গীতবিতান-GITABITAN
আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী।

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ২৫ আশ্বিন ১৩০২ (১৮৯৫)
কবির বয়স: ৩৪
রচনাস্থান: শিলাইদহ
প্রকাশ: ১৮৯৬,আশ্বিন ১৩০৩ , কাব্যগ্রন্থাবলী (গান) |
The Music of Hindosthan, Fox-Strangways; Sheaves
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রেম-প্রেমবৈচিত্র্য; ৮৬/৩০৬
রাগ / তাল: খাম্বাজ / একতাল
স্বরলিপি: গীতিমালা; শতগান; শেফালি; স্বরবিতান ৫০ (শেফালি)
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; সরলা দেবী; দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
কীর্তন।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-কৃত এবং দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর-কৃত 'শেফালি'-র স্বরলিপিগুলির সঙ্গে সুরভেদ আছে।  

আলোচনা

বহু-বাল্যকালে একটা গান শুনিয়াছিলাম,' তোমায় বিদেশিনী সাজিয়ে কে দিলে!' সেই গানের ঐ একটিমাত্র পদ মনে এমন একটি অপরূপ চিত্র আঁকিয়া দিয়াছিল যে আজও ঐ লাইনটা মনের মধ্যে গুঞ্জন করিয়া বেড়ায়। একদিন ঐ গানের ঐ পদটার মোহে আমিও একটি গান লিখিতে বসিয়াছিলাম। স্বরগুঞ্জনের সঙ্গে প্রথম লাইনটা লিখিয়াছিলাম, 'আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী' সঙ্গে যদি সুরটুকু না থাকিত তবে এ গানের কী ভাব দাঁড়াইত বলিতে পারিনা। কিন্তু ঐ সুরের মন্ত্রগুণে বিদেশিনীর এক অপরূপ মূর্তি জাগিয়া উঠিল। আমার মন বলিতে লাগিল, আমাদের এই জগতের মধ্যে একটি কোন্‌ বিদেশিনী আনাগোনা করে -- কোন রহস্যসিন্ধুর পরপারে ঘাটের উপরে তাহার বাড়ি -- তাহাকেই শারদপ্রাতে মাধবীরাত্রিতে ক্ষণে ক্ষণে দেখিতে পাই -- হৃদয়ের মাঝখানেও মাঝে মাঝে তাহার আভাস পাওয়া গেছে, আকাশে কান পাতিয়া তাহার কণ্ঠস্বর কখনো বা শুনিয়াছি। সেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশ্ববিমোহিনী বিদেশিনীর দ্বারে আমার গানের সুর আমাকে আনিয়া উপস্থিত করিল এবং আমি কহিলাম "ভুবন ভ্রমিয়া শেষে / এসেছি তোমারি দেশে,  / আমি অতিথি তোমারি দ্বারে, ওগো বিদেশিনী । "  
     --রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনস্মৃতি, গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ, বিশ্বভারতী, ১৯১২  



মুসোলিনির নিমন্ত্রণে ১৯২৬ সালের জুন মাসে রবীন্দ্রনাথ ইটালি যান। সেখানে টুরিন শহরে ২০শে জুন এক মহতী সভায় তাঁর বক্তৃতার পরে শ্লাভালিপো এভিট্‌জকা নামে এক মহিলা কবি তিনটি বাংলা গান করেন -- ' হে মোর দেবতা ', ' আমি চিনি গো চিনি ' ও ' যদি তোর ডাক শুনে কেউ '। সেই সফরের ভ্রমণসঙ্গিনী নির্মলকুমারী মহলানবিশ লিখছেন: "বিদেশী ঢং-এ গাওয়া হলেও তার স্বদেশী রঙ চাপা পড়েনি। বিশেষ করে 'যদি তোর ডাক শুনে' গানটা যেন চিরকালের চেনা সুরেই শুনতে পেলাম। শ্রোতার দল কবির সঙ্গীতের আভাস পেয়ে প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত, হাততালি বহুক্ষণ আর থামে না। " (৯৮)  
     --সমীর সেনগুপ্ত, গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, ২০০৮  


'শাতোব্রিয়ঁ যেমন ফ্রান্স হইতে বাংলাদেশ পর্যন্ত আসিয়াছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তেমনই বাংলাদেশ হইতে ইংলণ্ডে গিয়া পৌঁছিলেন' [নীরদ চৌধুরী]। কোন্‌ গানে আছে রবীন্দ্রনাথের ইংলণ্ডে পৌঁছবার এই মানস-ইতিহাস? নীরদচন্দ্রের বিবেচনায় সে হলো, 'আমি চিনি গো তোমারে'।

...বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিশ্ববিমোহিনী কোনো অপরূপ নারীমূর্তির স্মৃতিতেই যে ওই গানটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তা বুঝতে পারেন নীরদচন্দ্র। ১৮৯০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে 'য়ুরোপযাত্রীর ডায়ারি'তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে তাঁর বিশ্বাস 'ইংরাজ মেয়েদের মতো সুন্দরী পৃথিবীতে নেই। নবনীর মতো সুকোমল শুভ্র রঙের উপর একখানি পাতলা টুকটুকে ঠোঁট, সুগঠিত নাসিকা, এবং দীর্ঘপল্লববিশিষ্ট নির্মল নেত্র-- দেখে পথকষ্ট দূর হয়ে যায়। '  এরই কথা ভেবে না কি লেখা হয়েছিল 'আমি আকাশে পাতিয়া কান'। ১৮৯৫ সালে লেখা এই গানটির এইসব ভাষা থেকে নীরদচন্দ্র বুঝে নিতে পারেন ১৮৯০ সালের ওই জীবনঘটনাটুকু। (১৫)  
     --শঙ্খ ঘোষ, দামিনীর গান, প্যাপিরাস, ১৪০৯  


আর্নল্ড বাকে রবীন্দ্রনাথের গান সম্বন্ধে লিখেছিলেন: "This music... does not bear harmonization [26 songs...]"। কিন্তু ঠাকুর পরিবার-ঘনিষ্ঠ সংগীতজ্ঞরাই সেই মত অগ্রাহ্য করেছিলেন। এঁদের বেশ কয়েকজনেরই এ-বিষয়ে বিষম আগ্রহ ছিল।  

১৩২১ ভাদ্র আনন্দসঙ্গীত পত্রিকায় "আমি চিনি গো চিনি" গানটির দু-সুরী স্বরলিপি প্রকাশ করেন ইন্দিরা দেবী। পাদটিকায় বলা ছিল: "সঙ্গীত সঙ্ঘের বার্ষিক সঙ্গীতোৎসবের দিন সঙ্ঘের ছাত্রছাত্রীগণ দ্বারা সেতার এস্রাজ দুই ভাগে একত্র বাদিত হইয়াছিল। দুইটি ইংরাজ মহিলাও গীটার যন্ত্র লইয়া এই ঐক্যবাদনে যোগ দিয়াছিলেন । "  (২২০)  
     --সন্‌জীদা খাতুন, "রবীন্দ্রসংগীতে স্বরলিপির কথা", রবীন্দ্রনাথের গান:সঙ্গ অনুষঙ্গ, প্যাপিরাস, ২০০১  


রবীন্দ্রনাথ বরাবরই তাঁর গানের সুরে কর্ড প্রয়োগ এবং হার্মোনাইজেশনের কাজে উৎসাহ দিতেন। এই সব উদ্যমের পাকা দলিল এখন অবশ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। ১৮৮৪তে সরলা দেবী " সকাতরে ওই কাঁদিছে " গানে কর্ড প্রয়োগের যে চেষ্টা করেন, রবীন্দ্রসংগীতকে হার্মনাইজ করবার সেটা সম্ভবত সর্বপ্রথম নিদর্শন [গানের তথ্য পশ্য]। আর একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন আছে ১৩০১ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের 'সাধনা' পত্রিকায়। এটি পূর্বোক্ত দৃষ্টান্তের মতন অপরিণত হাতের কাজ নয়। ঠাকুরবাড়ির পাশ্চাত্য সংগীতশিক্ষক সিঁয়োর মন্‌জাতো 'মায়ার খেলার'র অন্তর্গত " পথহারা তুমি পথিক যেন গো " গানটির স্বরসন্ধি রচনা করেন। সাধনা পত্রিকায় তার পূর্ণাঙ্গ স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছে এবং ভূমিকায় বলা হয়েছে:

    "কেহ কেহ আপত্তি করেন, মিশ্রমিল আমাদের সংগীতের অনুপযোগী, উহার দ্বারা আমাদের রাগরাগিণীর রূপ রক্ষা করা কঠিন। অলংকারের অতিপ্রাচুর্যে রূপের স্ফূর্তিহানি হয় বটে কিন্তু যথাযোগ্যরূপে স্বল্প অলংকার প্রয়োগ করিলে কি তাদের রূপ আরও ফুটিয়া উঠে না?"

১৯২১-২২ সালের আনন্দসঙ্গীত পত্রিকায় এই জাতেয় কয়েকটি প্রয়াসের নিদর্শন পাওয়া যায় [বন্ধনীতে স্বরলিপিকার]: " আমি চিনি গো চিনি " (ইন্দিরা দেবী); "সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং" (সরলা দেবী) [অন্যান্য তথ্য বিভাগে 'মন্ত্রগান' পৃষ্ঠা পশ্য]; " বড়ো আশা করে " (অশোকা দেবী), " তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে "-- প্রভৃতি মুদ্রিত ও প্রকাশিত স্বরলিপিগুলিতে নিঃসন্দেহে এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কৌতূহল এবং সমর্থনের দ্যোতনা পাওয়া যায়। (৩৭)  
     --ভাস্কর মিত্র, রবীন্দ্রনাথ ও পাশ্চাত্য সংগীত, রবীন্দ্রসংগীতায়ন ২, সুচিত্রা মিত্র ও সুভাষ চৌধুরী সম্পাদিত, প্যাপিরাস ১৯৯০  


 

 

৮৬

আমি    চিনি গো চিনি  তোমারে ওগো বিদেশিনী।
তুমি    থাক সিন্ধুপারে   ওগো বিদেশিনী॥
তোমায়   দেখেছি শারদপ্রাতে,   তোমায়   দেখেছি মাধবী রাতে,
তোমায়   দেখেছি হৃদি-মাঝারে   ওগো বিদেশিনী।
আমি    আকাশে পাতিয়া কান   শুনেছি   শুনেছি তোমারি গান,
আমি    তোমারে সঁপেছি প্রাণ   ওগো বিদেশিনী।
ভুবন    ভ্রমিয়া শেষে   আমি   এসেছি নূতন দেশে,
আমি    অতিথি তোমারি দ্বারে   ওগো বিদেশিনী॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

Ami chini go chini

I KNOW, I know thee, O thou Bideshini*; thou dwellest on the other shore of the ocean.
  I have seen thee in the autumn, I have felt thee in the spring night. I have found thee in the midst of my heart, O thou Bideshini.
  Putting my ear to the sky* I have heard thy music, and I have offered to thee my life, O thou Bideshini.
  I have roamed all through the world and have come at last into the strange country. Here I am a guest at thy door, O thou Bideshini.

[*Bideshini: O thou stranger lady ; perhaps, Intellectual Beauty.
**Akasa, space: the source of all sound and speech.]
  
     --Rabindranath Tagore, in The Music of Hindostan, A.H. Fox Strangways, Oxford, 1914.  



Mr. Tagore writes: I heard -when I was very young the song "Who dressed you like a foreigner?" and that one line of the song painted such a strange picture in my mind that even now it is sounding in my memory. 1 once tried to compose a song myself under the spell of that line. As I hummed the tune I wrote the first line of the song " I know thee, thou stranger", and, if there were no tune to it, I don t know what would be left of the song. But under the spell (mantra) of the tune the mysterious figure of that stranger was evoked in my mind. My heart began to say, " There is a stranger going to and fro in this world of ours ; her house is on the further shore of an ocean of mystery. Sometimes she is to be seen in the autumn morning, sometimes in the flowery midnight ; sometimes we receive an intimation, of her in the depths of our heart, sometimes I hear her voice when I turn my ear to the sky. ...

One day, long afterwards, some one went along the road singing, "How does that unknown bird go to and away from the cage ? Could I but catch it, I would put the chain of my mind about its feet!" I saw that that BauL song too said the very same thing. Sometimes the unknown bird comes to the closed cage and speaks a word of the limitless Unknown. Then the mind would keep it for ever, but cannot. What but the tune of a song could report the coming and going of this unknown bird? Because of this I always feel hesitation in pub lishing a book of songs, for in such a book the main thing is left out. To set forth the music's vehicle and leave out the music itself is just like keeping the mouse and leaving out Ganapati himself. (90)
  
     --Rabindranath Tagore, in The Music of Hindostan, A.H. Fox Strangways, Oxford, 1914.  


A different kind of interest and a still greater pleasure was afforded by a visit to Rabindranath Tagore, the Bengali poet. In accordance with the best Indian tradition he is poet and musician in one. His poetry is beginning to speak to us for itself : even in a few scattered translations it is possible to hear the voice of a man. who thinks deeply and truly, who sees things as they really are, making- invisible things visible as florescence does in optics, and touching them with tenderness and reverence. To hear him recite his poems is to be reminded of the way in which Tennyson is said by his biographer to have recited Maud ; and indeed such a line as "Laborious orient ivory sphere in sphere" has something of the ring of Bengali verse about it, while the terseness, the inheritance of the Sutras, of a language which is the descendant of that compact wonder, Sanskrit, we could hardly parallel short of Horace. To hear him sing them is to realize the music in a way that it is seldom given to a foreigner to do. The notes of the song are no longer their mere selves, but the vehicle of a personality, and as such they go behind this or that system of music to that beauty o sound which all systems put out their hands to seize. These melodies are such as would have satisfied Plato. I do not know the modes/ said Socrates, but leave me one that will imitate the tones and accents of a brave man enduring danger or distress, fighting with constancy against fortune ; and also one fitted for the work of peace, for prayer heard by the gods, and for the successful persuasion or exhortation of men. (92)  
     --A.H. Fox Strangways, The Music of Hindostan, Oxford, 1914  


Another version:

The Strange Lady

I KNOW you, I know you,
    O lady from a strange land!
  You live over across the sea,
    O lady from a foreign land!
  I have seen you in the autumn morn,
  I have seen you in the summer night,
  I have seen you in my heart,
    O lady from a strange land!
  Laying my ear to the sky
  I have heard, .oh, I have heard your song,
  I have yielded to you my heart,
    O lady from a strange land!
  After roaming over the world I have come
      to a new land,
  I am a guest at your door,
    O lady from a strange land!
  
     --Nagendranath Gupta, Sheaves, Indian Press, Allahabad, 1929  



১৮৯৫ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: সুরেন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথের সঙ্গে কুষ্টিয়ায় 'টেগোর অ্যাণ্ড কোং'-এর প্রতিষ্ঠা। মাসিক পত্রিকা 'সাধনা'-র প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হোলো। সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাদিবসে বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ  নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ। হিন্দিতে 'চিত্রাঙ্গদা', গোপালরাম গেহেরী অনুবাদক, বোম্বাই থেকে প্রকাশিত হোলো। এটি কবির বইয়ের প্রথম অনুবাদ। প্রকাশ: গল্প দশক।

বহির্বিশ্বে: মার্কনি প্রথম বেতারে বার্তা পাঠালেন। রঞ্জন রশ্মি আবিষ্কৃত হোলো। লুমিয়েররা চলচ্চিত্রের জন্য বিশেষ ক্যামেরা তৈরি করলেন। প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন প্যারিসে।  চতুর্বার্ষিক অলিম্পিক ক্রীড়া-সম্মিলন চালু করার প্রস্তাব নেওয়া হোলো। ফেডারেটেড মালয় স্টেট্‌স্‌ গঠন। ফ্রেডেরিক এঙ্গেল্‌সের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম: দি টাইম মেশিন (ওয়েল্‌স), দাস্‌ ক্যাপিটাল ৩ (মার্ক্‌স)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


তারপরেও ["সকাতরে ওই" পশ্য] "চিনি গো চিনি বিদেশিনী" প্রভৃতি অনেকগুলি রবীন্দ্রগান ... আমার হাতে সেই রকমে য়ুরোপীয়ান্বিত হয়েছিল। অন্তরটি এদের একহারা দিশী সুর, বাইরের শরীরটা তাদের উচ্চ নীচ নানা সপ্তকে নানা সুরের অবিসম্বাদী মিলনময় একটি রূপ। এসব গান শেখান এবং গাওয়ানও হয়েছে অনেকবার অনেক সঙ্গীত সভায়। ইংরেজী স্বরলিপি প্রথায় লেখার শ্রমও করেছেন মেজমামার [সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর] কন্যা ইন্দিরা দেবী, কিন্তু বই করে কোনদিন ছাপান হয়নি। ছাপাখানার সুযোগের অভাবে, কিম্বা আমার ভিতর থেকে সে বিষয়ে দুর্দমনীয় আগ্রহের ও চেষ্টার অভাবে। (৩২)  
     --সরলা দেবী চৌধুরানী, জীবনের ঝরাপাতা, রূপা, কলকাতা, ১৯৮২  


[স্যার রাজেন মুখুয্যের বাড়ি হারকোর্ট বাটলারের বর্মায় গবর্নর হয়ে যাওয়ার উপলক্ষে বিদায়] ডিনারের পর আমার গান হল। ওঁদের ফরমাস ছিল-- ইংরেজী রকমে হার্মোনাইজ করা কোন গান গাইবার। আমি প্রথমে "ওগো বিদেশিনি" পরে "সুন্দর বসন্ত বারেক ফিরাও" [সরলাদেবীর স্বরচিত, উৎস 'শতগান'] গাইলুম। বিদায়কালে অতীব ভদ্র স্যার হারকোর্ট আমার কাছে এসে গম্ভীরভাবে দেহ অবনত করে bow করে আমায় সুমধুর সঙ্গীত-এর জন্য ধন্যবাদ দিলেন। (৭৫)  
     --সরলা দেবী চৌধুরানী, জীবনের ঝরাপাতা, রূপা, কলকাতা, ১৯৮২  


" আমি চিনি গো চিনি " গানটিতে লিপ দিতে গিয়ে কিশোরকুমার যে কত বড়ো গাইয়ে টের পেয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, জানিয়েছিলেন সৌমিত্রবাবু 'সারেগা' পত্রিকার ১৪০৮ শারদ সংখ্যায়। তিনি কিশোরকুমারের গলায় শোনা আর একটি গানের কথা উল্লেখ করেছেন, " দিন যদি হল অবসান "। এই গানটি সৌমিত্রবাবু যতজনের গলায় শুনেছেন, সবসময়েই মনে হয়েছে এটি ব্যথাতুর গান। অথচ গানটির বাণী অন্য কথা বলে। গানের ভিতরকার এই আনন্দের ভাবটি তিনি কিশোরকুমারের গলাতেই প্রথম পেলেন। সৌমিত্রবাবু অবশ্য জানান নি, যে মেমসাহেবের ফটো দেখিয়ে, নেচে নেচে, এবং শেষ পর্যন্ত 'বৌঠাকুরাণী'র নাম নিয়ে "আমি চিনি গো চিনি" গানটির ভাব ওই গানের বাণীতে ছিল কি না।

প্রমথনাথ বিশী শান্তিনিকেতনে ছাত্রাবস্থায় শুনেছিলেন, তাঁর এক অবাঙালি অধ্যাপক উত্তেজিত হয়ে গানটি [আমি চিনি গো চিনি] গাইছিলেন এবং ভাবছিলেন গুরুদেব চিনির ওপর গান লিখেছেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা বিলিতি চিনি। (১০৩)  
     --নিত্যপ্রিয় ঘোষ, রবীন্দ্রসংগীতের শ্রোতা, রবীন্দ্রনাথের গান:সঙ্গ অনুষঙ্গ, আলপনা রায় সম্পাদিত, প্যাপিরাস, ২০০২