গীতবিতান-GITABITAN
আমার বেলা যে যায় সাঁঝ বেলাতে

Stamp

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩২৬ (১৯১৯)
কবির বয়স: ৫২
প্রকাশ: শান্তিনিকেতন পত্রিকা (১৩২৬)
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-গান; ১২/১০
রাগ / তাল: খাম্বাজ / দাদরা/খেম্টা
স্বরলিপি: কাব্যগীতি; স্বরবিতান ৩৩ (কাব্যগীতি)
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
প্রচলিত ও কাব্যগীতির মধ্যে সুরভেদ আছে।
পাঠভেদ:
আমার একতারাটির একটি তারে...
তোমার গানের লীলার সেই কিনারে
    --[ গীবিন ] ১ম সং (১৩৩৮)।  

আলোচনা

যেমন পূজার, যেমন প্রেমের, রবীন্দ্র-রচনায় তেমনি কয়েকটি আছে গানের গান। 'পূজা' অংশে যে একুশটি উপশ্রেণীর কল্পনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তার প্রথমটিই ছিল 'গান', 'পূজা'র প্রথম বত্রিশটি রচনাই কোনো-না-কোনোভাবে সুরের কথা বলে। এটা আমাদের মনে থাকে বটে, কিন্তু অনেকসময় আমরা লক্ষ্য করতে ভুলে যাই যে 'প্রেম' অংশেরও প্রথম গানগুলি ওই একইরকমের গান, এরও প্রথম সাতাশটি রচনায় তৈরী হয়ে উঠেছে সুরের প্রসঙ্গ, গড়ে উঠেছে "গানের রতনহার"।

এ কি আকস্মিক একেবারে যে এই দুই পর্যায়ের প্রবেশক হিসেবে কবি সাজাতে চাইলেন এই গানের গানগুলি? না কি এর মধ্য দিয়ে গানের পথে ধর্মে আর গানের পথে ভালোবাসায় পৌঁছবার এক সাধনা করেন কবি? ধর্ম যেমন মানুষকে তার অহংসীমার বাইরে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়, ভালোবাসারও তো সেই কাজ। নিজেকে নিজের মধ্যে থেকে মুক্তি দিতে পারি যখন, নিজেকে মুক্ত করতে পারি পরিজন-পরিবেশের মধ্যে, অনায়াস আনন্দে বা গভীর বেদনায়, সেই মুহূর্তই ভালোবাসার মুহূর্ত। ধর্ম আর ভালোবাসা এই যে চরিতার্থতা চায়, ভেঙে দিতে চায় নিজের আবরণ, সেইখানেই তো নিয়ে যেতে চায় গান, যে গানের বিষয়ে বলা হয়েছিল 'চিরকালটাই আসে সামনে, ক্ষুদ্র কালটা যায় তুচ্ছ হয়ে'। তাই গানের গান হতে পারে এই দুই পর্যায়েরই যোগ্য প্রবেশক।

কিন্তু সে কথা যদি মেনে নেওয়া যায়, তবুও আমাদের জিজ্ঞাসা মেটে না। এই দুই পর্যায়ে যে সুর বা গানের কথা সাজানো হলো, তার মধ্যে কি কোনো ভিন্ন চরিত্রের কল্পনা আছে? কয়েকটি গান এ-পর্যায়ে, কয়েকটি ও-পর্যায়ে, এই মাত্র? না কি দু-পর্যায়ের গানেও আছে কোনো প্রচ্ছন্ন ভিন্নতা? এর একটা সহজ উত্তর হতে পারে এই যে 'পূজা'র বত্রিশটি গানের মধ্যে অন্তত কুড়িটি লেখা হয়েছিল ১৯২০ সালের আগে, আর 'প্রেমে'র সাতাশটির মধ্যে বাইশটি ওই সময়ের পরে।.. কিন্তু 'গীতবিতানে' কোনো অর্থেই গণ্য করা হয়নি কালক্রম। তাই সময়ের ক্রমিকতাই একমাত্র কথা নয়, এ-দুয়ের মধ্যে প্রভেদ থাকা সম্ভব অন্য কোনো ভাবনায়।

বহুদিন আগে অমিয় চক্রবর্তী তাঁর 'গানের গান' প্রবন্ধে বলেছিলেন যে এই গানগুলিকে সাজানো চলে তিনটি পর্যায়ে: গান-শোনা, গান-শোনানো আর গানের দেওয়া-নেওয়া। তাঁর মনে হয়েছিল 'পূজা' অংশে প্রধানত সেই সুরস্রষ্টার কথা আছে, বিশ্বলোক যাঁর রাগিণী। আর 'প্রেম' অংশের মধ্যে আছে দেওয়া-নেওয়ার সম্বন্ধ, বিরহমিলনের মধ্য দিয়ে গীতলীলা। কিন্তু তবুও একটা দ্বিধা ছিল অমিয় চক্রবর্তীর, হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে গানগুলিকে এইভাবে শনাক্ত করা সহজ নয় বড়ো, হয়তো তিনি 'পূজা', 'প্রেম' নামগুলিকেই অনেকটা প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন এই প্রভেদসূত্রের বর্ণনায়। তাই শেষ পর্যন্ত বলতে হয় তাঁকে: "কিন্তু পূজা ও প্রেমের মধ্যে তো ছেদ নেই; কবির সংকল্পিত গীতবিতানে তাই লিরিকের মালা গাঁথা হয়েছে।"

তবে কি একটু অন্যভাবে ভাববো আমরা? নিজের অস্তিত্বের মধ্যে যখন মানুষ অনুভব করতে পারে সমস্ত বিশ্বের অভিঘাত, তখন সে হয়ে ওঠে গভীরতর অন্য এক মানুষ। অভিঘাতের এই সম্পর্ককে রবীন্দ্রনাথ দেখেন সুরের উপমায়। এ অভিঘাত কখনো তীব্র, কখনো মৃদু, আনন্দের কখনো, কখনো ব্যথার। এ-গানগুলিতে সুরেরও বর্ণনা তাই কখনো আগুন হয়ে আসে, কখনো ঝরণা, হোম কখনো, কখনো মালা। কিন্তু সবসময়েই সে-সুর যোগ করছে একের সঙ্গে অন্যকে, আমির সঙ্গে এক তুমিকে। সে যোগ কখনো আমার গানে, কখনো তোমার গানে।

এই তুমির বোধ যদি আত্মস্থ এক সম্পূর্ণতার বোধ, এরই সঙ্গে যুক্ত হবার পথ যদি হয় গান, তবে সে-গানে কখনো তুমি এগিয়ে আসে আমির দিকে, কখনো তুমির দিকে আমি। 'পূজা'র মধ্যে যে গানের গান, সেখানে তুমি-আমির এই বিন্যাস প্রায় সমান সমান। সেখানে ' তোমার সুরের ধারা ঝরে ', তোমার সুর ফাগুনরাতে জাগে, তুমিই সেখানে সুরের আগুন লাগায়, তোমার বীণা বাজে, কিন্তু ওরই সঙ্গে আবার ' আমার সুরে লাগে তোমার হাসি ', ' আমার বেলা যে যায় সাঁঝবেলাতে, তোমার সুরে সুরে সুর মিলাতে '। বলা যায়, হয়তো এই সুর মেলানোর কাজ অনেকটা সম্পন্ন হয়ে এল 'প্রেম' পর্যায়ের গানের গানে, কেননা দু-একটি ছাড়া সেখানে সবক'টি গানের উৎসে আছি আমি। সেখানে ' তোমায় গান শোনাবো, তাইতো আমায় জাগিয়ে রাখো '।

অমিয় চক্রবর্তী লিখেছিলেন, "গান যেখানে ভক্তিরসে বিধৃত, কবির নিজের সংগীতও সেখানে পূজার পর্যায়ে স্থান পেয়েছে।" কিন্তু এই যে জাগিয়ে রাখার গানটির কথা বলা হলো, এর মধ্যে যদি কোনো ভক্তিরস না থাকে, এ যদি হয় প্রেমেরই গান, এ যদি নন্দিনীকে শোনাতে চায় বিশু, তবে ' আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান ' কেন হবে না স্বতন্ত্রভাবে ভক্তিরসের, তা বোঝা যায় না ভালো। এ কোনো ভক্তির কথা নয়, এ হলো ব্যক্তির কথা, এ কেবল প্রকাশ-বেদনার কথা, যে-বেদনা সম্পূর্ণের সঙ্গে নিজের বিচ্ছেদকে প্রত্যক্ষ করে তোলে শুধু, যে-বেদনা এগিয়ে নিতে চায় সমস্তের সঙ্গে মিলনের দিকে। তারই এক নাম হতে পারে প্রেম, তারই এক নাম হতে পারে পূজা। এই অর্থেই গানের গানগুলি এক সহজ সেতু তৈরি করে রাখে পূজা আর প্রেমের মধ্যে, দুই জগতে বড়-রকমের ভিন্নতা থাকে না আর। (৭৪)

['এই সাইটে 'সার্চ' পাতায় 'পূজা' বা 'প্রেম' পর্যায় ও 'গান' বিষয় খোঁজ করলে এসব গানের তালিকা পাওযা যাবে।]  
     --শঙ্খ ঘোষ, এ আমির আবরণ, প্যাপিরাস, ১৯৮২  



 

 

১২

      আমার    বেলা যে যায় সাঁঝ বেলাতে
      তোমার    সুরে সুরে সুর মেলাতে॥
একতারাটির একটি তারে    গানের বেদন বইতে নারে,
তোমার সাথে বারে বারে    হার মেনেছি এই খেলাতে
      তোমার    সুরে সুরে সুর মেলাতে॥
            এ তার বাঁধা কাছের সুরে,
            ঐ বাঁশি যে বাজে দূরে।
গানের লীলার সেই কিনারে    যোগ দিতে কি সবাই পারে
   বিশ্বহৃদয়পারাবারে    রাগরাগিণীর জাল ফেলাতে--
      তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে?।

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯১৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  দ্বিতীয়বার দক্ষিণ ভারত যাত্রা ও বক্তৃতা সফর। 'বিশ্বভারতী চালু হোলো। জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে 'সার' উপাধি ত্যাগ করলেন। সন্ন্যাসীর ভূমিকায় 'শারদোৎসবে' অভিনয়। প্রকাশ: জাপান যাত্রী, The Centre of Indian Culture and the World, Mother's Prayer.  

বহির্বিশ্বে: ১লা জানুয়ারি রাওলাট অ্যাক্টের প্রকাশ। প্রতিবাদে ১লা মার্চ গান্ধীজীর আহ্বানে দেশব্যাপী হরতাল, ২৩শে মার্চ গান্ধীজীর আমরণ অনশন শুরু। জেনারেল ডায়ারের হুকুমে জালিয়ানওয়ালা বাগে নিরস্ত্র জনতার উপর গুলি চালানো হয়, মৃত ৩৭৯, আহত ১২০৮ জন। ৩০শে মে রবীন্দ্রনাথের নাইটহুড ত্যাগ। গান্ধীজীর 'নবজীবন' ও 'ইয়ং ইণ্ডিয়া' পত্রিকার জন্ম। নিখিল ভারত খিলাফৎ সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন। প্রথম বাংলা চলচ্চিত্র 'বিল্বমঙ্গল'  (নির্বাক)। ভার্সাইতে শান্তি সম্মেলন শুরু ও লীগ অফ নেশন্‌সের প্রতিষ্ঠা। ইতালিতে মুসোলিনি ব্ল্যাক শার্ট্‌স দল গড়লেন। ইরাক স্বাধীন রাষ্ট্র। ডি ভ্যালেরা সিন্‌-ফিনের নেতা। আন্তর্জাতিক শ্রমসম্মেলন ওয়াশিংটনে, সেখানে দৈনিক কাজের মাত্রা আট ঘণ্টা নির্ধারিত। ব্রিটিশ পার্লামেণ্টের প্রথম মহিলা সদস্যা লেডি অ্যাস্টর। পরমাণু বিভাজন তত্ত্ব -- রাদারফোর্ড।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



গীতবিতানের বিষয়সূচী:
ভূমিকা, পূজা, প্রেম, স্বদেশ, বিচিত্র, প্রকৃতি, আনুষ্ঠানিক, গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য, ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী, নাট্যগীতি, জাতীয় সঙ্গীত, পূজা ও প্রার্থনা, আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত, প্রেম ও প্রকৃতি, পরিশিষ্ট  


রবীন্দ্র-সম্পাদিত দ্বিতীয় সংস্করণ গীতবিতানের বিষয়বিন্যাস (বন্ধনীর মধ্যে গীতসংখ্যা):  
ভূমিকা (১)
পূজা পর্যায়: গান (৩২), বন্ধু (৫৯), প্রার্থনা (৩৬), বিরহ (৪৭), সাধনা ও সংকল্প (১৭), দুঃখ (৪৯), আশ্বাস (১২), অন্তর্মুখে (৬), আত্মবিধান (৫), জাগরণ (২৬), নিঃসংশয় (১০), সাধক (২), উৎসব (৭), আনন্দ (২৫), বিশ্ব (৩৯), বিবিধ (১৪৩, একটি গান দ্বিজেন্দ্রনাথ-রচিত বিবেচনায় বাদ দেওয়া হয়), সুন্দর (৩০), বাউল (১৩), পথ (২৫), শেষ (৩৪), পরিণয় (৯, তৃতীয়োত্তর সংস্করণ গীতবিতানে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ের প্রথমাংশে গ্রথিত)
স্বদেশ (৮৬)
প্রেম: গান (২৭), প্রেমবৈচিত্র্য (৩৬৮)
প্রকৃতি: সাধারণ (৯), গ্রীষ্ম (১৬), বর্ষা (১১৫), শরৎ (৩০), হেমন্ত (৫), শীত (১২), বসন্ত (৯৬)
বিচিত্র (১৩৮)
আনুষ্ঠানিক (৯)
পরিশিষ্ট (২, মুদ্রণকার্যের তাগিদায় ২য় সংস্করণে এই বিভাগটিকে বাধ্য হয়ে যোগ করতে হয়, পরের সংস্করণে গানগুলি যথোচিত স্থানে বিন্যস্ত করা হয়)

রবীন্দ্রনাথের নির্দেশমতোই এই বিষয়বিন্যাস মূল গীতবিতানে না দিয়ে তাঁর লেখা একটি বিজ্ঞাপন হিসাবে গ্রথিত হয়। তৃতীয়োত্তর সংস্করণে এই তালিকা গ্রন্থপরিচয়ে পাওয়া যায়।