গীতবিতান-GITABITAN
যা ছিল কালো-ধলো তোমার রঙে রঙে রাঙা হল।

null

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩১৭ (১৯১০)
কবির বয়স: ৪৯
প্রকাশ: পৌষ ১৩১৭ , রাজা নাটক র-র ১০ |
অরূপরতন;গান (১৯১৪)
The King of the Dark Chamber - Kshitish Sen
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রেম-প্রেমবৈচিত্র্য; ৮৭/৩০৭
রাগ / তাল: বাউল / দাদরা
স্বরলিপি: স্বরবিতান ৪২ (অরূপরতন)
স্বরলিপিকার: অনাদিকুমার দস্তিদার
পাদটিকা:
বাউলের দলের গান।  

আলোচনা

  

চুম্বক প্রকাশ
   তৃতীয় দৃশ্য: কুঞ্জ-দ্বার। ঠাকুরদা ও দেশী পথিকদের প্রবেশ

ঠাকুরদা। কী ভাই, হল তোমাদের ?
কৌণ্ডিল্য। খুব হল ঠাকুরদা। এই দেখো-না একেবারে লালে লাল করে দিয়েছে। কেউ বাকি নেই।
ঠাকুরদা। বলিস কী? রাজাগুলোকে সুদ্ধ রাঙিয়েছে না কি?
জনার্দন। ওরে বাস রে! কাছে ঘেঁষে কে! তারা সব বেড়ার মধ্যে খাড়া হয়ে রইল... ।
      [বাউলের প্রবেশ]

       গান (বাউল): " যা ছিল কালো ধলো"

ঠাকুরদা। বেশ ভাই, বেশ -- খুব খেলা জমেছিল?
বাউল। খুব খুব। সব লালে লাল। কেবল আকাশের চাঁদটাই ফাঁকি দিয়েছে -- সাদাই রয়ে গেল।  


  


   ১৯১১ সালেই মনে হচ্ছে আমি প্রথম যাই শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের জন্মোৎসবে। ... [কুশলপ্রশ্নাদির] পরে বললেন, "আজ রাত্রে আমাদের 'রাজা' অভিনয় আছে জান তো?' জানতাম, তাই সকলেই বললাম, "হ্যাঁ জানি। "  ... সকলেরই আমাদের বিশেষ আগ্রহ অভিনয় দেখার। রবীন্দ্রনাথের অভিনয়ের কথা এত শুনেছি। গেলাম 'রাজা' অভিনয় দেখতে। এখানেও দেখলাম সেই খড়ের চালের ঘর। স্টেজ ইত্যাদি সেরকম কিছু নেই। দৃশ্য বা 'সিন' কিছুই দেখলাম না। উঁচু মতন একটু জায়গা, সেইখানেই হল অভিনয়, শুধু নটরাজের মূর্তি আঁকা একট 'ড্রপসিন' ঝুলছে দেখলাম। আর আমরা সেই ঘরের মাটিতে বসে দেখলাম অভিনয়। রবীন্দ্রনাথ করলেন 'রাজা'র পার্ট দৃশ্যত তাঁকে দেখা গেল না। অলক্ষ্যে রইলেন বটে ক্নিতু তাঁর অনন্যসাধারণ প্রতিভা যাবে কোথায়, মুহূর্তেই তা প্রতিভাত হল আমাদের সামনে। 'রাজা'কে চিনে নিতে আমাদের দেরী হল না। সবকিছুকে নিখুঁত করে সম্পন্ন করবার এক অসাধারণ ক্ষমতা দেখেছি তাঁর। আমার এক মামা সুধীরঞ্জন দাশ-- পরে সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি ও বিশ্বভারতীর উপাচার্য-- হয়েছিলেন 'সুদর্শনা'। বেশ ভালো করেছিলেন। অজিতকুমার চক্রবর্তী হয়েছিলেন 'সুরঙ্গমা'। তাঁর ' বিরহ মধুর হ'ল আজি ' গানটি মনে পড়ে। দিনুদা হয়েছিলেন 'ঠাকুরদা'। মনে আছে কালি ঝুলমাখা কতকগুলো কাপড়ের টুকরো পোশাকের সঙ্গে এখানে ওখানে ঝুলিয়ে দিনুদার গাইতে গাইতে প্রবেশ--

     তোরা যে যা বলিস ভাই

সে যে কী ভালোই লেগেছিল, এমন নতুন ধরনের আর এমন অদ্ভুত মনে হয়েছিল। এমন অনাড়ম্বর সবকিছুর মধ্যে যে এমন একটা জিনিস ফুটে উঠতে পারে তা দেখতে পাবার আনন্দে বিভোর হয়ে রাত কেটে গেল। (১০১)  
     --সাহানা দেবী, স্মৃতির খেয়া, প্রাইমা পাবলিকেশনস, কলকাতা, ২০০৪  


ঐ একই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন সীতা দেবী। তিনি লিখছেন

সন্ধ্যার পর 'রাজা' অভিনয় আরম্ভ হইল। তখন 'নাট্যঘর'-নামক একটি বড় মাটির ঘরে অভিনয় হইত। 'রাজা' অভিনয় দেখিয়া একেবারে বিস্মিত ও মুগ্ধ হইয়া গেলাম। রবীন্দ্রনাথ 'ঠাকুরদা' সাজিয়াছিলেন, আড়াল হইতে 'রাজা'র ভূমিকাও তিনিই অভিনয় করিয়াছিলেন। ঠাকুরদা সাজিতে তাঁহাকে বিশেষ কষ্ট পাইতে হয় নাই। সদাসর্বদা যে গেরুয়া রঙের পোশাক পরিতেন, তাহার উপর ফুলের মালা পরিয়া তিনি রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করিলেন। ঠাকুরদা যেখানে রাজসেনাপতির বেশে আবির্ভূত হইলেন, সেখানে অবশ্য বেশের পরিবর্তন হইল। রবীন্দ্রনাথের অভিনয়ের আর কি বর্ণনা দিব! তাঁহার সবকিছুর তুলনা একমাত্র তাঁঁহাতেই মিলিত। একটি জিনিস আমার সর্বদা মনে হইত, যখনই তাঁহার অভিনয় দেখিতাম-- তিনি যে ভূমিকায়ই অবতীর্ণ হোন, তিনি যে রবীন্দ্রনাথ ইহা কিছুতেই ভুলিতে পারিতাম না। আত্মগোপন করা তাঁহার পক্ষে অসম্ভব ছিল, যদিও তিনি অতি উৎকৃষ্ট প্রথম শ্রেণীর অভিনেতা ছিলেন। আকাশে সূর্যকে যেমন সাজাইয়া তারকার মূর্তি ধরানো যায় না, তাঁহাকেও তেমনি অন্য কাহারও মূর্তি ধরানো যাইত না।

দিনেন্দ্রনাথ কালিঝুলি মাখিয়া, আলখাল্লার উপর নানা রঙের ন্যাকড়ার ফালি ঝুলাইয়া মঞ্চে প্রবেশ করিলেন। তিনি পাগল সাজিয়াছিলেন। তাঁহার চেহারা দেখিয়া দুই-তিনটি শিশু কাঁদিয়া উঠিল। অজিতকুমার চক্রবর্তী রানী সুদর্শনা, ও তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুরঙ্গমা সাজিয়াছিলেন। নাটকের ভিতর অনেকগুলি গান ছিল, তাহার কয়েকটি বাদ দেওয়া হইয়াছিল। পরে শুনিলাম, অভিনয় বেশি দীর্ঘ হইলে অতিথিরা পাছে ক্লান্ত হইয়া পড়েন, তাই এই ব্যবস্থা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই করিয়াছিলেন। ক্লান্ত অবশ্য কেহই হন নাই, হইতেনও না। ছেলেদের গানগুলি অতি সুন্দর হইয়াছিল। তাহাদের মধ্যবর্তী ঠাকুরদারূপী কবিবরের নৃত্য দেখিয়া মুগ্ধ হইয়া গিয়াছিলাম। তিনি অতি সুন্দর নৃত্য করিতে পারিতেন। তাঁহার বৃদ্ধ বয়সের মূর্তি শুধু যাঁহারা দেখিয়াছেন তাঁহারা বঞ্চিত হইয়াছেন। (১০)  
     --সীতা দেবী, পুণ্যস্মৃতি, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৩৯০  


১৯৩৫ খ্রীস্টাব্দের শেষে কলিকাতায় 'রাজা' অভিনয় হয়। ৭৪ বৎসর বয়সেও তিনি রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হইলেন ঠাকুরদাদা-রূপে, আড়াল হইতে 'রাজা'র ভূমিকাও অভিনয় করিলেন। ইহার পর তিনি বোধহয় আর অভিনয় করেন নাই। ১৯৩৬ খ্রীস্টাব্দে নিউ এম্পায়ার থিয়েটারে যখন 'চিত্রাঙ্গদা' অভিনীত হইল তখন তিনি স্টেজে আসিয়া বসিয়াছিলেন বটে, তবে অভিনয়ে কোনো অংশ গ্রহণ করেন নাই। (২২১)  
     --সীতা দেবী, পুণ্যস্মৃতি, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৩৯০  


 

 

৮৭

যা ছিল কালো-ধলো      তোমার   রঙে রঙে রাঙা হল।
যেমন  রাঙাবরন তোমার চরণ      তার সনে আর ভেদ না র'ল॥
রাঙা হল বসন-ভূষণ,    রাঙা হল শয়ন-স্বপন--
মন    হল কেমন দেখ্‌ রে, যেমন       রাঙা কমল টলোমলো॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

A LL blacks and whites have lost their distinction
  And have become red--red as the tinge of your feet.
  Red is my bodice and red are my dreams,
  My heart sways and trembles like a red lotus.
  
     --Kshitish Chandra Sen, The King of Dark Chambers, Macmillan, New York, 1914.  



১৯১০ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  রথীন্দ্রনাথের বিবাহ। 'রাজা' রচনা। শান্তিনিকেতনের নানা উন্নতি -- মেয়েদের বোর্ডিং, শিশুদের জন্য নতুন বাড়ি, ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি। 'প্রায়শ্চিত্ত' অভিনয়, ধনঞ্জয় বৈরাগীর ভূমিকায় কবি। প্রকাশ: শান্তিনিকেতন ৯-১১, গোরা, গীতাঞ্জলি, রাজা।

বহির্বিশ্বে: লণ্ডনে ইণ্ডিয়া সোসাইটির প্রতিষ্ঠা, রদেন্‌স্টাইন সভাপতি, ফক্স স্ট্র্যাংওয়েজ সম্পাদক -- এই সোসাইটিই প্রথম ইংরেজি গীতাঞ্জলি প্রকাশ করে। সপ্তম এডওয়ার্ডের মৃত্যু, পঞ্চম জর্জ পরবর্তী ব্রিটিশ সম্রাট। জাপানের কোরিয়া জয়। পর্তুগালে প্রজাতন্ত্র স্থাপন। চীনে দাসত্ব প্রথার বিলোপ। নাসিক মামলায় বিনায়ক সাভারকারের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর। লিও টলস্টয়, ফ্লোরেন্‌স নাইটিংগেল ও রেড ক্রসের প্রতিষ্ঠাতা ডুনাণ্টের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: হাওয়ার্ড্‌স এণ্ড (ফর্স্টার), দি ভিলেজ (বুনিন)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮