগৎটা আমাদের ভারতবর্ষের সংগীত, একটি বিশুদ্ধ করুণ গম্ভীর অমিশ্র রাগিণী। দুটোই আমাদের বিচলিত করে, অথচ দুটোই পরস্পরবিরোধী। কী করা যাবে-- প্রকৃতির গোড়ায় একটা দ্বিধা একটা মস্ত বিরোধ আছে, রাজা এবং রানীর মধ্যে সমস্ত বিভক্ত। দিন এবং রাত্রি, বিচিত্র এবং অখণ্ড, পরিব্যক্ত এবং অনাদি। আমরা ভরতবর্ষীয়েরা [যল্লিখিতং] সেই রাত্রির রাজত্বে থাকি। আমরা অখণ্ড অনাদির দ্বারা অভিভূত। আমাদের নির্জন এককের গান, য়ুরোপের সজন লোকালয়ের গান। আমাদের গানে শ্রোতাকে মনুষ্যের প্রতিদিনের সুখদুঃখের সীমা থেকে বের করে নিয়ে নিখিলের মূলে যে-একটি সঙ্গীহীন বৈরাগ্যের দেশ আছে সেইখানে নিয়ে যায়, আর য়ুরোপের সংগীত মনুষ্যের সুখ-দুঃখের অনন্ত উত্থানপতনের মধ্যে বিচিত্রভাবে নৃত্য করিয়ে নিয়ে চলে।
  --শিলাইদহ, ১০ অগস্ট্‌ ১৮৯৪; ২৬.৪.১৩০১ #১৪২  

কাল অনেক রাত পর্যন্ত নহবতে কীর্তনের সুর বাজিয়েছিল; সে বড়ো চমৎকার লাগছিল, আর ঠিক এই পাড়াগাঁয়ের উপযুক্ত হয়েছিল-- যেমন সাদাসিধে তেমনি সকরুণ। ...সেকালের রাজাদের বৈতালিক ছিল-- তারা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে গান গেয়ে প্রহর জানিয়ে দিত, এই নবাবিটা আমার লোভনীয় মনে হয়। ... গান বাজনা শুনলেই তখনি বুঝতে পারি এতদিন আমি সংগীতের জন্যে তৃষিত হয়ে ছিলুম-- সেই জন্যে আমার ভারী ইচ্ছে করে আমার খুব একজন কাছের লোক বেশ ভালো রকম বাজনা শিখে নেয়।
  --সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯৫; ২২.৩.১৩০২ #২১৮  

আজ সকালে বসে বসে আমার একটা নতুন গানে সুর দিচ্ছিলুম-- সুরটা যে খুব নতুন তা নয়, এক রকম কীর্তন ধরণের ভৈরবী। কিন্তু তবু ছন্দে ছন্দে গাইতে গাইতে শরীরের সমস্ত রক্তের মধ্যে একটা সংগীতের মাদকতা প্রবেশ করতে থাকে-- সমস্ত শরীর এবং সমস্ত মন আগাগোড়া একটা বাজনার যন্ত্রের মতো কম্পিত এবং গুঞ্জরিত হয়ে উঠতে থাকে এবং সেই সুরের স্পন্দন আমার শরীর মন থেকে সমস্ত বাইরের জগতে সঞ্চারিত এবং ব্যাপ্ত হয়ে বিশ্বের সঙ্গে আমার সঙ্গে একটা স্বরসম্মিলন স্থাপিত হয়ে যায়। বীণার তার যখন বাজতে থাকে তখন সেটা যেমন আবছায়া দেখতে হয়, গানের সুরে সমস্ত জগৎটা সেই রকম বাষ্পময় এবং ঝঙ্কারপূর্ণ হয়ে ওঠে।
  --কলকাতা, ২৯ অগস্ট্‌, ১৮৯৪; ১৪.৫.১৩০১ #১৪৮  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  



বাংলা পড়িবার সময় অনেক পাঠক অধিকাংশ স্বরবর্ণকে দীর্ঘ করিয়া টানিয়া পড়েন। ... বাংলা শব্দের মধ্যে এই ধ্বনির অভাব-বশত বাংলায় পদ্যের অপেক্ষা গীতের প্রচলনই অধিক। কারণ, গীত সুরের সাহায্যে প্রত্যেক কথাটিকে মনের মধ্যে সম্পূর্ণ নিবিষ্ট করিয়া দেয়। কথায় যে অভাব আছে সুরে তাহা পূর্ণ হয়। এবং গানে এক কথা বার-বার ফিরিয়া গাহিলে ক্ষতি হয় না। যতক্ষণ চিত্ত না জাগিয়া উঠে ততক্ষণ সঙ্গীত ছাড়ে না। এইজন্য প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যে গান ছাড়া কবিতা নাই বলিলে হয়।  
     --রবীন্দ্রনাথ, বাংলা শব্দ ও ছন্দ, শ্রাবণ ১২৯৯ (২১৮)।  


 

 

৯৩

রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা--
   মন যে কেমন করে,  হল দিশাহারা॥
       যেন কে গিয়েছে ডেকে,
         রজনীতে সে কে  দ্বারে দিল নাড়া--
             রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা॥
বাঁধু দয়া করো,   আলোখানি ধরো হৃদয়ে।
    আধো-জাগরিত তন্দ্রার ঘোরে  আঁখি জলে যায় যে ভ'রে।
স্বপনের তলে ছায়াখানি দেখে    মনে মনে ভাবি, এসেছিল সে কে--
        রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯৩৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  জওহরলাল নেহরু আর সুভাষচন্দ্র বসু শান্তিনিকেতনে এলেন কবির সঙ্গে দেখা করতে। পুরী বেড়াতে গেলেন, পুরীরাজ কবিকে 'পরমগুরু' উপাধি দিলেন। প্রকাশ: প্রহাসিনী (কবিতা), আকাশপ্রদীপ (কবিতা), শ্যামা (নৃত্যনাট্য), পথের সঞ্চয় (পত্রাবলী)

বহির্বিশ্বে: ১৯শে অগাস্ট সুভাষচন্দ্রের পরিকল্পিত মহাজাতি সদনের ভিত্তি স্থাপন করলেন রবীন্দ্রনাথ। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি। ১লা সেপ্টেম্বর যুদ্ধ ঘোষণা না করেই জার্মানির পোল্যাণ্ড আক্রমণ -- অর্থাৎ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরু।  ডিডিটি, পলিথিলিন আবিষ্কার। কবি ইয়েট্‌স ও মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ইন্‌সাইড এশিয়া (গুন্‌থার), হাউ গ্রীন ওয়াজ মাই ভ্যালি (লিউলিন), কালেক্টেড পোয়েম্‌স (হাউসম্যান), ওয়েডিং ফিস্ট (কাম্যু), রোবেস্‌পিয়র (রল্যাঁ), দি ম্যাপ অফ লাভ (ডিলান টমাস), দি ওয়াল (সার্ত্র্‌), ফ্রীডম অ্যাণ্ড কালচার (ডিউই)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



গীতবিতানের বিষয়সূচী:
ভূমিকা, পূজা, প্রেম, স্বদেশ, বিচিত্র, প্রকৃতি, আনুষ্ঠানিক, গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য, ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী, নাট্যগীতি, জাতীয় সঙ্গীত, পূজা ও প্রার্থনা, আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত, প্রেম ও প্রকৃতি, পরিশিষ্ট  


রবীন্দ্র-সম্পাদিত দ্বিতীয় সংস্করণ গীতবিতানের বিষয়বিন্যাস (বন্ধনীর মধ্যে গীতসংখ্যা):  
ভূমিকা (১)
পূজা পর্যায়: গান (৩২), বন্ধু (৫৯), প্রার্থনা (৩৬), বিরহ (৪৭), সাধনা ও সংকল্প (১৭), দুঃখ (৪৯), আশ্বাস (১২), অন্তর্মুখে (৬), আত্মবিধান (৫), জাগরণ (২৬), নিঃসংশয় (১০), সাধক (২), উৎসব (৭), আনন্দ (২৫), বিশ্ব (৩৯), বিবিধ (১৪৩, একটি গান দ্বিজেন্দ্রনাথ-রচিত বিবেচনায় বাদ দেওয়া হয়), সুন্দর (৩০), বাউল (১৩), পথ (২৫), শেষ (৩৪), পরিণয় (৯, তৃতীয়োত্তর সংস্করণ গীতবিতানে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ের প্রথমাংশে গ্রথিত)
স্বদেশ (৮৬)
প্রেম: গান (২৭), প্রেমবৈচিত্র্য (৩৬৮)
প্রকৃতি: সাধারণ (৯), গ্রীষ্ম (১৬), বর্ষা (১১৫), শরৎ (৩০), হেমন্ত (৫), শীত (১২), বসন্ত (৯৬)
বিচিত্র (১৩৮)
আনুষ্ঠানিক (৯)
পরিশিষ্ট (২, মুদ্রণকার্যের তাগিদায় ২য় সংস্করণে এই বিভাগটিকে বাধ্য হয়ে যোগ করতে হয়, পরের সংস্করণে গানগুলি যথোচিত স্থানে বিন্যস্ত করা হয়)

রবীন্দ্রনাথের নির্দেশমতোই এই বিষয়বিন্যাস মূল গীতবিতানে না দিয়ে তাঁর লেখা একটি বিজ্ঞাপন হিসাবে গ্রথিত হয়। তৃতীয়োত্তর সংস্করণে এই তালিকা গ্রন্থপরিচয়ে পাওয়া যায়।