গীতবিতান-GITABITAN
তুমি এ-পার ও-পার কর কে গো ওগো খেয়ার নেয়ে?

Certificate

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৫ শ্রাবণ ১৩১২ (১৯০৫)
কবির বয়স: ৪৪
প্রকাশ: জ্যৈষ্ঠ ১৩১৩ , বঙ্গদর্শন |
"খেয়া" বইয়ের শেষ কবিতা, শিরোনাম "খেয়া" র-র ১০।
Crossing 2
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-বিরহ; ১৪৭/৬৮
রাগ / তাল: পিলু / দাদরা
স্বরলিপি: বিশ্বভারতী পত্রিকা(১৩৭৩); স্বরবিতান ৬০
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার; ঐ

আলোচনা

ভারতবর্ষের যেমন বাধাহীন পরিষ্কার আকাশ, বহুদূরবিস্তৃত সমতলভূমি আছে, এমন য়ুরোপের কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। এইজন্যে আমাদের জাতি যেন বৃহৎ পৃথিবীর সেই অসীম ঔদাস্য আবিষ্কার করতে পেরেছে। এইজন্যে আমাদের পূরবীতে কিংবা টোড়িতে সমস্ত বিশাল জগতের অন্তরের হাহাধ্বনি যেন ব্যক্ত করছে, কারও ঘরের কথা নয়। পৃথিবীর একটা অংশ আছে যেটা কর্মপটু, স্নেহশীল, সীমাবদ্ধ, তার ভাবটা আমাদের মনে তেমন প্রভাব বিস্তার করবার অবসর পায় নি। পৃথিবীর যে ভাবটা নির্জন, বিরল, অসীম, সেই আমাদের উদাসীন করে দিয়েছে। তাই সেতারে যখন ভৈরবীর মিড় টানে, আমাদের ভারতবর্ষীয় হৃদয়ে একটা টান পড়ে।
  --পতিসর কাছারি, রবিবার ৬ মাঘ ১২৯৭; ১৮.১.১৮৯১ #১০  

একটা লম্বা নৌকোয় অনেকগুলো ছোকরা ঝপ্‌ ঝপ্‌ করে দাঁড় ফেলছিল এবং সেই তালে গান গাচ্ছিল--

   যোবতী ক্যান্‌ বা কর মন ভারী?
     পাবনা থাক্যে আন্যে দেব
       ট্যাকা দামের মোটরি। '

স্থানীয় কবিটি যে ভাব অবলম্বন করে সংগীত রচনা করেছেন-- আমরাও ও ভাবের ঢের লিখেছি, কিন্তু কিছু ইতর-বিশেষ আছে। আমাদের যুবতী মন ভারী করলে তৎক্ষণাৎ জীবনটা দিতে কিম্বা নন্দনকানন থেকে পারিজাত এনে দিতে প্রস্তুত হই, কিন্তু এ অঞ্চলের লোক খুব সুখে আছে বলতে হবে-- অল্প ত্যাগস্বীকারেই যুবতীর মন পায়। মোটরি জিনিষটা কী তা বলা আমার সাধ্য নয়, কিন্তু তার দামটাও নাকি পার্শ্বেই উল্লেখ করা আছে-- তাতেই বোঝা যাচ্ছে খুব বেশি দুর্‌মূল্য নয় এবং নিতান্ত অগম্য স্থান থেকেও আনতে হয় না। গানটা শুনে বেশ মজার লাগল। যুবতীর মন ভারী হলে জগতে যে আন্দোলন উপস্থিত হয়, এই বিলের প্রান্তেও তার একটা সংবাদ পাওয়া গেল। এ গানটি কেবল অস্থানেই হাস্যজনক, কিন্তু দেশকালপাত্র-বিশেষে এর যথেষ্ট সৌন্দর্য আছে। আমার অজ্ঞাতনামা গ্রাম্য কবিভ্রাতার রচনাগুলিও এই গ্রামের লোকের সুখদুঃখের পক্ষে নিতান্ত আবশ্যক, আমার গানগুলি সেখানে কম হাস্যজনক নয়।
  --পতিসর, ১১ অগস্ট্‌, ১৮৯৩; ২৭.৪.১৩০০ #১০৮  

আসলে হয়েছে কী, এতক্ষণ কোনো কাজ না থাকাতে নদীর দিকে চেযে গুন্‌ গুন্‌ স্বরে ভৈরবী টোড়ি রামকেলি মিশিয়ে একটা প্রভাতী রাগিণী সৃজন-পূর্বক আপন মনে আলাপ করছিলুম, [কত কথা তারে ছিল বলিতে?] তাতে অকস্মাৎ মনের ভিতরে এমন একটা সুতীব্র অথচ সুমধুর চাঞ্চল্য জেগে উঠল, এমন একটা অনির্বচনীয় ভাবের এবং বাসনার আবেগ উপস্থিত হল, এক মুহূর্তের মধ্যেই আমার এই বাস্তবিক জীবন এবং বাস্তবিক জগৎ আগাগোড়া এমন একটা মূর্তিপরিবর্তন করে দেখা দিলে, অস্তিত্বের সমস্ত দুরূহ সমস্যার এমন একটা সংগীতময় ভাবময় অথচ ভাষাহীন অর্থহীন অনির্দেশ্য উত্তর কানে এসে বাজতে লাগল, এবং সেই সুরের ছিদ্র দিয়ে নদীর উপর জলের তরল পতনশব্দ অবিশ্রাম ধ্বনিত হয়ে এমন একটা পুলক সঞ্চার করতে লাগল--জগতের প্রান্তবর্তী এই সঙ্গীহীন একটিমাত্র প্রাণীকে ঘিরে আষাঢ়ের অশ্রুসজল ঘনঘোর শ্যামল মেঘের মতো 'সুখমিতি বা দুঃখমিতি বা' এমনি স্তরে স্তরে ঘনিয়ে এল, যে একসময়ে বলে উঠতে হল যে, 'থাক আর কাজ নেই। '
  --শিলাইদহ, ২৬ জুন, ১৮৯৪; ১৩.৩.১৩০১ #১২২  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  



গানের কাগজে রাগরাগিণীর নাম-নির্দেশ না থাকাই ভালো। নামের মধ্যে তর্কের হেতু থাকে, রূপের মধ্যে না। কোন্‌ রাগিণী গাওয়া হচ্ছে বলবার কোনো দরকার নেই। কী গাওয়া হচ্ছে সেইটেই মুখ্য কথা, কেননা তার সত্যতা তার মধ্যেই চরম। নামের সত্যতা দশের মুখে, সেই দশের মধ্যে মতের মিল না থাকতে পারে। কলিযুগে শুনেছি নামেই মুক্তি, কিন্তু গান চিরকালই সত্যযুগে।  
     --রবীন্দ্রনাথ, ইন্দিরাদেবীকে লিখিত চিঠি ১৩ জানুয়ারি ১৯৩৫।  


 

 

১৪৭

তুমি   এ-পার ও-পার কর কে গো ওগো খেয়ার নেয়ে?
আমি   ঘরের দ্বারে বসে বসে দেখি যে সব চেয়ে॥
       ভাঙিলে হাট দলে দলে   সবাই যবে ঘরে চলে
       আমি তখন মনে ভাবি আমিও যাই ধেয়ে॥
দেখি   সন্ধ্যাবেলা ও পার-পানে তরণী যাও বেয়ে।
দেখে   মন যে আমার কেমন করে, ওঠে যে গান গেয়ে
              ওগো খেয়ার নেয়ে॥
       কালো জলের কলকলে   আঁখি আমার ছলছলে,
       ও পার হতে সোনার আভা পরান ফেলে ছেয়ে।
দেখি   তোমার মুখে কথাটি নাই ওগো খেয়ার নেয়ে--
কী যে  তোমার চোখে লেখা আছে দেখি যে সব চেয়ে
              ওগো খেয়ার নেয়ে।
      আমার মুখে ক্ষণতরে   যদি তোমার আঁখি পড়ে
      আমি তখন মনে ভাবি আমিও যাই ধেয়ে
           ওগো খেয়ার নেয়ে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

2

W HEN the market is over and they return homewards through the dusk,
   I sit at the wayside to watch thee plying thy boat,
    Crossing the dark water with the sunset gleam upon thy sail;
   I see thy silent figure standing at the helm and suddenly catch thy eyes gazing upon me;
   I leave my song; and cry to thee to take me across.
  

Crossing: Published together with Lover's Gift. Many of the translations are transcreations and paraphrases of the original. Poems have been sourced from Naivedya, Kheya, Gitanjali, Gitimalya and Gitali.[Notes, "The English Writings of Rabindranath Tagore" - vol 1]  
     --Rabindranath Tagore, Lover's Gift and Crossing, Macmillan, London, 1918.  



১৯০৫ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  ১৯শে জানুয়ারি ৮৮ বছর বয়সে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু। বিধুশেখর ভট্টাচার্য শান্তিনিকেতনে শিক্ষক হয়ে এলেন। মাসিক 'ভাণ্ডার' পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। আগরতলায় ত্রিপুরা সাহিত্য সমিতির আমন্ত্রণে গিয়ে 'দেশীয় রাজ্য' প্রবন্ধ পাঠ করলেন। লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবে দেশব্যাপী বিক্ষোভে রবীন্দ্রনাথ যোগ দিলেন, 'অবস্থা ও ব্যবস্থা' প্রবন্ধে ব্রিটিশ দ্রব্য বয়কট ও অসহযোগ নীতির কথা বললেন। ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ হোলো। প্রতিবাদে শোভাযাত্রা হোলো রাখীবন্ধন উৎসব করে, 'বাংলার মাটি, বাংলার জল' গান গেয়ে। কবি নিজে এক বিরাট শোভাযাত্রার অগ্রণী হয়ে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদ ও সকল বাঙালির মিলনের শপথ গ্রহণ ঘোষণা করলেন। বেশীর ভাগ স্বদেশী সঙ্গীত এই সময়ের রচনা। কিছুকাল এই আন্দোলনে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থেকে কবি আন্দোলনের পথ থেকে সরে যান। ২২শে অক্টোবর ছাত্রদের রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে কুখ্যাত কার্লাইল সার্কুলার জারি করা হয়। তার প্রতিবাদে বহু ছাত্রসভায় বক্তৃতা। শেষে সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ডন সোসাইটিতে আন্দোলনের পথ ছেড়ে দেবার কথা ঘোষণা। কুষ্টিয়ায় বয়ন বিদ্যালয়, পতিসরে কৃষিব্যাঙ্ক এবং নিজ জমিদারিতে নানা গঠনমূলক কাজ শুরু করলেন। প্রকাশ: আত্মশক্তি, বাউল, স্বদেশ।

বহির্বিশ্বে: ১৮ ফেব্রুয়ারি লণ্ডনে ইণ্ডিয়ান হোম রুল সোসাইটি স্থাপিত হয়। ২০শে জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেণ্ট বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব অনুমোদন করে। ১৯শে অগাস্ট লর্ড কার্জন পদত্যাগ করেন, নতুন বড়লাট লর্ড মিণ্টো। ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকরী হয়। ঢাকা শহরে রাজধানী করে পূর্ববাংলা ও আসাম মিলিয়ে এক নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। রাখীবন্ধন, স্বদেশী গান গেয়ে শোভাযাত্রা এবং অরন্ধন ইত্যাদি দ্বারা বাঙালী শোক প্রকাশ করে। রাশিয়ার সঙ্গে জাপানের যুদ্ধে জাপানের জয়, শান্তিনিকেতনে বিজয়োৎসব। রাশিয়াতে জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিপ্লব। ডাবলিনে সিন্‌-ফিন পার্টির প্রতিষ্ঠা। সান-ইয়াৎ-সেন চীনের গুপ্তসমিতিগুলিকে একত্র করলেন মাঞ্চুদের বিতাড়নের জন্য।  লণ্ডনে মোটর বাস চলা আরম্ভ হোলো। আইনস্টাইন প্রকাশ করলেন বিশেষ আপেক্ষিকবাদ। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: বাঙালীর গান (দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত), ডি প্রোফাণ্ডিস (ওয়াইল্ড), রাইডার্স টু দি সী (সিন্‌জ্‌)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


শুধু একটি আবেগ বহন করে, শুধু বিশেষ একটি ব্যাকুলতা মনে জাগায়, এ গানগুলি এই জাতের রচনা। কিছু বলে না, অথচ সবই বলে। এমন বিশুদ্ধ আবেগ যে ভাষায় সম্ভব তা কি আমরা কখনো জানতুম। সংগীতের কাজ করিয়ে নিয়েছেন ভাষাকে দিয়ে, এত বড়ো শিল্পী তিনি। আমরা জানি সংগীতেরই ক্ষমতা আছে আমাদের মনের সেই প্রদেশ স্পর্শ করবার, যা সব চেয়ে ঘন, নিভৃত ও দুর্গম, গদ্যের যা অনধিগম্য, কাব্য যার প্রান্তটুকু মাত্র কখনো ছোঁয় কখনো ছোঁয় না; যে কথা হঠাৎ মনে প'ড়ে হারিয়ে যায়, ঘুম আর জেগে-ওঠার মধ্যে উজ্জ্বল অলীক সেতু রচনা করে, যে কথা মনে হয় যেন কতকাল আগে কোথায় শুনেছিলাম, যা ছায়াময়, সূক্ষ্ম-বিসর্পিত, অস্পষ্ট-স্মৃতি-বিজড়িত, সে-কথা এক সংগীতই আমাদের শোনাতে পারে -- এ কথা আমরা জানি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ভাষায় শুনিয়েছেন সে-কথা: কাব্যের স্বাদে যে অভ্যস্ত, তার কাছে রবীন্দ্রনাথের গান শোনা যতখানি রোমাঞ্চকর, তাঁর গান পড়া তার চেয়ে কম নয়; তাঁর গান পড়তে-পড়তেও সেই রহস্যময় জগতের দুয়ার খুলে যায় যা আমাদের প্রত্যেকের মনের মধ্যেই আছে, অথচ দৈনন্দিন জীবনে যাকে প্রায়ই ভুলে থাকি। আমার নিজের কথা বলতে পারি, রবীন্দ্রনাথের তিন-চারটির বেশি গান আমি এক সঙ্গে পড়তে পারিনে, হৃৎস্পন্দন  অত্যন্ত দ্রুত হয়, গলা যেন আটকে আসে।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১১