গীতবিতান-GITABITAN
শুনি ওই রুনু ঝুনু পায়ে পায়ে নূপুরধ্বনি

Group

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩৪৬ ( ১৯৩৯)
কবির বয়স: ৭৮
প্রকাশ: ভাদ্র, ১৩৫৭ , -
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): নাট্যগীতি-ডাকঘর; ১২৯/৮১১
রাগ / তাল: মল্লার / কাহারবা
স্বরলিপি: গীতবিতান বার্ষিকী পত্রিকা (১৩৫০); স্বরবিতান ৫৩
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার; ঐ
পাদটিকা:
ডাকঘর নাটকের জন্য রচনা করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নাটকে ধৃত হয়নি।  

আলোচনা

একবার ঠিক হল, নাটক হবে, 'ডাকঘর'। আমাকে গুরুদেব নিয়েছিলেন 'সুধা'র ভূমিকায়। প্রতিদিন রিহার্সালে যাওয়ার ব্যাপারটা আমার কাছে খুব আনন্দের ছিল। গুরুদেব নিজেই আমাদের অভিনয় শেখাতেন। ডাকঘরের গানগুলো আমার খুব ভালো লাগত। বিশেষ করে ' শুনি ওই রুনুঝুনু পায়ে পায়ে ' গানটি। নাটকের রিহার্সালের শেষে প্রায়ই গুরুদেব গাইতেন, ' সমুখে শান্তিপারাবার '। কী অপূর্ব ভঙ্গিতে তিনি গাইতেন। গাওয়া শেষ করে বলতেন, 'আমার মৃত্যুর পর এ গান গেয়ো তোমরা'। একথা শুনে আমার খুব মন খারাপ হয়ে যেত। কেন তিনি বারবার এ কথা বলেন? খুব কষ্ট হত আমার। সেবার তাঁর অসুস্থতার জন্যে 'ডাকঘর' আর মঞ্চস্থ হতে পারেনি। তিনি খুব অসুস্থ-- থাকেন 'উদয়ন'-এ। আমি গুরুদেবের পাশে মোড়ায় বসে তাঁকে গান শোনাতাম। এটা আমার প্র্তিদিনের কাজ ছিল।

... [রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর খবর শান্তিনিকেতনে পৌঁছবার পরে] সেই যে 'ডাকঘরে'র রিহার্সাল দিতে দিতে কতবার গাইতেন আর বলতেন, "আমার মৃত্যুর পর তোমরা গেয়ো, সমুখে শান্তিপারাবার"। তখন খুব কষ্ট হত। আজ এই দুঃসহ দিনে সেই গানই আমরা গাইলাম। যেন তিনিই গাইয়ে নিলেন। (২৩)  
     --কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দধারা, আজকাল, কলকাতা, ১৯৯৮  



 

 

১২৯

শুনি ওই রুনু ঝুনু   পায়ে পায়ে নূপুরধ্বনি
     চকিত পথে   বনে বনে॥
নির্ঝর ঝরো ঝরো   ঝরিছে দূরে,
        জলতলে বাজে শিলা ঠুনু-ঠুনু ঠুনু-ঠুনু॥
   ঝিল্লিঝঙ্কৃত বেণুবনছায়া   পল্লবমর্মরে কাঁপে,
        পাপিয়া ডাকে,   পুলকিত শিরীষশাখে
              দোল দিয়ে যায় দক্ষিণবায়   পুন পুন॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯৩৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  জওহরলাল নেহরু আর সুভাষচন্দ্র বসু শান্তিনিকেতনে এলেন কবির সঙ্গে দেখা করতে। পুরী বেড়াতে গেলেন, পুরীরাজ কবিকে 'পরমগুরু' উপাধি দিলেন। প্রকাশ: প্রহাসিনী (কবিতা), আকাশপ্রদীপ (কবিতা), শ্যামা (নৃত্যনাট্য), পথের সঞ্চয় (পত্রাবলী)

বহির্বিশ্বে: ১৯শে অগাস্ট সুভাষচন্দ্রের পরিকল্পিত মহাজাতি সদনের ভিত্তি স্থাপন করলেন রবীন্দ্রনাথ। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি। ১লা সেপ্টেম্বর যুদ্ধ ঘোষণা না করেই জার্মানির পোল্যাণ্ড আক্রমণ -- অর্থাৎ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরু।  ডিডিটি, পলিথিলিন আবিষ্কার। কবি ইয়েট্‌স ও মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ইন্‌সাইড এশিয়া (গুন্‌থার), হাউ গ্রীন ওয়াজ মাই ভ্যালি (লিউলিন), কালেক্টেড পোয়েম্‌স (হাউসম্যান), ওয়েডিং ফিস্ট (কাম্যু), রোবেস্‌পিয়র (রল্যাঁ), দি ম্যাপ অফ লাভ (ডিলান টমাস), দি ওয়াল (সার্ত্র্‌), ফ্রীডম অ্যাণ্ড কালচার (ডিউই)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



তৃতীয়ত, রবীন্দ্রনাথের গানের আত্মিক বৈশিষ্ট্য হলো এই যে প্রত্যেকটি সুরের কাঠামো এবং প্রত্যেকটি কবিতার কাঠামো একসঙ্গে মিশে একটি ভাব সৃষ্টি করে। আমরা উদাহরণস্বরূপ মল্লার রাগটির কথা উল্লেখ করতে পারি। উচ্চাঙ্গসংগীতে আমরা ছয় থেকে আট রকমের মল্লার পাই। মেঘমল্লার থেকে সুরদাসী মল্লার পর্যন্ত। মাঝে রয়েছে গৌড়মল্লার, সুরঠমল্লার এবং দেশমল্লার। এর প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র মেজাজ; এবং এই মেজাজ হলো বর্ষার। রবীন্দ্রনাথ অন্তত এই রাগের পঞ্চাশ রকম প্রয়োগ করেছেন। প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র ভাব সৃষ্টি করেছে। এখানে কয়েকটির উল্লেখ করবো। বিষণ্ণতা, বৈচিত্র্যহীনতা, স্বাগত, দুঃখ, আকস্মিক আনন্দ, শান্তি, এমনকি আনন্দের ভাবও রয়েছে এই গানগুলিতে। প্রত্যেকটির রূপ স্বতন্ত্র, প্রত্যেকটির পাঁচ-ছয় রকমের বৈচিত্র্য। এক কথায় বলতে গেলে এই প্রত্যেকটি মল্লার সংগীতের নিজস্ব কাব্যগুণ রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের গানের ভাব মূলত ছিল কাব্যিক একথা আমার মতে ঠিক নয়। কথা ও সুরের সুসামঞ্জস্য আরোপেই এই ভাবে সৃষ্টি হয়েছিল।  
     --ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথের গান, সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত রবীন্দ্রসংগীতের চিন্তা, প্রতিভাস, ১৯৯৩