গীতবিতান-GITABITAN
ওই জানালার কাছে বসে আছে করতলে রাখি মাথা-

Portrait

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৯০ ( ১৮৮৩)
কবির বয়স: ২২
প্রকাশ: ফাল্গুন, ১২৯০ , বিবাহ-উৎসব গীতিনাট্য |
ছবি ও গান(১২৯০);রবিচ্ছায়া(বিবিধ)
; Rabindranath - Basanta Koomar Roy
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): নাট্যগীতি-বিবাহ-উৎসব; ২৭/৭৭৮
রাগ / তাল: মিশ্র খাম্বাজ / একতাল
স্বরলিপি: ভারতী(১৩০০);গীতিমালা; স্বরবিতান ২০
স্বরলিপিকার: অনুল্লিখিত; জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
স্বর্ণকুমারী দেবীর জ্যেষ্ঠা কন্যা হিরণ্ময়ী ও ফণীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বিবাহ উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ (আঠাশটি গান), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, স্বর্ণকুমারী ও অক্ষয় চৌধুরীর যৌথ রচনা। পরে ঠাকুরবাড়ির অন্য বিবাহ উৎসব ও মেলায় নাটকটি অভিনীত হয়। রবীন্দ্রনাথের কিছু গান পূর্বপ্রকাশিত, কিছু গান পরে অন্য রচনায় ব্যবহৃত।  

আলোচনা

আমার মনে হয় দিনের জগৎটা য়ুরোপীয় সংগীত, সুরে-বেসুরে খণ্ডে-অংশে মিলে একটা গতিশীল প্রকাণ্ড হার্মনির জটলা-- আর, রাত্রের জগৎটা আমাদের ভারতবর্ষের সংগীত, একটি বিশুদ্ধ করুণ গম্ভীর অমিশ্র রাগিণী। দুটোই আমাদের বিচলিত করে, অথচ দুটোই পরস্পরবিরোধী। কী করা যাবে-- প্রকৃতির গোড়ায় একটা দ্বিধা একটা মস্ত বিরোধ আছে, রাজা এবং রানীর মধ্যে সমস্ত বিভক্ত। দিন এবং রাত্রি, বিচিত্র এবং অখণ্ড, পরিব্যক্ত এবং অনাদি। আমরা ভরতবর্ষীয়েরা [যল্লিখিতং] সেই রাত্রির রাজত্বে থাকি। আমরা অখণ্ড অনাদির দ্বারা অভিভূত। আমাদের নির্জন এককের গান, য়ুরোপের সজন লোকালয়ের গান। আমাদের গানে শ্রোতাকে মনুষ্যের প্রতিদিনের সুখদুঃখের সীমা থেকে বের করে নিয়ে নিখিলের মূলে যে-একটি সঙ্গীহীন বৈরাগ্যের দেশ আছে সেইখানে নিয়ে যায়, আর য়ুরোপের সংগীত মনুষ্যের সুখ-দুঃখের অনন্ত উত্থানপতনের মধ্যে বিচিত্রভাবে নৃত্য করিয়ে নিয়ে চলে।
  --শিলাইদহ, ১০ অগস্ট্‌ ১৮৯৪; ২৬.৪.১৩০১ #১৪২  

কাল অনেক রাত পর্যন্ত নহবতে কীর্তনের সুর বাজিয়েছিল; সে বড়ো চমৎকার লাগছিল, আর ঠিক এই পাড়াগাঁয়ের উপযুক্ত হয়েছিল-- যেমন সাদাসিধে তেমনি সকরুণ। ...সেকালের রাজাদের বৈতালিক ছিল-- তারা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে গান গেয়ে প্রহর জানিয়ে দিত, এই নবাবিটা আমার লোভনীয় মনে হয়। ... গান বাজনা শুনলেই তখনি বুঝতে পারি এতদিন আমি সংগীতের জন্যে তৃষিত হয়ে ছিলুম-- সেই জন্যে আমার ভারী ইচ্ছে করে আমার খুব একজন কাছের লোক বেশ ভালো রকম বাজনা শিখে নেয়।
  --সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯৫; ২২.৩.১৩০২ #২১৮  

আজ সকালে বসে বসে আমার একটা নতুন গানে সুর দিচ্ছিলুম-- সুরটা যে খুব নতুন তা নয়, এক রকম কীর্তন ধরণের ভৈরবী। কিন্তু তবু ছন্দে ছন্দে গাইতে গাইতে শরীরের সমস্ত রক্তের মধ্যে একটা সংগীতের মাদকতা প্রবেশ করতে থাকে-- সমস্ত শরীর এবং সমস্ত মন আগাগোড়া একটা বাজনার যন্ত্রের মতো কম্পিত এবং গুঞ্জরিত হয়ে উঠতে থাকে এবং সেই সুরের স্পন্দন আমার শরীর মন থেকে সমস্ত বাইরের জগতে সঞ্চারিত এবং ব্যাপ্ত হয়ে বিশ্বের সঙ্গে আমার সঙ্গে একটা স্বরসম্মিলন স্থাপিত হয়ে যায়। বীণার তার যখন বাজতে থাকে তখন সেটা যেমন আবছায়া দেখতে হয়, গানের সুরে সমস্ত জগৎটা সেই রকম বাষ্পময় এবং ঝঙ্কারপূর্ণ হয়ে ওঠে।
  --কলকাতা, ২৯ অগস্ট্‌, ১৮৯৪; ১৪.৫.১৩০১ #১৪৮  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  



বাংলা পড়িবার সময় অনেক পাঠক অধিকাংশ স্বরবর্ণকে দীর্ঘ করিয়া টানিয়া পড়েন। ... বাংলা শব্দের মধ্যে এই ধ্বনির অভাব-বশত বাংলায় পদ্যের অপেক্ষা গীতের প্রচলনই অধিক। কারণ, গীত সুরের সাহায্যে প্রত্যেক কথাটিকে মনের মধ্যে সম্পূর্ণ নিবিষ্ট করিয়া দেয়। কথায় যে অভাব আছে সুরে তাহা পূর্ণ হয়। এবং গানে এক কথা বার-বার ফিরিয়া গাহিলে ক্ষতি হয় না। যতক্ষণ চিত্ত না জাগিয়া উঠে ততক্ষণ সঙ্গীত ছাড়ে না। এইজন্য প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যে গান ছাড়া কবিতা নাই বলিলে হয়।  
     --রবীন্দ্রনাথ, বাংলা শব্দ ও ছন্দ, শ্রাবণ ১২৯৯ (২১৮)।  


 

 

২৭

ওই      জানালার কাছে বসে আছে   করতলে রাখি মাথা--
তার    কোলে ফুল পড়ে রয়েছে,  সে যে  ভুলে গেছে মালা গাঁথা॥
শুধু    ঝুরু ঝুরু বায়ু বহে যায়   তার    কানে কানে কী যে কহে যায়--
তাই   আধো শুয়ে আধো বসিয়ে   ভাবিতেছে কত কথা॥
               চোখের উপরে মেঘ ভেসে যায়,  উড়ে উড়ে যায় পাখি--
               সারা দিন ধ'রে বকুলের ফুল  ঝ'রে পড়ে থাকি থাকি।
       মধুর আলস, মধুর আবেশ,   মধুর মুখের হাসিটি--
       মধুর স্বপনে প্রাণের মাঝারে   বাজিছে মধুর বাঁশিটি॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

Pensive Beloved

T HE young girl who sits by the window alone has forgotten to garland the flowers for her beloved. With her head resting on her hand she seems entirely rapt, while about her the gathered blossoms of the summer lie neglected.
     For the breeze gently blows in to her, whispering softly, caressingly, as she sits by the window in a solemn rapture.
     The clouds fleet in the blue, and the birds flutter in the forest; and the odorous bakul blossoms fall intermittently before her eyes, yet she is unregardful.
     But in sweet repose she smiles, for now the tender chords of her heart stir melodiously in the shadowland of dreams.
  
     --Basanta Koomar Roy, Rabindranaath Tagore: The Man and His Poetry, Dodd, Mead & Co., New York,1925  



১৮৮৩ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে পশ্চিম ভারতের সমুদ্রতীরে কারোয়ার শহরে বাস ও 'প্রকৃতির প্রতিশোধ' রচনা। ৯ই ডিসেম্বর মৃণালিনী (ভবতারিণী) দেবীর সঙ্গে বিবাহ। প্রকাশিত বই: বৌঠাকুরানীর হাট, প্রভাতসংগীত, বিবিধ প্রসঙ্গ।

বহির্বিশ্বে: জাতীয় কংগ্রেসের অগ্রদূত ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত। ইলবার্ট বিল (ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গ অপরাধী বিচারের অধিকার সম্পর্কিত) নিয়ে আন্দোলন। বেঙ্গলি পত্রিকার সম্পাদক সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারাবরণ। ব্রিটেন মিশর অধিকার করলো। শিবনাথ শাস্ত্রীর কিশোর মাসিক 'মুকুল' আর শিবনাথ শাস্ত্রী ও অন্যান্যদের সম্পাদনায় 'সঞ্জীবনী' পত্রিকার প্রথম প্রকাশ। মৃত্যু: যদুভট্ট, তুর্গেনিভ, কার্ল মার্ক্‌স্‌ ; চিত্রশিল্পী মানে। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ট্রেজার আইল্যাণ্ড (স্টিভেনসন), দাস স্পেক জরথুস্ত্র (নীট্‌শে)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


[দিদির, হিরণ্ময়ী দেবী, স্বর্ণকুমারীর জ্যেষ্ঠা কন্যা] বাসরের আমোদ-উৎসবস্বরূপ রবিমামা 'বিবাহোৎসব' বলে একটি গীতি-নাটিকা রচনা করে অভিনয় করালেন দিদির সমবয়সী বা তাঁর চেয়ে কিছু বড় বোনেদের দিয়ে। এতে দিদির খুসীও [প্রসিদ্ধ ব্রাহ্মনেতা দুর্গামোহন দাসের কনিষ্ঠা কন্যা শৈলবালা] ছিল। সরোজাদিদি তাতে ছিলেন নায়িকা-- অন্যরা সব তাঁর সখী। দুজন পুরুষ ছিল, একজন নায়ক ও একজন তার আমুদে সখা। দ্বিপুদাদার [দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুর] প্রথমা স্ত্রী দিনুর [দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর] মা-- সুশীলা বৌঠান ও সুপ্রভাদিদি [শরৎকুমারীর কন্যা]-- এই দুজনে ঐ দুই পুরুষ সেজেছিলেন।  
     --সরলা দেবী চৌধুরানী, জীবনের ঝরাপাতা, রূপা, কলকাতা, ১৯৮২