গীতবিতান-GITABITAN
একি অন্ধকার এ ভারতভূমি !

Certificate

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৯১ ( ১৮৮৫)
কবির বয়স: ২৩
প্রকাশ: ১৮৮৫,বৈশাখ, ১২৯২ , রবিচ্ছায়া (জাতীয়)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): জাতীয় সঙ্গীত-জাতীয় সঙ্গীত; ৪/৮১৭
রাগ / তাল: প্রভাতী (গুজরাটি) / দাদরা
স্বরলিপি: সঙ্গীত প্রকাশিকা (১৩১১); শতগান; পাণ্ডুলিপি; স্বরবিতান ৪৭
স্বরলিপিকার: অনুল্লিখিত; সরলা দেবী; ইন্দিরা দেবী; ঐ
পাদটিকা:
অন্য-ভাঙা গান, গুজরাটি ভজন, সূত্র অজ্ঞাত। মাঘোৎসবে গীত। একতাল।  
[ র-ভা ]  

আলোচনা

[মাঘোৎসবের গানের প্রসঙ্গে] বৈষ্ণব ভক্তদের কীর্তন ভাবেতে মজে দশাপ্রাপ্ত হয়ে ধূলায় অবলুণ্ঠন প্রধান, আর ১১ই মাঘের সঙ্গীত ভাবেতে উড্ডীন হয়ে মর্ত হতে স্বর্গে আরোহণ প্রধান। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর ভ্রাতাদেরসহ ১১ই মাঘের সঙ্গীতের আসরে নামলেন তখন ব্রহ্মের উপাসনায় হৃদয়ের কোণে কোণে যেখানে যত নদী খাল বিল শুকনো ছিল সব ভরে উঠল। আর "মনে কর শেষের সেদিন কি ভয়ঙ্কর" নয়, শুধু "তুমি অগম্য অপার" ইত্যাদি বর্ণনামূলক নির্গুণ ব্রহ্মের স্তুতি নয়। এখন হল সমস্ত বাহ্য বা অন্তর-প্রকৃতিতে প্রতিভাত সগুণ ঈশ্বরের আবাহন। বৈষ্ণবদের লক্ষ্মী বিষ্ণু বা শাক্তদের শিব কালীর স্থলে খ্রিস্টানদের Personal God-এর অবতারণা--

     বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে
    আজ আনন্দে প্রেমচন্দ্রে নেহারো [?]
হল--
     তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না
হল--
     অনেক দিয়েছ নাথ

Personal God-এর অনুভূতি নিরাকারত্বে হয় না। যিনি চক্ষুষঃ চক্ষুঃ শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং তাঁকে চক্ষুকর্ণবান চরণহস্তবান বলে কল্পনায় না আনলে অন্তরে তাঁকে অঙ্গবান করে না দেখলে তাঁকে পাওয়াই হয় না। তাই রামমোহন যুগের পরবর্তী ব্রহ্মোৎসবের রবীন্দ্রের ব্রহ্ম বা ঈশ্বর 'অপাণিপাদ' নন, তিনি 'সর্বতো অক্ষি' 'সর্বত্র শিরোমুখ'। তাই তাঁর পরিচালিত ১১ই মাঘে পরপর গাওয়া হয়েছে--
     বড় আশা করে এসেছি গো ;   আজি শুভদিনে পিতার ভবনে ;   সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে ;   হেরি তব বিমল মুখভাতি ;   এস হে গৃহদেবতা ; তব প্রেম-আঁখি সতত জাগে [তোমারি ইচ্ছা হউক পূর্ণ]     
হল--
     এ কি অন্ধকার ভারতভূমি

...ভাবের ও ভাষার পার্থক্য দেখলে চিনতে পারা যাবে রামমোহন রায়ের সময়কার নিরাকার ব্রহ্ম কেমন করে ভাবের ঘরে একদম সাকার হয়ে নেমে ব্রহ্মবাদীদের আকার-নিরাকার অভেদ জ্ঞানের ভিত্তিই পুনঃস্থাপিত করলেন। অথচ ভাবের ছবির চৌকাঠ পেরিয়ে গেলেই-- মাটি-খড়ে, ধাতু-প্রস্তরে, বর্ণে-চিত্রে ভাবের উপলক্ষ্য ভগবানকে পূর্ণ লক্ষ্য করে মূর্ত করে আঁকড়ে ধরলেই রবীন্দ্রনাথ উত্যক্ত বিচলিত হয়ে উঠতেন। তাঁর আজন্ম 'নিরাকার' পূজার সংস্কারে ঘা লাগত।  (৬৭)  
     --সরলা দেবী চৌধুরানী, জীবনের ঝরাপাতা, রূপা, কলকাতা, ১৯৮২  



 

 

           একি অন্ধকার এ ভারতভূমি !  
                       বুঝি, পিতা, তারে ছেড়ে গেছ তুমি ।
       প্রতি পলে পলে ডুবে রসাতলে কে তারে ঊদ্ধার করিবে ॥  
     চারি দিকে চাই, নাহি হেরি গতি ।   নাহি যে আশ্রয়, অসহায় অতি ।
       আজি এ আঁধারে বিপদপাথারে  কাহার চরণ ধরিবে ।
     তুমি চাও পিতা, ঘুচাও এ দুখ ।  অভাগা দেশেরে হোয়ো না বিমুখ
       নহিলে আঁধারে বিপদপাথারে কাহার চরণ ধরিবে ।
     দেখো চেয়ে তব সহস্র সন্তান  লাজে নতশির, ভয়ে কম্পমান,
       কাঁদিছে সহিছে শত অপমান লাজ মান আর থাকে না ।
     হীনতা লয়েছে মাথায় তুলিয়া,  তোমারেও তাই গিয়াছে ভুলিয়া,
      দয়াময়  ব'লে আকুলহৃদয়ে  তোমারেও তারা ডাকে না ।
     তুমি চাও পিতা, তুমি চাও চাও ।  এ হীনতা-পাপ এ দু:খ ঘুচাও ।
       ললাটের কলঙ্ক মুছাও মুছাও নহিলে এ দেশ থাকে না ।
     তুমি যবে ছিলে এ পুণ্যভবনে  কী সৌরভসুধা বহিত পবনে,
       কী আনন্দগান উঠিত গগনে,  কী প্রতিভাজ্যোতি ঝলিত ।
       ভারত-অরণ্যে ঋষিদের গান  অনন্তসদনে করিত প্রয়াণ
       তোমারে চাহিয়া পুণ্যপথ দিয়া  সকলে মিলিয়া চলিত ।
     আজি কী হয়েছে !  চাও পিতা, চাও। এ তাপ এ পাপ এ দুখ ঘুচাও।
            মোরা তো রয়েছি তোমারি সন্তান
                    যদিও হয়েছি পতিত॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৮৫ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: জ্ঞানদানন্দিনী সম্পাদিত 'বালক' পত্রিকার দায়িত্ব নিলেন। বহু রচনা, বিশেষ করে গান, প্রকাশিত হয় এই পত্রিকায়। ভ্রমণ করলেন হাজারিবাগ, শোলাপুর আর বোম্বাই। বৈষ্ণব কবিতার সংকলন 'পদরত্নাবলী' প্রকাশ করলেন, শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে যুগ্ম সম্পাদনায়। যোগেন্দ্রনারায়ণ মিত্র প্রথম গানের বই 'রবিচ্ছায়া' সংকলন করলেন। প্রকাশিত বই: রামমোহন রায়, আলোচনা, রবিচ্ছায়া।

বহির্বিশ্বে: তৃতীয় ইঙ্গ-ব্রহ্ম যুদ্ধ শুরু। ২৮শে ডিসেম্বর বোম্বাই শহরে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন হোলো, সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম চললো লিভারপুলে । জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসা উদ্ভাবন করলেন লুই পাস্তুর। মৃত্যু হোলো ভিক্টর হুগোর। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: বিষাদসিন্ধু (মীর মশার্‌রফ হোসেন মরহুম), অ্যারেবিয়ান নাইট্‌স্‌ (বার্টন), দাস ক্যাপিটাল (মার্ক্‌স্‌), মিকাডো (গিলবার্ট ও সুলিভান, অপেরা)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



গীতবিতানের বিষয়সূচী:
ভূমিকা, পূজা, প্রেম, স্বদেশ, বিচিত্র, প্রকৃতি, আনুষ্ঠানিক, গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য, ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী, নাট্যগীতি, জাতীয় সঙ্গীত, পূজা ও প্রার্থনা, আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত, প্রেম ও প্রকৃতি, পরিশিষ্ট  


রবীন্দ্র-সম্পাদিত দ্বিতীয় সংস্করণ গীতবিতানের বিষয়বিন্যাস (বন্ধনীর মধ্যে গীতসংখ্যা):  
ভূমিকা (১)
পূজা পর্যায়: গান (৩২), বন্ধু (৫৯), প্রার্থনা (৩৬), বিরহ (৪৭), সাধনা ও সংকল্প (১৭), দুঃখ (৪৯), আশ্বাস (১২), অন্তর্মুখে (৬), আত্মবিধান (৫), জাগরণ (২৬), নিঃসংশয় (১০), সাধক (২), উৎসব (৭), আনন্দ (২৫), বিশ্ব (৩৯), বিবিধ (১৪৩, একটি গান দ্বিজেন্দ্রনাথ-রচিত বিবেচনায় বাদ দেওয়া হয়), সুন্দর (৩০), বাউল (১৩), পথ (২৫), শেষ (৩৪), পরিণয় (৯, তৃতীয়োত্তর সংস্করণ গীতবিতানে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ের প্রথমাংশে গ্রথিত)
স্বদেশ (৮৬)
প্রেম: গান (২৭), প্রেমবৈচিত্র্য (৩৬৮)
প্রকৃতি: সাধারণ (৯), গ্রীষ্ম (১৬), বর্ষা (১১৫), শরৎ (৩০), হেমন্ত (৫), শীত (১২), বসন্ত (৯৬)
বিচিত্র (১৩৮)
আনুষ্ঠানিক (৯)
পরিশিষ্ট (২, মুদ্রণকার্যের তাগিদায় ২য় সংস্করণে এই বিভাগটিকে বাধ্য হয়ে যোগ করতে হয়, পরের সংস্করণে গানগুলি যথোচিত স্থানে বিন্যস্ত করা হয়)

রবীন্দ্রনাথের নির্দেশমতোই এই বিষয়বিন্যাস মূল গীতবিতানে না দিয়ে তাঁর লেখা একটি বিজ্ঞাপন হিসাবে গ্রথিত হয়। তৃতীয়োত্তর সংস্করণে এই তালিকা গ্রন্থপরিচয়ে পাওয়া যায়।