গীতবিতান-GITABITAN
তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না, করে শুধু মিছে কোলাহল।

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১২৯২ (১৮৮৬)
কবির বয়স: ২৪
প্রকাশ: চৈত্র ১২৯২ , আলোচনা পত্রিকা-পুষ্পস্তবক |
গানের বহি (ব্রহ্ম)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-বিবিধ; ৩৯৫/১৬৩
রাগ / তাল: ইমন-ভূপালী / একতাল
স্বরলিপি: ব্রহ্মসঙ্গীত ১; স্বরবিতান ৪
স্বরলিপিকার: কাঙালীচরণ সেন; ঐ
পাদটিকা:
১২৯২ ব্রাহ্ম সমাজের মাঘোৎসবে জোড়াসাঁকোতে গীত।
প্রচলিত ও [ স্বর ৪] ১ম সংস্করণের মধ্যে সুরভেদ আছে।  

আলোচনা

[মাঘোৎসবের গানের প্রসঙ্গে] বৈষ্ণব ভক্তদের কীর্তন ভাবেতে মজে দশাপ্রাপ্ত হয়ে ধূলায় অবলুণ্ঠন প্রধান, আর ১১ই মাঘের সঙ্গীত ভাবেতে উড্ডীন হয়ে মর্ত হতে স্বর্গে আরোহণ প্রধান। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর ভ্রাতাদেরসহ ১১ই মাঘের সঙ্গীতের আসরে নামলেন তখন ব্রহ্মের উপাসনায় হৃদয়ের কোণে কোণে যেখানে যত নদী খাল বিল শুকনো ছিল সব ভরে উঠল। আর "মনে কর শেষের সেদিন কি ভয়ঙ্কর" নয়, শুধু "তুমি অগম্য অপার" ইত্যাদি বর্ণনামূলক নির্গুণ ব্রহ্মের স্তুতি নয়। এখন হল সমস্ত বাহ্য বা অন্তর-প্রকৃতিতে প্রতিভাত সগুণ ঈশ্বরের আবাহন। বৈষ্ণবদের লক্ষ্মী বিষ্ণু বা শাক্তদের শিব কালীর স্থলে খ্রিস্টানদের Personal God-এর অবতারণা--

     বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে
    আজ আনন্দে প্রেমচন্দ্রে নেহারো [?]
হল--
     তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না
হল--
     অনেক দিয়েছ নাথ

Personal God-এর অনুভূতি নিরাকারত্বে হয় না। যিনি চক্ষুষঃ চক্ষুঃ শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং তাঁকে চক্ষুকর্ণবান চরণহস্তবান বলে কল্পনায় না আনলে অন্তরে তাঁকে অঙ্গবান করে না দেখলে তাঁকে পাওয়াই হয় না। তাই রামমোহন যুগের পরবর্তী ব্রহ্মোৎসবের রবীন্দ্রের ব্রহ্ম বা ঈশ্বর 'অপাণিপাদ' নন, তিনি 'সর্বতো অক্ষি' 'সর্বত্র শিরোমুখ'। তাই তাঁর পরিচালিত ১১ই মাঘে পরপর গাওয়া হয়েছে--
     বড় আশা করে এসেছি গো ;   আজি শুভদিনে পিতার ভবনে ;   সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে ;   হেরি তব বিমল মুখভাতি ;   এস হে গৃহদেবতা ; তব প্রেম-আঁখি সতত জাগে [তোমারি ইচ্ছা হউক পূর্ণ]     
হল--
     এ কি অন্ধকার ভারতভূমি

...ভাবের ও ভাষার পার্থক্য দেখলে চিনতে পারা যাবে রামমোহন রায়ের সময়কার নিরাকার ব্রহ্ম কেমন করে ভাবের ঘরে একদম সাকার হয়ে নেমে ব্রহ্মবাদীদের আকার-নিরাকার অভেদ জ্ঞানের ভিত্তিই পুনঃস্থাপিত করলেন। অথচ ভাবের ছবির চৌকাঠ পেরিয়ে গেলেই-- মাটি-খড়ে, ধাতু-প্রস্তরে, বর্ণে-চিত্রে ভাবের উপলক্ষ্য ভগবানকে পূর্ণ লক্ষ্য করে মূর্ত করে আঁকড়ে ধরলেই রবীন্দ্রনাথ উত্যক্ত বিচলিত হয়ে উঠতেন। তাঁর আজন্ম 'নিরাকার' পূজার সংস্কারে ঘা লাগত।  (৬৭)  
     --সরলা দেবী চৌধুরানী, জীবনের ঝরাপাতা, রূপা, কলকাতা, ১৯৮২  



 

 

৩৯৫

তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না, করে শুধু মিছে কোলাহল।
সুধাসাগরের তীরেতে বসিয়া পান করে শুধু হলাহল॥
আপনি কেটেছে আপনার মূল- না জানে সাঁতার, নাহি পায় কূল,
স্রোতে যায় ভেসে, ডোবে বুঝি শেষে, করে দিবানিশি টলোমল॥
আমি কোথা যাব, কাহারে শুধাব, নিয়ে যায় সবে টানিয়া।
একেলা আমারে ফেলে যাবে শেষে অকূল পাথারে আনিয়া।
সুহৃদের তরে চাই চারি ধারে, আঁখি করিতেছে ছলোছল,
আপনার ভারে মরি যে আপনি কাঁপিছে হৃদয় হীনবল॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৮৬ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: নাসিকে সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে কিছুদিন কাটালেন। ভাইঝি প্রতিভা দেবীর সঙ্গে আশুতোষ চৌধুরীর বিবাহ। ৩রা জুলাই কলকাতার গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে 'রাজা বসন্ত রায়' (বউঠাকুরানীর হাটের নাট্যরূপ) উপস্থাপিত করা হয় । ২৫ অক্টোবর প্রথম সন্তান মাধুরীলতার (বেলা) জন্ম। কলকাতায় ভারতীয় কংগ্রেসের জাতীয় অধিবেশনে 'আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে' গান করেন। প্রকাশিত বই: কড়ি ও কোমল।

বহির্বিশ্বে: আমেরিকায় শিকাগো শহরে শ্রমিকদের সম্মানে প্রথম মে দিবস পালন। প্রথম ভারতীয় ক্রিকেট দলের ইংল্যাণ্ড সফর। প্যারিসে পাস্তুর ইন্‌স্টিটিউট প্রতিষ্ঠা। রামকৃষ্ণ পরমহংসের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: বিল্বমঙ্গল নাটক (গিরিশচন্দ্র ঘোষ), কোরানের বাংলা অনুবাদ (গিরিশ সেন), ডঃ জেকিল এ্যাণ্ড মিঃ হাইড (স্টিভেনসন), ডাস ক্যাপিটালের ইংরেজি অনুবাদ।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



রবীন্দ্রসঙ্গীতের যা শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, সেখানে রবীন্দ্রনাথের রচনা তাঁর সেরা ছবির মতোই সতেজ, সাবলীল ও অননুকরণীয়। এখানে রাগরাগিণীর প্রশ্ন আসে না, বাউল-কীর্তনের প্রশ্ন আসে না, বাদী-সম্বাদীর প্রশ্ন আসে না। এখানে সবটাই আছে, আবার সবই যেন নতুন। এমনকি এখানে কথা ও সুরের সামঞ্জস্যের বিচারটাও অবান্তর বলে মনে হয়, কারণ সব শ্রেষ্ঠ শিল্পরচনার মতোই এ গানও বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে। এসব গানের আদর্শগীতরূপ আজ স্বপ্নের বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।