গীতবিতান-GITABITAN
এ কি সত্য সকলই সত্য, হে আমার চিরভক্ত॥

Plaque

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩ আশ্বিন, ১৩০৪ ( ১৮৯৭)
কবির বয়স: ৩৬
রচনাস্থান: রেলপথে (পতিসর-কলকাতা)
প্রকাশ: বৈশাখ, ১৩০৭ , কল্পনা-ভগ্ন মন্দির র-র ৭ |
কাব্যগ্রন্থ ২(১৩১০)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): নাট্যগীতি-কল্পনা; ৫৮/৭৮৮
রাগ / তাল: মিশ্র ঝিঁঝিট / দাদরা
স্বরলিপি: স্বরবিতান ৩৫
স্বরলিপিকার: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাদটিকা:
তুলনীয়: আমি তব মালঞ্চের হব মালাকার।  

আলোচনা

পূজনীয় রবীন্দ্রনাথের স্বহস্তে লিখিত এই স্বরলিপিটি [এ কি সত্য সকলই সত্য] আমার কাছে এতদিন ছিল। আজ লোকচক্ষু-সমক্ষে তাকে বার করলুম এই জন্যে যে আমার বিশ্বাস, এইটিই তাঁর করা একমাত্র স্বরলিপি। অন্যান্য যে সব পুরনো গানের বইয়ে স্বরলিপিকার বলে তাঁর নাম রয়েছে দেখতে পাই, সেগুলি তাঁর নিজের হাতে করা কিনা সে বিষয়ে আমার বিশেষ সন্দেহ আছে। অন্তত কলকাতা বাসকালে আমরা তাঁকে কখনো স্বরলিপি করতে দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। শান্তিনিকেতনের অধিবাসীরাও বোধহয় এ সম্বন্ধে অনুরূপ সাক্ষ্যই দেবেন।

এই স্বরলিপি করবার সন-তারিখ আমি দিতে পারব না; তার বিশেষ আবশ্যকতাও বোধহয় নেই। তবে কাগজটি যে বহু দিনের, তার দুরবস্থাই তার প্রমাণ। মূল স্বরলিপির নীল পেনসিলের লেখা ব্লক করা সম্ভব হয়নি। তা ভিন্ন আর সবই যথাযথ রাখবার চেষ্টা করা হয়েছে। আধুনিক স্বরলিপিজ্ঞ্গণ দেখে কৌতুক বোধ করবেন যে, কবিগুরু মামুলি আকারমাত্রিক স্বরলিপির সংকেত সম্পূর্ণ মেনে চলেননি। সেটি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ স্বকীয়তাবশতঃ, অথবা তখন আকারমাত্রিক পদ্ধতির শৈশব অবস্থা ছিল বলে, সে কথা এখন নির্ণয় করা শক্ত।

আর একটি লক্ষ্য করবার কথা এই যে, গানের কথাগুলি স্বরলিপিতে যেরূপ দেখা যায়, মুদ্রিত অবস্থায় সে রূপ কতকটা বদলে গিয়েছিল।     
     --ইন্দিরা দেবী, বিশ্বভারতী পত্রিকা, ১ম বর্ষ , ২য় সংখ্যা, ভাদ্র ১৩৪৯  



 

 

৫৮

              এ কি সত্য সকলই সত্য,  হে আমার চিরভক্ত॥
              মোর নয়নের বিজুলি-উজল আলো
        যেন   ঈশান কোণের ঝটিকার মত কালো  এ কি সত্য
        মোর  মধুর অধর বধূর নবীন অনুরাগ-সম রক্ত
              হে আমার চিরভক্ত,  এ কি সত্য॥
              অতুল মাধুরী ফুটেছে আমার মাঝে,
        মোর  চরণে চরণে সুধাসঙ্গীত বাজে  এ কি সত্য।
              মোরে না হেরিয়া নিশির শিশির ঝরে,
              প্রভাত-আলোকে পুলক আমারি তরে  এ কি সত্য।
        মোর  তপ্তকপোল-পরশে-অধীর সমীর মদিরমত্ত
              হে আমার চিরভক্ত,   এ কি সত্য॥
৫৯

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৯৭ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: ১১ জুন নাটোরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের অধিবেশন, সভাপতি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব সভার কাজ বাংলায় করবার জন্য। আকস্মিক ভূমিকম্পে সম্মেলন বন্ধ। 'বৈকুণ্ঠের খাতা' রচনা ও খামখেয়ালী সঙ্ঘের অনুরোধে কেদারের ভূমিকায় অভিনয়। জগদীশচন্দ্র বসুকে কবিতায় অভিনন্দন। ইউনিভার্সিটি ইন্‌স্টিটিউটে  'গান্ধারীর আবেদন' আবৃত্তি। স্বদেশী পণ্যের প্রচার ও বিক্রয়ের জন্য হ্যারিসন রোডে স্বদেশী ভাণ্ডার স্থাপন। প্রকাশ: বৈকুণ্ঠের খাতা, পঞ্চভূত।

বহির্বিশ্বে: বিবেকানন্দ দেশে ফিরে সারা ভারত ঘুরে হিন্দুধর্ম ও দর্শন সম্বন্ধে বক্তৃতা দিলেন। ১লা মে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা। দামোদর হরি চাপেকর পুণার জেলাশাসককে গুলি করে হত্যা করলেন; অনেকে বলেন এই সময় থেকেই ভারতে গুপ্ত বিপ্লবী আন্দোলনের শুরু। ২০শে অগাস্ট রোনাল্ড রস কলকাতার সুখলাল কারনানি হাসপাতালে গবেষণা করে ম্যালেরিয়া রোগের উৎপত্তি রহস্য ভেদ করলেন -- পরে নোবেল পুরস্কার পান এই জন্য। কালীপ্রসন্ন সিংহের বাড়িতে 'ভারতীয় সঙ্গীতসমাজ' স্থাপিত হোলো জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে। বালগঙ্গাধর টিলকের কারাদণ্ড। অন্যান্য বিশিষ্ট লোকেদের সঙ্গে যোগ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ টিলকের মামলার খরচ চালাতে অর্থসাহায্য করেন। গ্রীসের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে তুরস্ক  হেরে যায়।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



১৩৩৮ (ইংরেজী ১৯৩১) সালে আশ্বিন মাসে "গীত-বিতান" প্রকাশিত হোলো দুখণ্ডে, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ২১০ কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, কলকাতা থেকে। প্রকাশক জগদানন্দ রায়, ছাপা শান্তিনিকেতন প্রেস। বাইশশো কপি ছাপা হয়। সংকলন হোলো কালানুক্রমিক -- ১৩০৩ সালে প্রকাশিত 'কৈশোরক' থেকে শুরু করে ১৩৩০ সালের 'বসন্ত' অবধি। বইটিতে কোনো লিখিত ভূমিকা ছিলোনা, সংগ্রাহক সুধীরচন্দ্র কর একটি সংক্ষিপ্ত 'পাঠ-পরিচয়' -এ লিখলেন "মোট ১১২৮টি গান লইয়া গীত-বিতান ১ম ও ২য় খণ্ড প্রকাশিত হইল। কবির নির্দেশমতো এই সংগ্রহ হইতে ১৪৮টি গান বাদ পড়িল। " তৃতীয় খণ্ডের প্রকাশ ১৩৩৯ শ্রাবণে, ঐ একই প্রকাশন, প্রকাশক ও ছাপার সংখ্যা নিয়ে। এটিরও বিন্যাস কালানুক্রমিক -- ১৩৩২ সালের প্রবাহিণী থেকে ১৩৩৮-এর গীতোৎসব পর্যন্ত। গানের সংখ্যা ৩৫৭। অর্থাৎ সবশুদ্ধ ১৪৮৫টি গান গীত-বিতানের তিন খণ্ডে সংগৃহীত হোলো।

প্রথম সংস্করণের পর থেকেই কবি বইটির "ব্যবহারযোগ্যতা" নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তার নমুনা পাওয়া যায় প্রথম সংস্করণের সূচীপত্রের মার্জিনে যেখানে তিনি স্বহস্তে গানের পাশেপাশে সম্ভাব্য বিষয় চিহ্নিত করেছেন। দ্বিতীয় সংস্করণের ছাপার কাজ শুরু হয় ১৩৪৫ (ইংরেজী ১৯৩৮) সালে। রবীন্দ্রনাথ এবারে নিজে হাল ধরেছেন, বিষয়বিন্যাস থেকে, গানের মার্জনা, প্রুফ দেখা কিছুই বাদ নেই। ২৩শে বৈশাখ, ১৩৪৫-এ সুধীরচন্দ্র করকে এক চিঠিতে লিখছেন, "গীতবিতানের প্রুফ দেখে দিলুম। ছাপাটায় যথাসম্ভব ঠাস বুনুনির দরকার, কারণ গানের বই সহজে বহন করবার যোগ্য হওয়া চাই, অকারণ ফাঁক বর্জনীয়। প্রত্যেক পর্যায়ের গান সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত করতে বলেছি। ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের শিরোনামা দেওয়া সম্ভব হয়নি, অথচ ইঙ্গিতে তাদের ভিন্নতা রক্ষিত হয়েছে। সংখ্যা পরিবর্তনে পর্যায়ের পরিবর্তন নীরবে নির্দিষ্ট হতে পারবে -- ভাবুক লোকের পক্ষে সেই যথেষ্ট।...

একটা কথা বলে রাখি, অন্য সকল বইয়ের মধ্যে 'গীতবিতানে'র দিকের [?] আমার মনটা সবচেয়ে বেশি তাড়া লাগাচ্ছে -- নতুন ধারায় ও একটা নতুন সৃষ্টিরূপেই প্রকাশ পাবে। "  

গীতবিতানের প্রথম আর দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণের মুদ্রণ শেষ হলে কবিকে মুদ্রিত গ্রন্থের এক খণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকাশ হয় ১৩৪৮ সালের মাঘ মাসে, অর্থাৎ কবির মৃত্যুর ছমাস পরে। তৃতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ হতে আরো অনেকদিন লাগলো -- ১৩৫৭ সালের আশ্বিন পর্যন্ত। ১ম ও ২য় সংস্করণের 'বিজ্ঞপ্তি'-তে জানানো হযেছিল যে "গীত-বিতান দুই খণ্ড মুদ্রিত হইয়া যাওয়ার পর কবি আরও অনেকগুলি গান রচনা করিয়াছিলেন, এই সকল গান তৃতীয় খণ্ডে শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে। " তৃতীয় খণ্ডের সম্পাদনা করলেন কানাই সামন্ত। নানান ভাবে বিন্যস্ত হয়ে তৃতীয় খণ্ডটির আরো তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।