গীতবিতান-GITABITAN
ওগো শোনো কে বাজায়।

Certificate

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৯৩ (১৮৮৬)
কবির বয়স: ২৫
প্রকাশ: ১২৯৩ , কড়ি ও কোমল-বাঁশি র-র ২ |
র-র ২;গানের বহি (বিবিধ)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রেম-প্রেমবৈচিত্র্য; ৫৬/২৯৪
রাগ / তাল: বেহাগ-কীর্তন / দাদরা
স্বরলিপি: ভারতী (১৩০২); শতগান; গীতিমালা (১৩০৪); স্বরবিতান ১০
স্বরলিপিকার: ইন্দিরা দেবী; সরলা দেবী; জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
তাল আড়খেমটা [ স্বর ১০]। প্রচলিত ও গীতিমালার (১৩০৪) মধ্যে সুরভেদ আছে।  

আলোচনা

আগে বেহাগে কোমল 'নি' ব্যবহার করা হত আরোহণ ও অবরোহণে, হালে হচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথ বেহাগ সুরে বাঁধা তাঁর অনেক গানেই কোমল 'নি' ব্যবহার করেছেন। যেমন প্রথম বয়সের রচনা ' ওগো শোনো কে বাজায় ' গানটিতে। আবার শুদ্ধ নিখাদ দিয়ে তৈরি করেছেন অনেক গান, যেমন ' মেঘ বলেছে যাবো যাবো ', ' আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে ' প্রভৃতি গান। বেহাগের প্রচলিত স্বরবিন্যাস হচ্ছে পা হ্মা গা মা গা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বেহাগ সুরের গানে এটি একেবারে পাওয়া যায় না। অনেক গানে কড়িমধ্যম সম্পূর্ণ বর্জিত, যেমন ' স্বামী তুমি এসো আজ ' গানটিতে। কোনো কোনো গানে কড়িমধ্যম নেই কিন্তু শুদ্ধ 'নি'-র সঙ্গে কোমল 'নি'র ব্যবহার আছে। বেহাগ সুরের কিছু গানে রবীন্দ্রনাথ বেহাগ সুরের সঙ্গে খাম্বাজ মিশিয়েছেন, যেমন, ' [আজি তোমায়] আবার চাই শুনাবারে ' গানটিতে। (৪৭)  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬  



রাগসংগীতে একটি বিশেষ বাঙালি ধারার কথা বলতে হয় যা রবীন্দ্রনাথও বরাবর অনুসরণ করে গেছেন। " অনন্তসাগরমাঝে দাও তরী ভাসাইয়া " এই গানে বাগেশ্রীর একটা বিশেষ অলংকার প্রয়োগ করা হয়েছে। এইটি বাংলার নিজস্ব রীতি, ঠিক এই অলংকারটি দ্বিজেন্দ্রলালও প্রয়োগ করেছিলেন তাঁর "সকল ব্যথার ব্যথী আমি হই, তুমি হও সব সুখের ভাগী"-- এই বিখ্যাত নাট্যসংগীতে। পুরাতন বাংলা গানে একটি রীতি ছিল খুব সহজ সরল ভাবে রাগসংগীতের ঢঙে পূর্ণাঙ্গ কাব্যসংগীতকে রূপায়িত করা। এসব গানে চারটি কলিই রক্ষিত হত। " সখি ওই বুঝি বাঁশি বাজে ", " মরি লো মরি আমায় ", " এখনো তারে চোখে দেখিনি "-- প্রভৃতি গান এই আদর্শে রচিত। এগুলোতে আড়খেমটার চলন থাকলেও তা চটুল ভাবে আত্মপ্রকাশ করেনি এবং রাগসংগীতের আবেদনও উপেক্ষিত হয় নি।  

" ওগো শোনো কে বাজায় " গানটি প্রাচীন বেহাগের প্রতীকস্বরূপ। বাংলার বেহাগে কোমল নিষাদের প্রয়োগ হত এবং রবীন্দ্রনাথ তাঁর বেহাগে সর্বত্রই এই রীতি অনুসরণ করেছেন। এই প্রসঙ্গে রমাপতি বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত "সখি শ্যাম না এল"-- এই বিখ্যাত বেহাগটির কথা মনে পড়ে। এ ক্ষেত্রেও কোমল নিষাদের প্রয়োগ প্রণিধানযোগ্য। রবীন্দ্রনাথ নিশ্চিত ভাবে এ গান শুনেছিলেন কেননা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে রমাপতি কিছুকাল অবস্থান করেছিলেন। (৭)  
     --রাজ্যেশ্বর মিত্র, পুরাতন বাংলা গানের পটভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রসংগীতায়ন ২, সুচিত্রা মিত্র ও সুভাষ চৌধুরী সম্পাদিত, প্যাপিরাস ১৯৯০  


রবীন্দ্রনাথ পুরাতন বাংলা গানের সারল্য এবং অল্প কথার মধ্যে জ্ঞাপকতার রীতিকে গ্রহণ করলেন। এইখানেই তাঁর চিন্তার বিশেষত্ব। এ সম্বন্ধে তাঁর নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল বলে তাঁর ভাষা আধুনিক এবং বিশেষ পরিমার্জিত। তাঁর এই ধরনের গানের মধ্যে পুরাতনকে পাওয়া যায়, কিন্তু তাঁর স্বকীয়ত্বকে কোন ক্ষেত্রেই অস্বীকার করা যায় না। " নয়ন মেলে দেখি আমায় " গানের কাঠামো এবং ভঙ্গির সঙ্গে পুরাতন বাংলা গানের মিল খুব বেশী কিন্তু এ গান শুনলে এ যে রবীন্দ্রনাথের রচনা সেটা বুঝতে ভুল হয়না। এই ধরনের পুরাতন বাংলা গানের ঐতিহ্যকে রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ করেছেন কিন্তু প্রকাশভঙ্গির মধ্যে নিজের স্বাতন্ত্র্যকে রক্ষা করে গেছেন। আরও অনেক গানের উল্লেখ করা যায়, যেমন-- " ও যে মানে না মানা ", " ওগো শোনো কে বাজায় ", " বঁধু তোমায় করব রাজা " ইত্যাদি। প্রত্যেকটির মধ্যে পুরাতন গানের ঐতিহ্য রয়েছে অথচ প্রত্যেকটিই বিশেষভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত। (৯১)  
     --রাজ্যেশ্বর মিত্র, সঙ্গীতস্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ, শনিবারের চিঠি, রবীন্দ্র-শতবার্ষিকী সংখ্যা, বৈশাখ ১৩৬৭-৬৮ (পুনর্মুদ্রণ নাথ ব্রাদার্স, ১৯৯৮)।  


 

 

৫৬

        ওগো   শোনো কে বাজায়।
বন্ফুলের মালার গন্ধ বাঁশির তানে মিশে যায়॥
    অধর ছুঁয়ে বাঁশিখানি   চুরি করে হাসিখানি--
         বঁধুর হাসি মধুর গানে প্রাণের পানে ভেসে যায়॥
কুঞ্জবনের ভ্রমর বুঝি বাঁশির মাঝে গুঞ্জরে,
    বকুলগুলি আকুল হয়ে বাঁশির গানে মুঞ্জরে।
         যমুনারই কলতান   কানে আসে, কাঁদে প্রাণ--
              আকাশে ওই মধুর বিধু কাহার পানে হেসে চায়॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৮৬ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: নাসিকে সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে কিছুদিন কাটালেন। ভাইঝি প্রতিভা দেবীর সঙ্গে আশুতোষ চৌধুরীর বিবাহ। ৩রা জুলাই কলকাতার গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে 'রাজা বসন্ত রায়' (বউঠাকুরানীর হাটের নাট্যরূপ) উপস্থাপিত করা হয় । ২৫ অক্টোবর প্রথম সন্তান মাধুরীলতার (বেলা) জন্ম। কলকাতায় ভারতীয় কংগ্রেসের জাতীয় অধিবেশনে 'আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে' গান করেন। প্রকাশিত বই: কড়ি ও কোমল।

বহির্বিশ্বে: আমেরিকায় শিকাগো শহরে শ্রমিকদের সম্মানে প্রথম মে দিবস পালন। প্রথম ভারতীয় ক্রিকেট দলের ইংল্যাণ্ড সফর। প্যারিসে পাস্তুর ইন্‌স্টিটিউট প্রতিষ্ঠা। রামকৃষ্ণ পরমহংসের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: বিল্বমঙ্গল নাটক (গিরিশচন্দ্র ঘোষ), কোরানের বাংলা অনুবাদ (গিরিশ সেন), ডঃ জেকিল এ্যাণ্ড মিঃ হাইড (স্টিভেনসন), ডাস ক্যাপিটালের ইংরেজি অনুবাদ।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



শুধু একটি আবেগ বহন করে, শুধু বিশেষ একটি ব্যাকুলতা মনে জাগায়, এ গানগুলি এই জাতের রচনা। কিছু বলে না, অথচ সবই বলে। এমন বিশুদ্ধ আবেগ যে ভাষায় সম্ভব তা কি আমরা কখনো জানতুম। সংগীতের কাজ করিয়ে নিয়েছেন ভাষাকে দিয়ে, এত বড়ো শিল্পী তিনি। আমরা জানি সংগীতেরই ক্ষমতা আছে আমাদের মনের সেই প্রদেশ স্পর্শ করবার, যা সব চেয়ে ঘন, নিভৃত ও দুর্গম, গদ্যের যা অনধিগম্য, কাব্য যার প্রান্তটুকু মাত্র কখনো ছোঁয় কখনো ছোঁয় না; যে কথা হঠাৎ মনে প'ড়ে হারিয়ে যায়, ঘুম আর জেগে-ওঠার মধ্যে উজ্জ্বল অলীক সেতু রচনা করে, যে কথা মনে হয় যেন কতকাল আগে কোথায় শুনেছিলাম, যা ছায়াময়, সূক্ষ্ম-বিসর্পিত, অস্পষ্ট-স্মৃতি-বিজড়িত, সে-কথা এক সংগীতই আমাদের শোনাতে পারে -- এ কথা আমরা জানি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ভাষায় শুনিয়েছেন সে-কথা: কাব্যের স্বাদে যে অভ্যস্ত, তার কাছে রবীন্দ্রনাথের গান শোনা যতখানি রোমাঞ্চকর, তাঁর গান পড়া তার চেয়ে কম নয়; তাঁর গান পড়তে-পড়তেও সেই রহস্যময় জগতের দুয়ার খুলে যায় যা আমাদের প্রত্যেকের মনের মধ্যেই আছে, অথচ দৈনন্দিন জীবনে যাকে প্রায়ই ভুলে থাকি। আমার নিজের কথা বলতে পারি, রবীন্দ্রনাথের তিন-চারটির বেশি গান আমি এক সঙ্গে পড়তে পারিনে, হৃৎস্পন্দন  অত্যন্ত দ্রুত হয়, গলা যেন আটকে আসে।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১১