গীতবিতান-GITABITAN
জ্বল্‌ জ্বল্‌ চিতা, দ্বিগুণ দ্বিগুণ-

Certificate

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৮২ ( ১৮৭৫)
কবির বয়স: ১৪
প্রকাশ: নভেম্বর, ১৮৭৫,অগ্রহায়ণ, ১২৮২ , সরোজিনী নাটক |
বাঙ্গালীর গান (১৩১২)।
Echoes from East and West (1899) by Robi Dutt
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): নাট্যগীতি-নাট্যগীতি; ১/৭৬৭
রাগ / তাল: ভূপালী / একতাল
স্বরলিপি: স্বরবিতান ৫১
স্বরলিপিকার: ইন্দিরা দেবী
পাদটিকা:
জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লেখা নাটকে দীর্ঘতর রচনাটি পাওয়া যায়; যেটুকুর স্বরলিপি আছে সেটুকুই গীতবিতানে সঙ্কলিত। রবীন্দ্রনাথের অন্য কোনো গানের বইতে পাওয়া যায় না।  

". . . সুর সম্ভবত জ্যোতিরিন্দ্রনাথেরই দেওয়া -- রবীন্দ্রনাথ তখনো গানে সুর যোজনা করা আরম্ভ করেননি। " --  সমীর সেনগুপ্ত, গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ, ২০০৮।  

আলোচনা

রবীন্দ্রনাথ তখন বাড়ীতে রামসর্বস্ব পণ্ডিতের নিকট সংস্কৃত পড়িতেন। আমি ও রামসর্বস্ব দুইজনে রবির পড়ার ঘরে বসিয়াই, 'সরোজিনী'র [জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লেখা নাটক, ১৮৭৫] প্রুফ সংশোধন করিতাম। রামসর্বস্ব খুব জোরে জোরে পড়িতেন। পাশের ঘর হইতে রবি শুনিতেন, ও মাঝে মাঝে পণ্ডিতমহাশয়কে উদ্দেশ্য করিয়া, কোন্‌ স্থানে কি করিলে ভাল হয়, সেই মতামত প্রকাশ করিতেন। রাজপুত মহিলাদের চিতাপ্রবেশের যে একটি দৃশ্য আছে, তাহাতে পূর্বে আমি গদ্যে একটি বক্তৃতা রcনা করিয়া দিয়াছিলাম। যখন এই স্থানটা পড়িয়া প্রুফ দেখা হইতেছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ পাশের ঘরে পড়াশুনা বন্ধ করিয়া চুপ করিয়া বসিয়া বসিয়া শুনিতেছিলেন। গদ্যরচনাটি এখানে একেবারেই খাপ খায় নাই বুঝিয়া, কিশোর রবি একেবারে আমাদের ঘরে আসিয়া হাজির। তিনি বলিলেন-- এখানে পদ্যরচনা ছাড়া কিছুতেই জোর বাঁধিতে পারে না। প্রস্তাবটা আমি উপেক্ষা করিতে পারিলাম না-- কারণ প্রথম হইতেই আমারও মন কেমন খুঁৎ খুঁৎ করিতেছিল। কিন্তু এখন আর সময় কৈ? আমি সময়াভাবের আপত্তি উত্থাপন করিলে, রবীন্দ্রনাথ সেই বক্তৃতটির পরিবর্তে একটি গান রচনা করিয়া দিবার ভার লইলেন, এবং তখনই খুব অল্প সময়ের মধ্যেই 'জ্বল্‌ জ্বল্‌ চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ' এই গানটি রচনা করিয়া আনিয়া, আমাদিগকে চমৎকৃত করিয়া দিলেন।    
     --বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি  



অভিনেত্রী বিনোদিনী 'আমার কথা' বইতে লিখছেন: "'সরোজিনী' নাটকের একটি দৃশ্যে রাজপুত ললনারা গাইতে গাইতে চিতারোহণ করছেন। সে দৃশ্যটি যেন মানুষকে উন্মাদ করে দিত। তিন চার জায়গায় ধু ধু করে চিতা জ্বলছে, সে আগুনের শিখা দু'তিন হাত উঁচুতে উঠে লকলক করছে। তখন তো বিদ্যুতের আলো ছিল না, স্টেজের ওপর ৪/৫ ফুট লম্বা টিন পেতে তার ওপর সরু সরু কাট জ্বেলে দেওয়া হত। লাল রঙের শাড়ী পরে কেউ বা ফুলের গয়নায় সেজে, কেউ বা ফুলের মালা হাতে নিয়ে এক এক দল রাজপুত রমণী সেই 'জ্বল্‌ জ্বল্‌ চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ' গাইতে গাইতে চিতা প্রদক্ষিণ করছে, আর ঝুপ করে সেই আগুনের মধ্যে পড়ছে, আর সঙ্গে সঙ্গে পিচকারী করে সেই আগুনের মধ্যে কেরোসিন ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে, তাতে কারু বা চুল পুড়ে যাচ্ছে, কারু বা কাপড় ধরে উঠছে-- তবুও কারুর ভ্রূক্ষেপ নেই-- তারা আবার ঘুরে সেই আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তখন যে কি রকমের একটা উত্তেজনা হত তা লিখে ঠিক বোঝাতে পারছি না।

একবার আমি প্রমীলা সেজে চিতারোহণ করতে যাচ্ছি। এমন সময় আমার মাথার রুক্ষ চুল ও চেলির কাপড়ের খানিকটা আঁচলে আগুন ধরে গেছল-- আমি তখন এমনই আত্মবিস্মৃত হয়েছিলাম যে কিছুই অনুভব করতে পারিনি। আমার চুল জ্বলছে কাপড় জ্বলছে আমার হুঁস নেই। আমি সেই অবস্থায় আগুনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। উপেন্দ্র মিত্র মহাশয় রাবণ সেজেছিলেন, আমার এই বিপদ দেখে তিনি ত সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে পড়ে দুহাত দিয়ে থাবড়ে সেই আগুন নিবুতে লাগলেন। তখন যবনিকা সবে অর্ধেক পড়েছে। যাই হক আর পাঁচজন ছুটে এসে কোন রকমে আমাকে ত সে যাত্রা পুড়ে মরার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেন। উপেনবাবুর হাত ঝলসে গেছল, আমার দেহের স্থানে স্থানে ফোস্কা পড়েছিল।

১৮৭৮ সালের ১৫ জানুয়ারি গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে মহাসমারোহে 'সরোজিনী'র প্রথম অভিনয় হয়। এই সময়ে বিনোদিনীর বয়স ১৪ বছর, দুবছর হল তিনি মঞ্চে অভিনয় করছেন। (২৯)  
     --সমীর সেনগুপ্ত, গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, ২০০৮  


 

 

জ্বল্‌ জ্বল্‌ চিতা, দ্বিগুণ দ্বিগুণ--
              পরান সঁপিবে বিধবা বালা।
জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুন,
              জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা॥
শোন্‌ রে যবন শোন্‌ রে তোরা,
            যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে
সাক্ষী র'লেন দেবতা তার--
               এর প্রতিফল ভুগিতে হবে॥
দেখ্‌ রে জগৎ, মেলিয়ে নয়ন,
               দেখ্‌ রে চন্দ্রমা, দেখ্‌ রে গগন,
স্বর্গ হতে সব দেখো দেবগণ--
               জ্বলদ্‌-অক্ষরে রাখো গো লিখে।
স্পর্ধিত যবন, তোরাও দেখ্‌ রে,
               সতীত্ব--রতন করতে রক্ষণ
রাজ্পুত-সতী আজিকে কেমন
               সঁপিছে পরান অনলশিখে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

THE FAIR MARTYRS

B LAZE, blaze thy last and brightest,
  Thou fiendly-friendly pyre :
The chaste will cast their bodies
  Upon thy mouth of fire.
Blaze, blaze, and in a moment
  Our burnings will be o'er ;
0 Chitor, crown of Princeland,
  Farewell for evermore !
List, list, ye sons of Islam,
  The ever-blazing pain
Ye raise within our bosoms
  Will never go in vain.
Ye Moslems iron-hearted,
  Ye may not hear our cry ;
That Judge Whose ear is open
  Will listen from on high.
Look, look how all the women,
  To shun undying shame,
Resign their dying bodies
  Unto the jaws of flame.
Come, sisters, come, 0 maidens,
  Take leave here the earth,
Be true unto the nation
  To which we owe our birth.
Let us, ere all our feelings
  Are thaw'd away by death,
Let us, ere we are ashes,
  Breathe out one last long breath ;
For, ne'er shall bard of Chitor
  In after ages say
We chose the gloss of pleasure
  And flung the gem away.
Blaze, blaze thy last and brightest,
  Thou fiendly-friendly pyre :
The chaste will cast their bodies
  Upon thy mouth of fire.
Look, look, ye heartless Moslems,
  Look how we shun disgrace—
We will be burnt to ashes,
  Yet never stain our race.
Come, sisters, come, 0 maidens,
  Why do we make delay ?
0 wear the crown of glory
  By throwing life away.
Look, look with eyes wide open,
  Thou earth, thou moon, thou sky ;
Write, write in starry letters,
  Ye gods that dwell on high. [October, 1899.]

[Roby Dutt's Note—This refers to one of the saddest chapters of India's history, when Hindus and Muhammadan, were constantly at war ; consult Todd's " Rajasthan."]
[While Roby Dutt assigns the source as "(From a Bengali Song)",the similarity with "jbal` jbal` chitaa" is indisputable. However, Dutt's rendering has many more lines than Rabindranath's Bengali song We included the entire verse here for completeness.]
  
     --Roby Dutt, Echoes from East and West [ to which are added stray notes of mine own],  Galloway & Porter, Cambridge, 1909  



১৮৭৫ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: হিন্দু মেলায় রবীন্দ্রনাথের কবিতাপাঠ।  ১০ই মার্চ জননীর মৃত্যু। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে শিলাইদহ গেলেন। বিদ্বজ্জন সভায় 'প্রকৃতির খেদ' কবিতা পাঠ। 'জ্ঞানাঙ্কুর ও প্রতিবিম্ব'-এ ধারাবাহিকভাবে 'বনফুল' রচনা প্রকাশ।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮