গীতবিতান-GITABITAN
বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে।

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  আশ্বিন ১৩০২ (১৮৯৫)
কবির বয়স: ৩৪
রচনাস্থান: শিলাইদহ
প্রকাশ: ১৮৯৬,আশ্বিন ১৩০৩ , কাব্যগ্রন্থাবলী (গান)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রকৃতি-সাধারণ; ১/৪২৭
রাগ / তাল: শঙ্ক‌রাভরণ / ঝাঁপতাল-কাহারবা
স্বরলিপি: গীতিমালা;শতগান-- দুটিই সম্পূর্ণ
কেতকী; শেফালি -- দুটিই আংশিক; স্বরবিতান ৩৬ ;স্বরবিতান ১১ (কেতকী);স্বরবিতান ৫০ (শেফালি)

স্বরলিপিকার: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর; সরলা দেবী;
দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ; দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ইন্দিরা দেবী (বিকল্প); ঐ; ঐ
পাদটিকা:
অন্য-ভাঙা গান, 'নাদবিদ্যা পরব্রহ্মরস', মারাঠি ভজন, প্রাপ্তিস্থান - ইন্দিরা দেবী [ র-ত্রি ];[ র-ভা ]। একই আদর্শে রচিত: ' বিশ্বরাজালয় 'এ।  তাল ঝাঁপতাল ও কাওয়ালি [ স্বর ]। ৪- ৯ আশ্বিনের মধ্যে রচিত, শিলাইদহে বোটে।
স্বরবিতানের মূল অংশেই দুটি স্বরলিপি আছে, প্রথমটি ইন্দিরা দেবী-কৃত (আগে মুদ্রিত ছিল না) ও সুরান্তরিত দ্বিতীয়টি দিনেন্দ্রনাথের করা।
পাঠভেদ:
শুনি রে শুনি মর্মর পল্লবে-পুঞ্জে...
মৃদু বায়ু-হিল্লোল-বিল্লোল-বিভোল...
অনিল সঞ্চারে ধীরে
  --[ গীবিন ] ১ম সং ১৩৩৮।  

আলোচনা

আদর্শ গান:

    শঙ্করাভরণ/ ঝাঁপ ও কাহারবা-তালফেরতা (মধ্যলয়)

      নাদবিদ্যা পরব্রহ্মরস জানরে
      রে গা মা পা, মা গা রে গা,
    গা মা পা মা গা রে, গা মা গা রে,
      সা রে সা রে গা রে সা সা।
    শ্রীল বীণা, সরস সঙ্গীত মধুরিমা
        রঞ্জিতাম রসমঞ্জুমা
      রঞ্জিত শ্রী কুচবিহার কুঙ্কুমরস
  তত মঞ্জুল তত মঞ্জুল তত মঞ্জুল বঞ্জুল কুঞ্জে
      রমণী, রমণীয় কলা সুখপুঞ্জে,
      রতিরঞ্জিত বা সুরমে, পরমে,
    রতিকেলি বিলোল বিশাল সলিল মরাল
    ব্রজইত বালা, ব্রজইত সুললিত লীলা,
      বরজবৃন্দার বরফলদ, বৃন্দার ধীরে
      রে, রেসানিসা, সানিধানি, নিধাপাধা,
        ধাপামাপা মাগারেসা,
      সা রে সা রে গা রে সা সা,
      সা রে গা মা পা ধা নি সা,
      সা নি ধা পা মা গা রে সা॥  
     --প্রফুল্লকুমার দাস, রবীন্দ্রসঙ্গীত গবেষণা গ্রন্থমালা ৩  



২৬শে নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠিতে ইন্দিরা দেবীকে লিখছেন: "দিনু এখানকার ছেলেদের 'বিশ্ববীণারবে' যে ধাঁচায় গাইতে শিখিয়েচে সেই ধাঁচা অনুসারে স্বরলিপি লিখেছে। ঠিক মূলের অনুবর্তন করা দরকার মনে করেনি। মৈথিলি বিদ্যাপতি বাংলায় এসে যেসব স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করেচে এবং সেই স্বাতন্ত্র্যকে আমরা স্বীকারও করে নিয়েচি এই সমস্ত বিদেশী সুরেরও সেই রকম কিছু রূপ পরিবর্তন হবেই-- হলে দোষই বা কী? এইসব যুক্তি মনে এনে ওকে আমি বেকসুর খালাস দিতে ইচ্ছা করি। "
কদিন পরে এর প্রত্যুত্তরের চিঠিতে লিখছেন: "'বিশ্ববীণারবে'র বিকৃতি সম্বন্ধে তোর আপত্তি সমর্থন করে তুই যে একটি অমোঘ যুক্তি [ইন্দিরা দেবীই মূল গানটি এনে দিয়েছিলেন] সব শেষে নিক্ষেপ করেছিস সে একেবারে শক্তিশেলের মতো এসে আমার মন্তব্যটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করেচে।... আসল কথা একে অজ্ঞতা তার উপরে কুঁড়েমি। ও গানের সুরটা ত জানিইনে (কোন গানেরই বা জানি, নিজেরই হোক পরেরই হোক) তারপরে ব্যবহার করবার যখন দরকার হল তখন গোঁজামিলন দিয়ে চালিয়ে দেওয়া গেল।... সেইজন্যে দিনু যখন ভুল করে 'বিশ্ববীণারবে' শেখালে, আমি বললুম বেশ হচ্চে, এই রকম হওয়াই উচিত। বুঝেচিস কেন? যদি বলি অন্যরকম হওয়া উচিত তাহলে হাঙ্গামা বাড়ে। "
সমীর সেনগুপ্তের টিকা: দিনেন্দ্রনাথ যেভাবে সুর রক্ষা করতেন তার উপরে তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা ছিল বলে মনে হয় না। নানা জায়গায় দিনেন্দ্রনাথ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য তিনি করেছেন তার থেকে মনে হয়, দিনেন্দ্রনাথ কোথাও কোথাও তাঁর সুর থেকে সরে গিয়ে স্বরলিপি করেছেন।  
     --সমীর সেনগুপ্ত, গানের পিছনে রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, ২০০৮  


[মাঘোৎসবের গানের প্রসঙ্গে] বৈষ্ণব ভক্তদের কীর্তন ভাবেতে মজে দশাপ্রাপ্ত হয়ে ধূলায় অবলুণ্ঠন প্রধান, আর ১১ই মাঘের সঙ্গীত ভাবেতে উড্ডীন হয়ে মর্ত হতে স্বর্গে আরোহণ প্রধান। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর ভ্রাতাদেরসহ ১১ই মাঘের সঙ্গীতের আসরে নামলেন তখন ব্রহ্মের উপাসনায় হৃদয়ের কোণে কোণে যেখানে যত নদী খাল বিল শুকনো ছিল সব ভরে উঠল। আর "মনে কর শেষের সেদিন কি ভয়ঙ্কর" নয়, শুধু "তুমি অগম্য অপার" ইত্যাদি বর্ণনামূলক নির্গুণ ব্রহ্মের স্তুতি নয়। এখন হল সমস্ত বাহ্য বা অন্তর-প্রকৃতিতে প্রতিভাত সগুণ ঈশ্বরের আবাহন। বৈষ্ণবদের লক্ষ্মী বিষ্ণু বা শাক্তদের শিব কালীর স্থলে খ্রিস্টানদের Personal God-এর অবতারণা--

     বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে
    আজ আনন্দে প্রেমচন্দ্রে নেহারো [?]
হল--
     তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না
হল--
     অনেক দিয়েছ নাথ

Personal God-এর অনুভূতি নিরাকারত্বে হয় না। যিনি চক্ষুষঃ চক্ষুঃ শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং তাঁকে চক্ষুকর্ণবান চরণহস্তবান বলে কল্পনায় না আনলে অন্তরে তাঁকে অঙ্গবান করে না দেখলে তাঁকে পাওয়াই হয় না। তাই রামমোহন যুগের পরবর্তী ব্রহ্মোৎসবের রবীন্দ্রের ব্রহ্ম বা ঈশ্বর 'অপাণিপাদ' নন, তিনি 'সর্বতো অক্ষি' 'সর্বত্র শিরোমুখ'। তাই তাঁর পরিচালিত ১১ই মাঘে পরপর গাওয়া হয়েছে--
     বড় আশা করে এসেছি গো ;   আজি শুভদিনে পিতার ভবনে ;   সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে ;   হেরি তব বিমল মুখভাতি ;   এস হে গৃহদেবতা ; তব প্রেম-আঁখি সতত জাগে [তোমারি ইচ্ছা হউক পূর্ণ]     
হল--
     এ কি অন্ধকার ভারতভূমি

...ভাবের ও ভাষার পার্থক্য দেখলে চিনতে পারা যাবে রামমোহন রায়ের সময়কার নিরাকার ব্রহ্ম কেমন করে ভাবের ঘরে একদম সাকার হয়ে নেমে ব্রহ্মবাদীদের আকার-নিরাকার অভেদ জ্ঞানের ভিত্তিই পুনঃস্থাপিত করলেন। অথচ ভাবের ছবির চৌকাঠ পেরিয়ে গেলেই-- মাটি-খড়ে, ধাতু-প্রস্তরে, বর্ণে-চিত্রে ভাবের উপলক্ষ্য ভগবানকে পূর্ণ লক্ষ্য করে মূর্ত করে আঁকড়ে ধরলেই রবীন্দ্রনাথ উত্যক্ত বিচলিত হয়ে উঠতেন। তাঁর আজন্ম 'নিরাকার' পূজার সংস্কারে ঘা লাগত।  (৬৭)  
     --সরলা দেবী চৌধুরানী, জীবনের ঝরাপাতা, রূপা, কলকাতা, ১৯৮২  


মানসিক বিকলতার মধ্যে আচ্ছন্ন আর পিষ্ট হয়ে পড়ে থাকা আমাদের যন্ত্রতাড়িত মহানাগরিক মন, সে যখন বিশ্বের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় তার ইন্দ্রিয়, শুনতে পায় "কত দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা" [ বিশ্ববীণারবে ]। তখন, ঠিকমতো যদি গাইতে পারেন কেউ আর শোনেন যদি কেউ ঠিকমতো, " জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ "-এর মতো কোনো আহ্বানভরা গানও জল এনে দিতে পারে চোখে। তার কারণ হয়তো নিহিত আছে আমাদের প্রগাঢ় কোনো পুনর্মিলনের আর্তিতে, অনেকদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবার পর আবার ফিরে পাবার-- নিজেকেই ফিরে পাবার-- কোনো আবেগে। যে সম্পর্কের বিষয়ে বা যে নিমন্ত্রণের দিকে বহুদিন অচেতন থেকে গেছে মন, নীচতায় নষ্টতায় পরস্পরহন্যমনতায় ফিরেও তাকাইনি যার দিকে, হঠাৎ সে যেন দাঁড়ায় এসে সামনে, আর আমরা টের পেতে থাকি " কোন পুরাতন প্রাণের টানে " মাটির দিকে ছুটে চলেছে আমার মন। ছুটেছে "কালহারা কোন্‌ কালের পানে" [ আজ শ্রাবণের আম্ন্ত্রণে ]। "অসীম কালে যে হিল্লোলে জোয়ারভাঁটায় ভুবন দোলে" [ আকাশভরা সূর্যতারা ] তার সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে আমার প্রাণ। এইভাবে, সমস্ত কাল আর সমস্ত দেশের সামঞ্জস্যের মধ্য দিয়ে মুহূর্তের জন্য জেগে ওঠে আমাদের সমগ্র সত্তা। মুহূর্তের সেই জাগরণ ঘটিয়ে দিতে পারে রবীন্দ্রনাথের গান, যখন প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের অবলীন সাহচর্যকে টেনে আনেন তিনি সে গানের মধ্যে। প্রকৃতি সেখানে আমাদের ঘিরে থাকে শুধুমাত্র রূপের চিত্রায়ণে নয়, অন্তঃস্বরূপের উদ্‌বোধনে। দেশকালের একাত্মতার মধ্য দিয়ে আমাদের সেই অন্তঃস্বরূপকে আমরা ছুঁতে পাই তখন। আর, তাকেই বলি ধর্ম। (১২৩)  
     --শঙ্খ ঘোষ, গান আর ধর্ম, রবীন্দ্রনাথের গান:সঙ্গ অনুষঙ্গ, আলপনা রায় সম্পাদিত, প্যাপিরাস, ২০০৩  


এ গানটি সাধারণত সম্মেলকরূপে গাওয়া হয় কিন্তু এর মহিমা ফোটে একক কণ্ঠে একা একা গাইলে। মঞ্চে কেউ এ গান একক কণ্ঠে কেন গায় না বুঝি না। সম্মেলক কণ্ঠে গানটি ফোটে না। এ গানে তালফেরের ব্যাপারটি সুপরিকল্পিত। স্তরে স্তরে সাজানো এমন প্রকৃতিমুখী ব্যালাড রবীন্দ্রনাথ আর একটাও লেখেননি। সুরের কম্পোজিশন ও স্বরের বহুল ওঠাপড়া সমর্থ কণ্ঠ দাবি করে। গানটির মূল সত্তা খুব ওজস্বী। কঠিন ও কোমলের সন্নিবেশ গানের চারিত্রের সঙ্গে ওতপ্রোত। 'আষাঢ়ে' থেকে 'উৎসব নব' পর্যন্ত যে দৃপ্ত সুরের উদ্‌ভাসন, তারপরেই 'অতি গম্ভীর অতি গম্ভীর' অংশ চমৎকার বৈপরীত্য আনে। নিরীক্ষার মূল অংশ ধরা যায় 'হেরো ক্ষুব্ধ ... বিতানে' যেমন জমজমাট সুর তেমন কোমল গীতল (sonal) 'ল' ধ্বনির কুশল ব্যবহার। (৪৬)  
     --সুধীর চক্রবর্তী, রবীন্দ্রনাথ অনেকান্ত, পত্রলেখা, ২০১২  


আমার অনেকদিন থেকেই ইচ্ছে ছিল রবীন্দ্রনাথ গানের ক্ষেত্রেও কিরকম পরকে আপন করে নিতে পেরেছেন -- চলিত কথায় যাকে আমরা তাঁর গান ভাঙা বলি -- তার পরিধি কত বিস্তৃত, এবং তাতেও কিরকম অপরূপ কারিগরি দেখিয়েছেন, তার একটি স-দৃষ্টান্ত আলোচনা করি।

গান ভাঙা দুরকমে হতে পারে-- এক, পরের সুরে নিজের কথা বসানো। এ ক্ষেত্রে পরের সুরে নিজের কথা বসাবার দৃষ্টান্তই বেশি পাওয়া যায়। পরের কথায় সুর দেবার দৃষ্টান্ত অতি বিরল; যদিও একেবারে নেই, তা নয়। এই প্রথম শ্রেণীকে আমি সুবিধার্থে দুই ভাগে বিভক্ত করেছি: এক, অ-বাংলা ভাষার গান ভাঙা; দুই, বাংলা ভাষার গান ভাঙা।

আদিব্রাহ্মসমাজের ব্রহ্মসংগীতগুলির কথার সম্পদ বাদ দিয়ে শুধু সুরের দিক থেকে আলোচনা করলেও আমাদের হিন্দুসংগীতের একটি বিপুল রত্নভাণ্ডারের পরিচয় ও ইতিহাস পাওয়া যাবে। আজ যে ভাঙা গানের আলোচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছি, তারও অধিকাংশ এই ভাণ্ডারেই সঞ্চিত। কবি নিজে যেখানে ভালো সুরটি শুনেছেন, অথবা অন্য লোকে দেশ-বিদেশ থেকে যে-সব গান আহরণ করে তাঁকে এনে দিয়েছেন, তার প্রায় সবগুলিই তিনি পূজার বেদীতে নিবেদন করেছেন, এ বললে অত্যুক্তি হয় না। মাঘোৎসবে নতুন নতুন গান সরবরাহের তাগিদ তার অন্যতম কারণ হতে পারে।  
     --ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, রবীন্দ্রসংগীতের ত্রিবেণীসংগম, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলিকাতা, ১৩৯৮  


 

 

বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে।
স্থলে জলে নভতলে বনে উপবনে
নদীনদে গিরিগুহা-পারাবারে
নিত্য জাগে সরস সঙ্গীতমধুরিমা,
নিত্য নৃত্যরসভঙ্গিমা।--

নব বসন্তে নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি মঞ্জুল, অতি মঞ্জুল, শুনি মঞ্জুল গুঞ্জন কুঞ্জে--
শুনি রে শুনি মর্মর পল্লবপুঞ্জে,
পিককূজন পুষ্পবনে বিজনে,
মৃদু বায়ুহিলোলবিলোল বিভোল বিশাল সরোবর-মাঝে
কলগীত সুললিত বাজে।
শ্যামল কান্তার-'পরে অনিল সঞ্চারে ধীরে রে,
নদীতীরে শরবনে উঠে ধ্বনি সরসর মরমর।
কত দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা॥

আষাঢ়ের নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি গম্ভীর, অতি গম্ভীর নীল অম্বরে ডম্বরু বাজে,
যেন রে প্রলয়ঙ্করী শঙ্করী নাচে।
করে গর্জন নির্ঝরিণী সঘনে,
হেরো ক্ষুব্ধ ভয়াল বিশাল নিরাল পিয়ালতমালবিতানে
উঠে রব ভৈরবতানে।
পবন মল্লারগীত গাহিছে আঁধার রাতে,
উন্মাদিনী সৌদামিনী রঙ্গভরে নৃত্য করে অম্বরতলে।
দিকে দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা॥

আশ্বিনে নব আনন্দ, উৎসব নব।
অতি নির্মল, অতি নির্মল, অতি নির্মল উজ্জ্বল সাজে
ভুবনে নব শারদলক্ষ্মী বিরাজে।
নব ইন্দুলেখা অলকে ঝলকে,
অতি নির্মল হাসবিভাসবিকাশ আকাশনীলাম্বুজ-মাঝে
শ্বেত ভুজে শ্বেত বীণা বাজে--
উঠিছে আলাপ মৃদু মধুর বেহাগতানে,
চন্দ্রকরে উল্লসিত ফুল্লবনে ঝিল্লিরবে তন্দ্রা আনে রে।
দিকে দিকে কত বাণী, নব নব কত ভাষা, ঝরঝর রসধারা॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৮৯৫ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: সুরেন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথের সঙ্গে কুষ্টিয়ায় 'টেগোর অ্যাণ্ড কোং'-এর প্রতিষ্ঠা। মাসিক পত্রিকা 'সাধনা'-র প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হোলো। সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাদিবসে বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ  নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ। হিন্দিতে 'চিত্রাঙ্গদা', গোপালরাম গেহেরী অনুবাদক, বোম্বাই থেকে প্রকাশিত হোলো। এটি কবির বইয়ের প্রথম অনুবাদ। প্রকাশ: গল্প দশক।

বহির্বিশ্বে: মার্কনি প্রথম বেতারে বার্তা পাঠালেন। রঞ্জন রশ্মি আবিষ্কৃত হোলো। লুমিয়েররা চলচ্চিত্রের জন্য বিশেষ ক্যামেরা তৈরি করলেন। প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন প্যারিসে।  চতুর্বার্ষিক অলিম্পিক ক্রীড়া-সম্মিলন চালু করার প্রস্তাব নেওয়া হোলো। ফেডারেটেড মালয় স্টেট্‌স্‌ গঠন। ফ্রেডেরিক এঙ্গেল্‌সের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম: দি টাইম মেশিন (ওয়েল্‌স), দাস্‌ ক্যাপিটাল ৩ (মার্ক্‌স)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



দুটি পৃথক পৃথক ভাবের গানে একই সুর কীভাবে রসোত্তীর্ণ হয়ে ওঠে?

...  বেতিয়ার মহারাজা নওলকিশোর সিংহ শঙ্করা রাগে চৌতালে গান বেঁধেছিলেন "য়হ জপ ঝুট জান রে মন"-- এ জগৎ মিথ্যা-- অর্থাৎ চরম বৈরাগ্যের গান। তর্কের খাতিরে বলা যায় যে এ বৈরাগ্যের সুর কখনো মর্ত্যপ্রীতির গানে প্রযুক্ত হতে পারেনা। কিন্তু এই একই সুরে-তালে ধ্বনিত হল রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ জীবনাকাঙ্ক্ষা ও জীবনপ্রীতির গান " আমারে করো জীবনদান "। আবার, প্রথম বয়সের এই গানের প্রারম্ভিক সুরটাই শেষ বয়সের নৃত্যনাট্য শ্যামায় হয়ে উঠেছে ক্ষুব্ধ অভিশাপের সুর " কাঁদিতে হবে রে পাপিষ্ঠা " গানটিতে।

টপ্পা তো মূলত ছিল প্রেমের গান। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের রচিত অনেক টপ্পা অঙ্গের গান রয়েছে ব্রহ্মসংগীত হিসাবে।

বৈশাখী ঝড় ও ফাল্গুনী বাতাস নিশ্চয়ই পৃথক পরিবেশের ও ভাবের সৃষ্টি করে। কিন্তু বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি, একই সুরে তালে ও গায়নশৈলীতে দুই পরিবেশের দুটি গান সমান রসোত্তীর্ণ-- " হৃদয় আমার ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে " এবং " হৃদয় আমার ওই বুঝি তোর ফাল্গুনী ঢেউ আসে "। দুটি গানে সুরমূর্তি একই। প্রত্যক্ষভাবে পার্থক্যকে প্রতিপন্ন করতে গেলে প্রথম গানটিতে প্রয়োগ করতে হবে বৈশাখী ঝড়ের মতো অতিনাটকীয় দাপট ও দ্বিতীয় গানটি গাইতে হবে বসন্ত বাতাসের উন্মাদনার ভঙ্গিতে। কিন্তু তাতে মূল সুরমূর্তি বিঘ্নিত হতে পারে, বিশেষ করে প্রথম গানটির। কারণ কবির পরিণত মতে গান আর অভিনয় এক জিনিস নয়, কণ্ঠে অতিরিক্ত ঝোঁক দিয়ে হৃদয়াবেগকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখালে সংগীতের আপন প্রকৃতিগত সৌন্দর্য বিঘ্নিত হয় [অন্তর-বাহির, সংগীতচিন্তা]।

" চলে ছল ছল নদীধারা " বর্ষার গান আর " দেখো দেখো শুকতারা " শরৎ-ঊষার গান। দেখছি যে সুরে নদীধারা ছলো ছলো শব্দে প্রবাহিত, সেই একই সুরে শুকতারার অনিমিখ দৃষ্টিপাত।

" বাকি আমি রাখবো না " ও " আমার এই রিক্ত ডালি " একই সুরে গান দুটির দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে ঐশ্বর্যের সুর আর রিক্ততার সুর একই। যে সুরে সব উজাড় করে দেওয়া যায় সেই সুরেই কাঙালিনী আঁচল বিছিয়ে দেয়।

জয়ের মালা আর দহনজ্বালার সুর এক হয়ে গেছে " বসন্তে ফুল গাঁথলো " আর " অশান্তি আজ হানলো " গান দুটিতে। প্রথম গানটি রয়েছে ফাল্গুনী নাটকের তত্ত্বজ্ঞ বাউলের কণ্ঠে, আর দ্বিতীয়টি নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদায় চিত্রাঙ্গদার রূপ-তৃষ্ণায় উন্মথিত-যৌবন অর্জুন গেয়ে উঠেছে। দুটি গানেরই পরিবেশ ও আবেদন ভিন্ন প্রকৃতির। সুর কিন্তু এক।

" আহা জাগি পোহালো " প্রেম পর্যায়ের প্রভাতী গান। এতে বিরহকাতরা ও রাত্রিজাগরণে ক্লান্তনয়না সুন্দরীকে সান্ত্বনা দিয়ে উজ্জীবিত করা হচ্ছে। একই সুরে-তালে " পোহালো পোহালো বিভাবরী " প্রকৃতি পর্যায়ের গান। দুটি গানই শরৎ প্রভাতের, কিন্তু প্রথমটি নারীর মনোবেদনাকে অবলম্বন করে শৃঙ্গার-রসাত্মক ও দ্বিতীয়টি শরৎ-প্রকৃতির আবেষ্টনে মাঙ্গলিক গান।

"সিক্ত মালতীগন্ধ"-এর [ যায় দিন শ্রাবণদিন যায় ] ও "ঝরে পড়া বকুলের গন্ধে" [ ধরা সে যে দেয় নাই ] সুর সম্পূর্ণ এক অথচ দুইয়ের স্মৃতি, অনুষঙ্গ, পরিবেশ, আবেষ্টন এমনকি পরিপ্রেক্ষিতে কোনো মিল নেই। গাইবার সময়'ইণ্টারপ্রিটেশনের স্বাধীনতা' গ্রহণ করে সংবেদনশীল সুশিল্পী নিশ্চয়ই দুটি গানে দুই রকমের পৃথক পৃথক সংবেদন সহৃদয় শ্রোতার অন্তরে সঞ্চার করতে পারেন।

অন্যতর দৃষ্টান্ত: " বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে " গানটির দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্তবকে যথাক্রমে বসন্ত, বর্ষা ও শরৎ চিত্রিত হয়েছে। কিন্তু তিনটি স্তবকের সুর হুবহু এক। একই সুরে নববসন্তের নব আনন্দের উৎসব, আষাঢ়ের নব আনন্দের উৎসব ও আশ্বিনের নব আনন্দের উৎসব। বসন্তের মঞ্জুলগুঞ্জন, আষাঢ়ের নীল অম্বরের গম্ভীর ডম্বরুরব, এবং শারদলক্ষ্মীর অতি নির্মল উজ্জ্বল সাজ একই সুরে-তালে গীতমূর্তি ধরেছে।

এই প্রশ্নের উত্তর: কথা ও সুরের সমন্বয়-- শুধু এই সুলভ উক্তিতে সন্তুষ্ট না থেকে আরো গভীরে প্রবেশ করা দরকার। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং লিখছেন:

    "কথা জিনিসটা মানুষেরই, আর গানটা প্রকৃতির। কথা সুস্পষ্ট এবং বিশেষ প্রয়োজনের দ্বারা সীমাবদ্ধ, আর গান অস্পষ্ট এবং সীমাহীনের ব্যাকুলতায় উৎকণ্ঠিত।... এই জন্য কথার সঙ্গে মানুষ যখন সুরকে জুড়ে দেয় তখন সেই কথা আপনার অর্থকে আপনি ছাড়িয়ে গিয়ে ব্যাপ্ত হয়ে যায়,... সেই সুরে মানুষের সুখদুঃখকে সমস্ত আকাশের করে তোলে"। [শ্রাবণ সন্ধ্যা, শান্তিনিকেতন, র-র ১২] (৬২)  
     --সিতাংশু রায়, কথা ও সুর: মিলনতত্ত্ব, রবীন্দ্রসংগীতায়ন ২, সুচিত্রা মিত্র ও সুভাষ চৌধুরী সম্পাদিত, প্যাপিরাস ১৯৯০  


রবীন্দ্রনাথের গানে তত্ত্ব আছে, চিত্র আছে অসংখ্য, আছে প্রেম, দেশপ্রেম কি ভক্তির মতো নির্দিষ্ট ভাব কিন্তু আমার মনে হয় সে-সমস্তই উপলক্ষ্য মাত্র, লক্ষ্য নয়। বিশুদ্ধ আবেগের জগতে আমাদের পৌঁছে দেবার নানা রাস্তাই তিনি আবিষ্কার করেছেন, তার মধ্যে যে-পথ সব চেয়ে সরল ও ঋজু তা প্রকৃতি কিংবা ঋতুচক্র। ব্রহ্মসংগীত যেমন সব চাইতে অ-রাবীন্দ্রিক, তেমনি ঋতুর গানগুলো রাবীন্দ্রিক সৌরভে সব্চেযে বেশি ভরপুর, সেখানে প্রতিটি কথার চরম ব্যঞ্জনা নিষ্কাশিত। এই গানগুলো আমাদের সমস্ত জীবন অধিকার করে আছে; প্রতিদিনের জীবনে কতবার যে নতুন ক'রে নানা গানের নানা চরণ মনে পড়ে, নতুন ক'রে তাদের উপলব্ধি করি, তার কি অন্ত আছে। আকাশে মেঘ করে, নদীতে ছায়া পড়ে, একা চাঁদ আকাশ পাড়ি দেয়, হাওয়ায় গাছের পাতা দোলে, হঠাৎ একটু লাল রোদের ফালি ঘরে এসে পড়ে, সূর্যাস্ত আকাশে সোনা ছড়ায়, আবার শীত সন্ধ্যার শূন্যতা আকাশকে রিক্ত করে যায় -- যখন যা কিছু চোখে পড়ে, যা-কিছু মন দিয়ে ছুঁই সে-সমস্তই বয়ে আনে রবীন্দ্রনাথের কত গানের কত বিক্ষিপ্ত চরণ। তাঁর গান মনে না করে আমরা দেখতে, শুনতে, ভালোবাসতে, ব্যথা পেতে পারি না, আমাদের নিগূঢ় মনের বিরাট মহাদেশের কোথায় কী আছে হয়তো স্পষ্ট জানিনে, তবে এটা জানি যে সে-মহাদেশের মানচিত্র আগাগোড়াই তাঁর গানের রঙে রঙিন।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১২