গীতবিতান-GITABITAN
প্রাণে গান নাই, মিছে তাই ফিরিনু যে

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ২৬ চৈত্র ১৩২০ (৯ এপ্রিল,১৯১৪)
কবির বয়স: ৫২
রচনাস্থান: কলকাতা
প্রকাশ: ১৯১৪ , গীতিমাল্য ৯৩ র-র ১১
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-দুঃখ; ২৩৮/১০৪
রাগ / তাল: ছায়ানট মিশ্র / দাদরা
স্বরলিপি: আনন্দসঙ্গীত পত্রিকা (১৩২৪); গীতলেখা ৩; স্বরবিতান ৪১
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ; ঐ

আলোচনা

অজিতকুমার [চক্রবর্তী] লিখেছেন: "ইংলণ্ডে গুণীসমাজ কবির গলায় যে প্রশংসার মালা পরাইয়া দিয়ছিলেন সে সম্বন্ধে একটিমাত্র গান গীতিমাল্যে আছে-- '   এ মণিহার আমায় নাহি সাজে '। " একটি মাত্র গান? প্রত্যক্ষত হয়তো তাই; কিন্তু একটু ভিতরদিক থেকে দেখলে মনে হবে যে 'গীতিমাল্য'র উত্তরাংশের একটা বড়ো আবেগই আসছে বাইরের মত্ততা থেকে নিজের কেন্দ্রকে বাঁচিয়ে রাখবার এক সতর্ক বোধ থেকে। এভাবে দেখলে বোঝা যায় যে এ গানটি কোনো বিচ্ছিন্ন গান নয়, তার ঠিক ছ-মাস পরে লেখা এসব গানেও আছে ওই একই অনুভব:' সভায় তোমার থাকি সবার শাসনে '।

সভা আর ঘরের এই বিরোধে, সবার আর একার এই বিরোধে যে 'গীতিমাল্য'র অনেকগুলি গান ভরে আছে, তা একেবারে আকস্মিক নয় নিশ্চয়। 'এ মণিহার' গানটির পরদিনই কবি লিখবেন "মনে হল আকাশ যেন কইল কথা কানে কানে" ['   ভোরের বেলা কখন এসে ']। সেই নিভৃত ভোরের সংলাপ থেকে তিনি অর্জন করে নিতে চাইবেন তাঁর জীবনীশক্তি, ঘরকে তিনি করে তুলবেন তাঁর আত্মস্থতার মুদ্রা। তাই জ্যোৎস্নারাতে সবাই যখন বনে চলে যায় তখনো তাঁকে বহু যত্নে সাজিয়ে রাখতে হবে তাঁর নিরালার ঘরখানি, যেন কোনো প্রেরণার মুহূর্তের প্রতীক্ষায়, "যদি আমায় পড়ে তাহার মনে" ['   আজ জ্যোৎস্নারাতে   ']।  একেবারে ভিন্ন দেশের এক আধুনিক কবি জাঁ কক্‌তো, তাঁর সৃষ্টিপ্রেরণার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে কবি আছেন তাঁর রাত্রির অধিকারে, কোনো এক গহন আবির্ভাবের জন্য তাঁকে ধুয়ে মুছে রাখতে হয় ঘর। অমলেরও সামনে এসে রাজকবিরাজ বলেছিলেন: "এই ঘরটি রাজার আগমনের জন্যে পরিষ্কার করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখো। " এ হলো তবে সেইসব ঘর, যেখানে দাঁড়িয়ে জীবনকে আর সুন্দরকে তার অন্তঃস্বরূপে দেখতে পাওয়া যায়। এই দেখা থেকে জেগে ওঠে মৃত্যু, মৃত্যুর ভূমিকায় জীবন, এই দেখা থেকেই জেগে ওঠে শিল্প। মৃত্যু আর শিল্প এইভাবে কখনো এক জায়গায় এসে মিলে যায়। আত্মসৃষ্টির সঙ্গে 'গীতিমাল্য'-র গানগুলি সেই শিল্পসৃষ্টিরও নেপথ্যঘর। তাই এত বেশি গানের গান ছড়িয়ে আছে এই বইটিতে, তাই এখানে এমন করে তিনি বলতে পারেন যে '   প্রাণে গান নাই ' বা "প্রকাশ করি, আপনি মরি" ['   সে দিনে আপদ আমার ']। (৪৮)  
     --শঙ্খ ঘোষ, এ আমির আবরণ, প্যাপিরাস, ১৯৮২  



 

 

২৩৮

প্রাণে গান    নাই, মিছে তাই    ফিরিনু যে
      বাঁশিতে     সে গান খুঁজে।
প্রেমেরে  বিদায় ক'রে   দেশান্তরে
       বেলা যায়   কারে পূজে॥
বনে তোর   লাগাস আগুন,   তবে ফাগুন কিসের তরে--
       বৃথা তোর   ভস্ম-'পরে   মরিস যুঝে॥
  ওরে, তোর   নিবিয়ে দিয়ে   ঘরের বাতি
       কী লাগি    ফিরিস পথে   দিবারাতি--
যে আলো    শতধারায়  আঁখিতারায় পড়ে ঝ'রে
     তাহারে   কে পায় ওরে    নয়ন বুজে?।

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯১৪ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  'বলাকা' রচনা। 'বিচিত্রা সভা' প্রতিষ্ঠা। 'অচলায়তন' অভিনয়, গুরুর ভূমিকায় কবি। সপরিবারে রামগড়ে সময় কাটালেন কিছুদিন। প্রকাশ: উৎসর্গ, স্মরণ, গীতিমাল্য, গান, ধর্মসঙ্গীত, গীতালি, The King of the Dark Chamber, One Hundred Poems of Kabir, The Post Office.  

বহির্বিশ্বে: আমেরিকার সান্‌ ফ্রান্‌সিস্কো শহরে স্থাপিত গদর সমিতির এক অভিযান ও সরকারের সঙ্গে সঙ্ঘর্ষে ১৭ জনের মৃত্যু। কলকাতায় অস্ত্রব্যবসায়ী রডা কোম্পানী লুট করে বিপ্লবীরা অনেক অস্ত্র সংগ্রহ করেন। ভারত ও চীনের সীমান্ত নির্দেশক ম্যাকমোহন লাইন প্রস্তাবিত। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে ইণ্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের সূচনা। প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় মাসিক 'সবুজপত্র'-এর প্রকাশ। পানামা ক্যানাল খুললো। ৪ঠা অগাস্ট ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো -- প্রথম মহাযুদ্ধের শুরু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: গ্রোথ অফ দি সয়েল (হামসুন), ডাবলিনার্স (জয়েস), দি কাপ অফ লাইফ (বুনিন)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রসংগীত পরিণত রূপ লাভ করবার পর রাগ নিজেই সমরূপের রাগের বিভিন্ন বৈচিত্র্যে বিকাশ লাভ করেছে। তাই, দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যেতে পারে, একটি ছায়ানট বহু ছায়ানটে বিস্তারলাভ করেছে। উচ্চাঙ্গসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীতে পার্থক্য হলো এই যে উচ্চাঙ্গসংগীতে রাগবৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায় এক থেকে দশ পর্যন্ত। যেমন, ভৈরবীতে একটি, টোড়ীতে ছয়টি এবং কানাড়াতে দশটি। রবীন্দ্রসংগীত অসংখ্য গানে বিভক্ত। তাতে অনেকগুলি ভৈরবী, অনেকগুলি টোড়ী ও অনেকগুলি কানাড়া সৃষ্ট হয়েছে। প্রত্যেকটি গান স্বতন্ত্র এক একটি রাগরূপ। এতে গায়কের নিজস্ব রাগারোপের কোনো অবকাশ নেই। ... দু হাজারের বেশী সুর তিনি রচনা করেছেন। তার মধ্যে দেড়শো সুর বাস্তবিকই অতি উৎকৃষ্ট। প্রত্যেকটি রবীন্দ্রনাথের রাগপদ্ধতির অন্তর্গত এবং প্রত্যেকটি এক একটি স্বতন্ত্র সংগীত।⤥  
     --ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথের গান, সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত রবীন্দ্রসংগীতের চিন্তা, প্রতিভাস, ১৯৯৩