গীতবিতান-GITABITAN
আমার সুরে লাগে তোমার হাসি

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩২৮ (১৯২১)
কবির বয়স: ৬০
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন (অনাদিকুমার দস্তিদারের খাতা)
প্রকাশ: -
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-গান; ১১/৯
রাগ / তাল: ভৈরবী / দাদরা
স্বরলিপি: নবগীতিকা ১; স্বরবিতান ১৪ (নবগীতিকা ১)
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
পাঠভেদ:
হঠাৎ এমন ভোলায়  - নবগীতিকা ১ (১৩২৯)।  

আলোচনা

ভৈরবী সুরের মোচড়গুলো কানে এলে জগতের প্রতি এক রকম বিচিত্র ভাবের উদয় হয়... মনে হয় একটা নিয়মের হস্ত অবিশ্রাম আর্গিন যন্ত্রের হাতা ঘোরাচ্ছে এবং সেই ঘর্ষণবেদনায় সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মর্মস্থল হতে একটা গম্ভীর কাতর করুণ রাগিণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে-- সকাল বেলাকার সূর্যের সমস্ত আলো ম্লান হয়ে এসেছে, গাছপালারা নিস্তব্ধ হয়ে কী যেন শুনছে এবং আকাশ একটা বিশ্বব্যাপী অশ্রুর বাষ্পে যেন আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে-- অর্থাৎ, দূর আকাশের দিকে চাইলে মনে হয় যেন একটা অনিমেষ নীল চোখ কেবল ছল্‌ছল্‌ করে চেয়ে আছে।
    কলকাতা, জুন ১৮৮৯  #৩  

অ[বন?] ও বাড়িতে তাদের এক তলার ঘরে বসে এস্‌রাজে ভৈরবী আলাপ করছে, আমি তেতলার কোণের ঘরে বসে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। তোর চিঠিতেও তুই মাটাঙ্গের ভৈরবী আলাপের কথা লিখেছিস। আজকাল সকালে দেখতে দেখতে বেলা দশটা এগারোটা দুপুর হয়ে যায়-- দিনটা যতই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে মনটাও ততই এক রকম উদাসীন হয়ে আসে; তার উপর কানে যখন বারম্বার ভৈরবীর অত্যন্ত করুণ মিনতির খোঁচ লাগতে থাকে তখন আকাশের মধ্যে, রৌদ্রের মধ্যে, একটা প্রকাণ্ড বৈরাগ্য ব্যাপ্ত হয়ে যায়। কর্মক্লিষ্ট সন্দেহপীড়িত বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটিকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে-একটি নিত্যশোক নিত্যভয় নিত্যমিনতির ভাব আছে, আমাদের হৃদয় উদ্‌ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদ্‌ব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। সত্যিই তো আমাদের কিছুই স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রকৃতি কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেই কথাটিই আমাদের সর্বদা ভুলিয়ে রেখেছে-সেইজন্যেই আমরা উৎসাহের সহিত সংসারের কাজ করতে পারি। ভৈরবীতে সেই চিরসত্য সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে; আমাদের এই কথা বলে দেয় যে, আমরা যা-কিছু জানি তার কিছুই থাকবে না এবং যা চিরকাল থাকবে তার আমরা কিছুই জানি নে।
  --কলকাতা, ২১ নভেম্বর ১৮৯৪; ৬.৮.১৩০১ #১৭৭  

[কিন্তু] আজ সকালে একটা সানাইয়েতে ভৈরবী বাজাচ্ছিল, এমনি অতিরিক্ত মিষ্টি লাগছিল যে সে আর কী বলব-- আমার চোখের সামনেকার শূন্য আকাশ এবং বাতাস পর্যন্ত একটা অন্তরা্‌নিরুদ্ধ ক্রন্দনের আবেগে যেন স্ফীত হয়ে উঠছিল-- বড়ো কাতর কিন্তু বড়ো সুন্দর-- সেই সুরটাই গলায় কেন যে তেমন করে আসে না বুঝতে পারি নে। মানুষের গলার চেয়ে কাঁসার নলের ভিতরে কেন এত বেশি ভাব প্রকাশ করে! এখন আবার তারা মুলতান বাজাচ্ছে-- মনটা বড়োই উদাস করে দিয়েছে-- পৃথিবীর এই সমস্ত সবুজ দৃশ্যের উপরে একটি অশ্রুবাষ্পের আবরণ টেনে দিয়েছে-- একপর্দা মুলতান রাগিণীর ভিতর দিয়ে সমস্ত জগৎ দেখা যাচ্ছে। যদি সব সময়েই এইরকম এক-একটা রাগিণীর ভিতর দিয়ে জগৎ দেখা যেত তা হলে বেশ হত। আমার আজকাল ভারী গান শিখতে ইচ্ছে করে-- বেশ অনেকগুলো ভূপালী ... এবং করুণ বর্ষার সুর-- অনেক বেশ ভালো ভালো হিন্দুস্থানী গান-- গান প্রায় কিচ্ছুই জানি নে বললেই হয়।
    সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯২; ২২.৩.১২৯৯ #৬৬  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  



আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  


রবীন্দ্রনাথের অনেক গানে আমরা দেখি একটি বিশেষ শব্দের তাৎপর্য ও তার দ্বারা উদ্রিক্ত ভাবকে পরিপূর্ণভাবে আহরণ করবার জন্য কবি সেই শব্দটিকে কতভাবে সুরে খেলিয়েছেন, কখনো বা সুদীর্ঘ মীড় টেনে, কখনো সুরের উচ্ছল গতিভঙ্গিতে, কখনো একটি পর্দায় থেমে থেকে। যেমন "উদাস" এই শব্দটি। তাঁর একটি গানে এই শব্দেতে সুর কিভাবে ভাব্মুখর হয়ে উঠেছে লক্ষ্য করার মতো।

      'শুকনো পাতা কে যে ছড়ায় ওই দূরে
            উদাস-করা কোন্‌ সুরে'।

এই উদাস শব্দটিতে প্রলম্বিত মীড়ের তান মনকে টেনে নিয়ে ঘর-ছাড়া করে এক সুদূর বিরহের নির্জন পথ ধরে। অন্য একটি গান -- 'আমার সুরে লাগে তোমার হাসি'। এই গানের দুটি পদ

      "আমি গানে তোমায় ধরব বলে
       উদাস হয়ে, যাই যে চলে--"

এখানে ভাবটি ব্যথাতুর বিরহের না; মন পুলকে মেতে আনন্দের লহরীতে কোন্‌ নিঃসীম পারাবারে ভেসে যেতে চায়। একই শব্দের দুই ভাব ভিন্ন রসাস্বাদে ব্যক্ত হয়েছে।... আরো অনেক এমনি শব্দের পরিচয় আমরা পাই-- যেমন 'দূর', 'পরশ', ধীরে'।  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, "রবীন্দ্রসংগীতের ভাব ও শিক্ষা", রবীন্দ্র ভাবনা, ২০০০ যুগ্ম সংখ্যা, টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটুট, কলকাতা  (পৃঃ ৪৪)  


যেমন পূজার, যেমন প্রেমের, রবীন্দ্র-রচনায় তেমনি কয়েকটি আছে গানের গান। 'পূজা' অংশে যে একুশটি উপশ্রেণীর কল্পনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তার প্রথমটিই ছিল 'গান', 'পূজা'র প্রথম বত্রিশটি রচনাই কোনো-না-কোনোভাবে সুরের কথা বলে। এটা আমাদের মনে থাকে বটে, কিন্তু অনেকসময় আমরা লক্ষ্য করতে ভুলে যাই যে 'প্রেম' অংশেরও প্রথম গানগুলি ওই একইরকমের গান, এরও প্রথম সাতাশটি রচনায় তৈরী হয়ে উঠেছে সুরের প্রসঙ্গ, গড়ে উঠেছে "গানের রতনহার"।

এ কি আকস্মিক একেবারে যে এই দুই পর্যায়ের প্রবেশক হিসেবে কবি সাজাতে চাইলেন এই গানের গানগুলি? না কি এর মধ্য দিয়ে গানের পথে ধর্মে আর গানের পথে ভালোবাসায় পৌঁছবার এক সাধনা করেন কবি? ধর্ম যেমন মানুষকে তার অহংসীমার বাইরে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়, ভালোবাসারও তো সেই কাজ। নিজেকে নিজের মধ্যে থেকে মুক্তি দিতে পারি যখন, নিজেকে মুক্ত করতে পারি পরিজন-পরিবেশের মধ্যে, অনায়াস আনন্দে বা গভীর বেদনায়, সেই মুহূর্তই ভালোবাসার মুহূর্ত। ধর্ম আর ভালোবাসা এই যে চরিতার্থতা চায়, ভেঙে দিতে চায় নিজের আবরণ, সেইখানেই তো নিয়ে যেতে চায় গান, যে গানের বিষয়ে বলা হয়েছিল 'চিরকালটাই আসে সামনে, ক্ষুদ্র কালটা যায় তুচ্ছ হয়ে'। তাই গানের গান হতে পারে এই দুই পর্যায়েরই যোগ্য প্রবেশক।

কিন্তু সে কথা যদি মেনে নেওয়া যায়, তবুও আমাদের জিজ্ঞাসা মেটে না। এই দুই পর্যায়ে যে সুর বা গানের কথা সাজানো হলো, তার মধ্যে কি কোনো ভিন্ন চরিত্রের কল্পনা আছে? কয়েকটি গান এ-পর্যায়ে, কয়েকটি ও-পর্যায়ে, এই মাত্র? না কি দু-পর্যায়ের গানেও আছে কোনো প্রচ্ছন্ন ভিন্নতা? এর একটা সহজ উত্তর হতে পারে এই যে 'পূজা'র বত্রিশটি গানের মধ্যে অন্তত কুড়িটি লেখা হয়েছিল ১৯২০ সালের আগে, আর 'প্রেমে'র সাতাশটির মধ্যে বাইশটি ওই সময়ের পরে।.. কিন্তু 'গীতবিতানে' কোনো অর্থেই গণ্য করা হয়নি কালক্রম। তাই সময়ের ক্রমিকতাই একমাত্র কথা নয়, এ-দুয়ের মধ্যে প্রভেদ থাকা সম্ভব অন্য কোনো ভাবনায়।

বহুদিন আগে অমিয় চক্রবর্তী তাঁর 'গানের গান' প্রবন্ধে বলেছিলেন যে এই গানগুলিকে সাজানো চলে তিনটি পর্যায়ে: গান-শোনা, গান-শোনানো আর গানের দেওয়া-নেওয়া। তাঁর মনে হয়েছিল 'পূজা' অংশে প্রধানত সেই সুরস্রষ্টার কথা আছে, বিশ্বলোক যাঁর রাগিণী। আর 'প্রেম' অংশের মধ্যে আছে দেওয়া-নেওয়ার সম্বন্ধ, বিরহমিলনের মধ্য দিয়ে গীতলীলা। কিন্তু তবুও একটা দ্বিধা ছিল অমিয় চক্রবর্তীর, হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে গানগুলিকে এইভাবে শনাক্ত করা সহজ নয় বড়ো, হয়তো তিনি 'পূজা', 'প্রেম' নামগুলিকেই অনেকটা প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন এই প্রভেদসূত্রের বর্ণনায়। তাই শেষ পর্যন্ত বলতে হয় তাঁকে: "কিন্তু পূজা ও প্রেমের মধ্যে তো ছেদ নেই; কবির সংকল্পিত গীতবিতানে তাই লিরিকের মালা গাঁথা হয়েছে।"

তবে কি একটু অন্যভাবে ভাববো আমরা? নিজের অস্তিত্বের মধ্যে যখন মানুষ অনুভব করতে পারে সমস্ত বিশ্বের অভিঘাত, তখন সে হয়ে ওঠে গভীরতর অন্য এক মানুষ। অভিঘাতের এই সম্পর্ককে রবীন্দ্রনাথ দেখেন সুরের উপমায়। এ অভিঘাত কখনো তীব্র, কখনো মৃদু, আনন্দের কখনো, কখনো ব্যথার। এ-গানগুলিতে সুরেরও বর্ণনা তাই কখনো আগুন হয়ে আসে, কখনো ঝরণা, হোম কখনো, কখনো মালা। কিন্তু সবসময়েই সে-সুর যোগ করছে একের সঙ্গে অন্যকে, আমির সঙ্গে এক তুমিকে। সে যোগ কখনো আমার গানে, কখনো তোমার গানে।

এই তুমির বোধ যদি আত্মস্থ এক সম্পূর্ণতার বোধ, এরই সঙ্গে যুক্ত হবার পথ যদি হয় গান, তবে সে-গানে কখনো তুমি এগিয়ে আসে আমির দিকে, কখনো তুমির দিকে আমি। 'পূজা'র মধ্যে যে গানের গান, সেখানে তুমি-আমির এই বিন্যাস প্রায় সমান সমান। সেখানে ' তোমার সুরের ধারা ঝরে ', তোমার সুর ফাগুনরাতে জাগে, তুমিই সেখানে সুরের আগুন লাগায়, তোমার বীণা বাজে, কিন্তু ওরই সঙ্গে আবার ' আমার সুরে লাগে তোমার হাসি ', ' আমার বেলা যে যায় সাঁঝবেলাতে, তোমার সুরে সুরে সুর মিলাতে '। বলা যায়, হয়তো এই সুর মেলানোর কাজ অনেকটা সম্পন্ন হয়ে এল 'প্রেম' পর্যায়ের গানের গানে, কেননা দু-একটি ছাড়া সেখানে সবক'টি গানের উৎসে আছি আমি। সেখানে ' তোমায় গান শোনাবো, তাইতো আমায় জাগিয়ে রাখো '।

অমিয় চক্রবর্তী লিখেছিলেন, "গান যেখানে ভক্তিরসে বিধৃত, কবির নিজের সংগীতও সেখানে পূজার পর্যায়ে স্থান পেয়েছে।" কিন্তু এই যে জাগিয়ে রাখার গানটির কথা বলা হলো, এর মধ্যে যদি কোনো ভক্তিরস না থাকে, এ যদি হয় প্রেমেরই গান, এ যদি নন্দিনীকে শোনাতে চায় বিশু, তবে ' আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান ' কেন হবে না স্বতন্ত্রভাবে ভক্তিরসের, তা বোঝা যায় না ভালো। এ কোনো ভক্তির কথা নয়, এ হলো ব্যক্তির কথা, এ কেবল প্রকাশ-বেদনার কথা, যে-বেদনা সম্পূর্ণের সঙ্গে নিজের বিচ্ছেদকে প্রত্যক্ষ করে তোলে শুধু, যে-বেদনা এগিয়ে নিতে চায় সমস্তের সঙ্গে মিলনের দিকে। তারই এক নাম হতে পারে প্রেম, তারই এক নাম হতে পারে পূজা। এই অর্থেই গানের গানগুলি এক সহজ সেতু তৈরি করে রাখে পূজা আর প্রেমের মধ্যে, দুই জগতে বড়-রকমের ভিন্নতা থাকে না আর। (৭৪)

['এই সাইটে 'সার্চ' পাতায় 'পূজা' বা 'প্রেম' পর্যায় ও 'গান' বিষয় খোঁজ করলে এসব গানের তালিকা পাওযা যাবে।]  
     --শঙ্খ ঘোষ, এ আমির আবরণ, প্যাপিরাস, ১৯৮২  


 

 

১১

          আমার সুরে লাগে তোমার হাসি,
যেমন      ঢেউয়ে ঢেউয়ে রবির কিরণ দোলে আসি॥
          দিবানিশি আমিও যে      ফিরি তোমার সুরের খোঁজে,
          হঠাৎ এ মন ভোলায় কখন তোমার বাঁশি॥
আমার     সকল কাজই রইল বাকি,      সকল শিক্ষা দিলেম ফাঁকি।
আমার     গানে তোমায় ধরব ব'লে      উদাস হয়ে যাই যে চলে,
          তোমার গানে ধরা দিতে ভালোবাসি॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯২১ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা। এল্‌ম্‌হার্স্টের সঙ্গে পরিচয়। পঞ্চমবার বিলেতে এলেন, সেখান থেকে মধ্য ইউরোপে ভ্রমণ ও বক্তৃতা। বার্লিনে কবিকণ্ঠ রেকর্ড করা হোলো। ভারতে ফিরলেন কিন্তু অসহযোগ আন্দোলনের সবদিক সমর্থন না করার জন্য সমালোচনা ও বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হোলো। প্রকাশ: বর্ষামঙ্গল, ঋণশোধ, শিক্ষার মিলন, The Fugitive, Glimpses of Bengal, Greater India, Poems from Tagore, Thought Relics, The Wreck.  

বহির্বিশ্বে: ১লা জানুয়ারি ভারত শাসনবিধি আইন কার্যকরী। সুভাষচন্দ্র বসু ইণ্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস ছেড়ে দিলেন, চিত্তরঞ্জন দাশ ছাড়লেন ব্যারিস্টারি। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে বিদেশী বস্ত্র বর্জনের প্রস্তাব গ্রহণ,  ৩১শে জুলাই গান্ধীজীর উদ্যোগে বোম্বাইতে লক্ষ লক্ষ টাকার বিদেশী কাপড় পোড়ানো হোলো, ১লা সেপ্টেম্বর বড়বাজারে বিদেশী কাপড়ের দোকানে পিকেটিং। অল ইণ্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস ও ইম্পিরিয়াল ব্যাঙ্ক অফ ইণ্ডিয়া (পরে স্টেট ব্যাঙ্ক) প্রতিষ্ঠা। ব্রিটেন ও আয়ার্ল্যাণ্ডের মধ্যে শান্তি চুক্তি। হিটলার স্টর্ম ট্রুপার্স বিরোধীদের ওপর অত্যাচার আরম্ভ করলো। ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভার প্রথম অধিবেশন। ওয়াশিংটনে নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনের শুরু। আফগানিস্তানের স্বাধীনতা লাভ। বি.বি.সির প্রতিষ্ঠা। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: রোবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম (কান্তিচন্দ্র ঘোষ), সিক্স ক্যারেক্‌টার্স ইন সার্চ অফ অ্যান অথর (পিরান্‌দেল্লো), থ্রি সোল্‌জার্স (ডস প্যাসোস), আর. ইউ. আর (সাপেক), মেমোয়ার্স অফ এ মিজেট (ডে ল মেয়ার)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



রবীন্দ্রনাথ নানান সুরে গান বেঁধেছেন, কিন্তু তাঁর সেই সহস্র সহস্র গানগুলির মধ্যে যদি কোনো একটি রাগের সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় তো সেটি হচ্ছে ভৈরবী। সুরসৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ভৈরবী-সিদ্ধ ছিলেন। তিনি প্রাচীন ভৈরবী রাগের অনুভূতি রেখে এক নব রাগ সৃষ্টি করলেন; রাগকর্তার নাম জড়িয়ে রাগের নাম-- যথা মিয়াকি তোড়ি, সুরদাসী মল্লার-- দেবার প্রথা অনুসরণ করে তার নাম দিয়েছি "রাবীন্দ্রী-ভৈরবী"। রবীন্দ্রনাথের সুরমিশ্রণ যেমন ভাবধর্মী, রাগধর্মী নয়, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীও তেমনি ভাব প্রকাশের তাগিদে সৃষ্টি হয়েছে।

রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে আশাবরী, ধানশ্রী ও টোড়ি -- এই তিনটি রাগের আসা যাওয়া কানে বাজে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবী একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাগ, এটি রবীন্দ্রনাথের অভিনব সৃষ্টি। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীর বিশেষত্বগুলি একটু তলিয়ে দেখতে পারলেই ধরা পড়ে যায়। প্রথমত, গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে, ভৈরবীতে এটি হয় না। আর গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে বলে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে কানাড়ার ছায়া পড়েছে, তবে সেটি কিন্তু শুদ্ধ কানাড়ার, দরবারী কানাড়ার নয়। দ্বিতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে যে 'ধা'টি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি হচ্ছে ভৈঁরোর 'ধা'। ভৈরবীর 'ধা'র সঙ্গে তার শ্রুতির পার্থক্য আছে। উদাহরণ স্বরূপ ' হে চিরনূতন ' গানটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। 'চিরনূতন'-এর 'চিরনূ' পর্যন্ত ভৈরোঁর 'ধা'-এ বাঁধা। তৃতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে নিরঙ্কুশ 'রে', 'গা', 'ধা' ও 'নি' পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় একমাত্র রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীত পর্যায়ের গানগুলিতে। চতুর্থত, এই স্বরব্যবস্থাকে বিকৃত পর্দার উদাহরণ বলে পার পাওয়ার উপায় নেই কেন না, বিকৃত পর্দার একটা সীমা আছে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে এই ধরনের পর্দা অনেক বেশি আছে।  এছাড়া রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে শুদ্ধ 'রে', শুদ্ধ 'গা' আর কড়ি 'মা'র ব্যবহার সহজেই ধরা পড়ে।

রবীন্দ্রনাথের প্রায় তিন হাজার [?] গানের মধ্যে এই নতুন রাগে বাঁধা প্রায় তিনশো গান আছে। [এইখানে সৌম্যেন্দ্রনাথ ৫০টি গানের তালিকা দিয়েছেন; আমরা এই আলোচনা খণ্ডটি সব ভৈরবী গানেই প্রয়োগ করলাম]
  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬