গীতবিতান-GITABITAN
যা হারিয়ে যায় তা আগলে ব'সে রইব কত আর

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১ আশ্বিন ১৩১৬ (১৯০৯)
কবির বয়স: ৪৮
রচনাস্থান: কলকাতা
প্রকাশ: ১৯১০,শ্রাবণ ১৩১৭ , গীতাঞ্জলি ৪০ র-র ১১ |
Rabeendra Beeksa - Misc. Sources
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-দুঃখ; ২৩৯/১০৪
রাগ / তাল: মিশ্র ঝিঁঝিট / একতাল
স্বরলিপি: সঙ্গীত প্রবেশিকা; গীতলিপি ১; সঙ্গীত গীতাঞ্জলি; স্বরবিতান ৩৮
স্বরলিপিকার: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়; ঐ; ভীমরাও শাস্ত্রী; সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
পাদটিকা:
মাঘোৎসবে গীত।  
প্রথম প্রকাশ ব্রহ্মসঙ্গীত মতে ঝিঁঝিট/কাওয়ালি, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় মিশ্র সিন্ধু/একতাল।  

আলোচনা

ভারতবর্ষের যেমন বাধাহীন পরিষ্কার আকাশ, বহুদূরবিস্তৃত সমতলভূমি আছে, এমন য়ুরোপের কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। এইজন্যে আমাদের জাতি যেন বৃহৎ পৃথিবীর সেই অসীম ঔদাস্য আবিষ্কার করতে পেরেছে। এইজন্যে আমাদের পূরবীতে কিংবা টোড়িতে সমস্ত বিশাল জগতের অন্তরের হাহাধ্বনি যেন ব্যক্ত করছে, কারও ঘরের কথা নয়। পৃথিবীর একটা অংশ আছে যেটা কর্মপটু, স্নেহশীল, সীমাবদ্ধ, তার ভাবটা আমাদের মনে তেমন প্রভাব বিস্তার করবার অবসর পায় নি। পৃথিবীর যে ভাবটা নির্জন, বিরল, অসীম, সেই আমাদের উদাসীন করে দিয়েছে। তাই সেতারে যখন ভৈরবীর মিড় টানে, আমাদের ভারতবর্ষীয় হৃদয়ে একটা টান পড়ে।
  --পতিসর কাছারি, রবিবার ৬ মাঘ ১২৯৭; ১৮.১.১৮৯১ #১০  

একটা লম্বা নৌকোয় অনেকগুলো ছোকরা ঝপ্‌ ঝপ্‌ করে দাঁড় ফেলছিল এবং সেই তালে গান গাচ্ছিল--

   যোবতী ক্যান্‌ বা কর মন ভারী?
     পাবনা থাক্যে আন্যে দেব
       ট্যাকা দামের মোটরি। '

স্থানীয় কবিটি যে ভাব অবলম্বন করে সংগীত রচনা করেছেন-- আমরাও ও ভাবের ঢের লিখেছি, কিন্তু কিছু ইতর-বিশেষ আছে। আমাদের যুবতী মন ভারী করলে তৎক্ষণাৎ জীবনটা দিতে কিম্বা নন্দনকানন থেকে পারিজাত এনে দিতে প্রস্তুত হই, কিন্তু এ অঞ্চলের লোক খুব সুখে আছে বলতে হবে-- অল্প ত্যাগস্বীকারেই যুবতীর মন পায়। মোটরি জিনিষটা কী তা বলা আমার সাধ্য নয়, কিন্তু তার দামটাও নাকি পার্শ্বেই উল্লেখ করা আছে-- তাতেই বোঝা যাচ্ছে খুব বেশি দুর্‌মূল্য নয় এবং নিতান্ত অগম্য স্থান থেকেও আনতে হয় না। গানটা শুনে বেশ মজার লাগল। যুবতীর মন ভারী হলে জগতে যে আন্দোলন উপস্থিত হয়, এই বিলের প্রান্তেও তার একটা সংবাদ পাওয়া গেল। এ গানটি কেবল অস্থানেই হাস্যজনক, কিন্তু দেশকালপাত্র-বিশেষে এর যথেষ্ট সৌন্দর্য আছে। আমার অজ্ঞাতনামা গ্রাম্য কবিভ্রাতার রচনাগুলিও এই গ্রামের লোকের সুখদুঃখের পক্ষে নিতান্ত আবশ্যক, আমার গানগুলি সেখানে কম হাস্যজনক নয়।
  --পতিসর, ১১ অগস্ট্‌, ১৮৯৩; ২৭.৪.১৩০০ #১০৮  

আসলে হয়েছে কী, এতক্ষণ কোনো কাজ না থাকাতে নদীর দিকে চেযে গুন্‌ গুন্‌ স্বরে ভৈরবী টোড়ি রামকেলি মিশিয়ে একটা প্রভাতী রাগিণী সৃজন-পূর্বক আপন মনে আলাপ করছিলুম, [কত কথা তারে ছিল বলিতে?] তাতে অকস্মাৎ মনের ভিতরে এমন একটা সুতীব্র অথচ সুমধুর চাঞ্চল্য জেগে উঠল, এমন একটা অনির্বচনীয় ভাবের এবং বাসনার আবেগ উপস্থিত হল, এক মুহূর্তের মধ্যেই আমার এই বাস্তবিক জীবন এবং বাস্তবিক জগৎ আগাগোড়া এমন একটা মূর্তিপরিবর্তন করে দেখা দিলে, অস্তিত্বের সমস্ত দুরূহ সমস্যার এমন একটা সংগীতময় ভাবময় অথচ ভাষাহীন অর্থহীন অনির্দেশ্য উত্তর কানে এসে বাজতে লাগল, এবং সেই সুরের ছিদ্র দিয়ে নদীর উপর জলের তরল পতনশব্দ অবিশ্রাম ধ্বনিত হয়ে এমন একটা পুলক সঞ্চার করতে লাগল--জগতের প্রান্তবর্তী এই সঙ্গীহীন একটিমাত্র প্রাণীকে ঘিরে আষাঢ়ের অশ্রুসজল ঘনঘোর শ্যামল মেঘের মতো 'সুখমিতি বা দুঃখমিতি বা' এমনি স্তরে স্তরে ঘনিয়ে এল, যে একসময়ে বলে উঠতে হল যে, 'থাক আর কাজ নেই। '
  --শিলাইদহ, ২৬ জুন, ১৮৯৪; ১৩.৩.১৩০১ #১২২  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  



গানের কাগজে রাগরাগিণীর নাম-নির্দেশ না থাকাই ভালো। নামের মধ্যে তর্কের হেতু থাকে, রূপের মধ্যে না। কোন্‌ রাগিণী গাওয়া হচ্ছে বলবার কোনো দরকার নেই। কী গাওয়া হচ্ছে সেইটেই মুখ্য কথা, কেননা তার সত্যতা তার মধ্যেই চরম। নামের সত্যতা দশের মুখে, সেই দশের মধ্যে মতের মিল না থাকতে পারে। কলিযুগে শুনেছি নামেই মুক্তি, কিন্তু গান চিরকালই সত্যযুগে।  
     --রবীন্দ্রনাথ, ইন্দিরাদেবীকে লিখিত চিঠি ১৩ জানুয়ারি ১৯৩৫।  


 

 

২৩৯

  যা      হারিয়ে যায় তা আগলে ব'সে রইব কত আর?
আর    পারি নে রাত জাগতে, হে নাথ, ভাবতে অনিবার॥
           আছি রাত্রি দিবস ধ'রে   দুয়ার আমার বন্ধ ক'রে,
           আসতে যে চায় সন্দেহে তায় তাড়াই বারে বার॥
     তাই তো কারো হয় না আসা আমার একা ঘরে।
     আনন্দময় ভুবন তোমার বাইরে খেলা করে।
তুমিও বুঝি পথ নাহি পাও,   এসে এসে ফিরিয়া যাও--
রাখতে যা চাই রয় না তাও, ধুলায় একাকার॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

T HE things that get lost I watch them with sleepless eyes, with my doors shut.
  Those who come to my gate I turn them away in suspicion.
  Thus I sit alone day and night and you find no way into my house.
  And all that I keep with care crumbles into dust.
  

[Rabindranath's own translations of a number of his poems and songs during his 1912-13 stay in America were collected and later turned over to the Rabindra-Bhavan by his American friends. Like many others, these are his transcreations that do not always follow the original.]  
     --Rabindranath Tagore, "Ingareji Rupantar", Rabindra Beeksaa, vol. 17, Rabindra-Bhavan, Aug 1987  



১৯০৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  মে মাসে কালকাভ্রমণে গিয়ে 'প্রায়শ্চিত্ত' রচনা। এছাড়া গীতাঞ্জলির কিছু গান, 'তপোবন' প্রবন্ধ (ওভারটুন হলে পাঠ)। শান্তিনিকেতনের বার্ষিক উৎসবে প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাষণ। রথীন্দ্রনাথ আমেরিকা থেকে ফিরলেন। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় সচিত্র 'চয়নিকা' প্রকাশ, চিত্রশিল্পী তরুণ নন্দলাল বসু। অধ্যাপক রবি দত্ত প্রণীত ইস্ট-ওয়েস্ট কাব্য সঙ্কলনে প্রথম কবির কবিতাগুচ্ছের ইংরেজি অনুবাদ গ্রথিত হোলো। প্রকাশ: শব্দতত্ত্ব, ধর্ম, শান্তিনিকেতন ১-৮ (গদ্যগ্রন্থাবলীর বিভিন্ন খণ্ড হিসাবে), প্রায়শ্চিত্ত, চয়নিকা, ছুটির পড়া, গান, বিদ্যাসাগর চরিত, ইংরেজি পাঠ, শিশু।

বহির্বিশ্বে: আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় দুজনের ফাঁসি ও সাতজনের দ্বীপান্তরের রায় দেওয়া হোলো। ১৫ নভেম্বর কাউন্সিল অফ ইণ্ডিয়া বিধিবদ্ধ। মর্লে-মিণ্টো শাসনসংস্কার প্রস্তাব গৃহীত হোলো -- দেশের শাসন ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিত্বের প্রবেশ হোলো। লর্ড সত্যপ্রসন্ন সিংহ ভারতের শাসন পরিষদে প্রথম ভারতীয় নির্বাচিত হলেন। রবার্ট পিয়েরি দ্বারা উত্তর মেরু আবিষ্কার। জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার ছাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত হোলো। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: দি ব্লু বার্ড (মেটারলিঙ্ক), দি ইন্‌টারপ্রিটেশন অফ ড্রিম্‌স (ফ্রয়েড)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


রবীন্দ্রসঙ্গীতের যা শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, সেখানে রবীন্দ্রনাথের রচনা তাঁর সেরা ছবির মতোই সতেজ, সাবলীল ও অননুকরণীয়। এখানে রাগরাগিণীর প্রশ্ন আসে না, বাউল-কীর্তনের প্রশ্ন আসে না, বাদী-সম্বাদীর প্রশ্ন আসে না। এখানে সবটাই আছে, আবার সবই যেন নতুন। এমনকি এখানে কথা ও সুরের সামঞ্জস্যের বিচারটাও অবান্তর বলে মনে হয়, কারণ সব শ্রেষ্ঠ শিল্পরচনার মতোই এ গানও বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে। এসব গানের আদর্শগীতরূপ আজ স্বপ্নের বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।