গীতবিতান-GITABITAN
ঝরঝর বরিষে বারিধারা।

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ৪ আশ্বিন ১৩০২ (২০ সেপ্টেম্বর,১৮৯৫)
কবির বয়স: ৩৪
রচনাস্থান: শিলাইদহ
প্রকাশ: ১৮৯৬,আশ্বিন ১৩০৩ , কাব্যগ্রন্থাবলী (গান) |
Poems 17
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রকৃতি-বর্ষা; ২৮/৪৩৯
রাগ / তাল: মেঘমল্লার / কাহারবা
স্বরলিপি: গীতিমালা; শতগান; কেতকী (১৩২৬); স্বরবিতান ১১ (কেতকী)
স্বরলিপিকার: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর; সরলা দেবী; দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর;ঐ
পাদটিকা:
ছিন্নপত্রাবলী - ২২৯ নং চিঠিতে গানের চার লাইনের খসড়া আছে।  

আলোচনা

কাল পর্‌শু দুদিন ঠিক আমার সেই নতুন গানের মতো দৃশ্যটা হয়েছিল-- "ঝরঝর বরিষে বারিধারা-- ... "। তার মধ্যে এই হতভাগ্য গৃহহারা ব্যক্তিটি স্টিমারে ছাতের উপরে আপাদমস্ত্ক ভিজে একেবারে কাদা হয়ে গিয়েছিল। গায়ে আমার সেই মস্ত রেশমের আলখাল্লা পরা ছিল, সেটা ঝোড়ো বাতাসে চতুর্দিকে অত্যন্ত হাস্য্করভাবে উড়ে বেড়াতে লাগল-- চোখের চশমা জল লেগে ঝাপসা হয়ে এল-- হাতে যে বই ছিল তার মলাটটা আমার করকমলে অবিরল রঙিন অশ্রুপাত করতে লাগল। আমি কাল-পরশু প্রায় মাঝে মাঝে সেই গানটা গাচ্ছিলুম। গাওয়ার দরুণ বৃষ্টির ঝরঝর, বাতাসের হাহাকার, গোরাই নদীর তরঙ্গধ্বনি একটা নতুন জীবন পেয়ে উঠতে লাগল-- চারি দিকে তাদের একটা ভাষা পরিস্ফুট হয়ে উঠল এবং আমিও এই ঝড়-বৃষ্টি-বাদলের সুবিশাল গীতিনাট্যের একজন প্রধান অভিনেতার মধ্যে দাঁড়িয়ে গেলুম।
  --শিলাইদহ, ২০ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৫; ৪.৬.১৩০২ #২২৯  

সংগীতের মতো এমন আশ্চর্য ইন্দ্রজালবিদ্যা জগতে আর কিছুই নেই-- এ এক নূতন সৃষ্টিকর্তা। আমি তো ভেবে পাই নে-- সংগীত একটা নতুন মায়াজগৎ সৃষ্টি করে না এই পুরাতন জগতের অন্তরতম অপরূপ নিত্যরাজ্য উদ্‌ঘাটিত করে দেয়। গান প্রভৃতি কতকগুলি জিনিস আছে যা মানুষকে এই কথা বলে যে, তোমরা জগতের সকল জিনিসকে যতই পরিষ্কার বুদ্ধিগম্য করতে চেষ্টা করো-না কেন এর আসল জিনিসটাই অনির্বচনীয় এবং তারই সঙ্গে আমাদের মর্মের মর্মান্তিক যোগ-- তারই জন্যে আমাদের এত দুঃখ, এত সুখ, এত ব্যাকুলতা।
  --শিলাইদহ, ২০ সেপ্টেম্বর ১৮৯৫; ৪.৬.১৩০২ #২২৯  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  



স্বরলিপিতে শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গান আছে। গানটি সুনির্বাচিত সুমিষ্ট শব্দের সমষ্টিমাত্র; ভাবের বিশেষত্ব, যাহা রবীন্দ্রনাথের ন্যায় কবির নিকট আশা করা যায়, ইহাতে তাহার সম্পূর্ণ অভাব।  
     --সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, মাসিক সাহিত্য সমালোচনা, সাহিত্য, ভাদ্র ১৩০৪  


... ঐ সকল গানের কথাগুলির উপর আমার বড়ই বিরক্তি হয়, কারণ কথাগুলিতে প্রায়ই, বিশেষ রবিবাবু-কৃত কথাগুলিতে ছন্দমাত্র নাই। ঐ সকল কথাতে ভাব ও কবিত্ব থাকিতে পারে। কিন্তু ছন্দহীন কথা গানের নিতান্ত অনুপযোগী। রবিবাবু ভাবের খাতিরে ছন্দ এড়াইয়া পদ্য রচনা সহজ করিয়া লইয়াছেন।..[কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায় (গীতসূত্রসার খ্যাত), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা পত্র]  
     -- [ রবি-জী ৪]   


 

 

২৮

ঝরঝর বরিষে বারিধারা।
হায় পথবাসী, হায় গতিহীন,   হায় গৃহহারা॥
ফিরে বায়ু হাহাস্বরে,   ডাকে কারে জনহীন অসীম প্রান্তরে--
রজনী আঁধারা॥
অধীরা যমুনা তরঙ্গ-আকুলা অকূলা রে,   তিমিরদুকূলা রে।
নিবিড় নীরদ গগনে   গরগর গরজে সঘনে,
চঞ্চলচপলা চমকে--  নাহি শশীতারা॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

17

C EASELESS is the welter of rain
    that wearies the sky.
Alas  for the forsaken! Alas for the
    homeless wanderer!
The  shrieks of the wind die away in
    sobs and sighs.
What  flying phantom does it pursue
    across the pathless wild?
The  night is hopeless like the eyes of
    the blind.
Alas  for the forsaken! Alas for the
    homeless wanderer!
The  waves are frantic in the river lost
    in the shoreless dark.
The  thunder growls, the lightning
    flashes its teeth.
The  lights of the stars are dead.
Alas  for the forsaken! Alas for the
    homeless wanderer!
  

Poems: a collection of one hundred and thirty poems, all but fifteen of which have been translated by the Poet himself. Edited by Krishna Kripalani, Amiya Chakrabarty and others.  
     --Rabindranath Tagore, Poems, Visva-Bharati, 1942  



১৮৯৫ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ: সুরেন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথের সঙ্গে কুষ্টিয়ায় 'টেগোর অ্যাণ্ড কোং'-এর প্রতিষ্ঠা। মাসিক পত্রিকা 'সাধনা'-র প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হোলো। সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাদিবসে বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ  নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ। হিন্দিতে 'চিত্রাঙ্গদা', গোপালরাম গেহেরী অনুবাদক, বোম্বাই থেকে প্রকাশিত হোলো। এটি কবির বইয়ের প্রথম অনুবাদ। প্রকাশ: গল্প দশক।

বহির্বিশ্বে: মার্কনি প্রথম বেতারে বার্তা পাঠালেন। রঞ্জন রশ্মি আবিষ্কৃত হোলো। লুমিয়েররা চলচ্চিত্রের জন্য বিশেষ ক্যামেরা তৈরি করলেন। প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শন প্যারিসে।  চতুর্বার্ষিক অলিম্পিক ক্রীড়া-সম্মিলন চালু করার প্রস্তাব নেওয়া হোলো। ফেডারেটেড মালয় স্টেট্‌স্‌ গঠন। ফ্রেডেরিক এঙ্গেল্‌সের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম: দি টাইম মেশিন (ওয়েল্‌স), দাস্‌ ক্যাপিটাল ৩ (মার্ক্‌স)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


তৃতীয়ত, রবীন্দ্রনাথের গানের আত্মিক বৈশিষ্ট্য হলো এই যে প্রত্যেকটি সুরের কাঠামো এবং প্রত্যেকটি কবিতার কাঠামো একসঙ্গে মিশে একটি ভাব সৃষ্টি করে। আমরা উদাহরণস্বরূপ মল্লার রাগটির কথা উল্লেখ করতে পারি। উচ্চাঙ্গসংগীতে আমরা ছয় থেকে আট রকমের মল্লার পাই। মেঘমল্লার থেকে সুরদাসী মল্লার পর্যন্ত। মাঝে রয়েছে গৌড়মল্লার, সুরঠমল্লার এবং দেশমল্লার। এর প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র মেজাজ; এবং এই মেজাজ হলো বর্ষার। রবীন্দ্রনাথ অন্তত এই রাগের পঞ্চাশ রকম প্রয়োগ করেছেন। প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র ভাব সৃষ্টি করেছে। এখানে কয়েকটির উল্লেখ করবো। বিষণ্ণতা, বৈচিত্র্যহীনতা, স্বাগত, দুঃখ, আকস্মিক আনন্দ, শান্তি, এমনকি আনন্দের ভাবও রয়েছে এই গানগুলিতে। প্রত্যেকটির রূপ স্বতন্ত্র, প্রত্যেকটির পাঁচ-ছয় রকমের বৈচিত্র্য। এক কথায় বলতে গেলে এই প্রত্যেকটি মল্লার সংগীতের নিজস্ব কাব্যগুণ রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের গানের ভাব মূলত ছিল কাব্যিক একথা আমার মতে ঠিক নয়। কথা ও সুরের সুসামঞ্জস্য আরোপেই এই ভাবে সৃষ্টি হয়েছিল।  
     --ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথের গান, সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত রবীন্দ্রসংগীতের চিন্তা, প্রতিভাস, ১৯৯৩  


এ কথা ঠিক যে দিনেন্দ্রনাথের স্বরলিপিতে তাল নিয়ে দ্বিধার পরিচয় আছে। "ঝরঝর বরিষে" গানটিকে ঢিমা ত্রিতালে বেঁধেছিলেন তাঁর পূর্বসূরী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আর সরলা দেবী। দিনেন্দ্রনাথ কাহারবাতে আরম্ভ করে অন্তরাতে পৌঁছে চলে গেলেন ত্রিতালে, সঞ্চারী থেকে আবার ফিরলেন কাহারবাতে। (২১৩)  
     --সন্‌জীদা খাতুন, "রবীন্দ্রসংগীতে স্বরলিপির কথা", রবীন্দ্রনাথের গান:সঙ্গ অনুষঙ্গ, প্যাপিরাস, ২০০১  


[ইন্দিরা দেবী] "ঝরঝর বরিষে" গানের ক্ষেত্রে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এবং সরলা দেবীর সুর-তালকে অগ্রাহ্যই করলেন। শুধু তালের কথাই ধরা যাক, এ-গানটিতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এবং সরলা দেবীর ত্রিতালে বিন্যস্ত রূপকে উপেক্ষা করে দিনেন্দ্রনাথের গীতারম্ভের কাহারবা তালকেই তিনি ত্রুটি সারিয়ে শেষ অবধি টেনে নিয়ে গেছেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এবং সরলা দেবীর স্বরলিপির তালবিন্যাসকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ত্রিতালে মেলাবার জন্য উভয়ে কোথাও-কোথাও মাত্রা টেনে রেখেছেন কিছুক্ষণ ধরে। যেমন "ফিরে বায়ু হাহা" অংশের পরে ছয় মাত্রা টানা হয়েছে। "রজনী আঁধারা" অংশে "ধা" আর "রা"-র মাঝখানে অনেকটা বিরাম। এরকম আরো আছে। মনে হয় এইসব জায়গাতে অতক্ষণ টেনে রাখতে গিয়ে গানটির সংহত ভাব বিস্রস্ত হয় বলেই ইন্দিরা দিনেন্দ্রনাথের কাহারবা তালকেই এ-গানের জন্যে সংগত মনে করেছিলেন। (২১৮)  
     --সন্‌জীদা খাতুন, "রবীন্দ্রসংগীতে স্বরলিপির কথা", রবীন্দ্রনাথের গান:সঙ্গ অনুষঙ্গ, প্যাপিরাস, ২০০১