গীতবিতান-GITABITAN
ঐ মহামানব আসে।

Book Cover

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১ বৈশাখ, ১৩৪৮ (১৪ এপ্রিল, ১৯৪১)
কবির বয়স: ৮০
রচনাস্থান: উদয়ন
প্রকাশ: -
Wings of Death; The Later Poems of Tagore
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত-আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত; ১২/৮৬৫
রাগ / তাল: ভৈরবী / কাহারবা
স্বরলিপি: দেশ পত্রিকা(১৩৪৮); স্বরবিতান ৫৫
স্বরলিপিকার: শান্তিদেব ঘোষ; ঐ

আলোচনা

সেই দিনটা ছিল গ্রীষ্মের একটা দুপুর। উদয়নের বড় ঘরে কবি শুয়ে আছেন আচ্ছন্নভাবে, অধিকাংশ সময়ই তখন 'কোমা'র ঘোর থাকত। তারই মধ্যে 'সভ্যতার সঙ্কট' লেখা হয়েছে। আমি মাটিতে মাদুর বিছিয়ে মীরা দেবীর [রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠা কন্যা] রান্নার বই থেকে রান্না লিখছি। সৌমেন ঠাকুর ঘরে ঢুকলেন-- দীর্ঘদেহ, সুপুরুষ, দৃপ্তভঙ্গী, সেই তাঁকে প্রথম দেখলুম অন্তত আমার তাই মনে পড়ে, তিনি তো তখন একটা 'লিজেণ্ড' জার্মানীতে জেল খাটছেন শুনে অবধি আমরা তাকে বিশেষ রহস্যময় ব্যক্তি বলে ভাবতুম। সৌমেনবাবু এসে খাটের পাশে দাঁড়ালেন-- "রবিদা", "কি সৌম্য এখন যাবার সময় হল?" সৌম্যবাবু বললেন "রবিদা তুমি 'নমো যন্ত্র নমো যন্ত্র' গান লিখে যন্ত্রের বন্দনা করেছ এ কি ভালো? এবার মানুষের কথা কিছু লেখ। " আমি অবাক হয়ে ভাবছি জার্মানীর জেলফেরত ভদ্রলোক বলে কি? সারাজীবন তো ইনি মানুষের গানই লিখলেন, ইনি তো যন্ত্রবিমুখ-- কিন্তু বললাম না। কারণ আমাদের সময় স্বল্প-পরিচিত পুরুষমানুষের সঙ্গে কথা বলার রেওয়াজ ছিল না। ... আমি ভাব্ছিলাম কবি হয়ত সেকথাই বলবেন। কিন্তু তা বললেন না, রাজি হয়ে গিয়ে বললেন, "আচ্ছা লিখব। " সেই দিনই বিকেলবেলা আশ্চর্য গানটি লিখলেন-- ওই মহামানব আসে। গানটি আমি লিখে নিলাম। সন্ধ্যেবেলা শান্তিদেব ঘোষকে ডাকলেন। তিনি এলে আমায় গানটি এনে দিতে বললেন। এই গানে সুর দিতে গলায় সুর আনতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল, এই নিদারুণ রোগশয্যায় সুরের ধারা প্রতিহত হত। ...

'সভ্যতার সঙ্কট' পড়া হলে এই গানটি দিয়ে শেষ হবে। ১লা বৈশাখ রবীন্দ্র-জন্মোৎসব পালন হত। শান্তিনিকেতনে গরম পড়ে যায় অথচ জন্মোৎসব না করে ছুটি হয়ে গেলে কারু ভালো লাগে না তাই কবি ঐ নিয়ম করলেন, তারিখে কি এসে যায়? ১লা বৈশাখই ধরে নাও আমার জন্মদিন। উদয়নের সামনের চত্বরে উড়িষ্যার বিচিত্রবর্ণের সামিয়ানার নিচে সভা হল। রোগক্লান্ত রবীন্দ্রনাথ একটা বড় চেয়ারে বসে রইলেন। ক্ষিতিমোহন সেন প্রবন্ধটি পড়লেন। ঐ প্রবন্ধের শেষদিকে নতুন মানুষ অভ্যুদয়ের যে আশার বাণী আছে এই গানটিতে তারই বন্দনা করা হয়েছে। কিন্তু শান্তিদেবকে গানটি শেখাতে শেখাতে তাঁর আশঙ্কা হচ্ছে লোকে ভুল বুঝবে নাতো, এই বোকার দেশে কেউ ভাববে নাতো এ নিজের জন্মদিনে নিজেরই বন্দনা লিখছে। (২০১)

['দুটি দিনের' অন্য দিনের গানটি '   একদিন যারা মেরেছিল ']  
     --মৈত্রেয়ী দেবী, রবীন্দ্রনাথ গৃহে ও বিশ্বে, প্রাইমা পাবলিকেশন্‌স, কলকাতা, ১৩৮৮  



[১৩৪৮ সালে] মনে ভাবলুম গুরুদেব লিখে দেশকে নববর্ষের বাণী পাঠাচ্ছেন অথচ গানে কোনো বাণী দেবেন না তা হতে পারে না। পরের দিন গিয়ে বললাম, "নববর্ষের প্রভাতে বৈতালিকের জন্য একটি নতুন গান রচনা করতে কি আপনার কষ্ট হবে?" প্রথমে আপত্তি করলেন, কিন্তু আমার আগ্রহ দেখে তা বন্ধ রাখতে পারলেন না। বললেন, " সৌম্য [সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর] আমাকে বলেছে মানবের জয়গান গেয়ে একটা কবিতা লিখতে। সে বলে আমি যন্ত্রের জয়গান গেয়েছি, মানবের জয়গান করিনি। তাই একটা কবিতা রচনা করেছি, সেটাই হবে নববর্ষের গান। " কাছে ছিলেন শ্রীযুক্তা মৈত্রেয়ী দেবী, তিনি গুরুদেবের খাতা খুলে কবিতাটি কপি করে আমাকে দিলেন। কবিতাটি ছিল একটু বড়ো, দেখে ভাবলাম এত বড়ো কবিতায় সুরযোজনা করতে বলা মানে তাঁকে কষ্ট দেওয়া। সুর দেবার একটু চেষ্টা করে সেদিন আর পারলেন না, বললেন, "কালকে হবে। " পরের দিন সেই কবিতাটি সংক্ষেপ করতে করতে শেষপর্যন্ত, বর্তমানে 'ওই মহামানব আসে' গানটি যে আকারে আছে, সেই আকারে তাকে পেলাম। (২৬৫)

[গানটির দুটি প্রাথমিক রূপ শান্তিদেবের বইতে পাওয়া যাবে।]  
     --শান্তিদেব ঘোষ, রবীন্দ্রসংগীত, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৬  


ভৈরবী সুরের মোচড়গুলো কানে এলে জগতের প্রতি এক রকম বিচিত্র ভাবের উদয় হয়... মনে হয় একটা নিয়মের হস্ত অবিশ্রাম আর্গিন যন্ত্রের হাতা ঘোরাচ্ছে এবং সেই ঘর্ষণবেদনায় সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মর্মস্থল হতে একটা গম্ভীর কাতর করুণ রাগিণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে-- সকাল বেলাকার সূর্যের সমস্ত আলো ম্লান হয়ে এসেছে, গাছপালারা নিস্তব্ধ হয়ে কী যেন শুনছে এবং আকাশ একটা বিশ্বব্যাপী অশ্রুর বাষ্পে যেন আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে-- অর্থাৎ, দূর আকাশের দিকে চাইলে মনে হয় যেন একটা অনিমেষ নীল চোখ কেবল ছল্‌ছল্‌ করে চেয়ে আছে।
    কলকাতা, জুন ১৮৮৯  #৩  

অ[বন?] ও বাড়িতে তাদের এক তলার ঘরে বসে এস্‌রাজে ভৈরবী আলাপ করছে, আমি তেতলার কোণের ঘরে বসে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। তোর চিঠিতেও তুই মাটাঙ্গের ভৈরবী আলাপের কথা লিখেছিস। আজকাল সকালে দেখতে দেখতে বেলা দশটা এগারোটা দুপুর হয়ে যায়-- দিনটা যতই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে মনটাও ততই এক রকম উদাসীন হয়ে আসে; তার উপর কানে যখন বারম্বার ভৈরবীর অত্যন্ত করুণ মিনতির খোঁচ লাগতে থাকে তখন আকাশের মধ্যে, রৌদ্রের মধ্যে, একটা প্রকাণ্ড বৈরাগ্য ব্যাপ্ত হয়ে যায়। কর্মক্লিষ্ট সন্দেহপীড়িত বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটিকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে-একটি নিত্যশোক নিত্যভয় নিত্যমিনতির ভাব আছে, আমাদের হৃদয় উদ্‌ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদ্‌ব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। সত্যিই তো আমাদের কিছুই স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রকৃতি কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেই কথাটিই আমাদের সর্বদা ভুলিয়ে রেখেছে-সেইজন্যেই আমরা উৎসাহের সহিত সংসারের কাজ করতে পারি। ভৈরবীতে সেই চিরসত্য সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে; আমাদের এই কথা বলে দেয় যে, আমরা যা-কিছু জানি তার কিছুই থাকবে না এবং যা চিরকাল থাকবে তার আমরা কিছুই জানি নে।
  --কলকাতা, ২১ নভেম্বর ১৮৯৪; ৬.৮.১৩০১ #১৭৭  

[কিন্তু] আজ সকালে একটা সানাইয়েতে ভৈরবী বাজাচ্ছিল, এমনি অতিরিক্ত মিষ্টি লাগছিল যে সে আর কী বলব-- আমার চোখের সামনেকার শূন্য আকাশ এবং বাতাস পর্যন্ত একটা অন্তর্‌নিরুদ্ধ ক্রন্দনের আবেগে যেন স্ফীত হয়ে উঠছিল-- বড়ো কাতর কিন্তু বড়ো সুন্দর-- সেই সুরটাই গলায় কেন যে তেমন করে আসে না বুঝতে পারি নে। মানুষের গলার চেয়ে কাঁসার নলের ভিতরে কেন এত বেশি ভাব প্রকাশ করে! এখন আবার তারা মুলতান বাজাচ্ছে-- মনটা বড়োই উদাস করে দিয়েছে-- পৃথিবীর এই সমস্ত সবুজ দৃশ্যের উপরে একটি অশ্রুবাষ্পের আবরণ টেনে দিয়েছে-- একপর্দা মুলতান রাগিণীর ভিতর দিয়ে সমস্ত জগৎ দেখা যাচ্ছে। যদি সব সময়েই এইরকম এক-একটা রাগিণীর ভিতর দিয়ে জগৎ দেখা যেত তা হলে বেশ হত। আমার আজকাল ভারী গান শিখতে ইচ্ছে করে-- বেশ অনেকগুলো ভূপালী ... এবং করুণ বর্ষার সুর-- অনেক বেশ ভালো ভালো হিন্দুস্থানী গান-- গান প্রায় কিচ্ছুই জানি নে বললেই হয়।
    সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯২; ২২.৩.১২৯৯ #৬৬  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  


 

 

১২

      ঐ মহামানব আসে।
দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে
      মর্তধূলির ঘাসে ঘাসে॥
সুরলোকে বেজে ওঠে শঙ্খ,
নরলোকে বাজে জয়ডঙ্ক--
      এল মহাজন্মের লগ্ন।
আজি অমারাত্রির দুর্গতোরণ যত
      ধূলিতলে হয়ে গেল ভগ্ন।
উদয়শিখরে জাগে মাভৈঃ মাভৈঃ'
      নবজীবনের আশ্বাসে।
জয় জয় জয় রে মানব-অভ্যুদয়'
      মন্দ্রি-উঠিল মহাকাশে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

T HE Great One comes, sending shivers
  across the dust of the Earth.
In the heavens sounds the trumpet,
  in the world of man,
  the drums of victory are beaten,
The hour has arrived for the great Birth.
To-day the gates of night's fortress
  crumble into the dust.
On the crest of awakening dawn
  assurance of new life proclaims "Fear Not."
The great sky resounds with paeans of victory
  to the Coming of Man.
  
     --Anon., Anthology  



১৯৪১ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  জন্মদিনের বাণী 'সভ্য্তার সঙ্কট'। পঁচিশে বৈশাখ ভারতব্যপী জন্মোৎসব। শেষ গান 'হে নূতন দেখা দিক আরবার'। ত্রিপুরারাজ উপাধি দিলেন 'ভারতভাস্কর'। অসুস্থ অবস্থায় শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় আনা হোলো। বাইশে শ্রাবণ, ৭ই অগাস্ট তিরোভাব। প্রকাশ: আরোগ্য (কবিতা), জন্মদিনে (কবিতা), গল্পসল্প (গল্প), সভ্যতার সংকট (ভাষণ), আশ্রমের রূপ ও বিকাশ (প্রবন্ধ), গীতবিতান ১ ও ২ (গানের সংকলন), ছড়া, শেষ লেখা, স্মৃতি (চিঠিপত্র),Crisis of Civilization.

বহির্বিশ্বে: ২৬শে জানুয়ারি সুভাষচন্দ্র পুলিশ পাহারা এড়িয়ে অন্তরীণ অবস্থা থেকে পালালেন। হাওড়া ব্রিজ খোলা হোলো। নাৎসী বাহিনীর যুগোস্লাভিয়া এবং অক্ষশক্তির রাশিয়া আক্রমণ। ৭ই ডিসেম্বর জাপান পার্ল হারবার, ফিলিপিন এবং মালয় দ্বীপপুঞ্জ আক্রমণ করলো, ৮ই ডিসেম্বর আমেরিকা যুদ্ধ ঘোষণা করে। দার্শনিক বের্গ্সঁর মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: পয়েণ্ট্‌স অফ ভিউ (এলিয়ট), বিটুইন টু ওয়ার্ল্ড্‌স (সিন্‌ক্লয়ার), বিটুইন দি অ্যাক্‌ট্‌স (উল্‌ফ), দি ডন ফ্লোজ টু দি সী (শোলোকোভ), দি সেঞ্চুরি ওয়াজ ইয়ং (আরাগঁ)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


২৬শে মে, ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ বলছেন: "কিন্তু গানটা শুনলেই আমি আশ্চর্য হয়ে যাই। এই সুরগুলি কারো কাছে ধার করা নয়। কোথা থেকে এসেছে বলতে পারিনে। আপনার ইচ্ছেমতো গলায় এসেছে, গেয়েছি; গান হয়ে উঠেছে। তাই ফিরে শুনি যখন, বিস্মিত হই এবং আমি নিজেকে বলি-- তোমার গান রইল, এ আর কাল অপহরণ করতে পারবে না। " (৭৩)
  
     --পার্থ বসু, "গায়ক রবীন্দ্রনাথ", আনন্দ - ১৩৯৩-তে উদ্ধৃত  


রবীন্দ্রনাথ নানান সুরে গান বেঁধেছেন, কিন্তু তাঁর সেই সহস্র সহস্র গানগুলির মধ্যে যদি কোনো একটি রাগের সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় তো সেটি হচ্ছে ভৈরবী। সুরসৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ভৈরবী-সিদ্ধ ছিলেন। তিনি প্রাচীন ভৈরবী রাগের অনুভূতি রেখে এক নব রাগ সৃষ্টি করলেন; রাগকর্তার নাম জড়িয়ে রাগের নাম-- যথা মিয়াকি তোড়ি, সুরদাসী মল্লার-- দেবার প্রথা অনুসরণ করে তার নাম দিয়েছি "রাবীন্দ্রী-ভৈরবী"। রবীন্দ্রনাথের সুরমিশ্রণ যেমন ভাবধর্মী, রাগধর্মী নয়, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীও তেমনি ভাব প্রকাশের তাগিদে সৃষ্টি হয়েছে।

রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে আশাবরী, ধানশ্রী ও টোড়ি -- এই তিনটি রাগের আসা যাওয়া কানে বাজে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবী একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাগ, এটি রবীন্দ্রনাথের অভিনব সৃষ্টি। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীর বিশেষত্বগুলি একটু তলিয়ে দেখতে পারলেই ধরা পড়ে যায়। প্রথমত, গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে, ভৈরবীতে এটি হয় না। আর গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে বলে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে কানাড়ার ছায়া পড়েছে, তবে সেটি কিন্তু শুদ্ধ কানাড়ার, দরবারী কানাড়ার নয়। দ্বিতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে যে 'ধা'টি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি হচ্ছে ভৈঁরোর 'ধা'। ভৈরবীর 'ধা'র সঙ্গে তার শ্রুতির পার্থক্য আছে। উদাহরণ স্বরূপ ' হে চিরনূতন ' গানটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। 'চিরনূতন'-এর 'চিরনূ' পর্যন্ত ভৈরোঁর 'ধা'-এ বাঁধা। তৃতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে নিরঙ্কুশ 'রে', 'গা', 'ধা' ও 'নি' পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় একমাত্র রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীত পর্যায়ের গানগুলিতে। চতুর্থত, এই স্বরব্যবস্থাকে বিকৃত পর্দার উদাহরণ বলে পার পাওয়ার উপায় নেই কেন না, বিকৃত পর্দার একটা সীমা আছে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে এই ধরনের পর্দা অনেক বেশি আছে।  এছাড়া রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে শুদ্ধ 'রে', শুদ্ধ 'গা' আর কড়ি 'মা'র ব্যবহার সহজেই ধরা পড়ে।

রবীন্দ্রনাথের প্রায় তিন হাজার [?] গানের মধ্যে এই নতুন রাগে বাঁধা প্রায় তিনশো গান আছে। [এইখানে সৌম্যেন্দ্রনাথ ৫০টি গানের তালিকা দিয়েছেন; আমরা এই আলোচনা খণ্ডটি সব ভৈরবী গানেই প্রয়োগ করলাম]
  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬