গীতবিতান-GITABITAN
মোহিনী মায়া এল

Group

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৫ মাঘ, ১৩৪২ (২৯ জানুয়ারি, ১৯৩৬)
কবির বয়স: ৭৪
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
প্রকাশ: মার্চ, ১৯৩৬,ফাল্গুন, ১৩৪২ , নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা অভিনয়পুস্তিকা র-র ২৫
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য-চিত্রাঙ্গদা; ১/৬৮৪
রাগ / তাল: মিশ্র হাম্বীর-রামকেলি / কাহারবা
স্বরলিপি: চিত্রাঙ্গদা স্বরলিপি সংস্করণ; স্বরবিতান ১৭ (চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্য)
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার; ঐ

আলোচনা

  

চুম্বক প্রকাশ
   ১ম দৃশ্য। "অর্জুন দ্বাদশবর্ষব্যাপী ব্রহ্মচর্যব্রত গ্রহণ করে ভ্রমণ করতে করতে এসেছেন মণিপুরে। তখন এই নাটকের আখ্যান আরম্ভ"
     গান (অর্জুন) মোহিনী মায়া এল(ক্রমিক ১)  


  


   ১৮৯২ সালে কবি চিত্রাঙ্গদা শীর্ষনামে এক দীর্ঘ কাব্যনাট্য রচনা করেন। বহুদিন পর, ১৯৩৬ সালের গোড়ায় কবির পুত্রবধূ সেই নাটক অবলম্বন করে এক নৃত্য ও মূকাভিনয়ের অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা নেন। রবীন্দ্রনাথ স্বীকার হন যে নৃত্যনাট্যের উপযোগী গান তিনি রচনা করে দেবেন। এইভাবে কাজ আরম্ভ করে শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ নৃত্যনাট্যটির পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বহু সংযোগ-বিয়োগের পর প্রথম যে রূপটি দাঁড়ায় সেটি ছিল পুরোপুরি নাচ ও গান বা সুরে গাঁথা সংলাপভিত্তিক। সাধারণ্যে প্রথম অভিনয়ের আগে রবীন্দ্রনাথ সুরহীন কিছু পদ্যাংশ যোগ করেন। ১৩৪২ সালের ৮ই ফাল্গুন চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের কথা অংশের প্রকাশ এক অভিনয়পুস্তিকা হিসেবে। তার অব্যবহিত পরে ১৩৪৩ সালে একটি স্বরলিপিযুক্ত সংস্করণ প্রকাশিত হয়, সেটিই প্রামাণ্য। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় চিত্রাঙ্গদা বহুবার পরিবেশিত হয়েছে এবং কবি অল্পস্বল্প পরিবর্তনও করেছেন। এই নাটকটি সম্পর্কিত অনেক তথ্য দুদিকের আলোচনাস্তম্ভে বিন্যস্ত হয়েছে।  


১৩৪২ সালের ফাল্গুনে নৃত্যনাট্যটি প্রথম বারের অভিনয় আরম্ভ হইবার পূর্বে নাট্যের মর্মকথাটি অভিনয় মঞ্চ হইতে রবীন্দ্রনাথ নিম্নলিখিত ভাষায় ব্যক্ত করেন।
"প্রভাতের প্রথম আভাস অরুণবর্ণ আভার আবরণে,
  অর্ধসুপ্ত চক্ষুর 'পরে লাগে তারি আঘাত।
অবশেষে সেই আবরণ ভেদ ক'রে সে আপন নিরঞ্জন শুভ্রতায়
    সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে জাগ্রত জগতে।
তেমনি সত্যের প্রথম আবির্ভাব সাজ-সজ্জার বহিরঙ্গে, বর্ণবৈচিত্র্যে,
  তাই দিয়ে অসংস্কৃত চিত্তকে সে করে মুগ্ধ।
অবশেষে নিজের সেই আচ্ছাদন যখন সে মোচন ক'রে
  তখন প্রবুদ্ধ মনের কাছে নির্মল মহিমায় তার বিকাশ।
    এই কথাটাই চিত্রাঙ্গদা নাট্যের মর্মকথা।
  এই নাট্যকাহিনীর মধ্যে আছে, প্রথমে প্রেমের বন্ধন মোহাবেশে,
    পরে তার মুক্তি সেই কুহক হতে
      নিরলংকার সত্যের সহজ মহিমায়।  
     --গ্রন্থপরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী, ২৫শ খণ্ড  


সুরের বোঝাই-ভরা তিনটে নাটিকার মাঝিগিরি শেষ করা গেল। নটনটীরা যন্ত্রতন্ত্র নিয়ে চলে গেল কলকাতায়। দীর্ঘকাল আমার মন ছিল গুঞ্জনমুখরিত। আনন্দে ছিলুম। সে আনন্দ বিশুদ্ধ, কেননা সে নির্বস্তুক (abstract)। বাক্যের সৃষ্টির উপরে আমার সংশয় জন্মে গেছে। এতরকম চলতি খেয়ালের উপর তার দর যাচাই হয়, খুঁজে পাই নে তার মূল্যের আদর্শ।...গানেতে মনের মধ্যে এনে দেয় একটা দূরত্বের পরিপ্রেক্ষণী। বিষয়টা যত কাছেরই হোক সুরে হয় তার রথযাত্রা, তাকে দেখতে পাই ছন্দের লোকান্তরে, সীমান্তরে, প্রাত্যহিকের করস্পর্শে তার ক্ষয় ঘটে না, দাগ ধরে না।  
     --গ্রন্থপরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী, ২৫শ খণ্ড (অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা চিঠি ১৪।২।৩৯; চিঠিপত্র ১১, বিশ্বভারতী)  


[১৮৯২ সালে রচিত 'চিত্রাঙ্গদা' কাব্যনাট্যকে উদ্দেশ করে] নারীজাতিকে দেখিয়া কবির মাতৃত্বের কথা মনে পড়ে না। নারীজাতিকে দেখিয়া কেবল তাঁহার "মরমে গুমরি মরিছে কামনা কত"।

... রবীন্দ্রবাবুর চিত্রাঙ্গদা কাব্যটি লউন। এটি রবীন্দ্রবাবুর ভক্তদের বড় প্রিয় কি না! তাই চিত্রাঙ্গদাই লইলাম। ... রবীন্দ্রবাবু অর্জুনকে কিরূপ জঘন্য পশু করিয়া চিত্রিত করিয়াছেন দেখুন। কোনও ভদ্রসন্তান এইরূপ করিলে তাহাকে আমরা এক আসনে বসিতে দিতে চাহিতাম না। অর্জুন একজন কুমারীর ধর্ম নষ্ট করিলেন! বর্ষকাল ধরিয়া একটি ভদ্রমহিলাকে সম্ভোগ করিলেন।... আর চিত্রাঙ্গদা! বেচারা মা আমার! বঙ্গের কবিবরের হাতে পড়িয়া তোমার যে এহেন দুর্গতি হইবে, তাহা বোধহয় স্বপ্নেও ভাবি নাই।... বর্ষকালের ভিতর, কি তাহার পরেও ব্যভিচারিণীর একদিনের জন্যও অনুতাপ হইল না।

...রবীন্দ্রবাবুর চিত্রাঙ্গদার সম্ভোগ অভিসারিকার সম্ভোগ। পৃথিবীর কোনও সভ্য সমাজে এ চিত্রাঙ্গদা মুখ দেখাইতে পারিত না। 'অশ্লীলতা' ঘৃণার্হ বটে কিন্তু 'অধর্ম' ভয়ানক। সুরুচি বাঞ্ছনীয় কিন্তু সুনীতি অপরিহার্য। আর রবীন্দ্রবাবু এই পাপকে যেমন উজ্জ্বলবর্ণে চিত্রিত করিয়াছেন, তেমন বঙ্গদেশে আর কোন কবি অদ্যাবধি পারেন নাই। সেই জন্য এ কুনীতি আরও ভয়ানক। এ পুস্তকখানি দগ্ধ করা উচিত। (১৪২)  
     --দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, কাব্যে নীতি, সাহিত্য মাসিক পত্রিকা, জ্যৈষ্ঠ ১৩১৬  


গুরুদেবের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত শান্তিনিকেতনে, কলিকাতা বা সে যুগের বাংলাদেশের বাইরে নৃত্যগীতের অনুষ্ঠানে কখনো মাইকের ব্যবহার হয় নি। বিনা মাইকেই গান-বাজনা হতো। একক কণ্ঠের গান প্রেক্ষাগৃহের শেষ পর্যন্ত পৌঁছতো না বলে চিত্রাঙ্গদার সব গানই পুরুষ ও মেয়েদের সমবেত কণ্ঠে গাইতে হতো। গানগুলি গাওয়া হতো সাধারণত শুদ্ধ নি সুরকে খরজ সুর করে। ঐ স্কেলে গাওয়া হতো বলে গানের অত্যধিক উঁচু সুরের অংশ মেয়েরা গাইত না। নিচু সুরের অংশে মেয়েরা সহজে গাইতে পারার জন্য ছেলেরা তা অনেক সময় গাইত না। (১৯৫)  
     --শান্তিদেব ঘোষ, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক ভারতীয় নৃত্য, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯০

  


 

 

   মোহিনী মায়া এল,
      এল  যৌবনকুঞ্জবনে।
           এল হৃদয়শিকারে,
               এল  গোপন পদসঞ্চারে,
           এল  স্বর্ণকিরণবিজড়িত অন্ধকারে।
    পাতিল ইন্দ্রজালের ফাঁসি,
হাওয়ায় হাওয়ায় ছায়ায় ছায়ায়
            বাজায় বাঁশি।
      করে  বীরের বীর্যপরীক্ষা,
      হানে  সাধুর সাধনদীক্ষা,
   সর্বনাশের বেড়াজাল
         বেষ্টিল চারি ধারে।
         এসো   সুন্দর নিরলঙ্কার,
         এসো   সত্য নিরহঙ্কার--
             স্বপ্নের দুর্গ হানো,
                 আনো, আনো মুক্তি আনো--
         ছলনার বন্ধন ছেদি
             এসো পৌরুষ-ঊদ্ধারে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯৩৬ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  অভিনয়ের দল নিয়ে উত্তর ভারতে সফর। কবির কষ্ট দেখে গান্ধীজী স্বয়ং বিড়লাদের কাছ থেকে টাকা এনে বিশ্বভারতীর তৎকালীন দেনাশোধের ব্যবস্থা করে দিলেন। দিল্লী রেডিও থেকে কবির আবৃত্তি প্রচার করা হোলো। দৌহিত্রী নন্দিতার (মীরা দেবীর একমাত্র কন্যা) বিবাহ, কৃষ্ণ কৃপালনীর সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে 'ডি লিট' উপাধি দিলো। প্রকাশ: নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা, পত্রপুট (গদ্যকাব্য), ছন্দ (প্রবন্ধ), জাপানে-পারস্যে (জাপানযাত্রী ও পারস্যভ্রমণ), শ্যামলী (গদ্যকাব্য), সাহিত্যের পথে (প্রবন্ধ), প্রাক্তনী (ভাষণসংগ্রহ), অরূপরতন (গীতিনাট্য), শিক্ষার ধারা (প্রবন্ধ), শিক্ষার সাঙ্গীকরণ (প্রবন্ধ), পাশ্চাত্য ভ্রমণ, Collected Poems and Plays.

বহির্বিশ্বে: পঞ্চম জর্জের মৃত্যুর পর অষ্টম এডওয়ার্ড ইংল্যাণ্ডের সম্রাট, তারপর এক আমেরিকান মহিলাকে বিবাহ করার জন্য সিংহাসনত্যাগ, ষষ্ঠ জর্জ সম্রাট। স্পেনে গৃহযুদ্ধের শুরু জুলাইতে, সেপ্টেম্বরে ফ্র্যাঙ্কো একনায়ক। জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করলো চীন। ট্রট্‌স্কি রাশিয়া থেকে নির্বাসিত হয়ে মেক্সিকোতে আশ্রয় নিলেন। রুডইয়ার্ড কিপ্‌লিঙের মৃত্যু। 'লাইফ ম্যাগাজিন' ও 'পেঙ্গুইন সিরিজ'-এর প্রকাশ। ফোর্ড ফাউণ্ডেশনের স্থাপন। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: গন উইথ দি উইণ্ড (মিচেল), টোয়েণ্টিফাইভ পোয়েম্‌স (ডিলান টমাস), দি হাউস অফ বার্নার্ডা আল্‌ভা (লোর্কা), অক্স্‌ফোর্ড বুক অফ মডার্ণ ভার্স (ইয়েট্‌স সম্পাদিত), দি থিওরি অ্যাণ্ড প্র্যাকটিস অফ সোস্যালিজ্‌ম (স্ট্র্যাচি)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



গ্রন্থারম্ভে বিজ্ঞপ্তিতে কবি বলিয়াছেন "এই গ্রন্থের অধিকাংশই গানে রচিত"। সেইসঙ্গে ইহাও উল্লেখযোগ্য যে, আলোচ্য নাটকে কেবলমাত্র নিম্ননির্দেশিত অংশগুলিই "কাব্য-আবৃত্তির আদর্শে" রচিত: [এর পর বারোটি কাব্যাংশের, যথা "সখী, কী দেখা দেখিলে তুমি", তালিকা আছে]।... প্রতিমাদেবী [রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ] লিখিত ও রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক অনুমোদিত "চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্য" [প্রবাসী, চৈত্র ১৩৪৩] প্রবন্ধের উদ্ধৃত অংশ এই প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য:
    "চিত্রাঙ্গদার আর একটা বিশেষ জিনিস হল ছোটো ছোটো কবিতাগুলি, তারা মাঝে মাঝে সূত্র ধরিয়ে দিয়েছে মূল ঘটনার, গান ও নাচ বন্ধ করে দর্শকের চিত্তকে বিশ্রাম দেওয়ার সঙ্গে নাটকের ঘটনাসূত্রের যোগ রাখাই হল তাদের কাজ, এই কবিতাগুলির ছন্দ দেহের নৃত্যলীলাকে বাঁচিয়ে রাখে। পরবর্তী নৃত্য যে আবার সেই ভঙ্গীর মধ্যে সাড়া দিয়ে উঠবে এ যেন তারই ভূমিকা। "  
     --গ্রন্থপরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী, ২৫শ খণ্ড  


১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত চার বছরে চিত্রাঙ্গদার অভিনয় হয়েছিল মোট প্রায় চল্লিশ বার। প্রথমবারে কলিকাতা থেকে পশ্চিম ভারতে বিভিন্ন শহরের অভিনয় কালে গুরুদেব স্বয়ং ছিলেন এই অভিনয় দলের দলপতি। তিনি অভিনয়কালে মঞ্চের সমুখ ভাগের বাঁ পাশে সাজানো একটি কাঠের চৌকিতে সামনে পা ঝুলিয়ে বসতেন। সেখান থেকে চিত্রাঙ্গদা অর্জুন এবং সখীদের কবিতাগুলি ও সংস্কৃত মন্ত্রটি তিনি আবৃত্তি করতেন। সেই আবৃত্তির ছন্দের সঙ্গে মিলিয়ে নৃত্যভঙ্গীতে অভিনয় হতো। (২০১)  

পশ্চিম ভারতে বিভিন্ন শহরে, অভিনয়ের ব্যবস্থার পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছিলেন সে যুগের প্রসিদ্ধ ইম্প্রেসারিও হরেন ঘোষ। এই ভ্রমণের সময়েই মহাত্মা গান্ধী দিল্লীতে বিশ্বভারতীর সাহায্যকল্পে গুরুদেবের হাতে ৬০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। গুরুদেবকে অনুরোধ করেছিলেন তিনি যেন তাঁর এই বয়সে নৃত্যগীতের দল নিয়ে বাইরে আর না যান। গুরুদেব তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত, একমাত্র কলকাতা ছাড়া, নৃত্য গীতানুষ্ঠানের দলের সঙ্গে আর কোথাও যান নি। (২০১)  
     --শান্তিদেব ঘোষ, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক ভারতীয় নৃত্য, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯০

  


চিত্রাঙ্গদার গদ্যছন্দের আবৃত্তিগুলি ১৯৩৮ পর্যন্ত কখনো নৃত্যভঙ্গিতে আবৃত্তির ছন্দে অভিনীত হয় নি। এই সময় পর্যন্ত সাধারণভাবে এই কবিতাগুলিকে অভিনয় করা হত। কিন্তু ১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ঐ কবিতাগুলিও সম্পূর্ণরূপে নৃত্যছন্দে অভিনীত হতে শুরু হল। এও একপ্রকার নাচে পরিণত হল। ... অনেক সময়ে দেখা গেছে এই পদ্ধতির অভিনয় গানের অভিনয়ের চেয়েও দর্শকদের মন বেশি আকর্ষণ করে।  (২৫২)  
     --শান্তিদেব ঘোষ, রবীন্দ্রসঙ্গীত, বিশ্বভারতী, ১৯৭০  


প্রথম যুগে চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যটি অভিনীত হতো পুরোপুরি মণিপুরী নৃত্যভঙ্গীকে ভিত্তি করে। তার সঙ্গে মিশে ছিল কিছু কিছু লোকনৃত্যের ভঙ্গী। বহির্ভারতের নৃত্য পদ্ধতিও যে কখন কখন পরে স্থান না পেয়েছে তা নয়। ... মাকী নামক এক জাপানী যুবক ... মদনের গানগুলির সঙ্গে জাপানী নৃত্যপদ্ধতিকেই প্রয়োগ করেছিলেন।... ১৯৩৭ সালে কথাকলি নাচের নিয়মিত শিক্ষার ব্যবস্থা করবার পর কথাকলি অভিনয় পদ্ধতি চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যে স্থান পায়। কেলু নায়ার, ১৯৩৯-৪০ সালে চিত্রাঙ্গদাতে অর্জুনের ভূমিকায় অভিনয় করত কথাকলি নৃত্যভঙ্গীতে। (১৯৯)  
     --শান্তিদেব ঘোষ, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক ভারতীয় নৃত্য, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯০

  


কয়েক বৎসর আগে শান্তিনিকেতনের কোনো বিশেষ উৎসব-উপলক্ষ্যে "চিত্রাঙ্গদা" নৃত্যনাট্যের মহড়া শুরু হবার কয়েকদিন পরে তিনি [রবীন্দ্রনাথ] মহড়ায় যোগ দেন, এবং সেই দিন সকালে শ্রীযুক্তা প্রতিমা দেবীকে [রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ] লিখে পাঠান--
      "বৌমা, কাল ক্লান্ত শরীরে নাচের বাহুল্য ক্লেশকর হয়েছিল। মণিপুরীকে না ছাঁটলে সভা ছেড়ে পালাতে হবে। সমস্ত জিনিষটি বেশ দ্রুত এবং সুঠাম হলে ভালো হয়। এ নাটকটি লিরিক্যালের চেয়ে ড্রামাটিক বেশী। " (২২২)  
     --শান্তিদেব ঘোষ, রবীন্দ্রসঙ্গীত, বিশ্বভারতী, ১৯৭০  


প্রতিমাদেবী [রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ] লিখিত ও রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক অনুমোদিত "চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্য" [প্রবাসী, চৈত্র ১৩৪৩] প্রবন্ধের ... কয়েকটি প্রাসঙ্গিক ছত্র নিম্নে উদ্ধৃত হইল:
    "চিত্রাঙ্গদার সম্বন্ধে আলোচনার সময় মনে রাখতে হবে যে নৃত্যনাট্যে কলাকৌশল কথার ভাষা নিয়ে কারবার করে না, তার ভাষা হল সুর ও তাল; ভাব খেলে তার দেহরেখায়। এই রেখার খেলা মাত্রেই ছবির ভাষা এসে পড়ে, তাই তার জন্যে পটভূমির দরকার হয় রঙ ও আলো। এই রঙ আলো ছাড়া নৃত্যকলার পরিপ্রেক্ষিত ফুটিয়ে তোলা শক্ত, বিশেষত সে যখন নাটকীয় রাজ্যে গিয়ে পৌঁছয়। নাচেতে দেহের রেখা খুব নিখুঁত হওয়া চাই, কোথাও তার কোনো অবান্তর ভঙ্গী হলে তালের সঙ্গে ভঙ্গীর সঙ্গতি রক্ষা করা দুরূহ হয়ে পড়ে। রেখা ও তালের মিলন ছাড়া নৃত্যকলা পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। কবিতা ও গদ্যে যে তফাৎ, নৃত্যনাট্যের সঙ্গে বিশুদ্ধ নাটকের সেই রকমই পার্থক্য।  
     --গ্রন্থপরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী, ২৫শ খণ্ড  


নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদার বিষয়ে দু'একজন সমালোচকের মত যে, কোনো কোনো স্থানে নাটকের গতি সম্পূর্ণ অব্যাহত থাকে নি, হয় বাধাপ্রাপ্ত, নয় গতি মন্থর হয়েছে। কেন এটি ঘটেছে সে বিষয়ে কয়েকটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন। এই নাটকগুলি সব সময়েই নাচের তাগিদে লেখা। অনেক সময় এই সব নাটকের কতক অংশ কেবলমাত্র নাচের প্রয়োজনে লিখিত, মহড়ার সময় এখানে সেখানে নতুন কথা সংযোজিত হয়। রঙ্গমঞ্চে অভিনয়ের সময় বাড়াবার জন্যেও এখানে সেখানে তিনি গান জুড়েছেন।  সাজবদলের জন্য সময় দরকার, তখনো গান বসিয়েছেন। (২৫০)  
     --শান্তিদেব ঘোষ, রবীন্দ্রসঙ্গীত, বিশ্বভারতী, ১৯৭০  


এখনকার [১৯৮৬তে লেখা] যুগের LP রেকর্ড তখনকার [১৯৫০] যুগে ৬খানা 78 RPM রেকর্ডে করতে হত।... ১৯৫৫ সালে চিত্রাঙ্গদা করি ঐ ৬খানা রেকর্ডে। এতে দেবব্রত বিশ্বাস, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, পূরবী চট্টোপাধ্যায়, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরে আবার ভিন্ন শিল্পী সমাবেশে ১৯৭৪ সালে এটি পুনরায় রেকর্ড করা হয়। এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি।  
     --সন্তোষ সেনগুপ্ত, আমার সঙ্গীত ও আনুষঙ্গিক জীবন, এ মুখার্জী অ্যাণ্ড কোং, ১৯৮৬