গীতবিতান-GITABITAN
তোমায় গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ

Book Cover

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ২৯ ফাল্গুন ১৩২৯ (১৩ মার্চ,১৯২৩)
কবির বয়স: ৬১
রচনাস্থান: আহমেদাবাদ
প্রকাশ: শ্রাবণ ১৩৩০ , শান্তিনিকেতন পত্রিকা |
রক্তকরবী র-র ১৫
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রেম-গান; ৬/২৭২
রাগ / তাল: পিলু / দাদরা
স্বরলিপি: শান্তিনিকেতন পত্রিকা (১৩৩০); গীতমালিকা; স্বরবিতান ৩০ (গীতমালিকা ১)
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ; ঐ

আলোচনা

যেমন পূজার, যেমন প্রেমের, রবীন্দ্র-রচনায় তেমনি কয়েকটি আছে গানের গান। 'পূজা' অংশে যে একুশটি উপশ্রেণীর কল্পনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তার প্রথমটিই ছিল 'গান', 'পূজা'র প্রথম বত্রিশটি রচনাই কোনো-না-কোনোভাবে সুরের কথা বলে। এটা আমাদের মনে থাকে বটে, কিন্তু অনেকসময় আমরা লক্ষ্য করতে ভুলে যাই যে 'প্রেম' অংশেরও প্রথম গানগুলি ওই একইরকমের গান, এরও প্রথম সাতাশটি রচনায় তৈরী হয়ে উঠেছে সুরের প্রসঙ্গ, গড়ে উঠেছে "গানের রতনহার"।

এ কি আকস্মিক একেবারে যে এই দুই পর্যায়ের প্রবেশক হিসেবে কবি সাজাতে চাইলেন এই গানের গানগুলি? না কি এর মধ্য দিয়ে গানের পথে ধর্মে আর গানের পথে ভালোবাসায় পৌঁছবার এক সাধনা করেন কবি? ধর্ম যেমন মানুষকে তার অহংসীমার বাইরে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়, ভালোবাসারও তো সেই কাজ। নিজেকে নিজের মধ্যে থেকে মুক্তি দিতে পারি যখন, নিজেকে মুক্ত করতে পারি পরিজন-পরিবেশের মধ্যে, অনায়াস আনন্দে বা গভীর বেদনায়, সেই মুহূর্তই ভালোবাসার মুহূর্ত। ধর্ম আর ভালোবাসা এই যে চরিতার্থতা চায়, ভেঙে দিতে চায় নিজের আবরণ, সেইখানেই তো নিয়ে যেতে চায় গান, যে গানের বিষয়ে বলা হয়েছিল 'চিরকালটাই আসে সামনে, ক্ষুদ্র কালটা যায় তুচ্ছ হয়ে'। তাই গানের গান হতে পারে এই দুই পর্যায়েরই যোগ্য প্রবেশক।

কিন্তু সে কথা যদি মেনে নেওয়া যায়, তবুও আমাদের জিজ্ঞাসা মেটে না। এই দুই পর্যায়ে যে সুর বা গানের কথা সাজানো হলো, তার মধ্যে কি কোনো ভিন্ন চরিত্রের কল্পনা আছে? কয়েকটি গান এ-পর্যায়ে, কয়েকটি ও-পর্যায়ে, এই মাত্র? না কি দু-পর্যায়ের গানেও আছে কোনো প্রচ্ছন্ন ভিন্নতা? এর একটা সহজ উত্তর হতে পারে এই যে 'পূজা'র বত্রিশটি গানের মধ্যে অন্তত কুড়িটি লেখা হয়েছিল ১৯২০ সালের আগে, আর 'প্রেমে'র সাতাশটির মধ্যে বাইশটি ওই সময়ের পরে।.. কিন্তু 'গীতবিতানে' কোনো অর্থেই গণ্য করা হয়নি কালক্রম। তাই সময়ের ক্রমিকতাই একমাত্র কথা নয়, এ-দুয়ের মধ্যে প্রভেদ থাকা সম্ভব অন্য কোনো ভাবনায়।

বহুদিন আগে অমিয় চক্রবর্তী তাঁর 'গানের গান' প্রবন্ধে বলেছিলেন যে এই গানগুলিকে সাজানো চলে তিনটি পর্যায়ে: গান-শোনা, গান-শোনানো আর গানের দেওয়া-নেওয়া। তাঁর মনে হয়েছিল 'পূজা' অংশে প্রধানত সেই সুরস্রষ্টার কথা আছে, বিশ্বলোক যাঁর রাগিণী। আর 'প্রেম' অংশের মধ্যে আছে দেওয়া-নেওয়ার সম্বন্ধ, বিরহমিলনের মধ্য দিয়ে গীতলীলা। কিন্তু তবুও একটা দ্বিধা ছিল অমিয় চক্রবর্তীর, হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে গানগুলিকে এইভাবে শনাক্ত করা সহজ নয় বড়ো, হয়তো তিনি 'পূজা', 'প্রেম' নামগুলিকেই অনেকটা প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন এই প্রভেদসূত্রের বর্ণনায়। তাই শেষ পর্যন্ত বলতে হয় তাঁকে: "কিন্তু পূজা ও প্রেমের মধ্যে তো ছেদ নেই; কবির সংকল্পিত গীতবিতানে তাই লিরিকের মালা গাঁথা হয়েছে।"

তবে কি একটু অন্যভাবে ভাববো আমরা? নিজের অস্তিত্বের মধ্যে যখন মানুষ অনুভব করতে পারে সমস্ত বিশ্বের অভিঘাত, তখন সে হয়ে ওঠে গভীরতর অন্য এক মানুষ। অভিঘাতের এই সম্পর্ককে রবীন্দ্রনাথ দেখেন সুরের উপমায়। এ অভিঘাত কখনো তীব্র, কখনো মৃদু, আনন্দের কখনো, কখনো ব্যথার। এ-গানগুলিতে সুরেরও বর্ণনা তাই কখনো আগুন হয়ে আসে, কখনো ঝরণা, হোম কখনো, কখনো মালা। কিন্তু সবসময়েই সে-সুর যোগ করছে একের সঙ্গে অন্যকে, আমির সঙ্গে এক তুমিকে। সে যোগ কখনো আমার গানে, কখনো তোমার গানে।

এই তুমির বোধ যদি আত্মস্থ এক সম্পূর্ণতার বোধ, এরই সঙ্গে যুক্ত হবার পথ যদি হয় গান, তবে সে-গানে কখনো তুমি এগিয়ে আসে আমির দিকে, কখনো তুমির দিকে আমি। 'পূজা'র মধ্যে যে গানের গান, সেখানে তুমি-আমির এই বিন্যাস প্রায় সমান সমান। সেখানে ' তোমার সুরের ধারা ঝরে ', তোমার সুর ফাগুনরাতে জাগে, তুমিই সেখানে সুরের আগুন লাগায়, তোমার বীণা বাজে, কিন্তু ওরই সঙ্গে আবার ' আমার সুরে লাগে তোমার হাসি ', ' আমার বেলা যে যায় সাঁঝবেলাতে, তোমার সুরে সুরে সুর মিলাতে '। বলা যায়, হয়তো এই সুর মেলানোর কাজ অনেকটা সম্পন্ন হয়ে এল 'প্রেম' পর্যায়ের গানের গানে, কেননা দু-একটি ছাড়া সেখানে সবক'টি গানের উৎসে আছি আমি। সেখানে ' তোমায় গান শোনাবো, তাইতো আমায় জাগিয়ে রাখো '।

অমিয় চক্রবর্তী লিখেছিলেন, "গান যেখানে ভক্তিরসে বিধৃত, কবির নিজের সংগীতও সেখানে পূজার পর্যায়ে স্থান পেয়েছে।" কিন্তু এই যে জাগিয়ে রাখার গানটির কথা বলা হলো, এর মধ্যে যদি কোনো ভক্তিরস না থাকে, এ যদি হয় প্রেমেরই গান, এ যদি নন্দিনীকে শোনাতে চায় বিশু, তবে ' আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান ' কেন হবে না স্বতন্ত্রভাবে ভক্তিরসের, তা বোঝা যায় না ভালো। এ কোনো ভক্তির কথা নয়, এ হলো ব্যক্তির কথা, এ কেবল প্রকাশ-বেদনার কথা, যে-বেদনা সম্পূর্ণের সঙ্গে নিজের বিচ্ছেদকে প্রত্যক্ষ করে তোলে শুধু, যে-বেদনা এগিয়ে নিতে চায় সমস্তের সঙ্গে মিলনের দিকে। তারই এক নাম হতে পারে প্রেম, তারই এক নাম হতে পারে পূজা। এই অর্থেই গানের গানগুলি এক সহজ সেতু তৈরি করে রাখে পূজা আর প্রেমের মধ্যে, দুই জগতে বড়-রকমের ভিন্নতা থাকে না আর। (৭৪)

['এই সাইটে 'সার্চ' পাতায় 'পূজা' বা 'প্রেম' পর্যায় ও 'গান' বিষয় খোঁজ করলে এসব গানের তালিকা পাওযা যাবে।]  
     --শঙ্খ ঘোষ, এ আমির আবরণ, প্যাপিরাস, ১৯৮২  



 

 

তোমায়       গান শোনাব তাই তো আমায় জাগিয়ে রাখ
            ওগো   ঘুম-ভাঙানিয়া।
        বুকে    চমক দিয়ে তাই তো ডাক'
                    ওগো   দুখজাগানিয়া॥
        এল    আঁধার ঘিরে,   পাখি    এল নীড়ে,
                    তরী   এল তীরে--
শুধু      আমার হিয়া বিরাম পায় নাকো
                    ওগো দুখজাগানিয়া॥
     আমার   কাজের মাঝে মাঝে
কান্নাহাসির দোলা তুমি থামতে দিলে না যে।
      আমায়    পরশ ক'রে   প্রাণ   সুধায় ভ'রে
                   তুমি   যাও যে সরে--
বুঝি     আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাক
                   ওগো দুখজাগানিয়া॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯২৩ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  ৯ই জানুয়ারি বড়ো ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু। প্রথম আসাম ও শিলং পাহাড়ে ভ্রমণ। বিশ্বভারতীর ট্রাস্ট ডীড করা হোলো আর প্রকাশন বিভাগের হোলো সূত্রপাত। 'বিসর্জন' অভিনয়ে জয়সিংহ। 'পূরবী' রচনা। প্রকাশ: বসন্ত, ছুটির পড়া, The Visva-Bharati.  

বহির্বিশ্বে: ১লা জানুয়ারি স্বরাজ্য পার্টির জন্ম -- দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও পণ্ডিত মতিলাল নেহরুর উদ্যোগে। স্পেনে একনায়কতন্ত্রের শাসন। নেপাল স্বাধীন। তুরস্কে গণতন্ত্র, আতাতুর্ক প্রথম রাষ্ট্রপতি। টেলিভিশন আবিষ্কার। সারা বার্নহার্ট ও পিয়ের লোতির মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ফিলজফি অফ সিভিলাইজেশন (সোয়াইৎজার), সেণ্ট জোন (শ), এরিয়েল (মরোয়া), দি ডাভ্‌স নেস্ট (ম্যানস্‌ফিল্ড)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



১৩৩৮ (ইংরেজী ১৯৩১) সালে আশ্বিন মাসে "গীত-বিতান" প্রকাশিত হোলো দুখণ্ডে, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ২১০ কর্ণওয়ালিস স্ট্রীট, কলকাতা থেকে। প্রকাশক জগদানন্দ রায়, ছাপা শান্তিনিকেতন প্রেস। বাইশশো কপি ছাপা হয়। সংকলন হোলো কালানুক্রমিক -- ১৩০৩ সালে প্রকাশিত 'কৈশোরক' থেকে শুরু করে ১৩৩০ সালের 'বসন্ত' অবধি। বইটিতে কোনো লিখিত ভূমিকা ছিলোনা, সংগ্রাহক সুধীরচন্দ্র কর একটি সংক্ষিপ্ত 'পাঠ-পরিচয়' -এ লিখলেন "মোট ১১২৮টি গান লইয়া গীত-বিতান ১ম ও ২য় খণ্ড প্রকাশিত হইল। কবির নির্দেশমতো এই সংগ্রহ হইতে ১৪৮টি গান বাদ পড়িল।" তৃতীয় খণ্ডের প্রকাশ ১৩৩৯ শ্রাবণে, ঐ একই প্রকাশন, প্রকাশক ও ছাপার সংখ্যা নিয়ে। এটিরও বিন্যাস কালানুক্রমিক -- ১৩৩২ সালের প্রবাহিণী থেকে ১৩৩৮-এর গীতোৎসব পর্যন্ত। গানের সংখ্যা ৩৫৭। অর্থাৎ সবশুদ্ধ ১৪৮৫টি গান গীত-বিতানের তিন খণ্ডে সংগৃহীত হোলো।

প্রথম সংস্করণের পর থেকেই কবি বইটির "ব্যবহারযোগ্যতা" নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তার নমুনা পাওয়া যায় প্রথম সংস্করণের সূচীপত্রের মার্জিনে যেখানে তিনি স্বহস্তে গানের পাশেপাশে সম্ভাব্য বিষয় চিহ্নিত করেছেন। দ্বিতীয় সংস্করণের ছাপার কাজ শুরু হয় ১৩৪৫ (ইংরেজী ১৯৩৮) সালে। রবীন্দ্রনাথ এবারে নিজে হাল ধরেছেন, বিষয়বিন্যাস থেকে, গানের মার্জনা, প্রুফ দেখা কিছুই বাদ নেই। ২৩শে বৈশাখ, ১৩৪৫-এ সুধীরচন্দ্র করকে এক চিঠিতে লিখছেন, "গীতবিতানের প্রুফ দেখে দিলুম। ছাপাটায় যথাসম্ভব ঠাস বুনুনির দরকার, কারণ গানের বই সহজে বহন করবার যোগ্য হওয়া চাই, অকারণ ফাঁক বর্জনীয়। প্রত্যেক পর্যায়ের গান সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত করতে বলেছি। ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ের শিরোনামা দেওয়া সম্ভব হয়নি, অথচ ইঙ্গিতে তাদের ভিন্নতা রক্ষিত হয়েছে। সংখ্যা পরিবর্তনে পর্যায়ের পরিবর্তন নীরবে নির্দিষ্ট হতে পারবে -- ভাবুক লোকের পক্ষে সেই যথেষ্ট।...

একটা কথা বলে রাখি, অন্য সকল বইয়ের মধ্যে 'গীতবিতানে'র দিকের [?] আমার মনটা সবচেয়ে বেশি তাড়া লাগাচ্ছে -- নতুন ধারায় ও একটা নতুন সৃষ্টিরূপেই প্রকাশ পাবে।"  

গীতবিতানের প্রথম আর দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণের মুদ্রণ শেষ হলে কবিকে মুদ্রিত গ্রন্থের এক খণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকাশ হয় ১৩৪৮ সালের মাঘ মাসে, অর্থাৎ কবির মৃত্যুর ছমাস পরে। তৃতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ হতে আরো অনেকদিন লাগলো -- ১৩৫৭ সালের আশ্বিন পর্যন্ত। ১ম ও ২য় সংস্করণের 'বিজ্ঞপ্তি'-তে জানানো হযেছিল যে "গীত-বিতান দুই খণ্ড মুদ্রিত হইয়া যাওয়ার পর কবি আরও অনেকগুলি গান রচনা করিয়াছিলেন, এই সকল গান তৃতীয় খণ্ডে শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে।" তৃতীয় খণ্ডের সম্পাদনা করলেন কানাই সামন্ত। নানান ভাবে বিন্যস্ত হয়ে তৃতীয় খণ্ডটির আরো তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।