গীতবিতান-GITABITAN
পথহারা তুমি পথিক যেন গো সুখের কাননে--

Certificate

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  (১৯৩৮)
কবির বয়স:
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পরিশিষ্ট-নৃত্যনাট্য মায়ার খেলা; ২/৯১৬
পাদটিকা:
   গীতিনাট্য মায়ার খেলার গান অপরিবর্তিতভাবে গৃহীত হয়েছে।  

আলোচনা

  

চুম্বক প্রকাশ
   মায়াকুমারীরা আবির্ভূত হইয়া বসন্তরাত্রে কিছু যুবকযুবতীকে লইয়া মায়ার খেলা খেলিতে প্রবৃত্ত হইয়াছে।  

দ্বিতীয় দৃশ্য: গৃহ। নবযৌবনবিকাশে গ্রন্থের নায়ক অমর সহসা হৃদয়ের মধ্যে এক অপূর্ব আকাঙ্ক্ষা অনুভব করিতেছে। সে উদাসভাবে জগতে আপন মানসী মূর্তির অনুরূপ প্রতিমা খুঁজিতে বাহির হইতেছে।
     গান(শান্তা) পথ-হারা তুমি পথিক যেন গো (ক্রমিক ২)  


  


   সাতাশ বছর বয়সে গীতিনাট্য 'মায়ার খেলা' লিখেছিলেন কবি। তার পঞ্চাশ বছর পরে তিনি সেই 'মায়ার খেলা'-কে নৃত্যনাট্যে রূপ দেবার কাজে হাত দিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ নাটকের অভিনয় কখনো হয় নি, যদিও পাণ্ডুলিপিতে যা পাওয়া যায় (সম্পূর্ণ বলেই বোধ হয়) তা গীতবিতানের পরিশিষ্ট হিসাবে ছাপা হয়েছে। গীতিনাট্যের ৬৫টি গানের সঙ্গে নৃত্যনাট্যের ৪৮টি গানের তুলনা করলে দেখা যায়: অপরিবর্তিত - ২১টি, স্বল্প পরিবর্তন - ৭টি, বহু পরিবর্তন - ৫টি, নতুন গান (বা প্রয়োগ) - ১৫টি। অর্থাৎ অনেক গান (১৬টি) বর্জিত হয়েছে। নতুন গানগুলি গীতবিতানের অন্যান্য পর্যায়ে বিন্যস্ত। স্বরবিতান ৬১ খণ্ডে নৃত্যনাট্য মায়ার খেলার গান হিসাবেই সেগুলির স্বরলিপি সংগৃহীত। পরিবর্তিত গানগুলির পরিবর্তিতরূপ মাত্র পরিশিষ্টেই রক্ষিত। নাটকের কাহিনী,মর্মকথা ও আঙ্গিকের পরিবর্তন বিস্ময়কর ও অনুধাবনীয়।  উপর উপর দেখলে পরিবর্তন হয়েছে: মায়াকুমারীদের আবির্ভাব ও বক্তব্য অনেক বাদ গেছে, তাদের কিছু কিছু সংলাপ সখীদের দিয়ে বলানো হয়েছে; প্রমদার প্রণয়ার্থী অশোক ও কুমার প্রায় অদৃশ্য, অমরই তাদের শূন্যস্থান পূর্ণ করেছে যখন দরকার।

ডানদিকের স্তম্ভে গীতবিতান গ্রন্থপরিচয়ের এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। যেহেতু এই গানগুলির সংশ্লিষ্ট তথ্য এই সংকলনের অন্যত্র দেওয়া আছে, সেজন্য নৃত্যনাট্যের গান হিসাবে সেসব তথ্য আর দেখানো হলো না, কিন্তু লিঙ্ক দেওয়া হলো।  


মায়ার খেলার নতুন গান রচনার [নৃত্যনাট্য্রূপ দান উপলক্ষ্যে] ঘূর্ণি হাওয়ায় মন উড়ে বেড়াচ্চে-- সমাজ সংসারের কর্তব্য ক্ষেত্রে নেবে আসবার মতো অবকাশ নেই।  
     --রবীন্দ্রনাথ, ডঃ দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্রের কন্যা মীরা চৌধুরীকে (বাবলি) লেখা চিঠি, ১৬।১২।৩৮; চিঠিপত্র ১৭, বিশ্বভারতী ১৯৮৯;  


 

 

শান্তা।
    পথহারা তুমি পথিক যেন গো সুখের কাননে--
    ওগো যাও, কোথা যাও।
    সুখে ঢলোঢলো বিবশ বিভল পাগল নয়নে
    তুমি চাও, কারে চাও।
    কোথা গেছে তব উদাস হৃদয়, কোথা পড়ে আছে ধরণী,
    মায়ার তরণী বাহিয়া যেন গো মায়াপুরী-পানে ধাও--
    কোন মায়াপুরী-পানে ধাও॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৮৮ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: গাজিপুরে বসে 'মানসী'- কাব্যের অনেক কবিতা রচনা। 'নিষ্ফল কামনা' কবিতার ইংরেজি অনুবাদ। ১৯ অক্টোবর ট্রাস্ট ডীড করে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন আশ্রমের প্রতিষ্ঠা করলেন, রবীন্দ্রনাথ উপাসনা ও গান করেন। ২৭শে নভেম্বর রথীন্দ্রনাথের জন্ম। স্বর্ণকুমারী দেবীর উদ্যোগে 'সখী সমিতি' নামে এক মহিলা সম্মেলন চালু হয়, ডিসেম্বর মাসে বেথুন স্কুলে  তাদের শিল্পমেলাতে 'মায়ার খেলা'-র অভিনয়। প্রকাশিত বই: সমালোচনা, মায়ার খেলা।

বহির্বিশ্বে: উল্লেখযোগ্য সাহিত্য ও শিল্পকর্ম: আমুর (ভের্লেন), ফিফ্‌থ সিম্ফনি (চাইকোভস্কি)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



[এই নাটকটি] রবীন্দ্রসদনে সংরক্ষিত ১৩৪৫ পৌষের একখানি পাণ্ডুলিপি হইতে সংকলিত। পাণ্ডুলিপির অধিকাংশ অন্যের হাতের নকল হইলেও রবীন্দ্রনাথ স্বহস্তে বহু বর্জন ও পরিবর্তন করিয়াছেন , বহু নূতন অংশ যোগ করিয়াছেন দেখা যায়।  পাণ্ডুলিপি দেখিয়া মনে করিবার কারণ আছে যে, রচনা একরূপ পূর্ণতা প্রাপ্ত হইয়াছিল। ব্যক্তিগত সাক্ষ্যে এরূপ জানা যায় যে, ১৩৪৫ অগ্রহায়ণে এই নৃত্যনাট্যের কল্পনা ও রচনা শুরু হয়; কিছুকাল মহলা চলিবার পর ওই বৎসরে দোলপূর্ণিমার উৎসব উপলক্ষ্যে নৃত্যগীতযোগে শান্তিনিকেতন-আশ্রমে উহার অংশবিশেষ অভিনীত হইয়াছিল। সম্পূর্ণ নৃত্যনাট্যের অভিনয় কখনোই হয় নাই। পাণ্ডুলিপিতে প্রবেশ-প্রস্থান ইযাদি নাট্য-নির্দেশে যে যে স্থলে সংশয়ের অবকাশ আছে, বর্তমান মুদ্রণে সম্ভবপর নির্দেশ বন্ধনী-মধ্যে দেওয়া গেল। পূর্বসংকলিত গীতিনাট্যের সহিত বর্তমান নৃত্যনাট্যের তুলনা করিলে রবীন্দ্রনাথের কবি ও শিল্পী-মানসের বিস্ময়কর পরিণতির কিছু আভাস পাওয়া যাইবে আশা করা যায়। হয়তো ইহাও বুঝা যাইবে কেন রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন, 'প্রথম বয়সে আমি হৃদয়ভাব প্রকাশ করবার চেষ্টা করেছি গানে, আশা করি সেটা কাটিয়ে উঠেছি পরে। পরিণত বয়সের গান ভাব বাৎলাবার জন্যে নয়, রূপ দেবার জন্য। তৎসংশ্লিষ্ট কাব্যগুলির অধিকাংশই রূপের বাহন।'  [সুর ও সঙ্গতি--সংগীতচিন্তা] (১০১৩)  
     --গীতবিতান গ্রন্থপরিচয়  


রবীন্দ্রনাথ বরাবরই তাঁর গানের সুরে কর্ড প্রয়োগ এবং হার্মোনাইজেশনের কাজে উৎসাহ দিতেন। এই সব উদ্যমের পাকা দলিল এখন অবশ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। ১৮৮৪তে সরলা দেবী " সকাতরে ওই কাঁদিছে " গানে কর্ড প্রয়োগের যে চেষ্টা করেন, রবীন্দ্রসংগীতকে হার্মনাইজ করবার সেটা সম্ভবত সর্বপ্রথম নিদর্শন [গানের তথ্য পশ্য]। আর একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন আছে ১৩০১ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের 'সাধনা' পত্রিকায়। এটি পূর্বোক্ত দৃষ্টান্তের মতন অপরিণত হাতের কাজ নয়। ঠাকুরবাড়ির পাশ্চাত্য সংগীতশিক্ষক সিঁয়োর মন্‌জাতো 'মায়ার খেলার'র অন্তর্গত " পথহারা তুমি পথিক যেন গো " গানটির স্বরসন্ধি রচনা করেন। সাধনা পত্রিকায় তার পূর্ণাঙ্গ স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছে এবং ভূমিকায় বলা হয়েছে:

    "কেহ কেহ আপত্তি করেন, মিশ্রমিল আমাদের সংগীতের অনুপযোগী, উহার দ্বারা আমাদের রাগরাগিণীর রূপ রক্ষা করা কঠিন। অলংকারের অতিপ্রাচুর্যে রূপের স্ফূর্তিহানি হয় বটে কিন্তু যথাযোগ্য্রূপে স্বল্প অলংকার প্রয়োগ করিলে কি তাদের রূপ আরও ফুটিয়া উঠে না?"

১৯২১-২২ সালের আনন্দসঙ্গীত পত্রিকায় এই জাতেয় কয়েকটি প্রয়াসের নিদর্শন পাওয়া যায় [বন্ধনীতে স্বরলিপিকার]: " আমি চিনি গো চিনি " (ইন্দিরা দেবী); "সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং" (সরলা দেবী) [অন্যান্য তথ্য বিভাগে 'মন্ত্রগান' পৃষ্ঠা পশ্য]; " বড়ো আশা করে " (অশোকা দেবী), " তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে "-- প্রভৃতি মুদ্রিত ও প্রকাশিত স্বরলিপিগুলিতে নিঃসন্দেহে এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কৌতূহল এবং সমর্থনের দ্যোতনা পাওয়া যায়। (৩৭)  
     --ভাস্কর মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ও পাশ্চাত্য সংগীত, রবীন্দ্রসংগীতায়ন ২, সুচিত্রা মিত্র ও সুভাষ চৌধুরী সম্পাদিত, প্যাপিরাস ১৯৯০