গীতবিতান-GITABITAN
নীরব রজনী দেখো মগ্ন জোছনায়।

Certificate

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৮৫ ( ১৮৭৮)
কবির বয়স: ১৭
প্রকাশ: ফাল্গুন, ১২৮৭ , ভারতী |
ভগ্নহৃদয় র-র অচ১; স্বপ্নময়ী নাটক (নাট্যকার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর);রবিচ্ছায়া (বিবিধ);কাব্যগ্রন্থাবলী(কৈশোরক,১৩৯৩)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): নাট্যগীতি-ভগ্নহৃদয়; ৩/৭৬৮
রাগ / তাল: মিশ্র বেহাগ-পূরবী-কাফি / মধ্যমান
স্বরলিপি: গীতিমালা; স্বরবিতান ২০
স্বরলিপিকার: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
৬ষ্ঠ সর্গ, কবি (গান)। রবিচ্ছায়ার প্রথম গান। আড়াঠেকা [ কা-সূ ] ।  

আলোচনা

এ শাহিবাগ-প্রাসাদের চূড়ার উপরকার একটি ছোটো ঘরে আমার আশ্রয় ছিল। কেবল একটি চাকভরা বোলতার দল আমার এই ঘরের অংশী। রাত্রে আমি সেই নির্জন ঘরে শুইতাম এক-একদিন অন্ধকারে দুই-একটা বোলতা চাক হইতে আমার বিছানায় উপর আসিয়া পড়িত যখন পাশ ফিরিতাম তখন তাহারাও প্রীত হইত না এবং আমার পক্ষেও তাহা তীক্ষ্ণভাবে অপ্রীতিকর হইত। শুক্লপক্ষের গভীর রাত্রে সেই নদীর দিকের প্রকাণ্ড ছাদটাতে একলা ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়ানো আমার আর-একটা উপসর্গ ছিল। এই ছাদের উপর নিশাচর্য করিবার সময়ই আমার নিজের সুর দেওয়া সর্বপ্রথম গানগুলি রচনা করিয়াছিলাম। [সর্বপ্রথম গান:   নীরব রজনী দেখো ]  তাহার মধ্যে ' বলি ও আমার গোলাপবালা ' গানটি এখনো আমার কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আসন রাখিয়াছে। (৩৫৭)  
     --রবীন্দ্রনাথ, "স্বাদেশিকতা" - জীবনস্মৃতি, র-র ১৭  



নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় [রবীন্দ্রজীবনীবিদ] লিখছেন: " সেদিন ২৩শে চৈত্র [১৩৪৭]। আমার প্রশ্নের উত্তরে কবি বললেন: 'প্রথম গান যেটি রচনা করেছিলাম আমেদাবাদে, তা রাখবার সাহস তখন হয়নি। তাতে ছিল গানের একটি সত্যকারের মুক্তরূপ। একটিমাত্র কলি তার মনে পড়ছে (কবি গেয়ে উঠলেন)-- নীরব রজনী দেখ মগ্ন জ্যোছনায়'। " (৭০)  
     --পার্থ বসু, "গায়ক রবীন্দ্রনাথ", আনন্দ - ১৩৯৩-তে উদ্ধৃত  


 

 

    নীরব রজনী দেখো মগ্ন জোছনায়।
ধীরে ধীরে, অতি ধীরে, অতি ধীরে গাও গো॥
    ঘুমঘোরময় গান বিভাবরী গায়--
    রজনীর কণ্ঠ-সাথে সুকণ্ঠ মিলাও গো॥
নিশার কুহকবলে       নীরবতাসিন্ধুতলে
    মগ্ন হয়ে ঘুমাইছে বিশ্বচরাচর--
প্রশান্ত সাগরে হেন       তরঙ্গ না তুলে যেন
    অধীর উচ্ছ্বাসময় সঙ্গীতের স্বর।
তটিনী কী শান্ত আছে--   ঘুমাইয়া পড়িয়াছে
    বাতাসের মৃদুহস্ত-পরশে এমনি
ভুলে যদি ঘুমে ঘুমে       তটের চরণ চুমে
    সে চুম্বনধ্বনি শুনে চমকে আপনি।
তাই বলি, অতি ধীরে,  অতি ধীরে গাও গো--
    রজনীর কণ্ঠ-সাথে সুকণ্ঠ মিলাও গো॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৭৮ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: ভারতী পত্রিকায় 'কবিকাহিনী'-র ধারাবাহিক প্রকাশ। ব্যারিস্টারি পড়তে ইংল্যাণ্ড যাবার আগে আমেদাবাদে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গেলেন, তারপর ডাঃ আত্মারাম পাণ্ডুরঙের বাড়ি, গৃহস্বামীর কন্যা আন্নাতরখড় ভার পেলেন রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজি শেখাবার। সেখানে পরস্পরের মধ্যে হৃদ্যতা হয়। কবি তাঁর নাম দিয়েছিলেন নলিনী এবং পরবর্তী কালের রচনায় নলিনীর উল্লেখ আছে। ২৮শে জুন দ্বিজেন্দ্র্নাথের স্ত্রী সর্বসুন্দরীর মৃত্যু। ২০শে সেপ্টেম্বর সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে বিলেতযাত্রা, অক্টোবরে ব্রাইটন স্কুলে ভর্তি। প্রকাশিত বই: কবিকাহিনী (বন্ধু প্রবোধচন্দ্র ঘোষের উৎসাহে)

বহির্বিশ্বে: দেশীয় সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক 'ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট' চালু। ভারতীয় জাদুঘর সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হোলো। কেশবচন্দ্র সেনের অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিবাহ উপলক্ষ্যে ব্রাহ্মসমাজে প্রবল আন্দোলন। শিবনাথ শাস্ত্রী ও আনন্দমোহন বসু 'সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ'-এর সূচনা করলেন। মাদ্রাজের বিখ্যাত হিন্দু সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্ম। রুশ-তুরস্ক যুদ্ধবিরতি চুক্তি। মাইক্রোফোনের প্রথম ব্যবহার ও লণ্ডনের রাস্তায় প্রথম বিদ্যুতের আলো।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



১৩৩৮ (ইংরেজী ১৯৩১) সালে আশ্বিন মাসে "গীত-বিতান" প্রকাশিত হোলো দুখণ্ডে, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ২১০ কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, কলকাতা থেকে। প্রকাশক জগদানন্দ রায়, ছাপা শান্তিনিকেতন প্রেস। বাইশশো কপি ছাপা হয়। সংকলন হোলো কালানুক্রমিক -- ১৩০৩ সালে প্রকাশিত 'কৈশোরক' থেকে শুরু করে ১৩৩০ সালের 'বসন্ত' অবধি। বইটিতে কোনো লিখিত ভূমিকা ছিলোনা, সংগ্রাহক সুধীরচন্দ্র কর একটি সংক্ষিপ্ত 'পাঠ-পরিচয়' -এ লিখলেন "মোট ১১২৮টি গান লইয়া গীত-বিতান ১ম ও ২য় খণ্ড প্রকাশিত হইল। কবির নির্দেশমতো এই সংগ্রহ হইতে ১৪৮টি গান বাদ পড়িল। " তৃতীয় খণ্ডের প্রকাশ ১৩৩৯ শ্রাবণে, ঐ একই প্রকাশন, প্রকাশক ও ছাপার সংখ্যা নিয়ে। এটিরও বিন্যাস কালানুক্রমিক -- ১৩৩২ সালের প্রবাহিণী থেকে ১৩৩৮-এর গীতোৎসব পর্যন্ত। গানের সংখ্যা ৩৫৭। অর্থাৎ সবশুদ্ধ ১৪৮৫টি গান গীত-বিতানের তিন খণ্ডে সংগৃহীত হোলো।

প্রথম সংস্করণের পর থেকেই কবি বইটির "ব্যবহারযোগ্যতা" নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তার নমুনা পাওয়া যায় প্রথম সংস্করণের সূচীপত্রের মার্জিনে যেখানে তিনি স্বহস্তে গানের পাশেপাশে সম্ভাব্য বিষয় চিহ্নিত করেছেন। দ্বিতীয় সংস্করণের ছাপার কাজ শুরু হয় ১৩৪৫ (ইংরেজী ১৯৩৮) সালে। রবীন্দ্রনাথ এবারে নিজে হাল ধরেছেন, বিষয়বিন্যাস থেকে, গানের মার্জনা, প্রুফ দেখা কিছুই বাদ নেই। ২৩শে বৈশাখ, ১৩৪৫-এ সুধীরচন্দ্র করকে এক চিঠিতে লিখছেন, "গীতবিতানের প্রুফ দেখে দিলুম। ছাপাটায় যথাসম্ভব ঠাস বুনুনির দরকার, কারণ গানের বই সহজে বহন করবার যোগ্য হওয়া চাই, অকারণ ফাঁক বর্জনীয়। প্রত্যেক পর্যায়ের গান সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত করতে বলেছি। ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের শিরোনামা দেওয়া সম্ভব হয়নি, অথচ ইঙ্গিতে তাদের ভিন্নতা রক্ষিত হয়েছে। সংখ্যা পরিবর্তনে পর্যায়ের পরিবর্তন নীরবে নির্দিষ্ট হতে পারবে -- ভাবুক লোকের পক্ষে সেই যথেষ্ট।...

একটা কথা বলে রাখি, অন্য সকল বইয়ের মধ্যে 'গীতবিতানে'র দিকের [?] আমার মনটা সবচেয়ে বেশি তাড়া লাগাচ্ছে -- নতুন ধারায় ও একটা নতুন সৃষ্টিরূপেই প্রকাশ পাবে। "  

গীতবিতানের প্রথম আর দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণের মুদ্রণ শেষ হলে কবিকে মুদ্রিত গ্রন্থের এক খণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকাশ হয় ১৩৪৮ সালের মাঘ মাসে, অর্থাৎ কবির মৃত্যুর ছমাস পরে। তৃতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ হতে আরো অনেকদিন লাগলো -- ১৩৫৭ সালের আশ্বিন পর্যন্ত। ১ম ও ২য় সংস্করণের 'বিজ্ঞপ্তি'-তে জানানো হযেছিল যে "গীত-বিতান দুই খণ্ড মুদ্রিত হইয়া যাওয়ার পর কবি আরও অনেকগুলি গান রচনা করিয়াছিলেন, এই সকল গান তৃতীয় খণ্ডে শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে। " তৃতীয় খণ্ডের সম্পাদনা করলেন কানাই সামন্ত। নানান ভাবে বিন্যস্ত হয়ে তৃতীয় খণ্ডটির আরো তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।