গীতবিতান-GITABITAN
আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে

Certificate

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩৪৬ (১৯৩৯)
কবির বয়স: ৭৮
প্রকাশ: শ্রীরূপা পত্রিকা-উদাসী
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রকৃতি-বর্ষা; ১২৯/৪৭৭
রাগ / তাল: কাফি (বা মিশ্র মল্লার) / ২ + ২ ছন্দ (বা ষষ্ঠী)
স্বরলিপি: স্বরবিতান ৫৯
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার
পাদটিকা:
সুরান্তর ও ছন্দান্তর: মিশ্র মল্লার / ষষ্ঠী তাল। দুটি স্বরলিপিই স্বরবিতানের মূল অংশে আছে। "গানটি মীড়প্রধান। তারযন্ত্রে মধ্যলয়ে গেয়॥" [স্বর ৫৯]
পাঠান্তর:
উদাসী মেঘে মন চায়।  

আলোচনা

['আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে'] এই গানটি বেহাগের ওপর লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। এটি খুব জনপ্রিয় গান। গানটির সত্যিকারের সুরটা একটু ধীরে, একটু নরম, উদ্দীপনা বেশি নেই।

... স্বরলিপি করে নিয়ে বেরিয়ে আসছি, তিনি আমাকে ডেকে বললেন-- "শোনো, আমার একটা বিশেষ সন্দেহ হচ্ছে, দ্বিধা হচ্ছে। সকলে এ-গানটা গাইবে না গো, এ গান গাইবে না।...আমি আর একটা ভাবছি, তুমি শোনোই না। শুনে দেখোই না কি হয়েছে, তাতে ভালো না হয় তো এটাই গাইবে।" তারপর করলেন এই গানটা-- 'উদাসী মেঘে মন চায়''--'উদাসী' কথাটাকে 'উদ্‌ভ্রান্ত' করে দিলেন। মেজাজ বদলে দিলেন মেঘের চেহারাটা বদলাবার জন্য, মেঘের স্বভাবটাকে একটু বদলে দিলেন।... গানটার ছন্দটা জোর করে দিলেন, কাট্‌কাট্‌ ছন্দ।

পরের দিনে স্বরলিপি করে যখন ফাইনালাইজ করতে গেলাম তখন বললেন "উদ্‌ভ্রান্ত মেঘে জায়গাটা একটু চড়িয়ে দিলে ঠিক হবে, ভালো হবে।" আমি বললাম --"গুরুদেব, তাহলে আমার একটা নিবেদন আছে।... অন্তরা তো দুই-ই। প্রথামতো দু-বারেই গায়। প্রথমবারে প্রথম সুরটা গাইব আর দ্বিতীয়বারে আপনার দ্বিতীয় সুরটা গাইব।"  

১৯৩৯ সন। বর্ষামঙ্গলের প্রস্তুতি চলছিল। ... আমি গুরুদেবকে বললাম যে, ছেলেমেয়েরা বলছে নতুন গান চাই, পুরানো গানে ওরা আর বর্ষামঙ্গল করবে না। গুরুদেব বললেন-- এই অল্প সময়ের মধ্যে কি করে আর নতুন গান লেখা যায়? অন্য অনেক কাজও তো আছে। সেদিন এই পর্যন্ত। পরদিন বেলা এগারোটায় গুরুদেব আমাকে ডেকে পাঠালেন। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নতুন লেখা একটি গান হাতে দিলেন। গানটি -- 'ওগো সাঁওতালি ছেলে'। দ্বিতীয় গান 'বাদলদিনের প্রথম কদমফুল' পেলাম তার পরের দিনই। ... [টেবিলে 'বেহাগ' লিখে রেখে আসার পর;   গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য] সেই বেহাগে পেলাম এই গান -- 'আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে'। তার পরের দিন আবার কাগজে লিখে এলাম 'ইমন', পেলামও--'এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও' গানটি। এবার আবার কাগজে লিখে রেখে দিয়ে এলাম-- 'তান দেওয়া গান'। পেয়ে গেলাম-- 'আজ শ্রাবণের গগনের গায়'।

সব শুদ্ধ হল পাঁচটি নতুন গান। ষষ্ঠ গানটি ['আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে',   গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য ] গুরুদেব নিজে থেকে লিখলেন। ছটি নতুন গান লেখার পর গুরুদেব বললেন-- তোমার কাজ তো হয়ে গেল, এবার তুমি থামো। আমি বললাম -- এক ডিজিটের মূল্য কি? অন্তত দুটো ডিজিট করে দিন, একের পাশে অন্তত শূন্য চাই।

পরের গান যেটি পেলাম সেটি 'স্বপ্নে আমার মনে হল [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]। পরের গানটি পেলাম-- 'এসেছিলে তবু আস নাই'। এটি শ্রীমতী অমিতা ঠাকুরের উদ্দেশে লেখা। 'এসেছিনু দ্বারে তব', 'নিবিড় মেঘের ছায়ায় মন দিয়েছি মেলে' এই গান দুটি পর পর পেয়ে গেলাম। এর পরেই কবি বললেন-- একের পরে শূন্য বসে গেল, এবার শেষ। আমি বললাম-- শূন্যের কোন মূল্যই নেই, একের পাশে অন্তত দুই বসিয়ে এক ডজন করে দিন।

পরের দিন আবার কাগজে 'কীর্তন', 'বাউল' কথা দুটি লিখে চাপা দিয়ে রেখে এলাম লেখার টেবিলে। সেই সূত্রে পাওয়া গেল-- 'পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে'। তার পরের বারো নম্বর গানটি হল-- 'শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে'।

এভাবে বারোটি গান শেষ করে গুরুদেব বললেন-- আমাকে অন্য কাজে মন দিতে হবে, এবারে তুমি থামো, তুমি বুঝতে পারছ না তোমার ওপর আশ্রমের অনেকেই অসন্তুষ্ট হচ্ছেন। বর্ষামঙ্গলেরও তো দেরি হয়ে যাচ্ছে।

সেদিন হাতজোড় করে বলেছিলাম--ষোলকলায় পূর্ণ করে দিন, আর চাইব না। 'আজি মেঘ কেটে গেছে' লেখা হল। এরপর আবার গানের অনুরোধ করে সেই একই উপায়ে কাগজে 'বাগেশ্রী' কথাটি লিখে রেখে এলাম।... পরদিন বাগেশ্রীতে পেলাম 'সঘন গহন রাত্রি' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।... পরের গানটি 'ওগো তুমি পঞ্চদশী' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।  

[পরে লাইব্রেরীর বারান্দায় নতুন পনেরোটি গান নিয়ে বর্ষামঙ্গল আরম্ভ হল, কিন্তু অসুস্থতার কারণে মাঝপথে অনুষ্ঠান বন্ধ করে রবীন্দ্রনাথকে চলে যেতে হয়। কয়েকদিন পরে 'বাসি বর্ষামঙ্গল' নাম দিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি করার কথা উঠলো] সেদিন সকালবেলা অনুষ্ঠান-সূচী নিয়ে আমি যখন গুরুদেবের কাছে গেলাম তখন গুরুদেব বললেন-- এখনই যদি আমি তোমাকে একটা নতুন গান শিখিয়ে দিই তাহলে সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের দিয়ে গাওয়াতে পার কি? এটা হলে তোমার প্রস্তাব মত ষোলটি গান হয়ে যায়, ষোলকলা পূর্ণ হয়। আমি তখনই রাজী। সেই নতুন গানটি হল -- 'যবে রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।  

আমার কেন জানি মনে হয়, তাঁর নিজের সৃষ্ট এই ষষ্ঠী তালটি যদিও গুরুদেবের অত্যন্ত প্রিয় ছিল-- এই তালের গানগুলি সাধারণ শ্রোতারা নেবে কিনা এ বিষয়ে তাঁর বরাবর একটা সংশয় দেখেছি। তাই অনেক সময়ই এই গানগুলি বর্জন করতেন। যেমন 'শ্রাবণ গাথা'তে ' ও শ্রাবণের [আষাঢ়ের] পূর্ণিমা আমার ' -- এ গানটি প্রায়ই বাদ পড়ত।...পরেও ১৯৩৯ সনে নতুন গান দিয়ে বর্ষামঙ্গলের বেলায়ও-- ' আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে ' গানটি প্রথম ষষ্ঠী তালে রচনা করে ওই একই কারণে গুরুদেব ওটাকে কাহারবা তালে রূপান্তরিত করেন।  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, যাত্রাপথের আনন্দগান, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৮৫  



"আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে"-- কাফি সুর আশ্রয় করে একবার গানটি চলে কাহারবার জলদ ছন্দে চঞ্চল গতিতে, "কিছুতে কেন যে মন লাগে না", কিন্তু বেদনার তীব্রতা নেই, রয়েছে আশ্বাস।
কবি আবার যখন গানটিকে মল্লার-এর বেশে সাজালেন, তখন গতি হয়ে এল মন্থর, ছন্দ হল বিষম ষষ্ঠী তাল, আকুলতাময় মীড়ের টান পেল প্রাধান্য। গঠন আঙ্গিকের দিক থেকে, এ সুরে বারম্বার র্সা র্রা র্সা। র্সা র্রা র্সা, বা র্জ্ঞা র্মা র্জ্ঞা র্মা-- স্বর সংগঠনের পুনরুক্তি, সুরটিকে দেয় এক বিরল বৈশিষ্ট্য।  
     --সুধীর চন্দ," রবীন্দ্রসঙ্গীত:সুরান্তর, রূপান্তর", বহুরূপী রবীন্দ্রনাথ, প্যাপিরাস, ২০০৫  


[' ঝড়ে যায় উড়ে যায় গো '] গানটার মধ্যে যে সুরের এতটাBinary opposite আছে সেটাই মোহনরূপে টানে। রবীন্দ্রনাথের এমন কয়েকটা বিরল নিরীক্ষামূলক গান রয়েছে যাতে দুরকমের সুর করেছেন কিন্তু কোনো রূপটাকেই প্রত্যাহার করে নেননি। কেন? প্রথমটার চেয়ে দ্বিতীয়টা উচ্চতর এমন ভাবেননি নিশ্চয়। একবার যে বিশ্বস্রষ্টা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন -- তাঁহার কাজ ধ্যানের রূপ বাহিরে মেলে দেখা -- এও তাই। একটা গানের 'অরমাঁ' বা আকাঙ্ক্ষা গড়ে নিয়েছে দ্বিরূপ বা দ্বিরালাপ, সুরের স্বতন্ত্র স্বরূপে। অসামান্য সন্দেহ কি। এই রকম আরেকটা গান ' আজি ঝরঝর মুখর ' একই কারণে অনবদ্য। তাতেও স্বরান্তরের লীলা ভারি উপভোগ্য।

এই গানে রবীন্দ্রনাথ ছোট্ট এক শব্দ পরিবর্তন করেছিলেন। প্রথম প্রথম গাওয়া হত ঝড়ে উড়ে যায় 'বুকের আঁচলখানি', সেটা বদলে দিয়ে কবি আনেন 'মুখের' শব্দটি। বুকের আঁচল উড়ে যাওয়ার ফলে নারীর যে লজ্জা ও সংকোচ সেটাই তো বেশ ছিল। রবীন্দ্রনাথ একটা বয়সের পরে গানের ভাবরসকে কিছুতেই শরীরী হতে দেননি। মনে পড়ে এই কবিই একদিন লিখেছিলেন 'আজ বুকের বসন ছিঁড়ে ফেলে দাঁড়িয়েছে এই প্রভাতখানি'। ঝড়ে উড়ে যাওয়া চকিত বুকের আঁচলের স্খলন গানটিকে হয়তো আরেকটু কবোষ্ণ করতে পারত। কবির অভিপ্রায় অবশ্য শেষ কথা। (৪৩)  
     --সুধীর চক্রবর্তী, রবীন্দ্রনাথ অনেকান্ত, পত্রলেখা, ২০১২  


 

 

১২৯

    আজি   ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে
জানি নে,   জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না॥
    এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে   উদ্‌ভ্রান্ত মেঘে   মন চায়
         মন চায়   ওই বলাকার পথখানি নিতে চিনে॥
মেঘমল্লারে সারা দিনমান
      বাজে ঝরনার গান।
         মন হারাবার আজি বেলা,   পথ ভুলিবার খেলা-- মন চায়
               মন চায়   হৃদয় জড়াতে কার চিরঋণে॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯৩৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  জওহরলাল নেহরু আর সুভাষচন্দ্র বসু শান্তিনিকেতনে এলেন কবির সঙ্গে দেখা করতে। পুরী বেড়াতে গেলেন, পুরীরাজ কবিকে 'পরমগুরু' উপাধি দিলেন। প্রকাশ: প্রহাসিনী (কবিতা), আকাশপ্রদীপ (কবিতা), শ্যামা (নৃত্যনাট্য), পথের সঞ্চয় (পত্রাবলী)

বহির্বিশ্বে: ১৯শে অগাস্ট সুভাষচন্দ্রের পরিকল্পিত মহাজাতি সদনের ভিত্তি স্থাপন করলেন রবীন্দ্রনাথ। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি। ১লা সেপ্টেম্বর যুদ্ধ ঘোষণা না করেই জার্মানির পোল্যাণ্ড আক্রমণ -- অর্থাৎ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরু।  ডিডিটি, পলিথিলিন আবিষ্কার। কবি ইয়েট্‌স ও মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ইন্‌সাইড এশিয়া (গুন্‌থার), হাউ গ্রীন ওয়াজ মাই ভ্যালি (লিউলিন), কালেক্টেড পোয়েম্‌স (হাউসম্যান), ওয়েডিং ফিস্ট (কাম্যু), রোবেস্‌পিয়র (রল্যাঁ), দি ম্যাপ অফ লাভ (ডিলান টমাস), দি ওয়াল (সার্ত্র্‌), ফ্রীডম অ্যাণ্ড কালচার (ডিউই)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



তৃতীয়ত, রবীন্দ্রনাথের গানের আত্মিক বৈশিষ্ট্য হলো এই যে প্রত্যেকটি সুরের কাঠামো এবং প্রত্যেকটি কবিতার কাঠামো একসঙ্গে মিশে একটি ভাব সৃষ্টি করে। আমরা উদাহরণস্বরূপ মল্লার রাগটির কথা উল্লেখ করতে পারি। উচ্চাঙ্গসংগীতে আমরা ছয় থেকে আট রকমের মল্লার পাই। মেঘমল্লার থেকে সুরদাসী মল্লার পর্যন্ত। মাঝে রয়েছে গৌড়মল্লার, সুরঠমল্লার এবং দেশমল্লার। এর প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র মেজাজ; এবং এই মেজাজ হলো বর্ষার। রবীন্দ্রনাথ অন্তত এই রাগের পঞ্চাশ রকম প্রয়োগ করেছেন। প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র ভাব সৃষ্টি করেছে। এখানে কয়েকটির উল্লেখ করবো। বিষণ্ণতা, বৈচিত্র্যহীনতা, স্বাগত, দুঃখ, আকস্মিক আনন্দ, শান্তি, এমনকি আনন্দের ভাবও রয়েছে এই গানগুলিতে। প্রত্যেকটির রূপ স্বতন্ত্র, প্রত্যেকটির পাঁচ-ছয় রকমের বৈচিত্র্য। এক কথায় বলতে গেলে এই প্রত্যেকটি মল্লার সংগীতের নিজস্ব কাব্যগুণ রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের গানের ভাব মূলত ছিল কাব্যিক একথা আমার মতে ঠিক নয়। কথা ও সুরের সুসামঞ্জস্য আরোপেই এই ভাবে সৃষ্টি হয়েছিল।  
     --ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথের গান, সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত রবীন্দ্রসংগীতের চিন্তা, প্রতিভাস, ১৯৯৩