গীতবিতান-GITABITAN
স্বপ্নে আমার মনে হল কখন ঘা দিলে আমার দ্বারে, হায়।

Stamp

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩৪৬ (১৯৩৯)
কবির বয়স: ৭৮
প্রকাশ: ০ , সানাই-আধোজাগা র-র ২৪
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রকৃতি-বর্ষা; ১৩১/৪৭৭
রাগ / তাল: হাম্বীর / ষষ্ঠী
স্বরলিপি: স্বরবিতান ৫৮
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার
পাদটিকা:
স্বতন্ত্র কাব্যরূপ আছে।  

আলোচনা

'স্বপ্নে আমার মনে হল' গানটি আমার মনকে গভীরভাবে নাড়া দিযেছিল, শেখাবার সময় গুরুদেব তা লক্ষ্য করেছিলেন। পরদিন প্রবল বর্ষার মধ্যে সকালবেলা যখন গুরুদেবের কাছে গেলাম তখন তিনি বললেন-- এই দুর্যোগের মধ্যেও তুমি এসেছ, ভালই হল। তোমাকে আমার দরকার। গতকালের গানের সুরটি তেমন ভালো হয়নি, চলো বদলে দিই।

আমি বললাম-- আমি সমস্ত রাত্রি গানটির সুরের মধ্যে ডুবে ছিলাম। এই সুরটি আমার পিছু তাড়া করেছে। দোহাই, এটিকে আর বদলাবেন না। এই বলে আমি ঘোর আপত্তি জানাচ্ছিলাম, তখন গুরুদেব হেসে বললেন-- তোমাকে নিয়ে যে ঠাট্টা করি তাও তুমি বুঝতে পার না। ঐ গানের সুর আমারও ভাল লেগেছে।  

১৯৩৯ সন। বর্ষামঙ্গলের প্রস্তুতি চলছিল। ... আমি গুরুদেবকে বললাম যে, ছেলেমেয়েরা বলছে নতুন গান চাই, পুরানো গানে ওরা আর বর্ষামঙ্গল করবে না। গুরুদেব বললেন-- এই অল্প সময়ের মধ্যে কি করে আর নতুন গান লেখা যায়? অন্য অনেক কাজও তো আছে। সেদিন এই পর্যন্ত। পরদিন বেলা এগারোটায় গুরুদেব আমাকে ডেকে পাঠালেন। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নতুন লেখা একটি গান হাতে দিলেন। গানটি -- 'ওগো সাঁওতালি ছেলে'। দ্বিতীয় গান 'বাদলদিনের প্রথম কদমফুল' পেলাম তার পরের দিনই। ... [টেবিলে 'বেহাগ' লিখে রেখে আসার পর;   গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য] সেই বেহাগে পেলাম এই গান -- 'আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে'। তার পরের দিন আবার কাগজে লিখে এলাম 'ইমন', পেলামও--'এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও' গানটি। এবার আবার কাগজে লিখে রেখে দিয়ে এলাম-- 'তান দেওয়া গান'। পেয়ে গেলাম-- 'আজ শ্রাবণের গগনের গায়'।

সব শুদ্ধ হল পাঁচটি নতুন গান। ষষ্ঠ গানটি ['আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে',   গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য ] গুরুদেব নিজে থেকে লিখলেন। ছটি নতুন গান লেখার পর গুরুদেব বললেন-- তোমার কাজ তো হয়ে গেল, এবার তুমি থামো। আমি বললাম -- এক ডিজিটের মূল্য কি? অন্তত দুটো ডিজিট করে দিন, একের পাশে অন্তত শূন্য চাই।

পরের গান যেটি পেলাম সেটি 'স্বপ্নে আমার মনে হল [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]। পরের গানটি পেলাম-- 'এসেছিলে তবু আস নাই'। এটি শ্রীমতী অমিতা ঠাকুরের উদ্দেশে লেখা। 'এসেছিনু দ্বারে তব', 'নিবিড় মেঘের ছায়ায় মন দিয়েছি মেলে' এই গান দুটি পর পর পেয়ে গেলাম। এর পরেই কবি বললেন-- একের পরে শূন্য বসে গেল, এবার শেষ। আমি বললাম-- শূন্যের কোন মূল্যই নেই, একের পাশে অন্তত দুই বসিয়ে এক ডজন করে দিন।

পরের দিন আবার কাগজে 'কীর্তন', 'বাউল' কথা দুটি লিখে চাপা দিয়ে রেখে এলাম লেখার টেবিলে। সেই সূত্রে পাওয়া গেল-- 'পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে'। তার পরের বারো নম্বর গানটি হল-- 'শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে'।

এভাবে বারোটি গান শেষ করে গুরুদেব বললেন-- আমাকে অন্য কাজে মন দিতে হবে, এবারে তুমি থামো, তুমি বুঝতে পারছ না তোমার ওপর আশ্রমের অনেকেই অসন্তুষ্ট হচ্ছেন। বর্ষামঙ্গলেরও তো দেরি হয়ে যাচ্ছে।

সেদিন হাতজোড় করে বলেছিলাম--ষোলকলায় পূর্ণ করে দিন, আর চাইব না। 'আজি মেঘ কেটে গেছে' লেখা হল। এরপর আবার গানের অনুরোধ করে সেই একই উপায়ে কাগজে 'বাগেশ্রী' কথাটি লিখে রেখে এলাম।... পরদিন বাগেশ্রীতে পেলাম 'সঘন গহন রাত্রি' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।... পরের গানটি 'ওগো তুমি পঞ্চদশী' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।  

[পরে লাইব্রেরীর বারান্দায় নতুন পনেরোটি গান নিয়ে বর্ষামঙ্গল আরম্ভ হল, কিন্তু অসুস্থতার কারণে মাঝপথে অনুষ্ঠান বন্ধ করে রবীন্দ্রনাথকে চলে যেতে হয়। কয়েকদিন পরে 'বাসি বর্ষামঙ্গল' নাম দিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি করার কথা উঠলো] সেদিন সকালবেলা অনুষ্ঠান-সূচী নিয়ে আমি যখন গুরুদেবের কাছে গেলাম তখন গুরুদেব বললেন-- এখনই যদি আমি তোমাকে একটা নতুন গান শিখিয়ে দিই তাহলে সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের দিয়ে গাওয়াতে পার কি? এটা হলে তোমার প্রস্তাব মত ষোলটি গান হয়ে যায়, ষোলকলা পূর্ণ হয়। আমি তখনই রাজী। সেই নতুন গানটি হল -- 'যবে রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, যাত্রাপথের আনন্দগান, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৮৫  



রবীন্দ্রসংগীতে তানের ব্যবহার প্রসঙ্গে: রবীন্দ্রনাথ বলতেন, তান চলে তরঙ্গায়িত গতিতে, আর মীড় চলে গড়িয়ে। শাস্ত্রীয় মার্গসংগীতে তান ও আলাপের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ছোটো ছোটো তান ব্যবহার করেছেন মাত্র কথার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। ভাবের অভিব্যক্তির জন্য যতোটুকু প্রয়োজন ততটুকুই। একটা উদাহরণ পাই '   পাতার ভেলা ভাসাই নীরে '-- এই গানটিতে। জলের স্রোতোধারার সঙ্গে সুরের মিল যেন সম্পূর্ণ। সারা গানটাই তানে তানে মুখর, স্রোতের ভাবটি ফুটিয়ে তোলার জন্য। '   প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে '-- এই গানে 'খুশির তুফান উঠেছে' এই কথার ভিতর প্রাণের উচ্ছল আনন্দ ছুটে বার হয়ে আসতে চাইছে। সেই স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দকে প্রকাশ করা হয়েছে কয়েকটি তানে। 'উঠেছে' এই শব্দের শেষে বারে বারে এই তান ঘুরে ঘুরে আসে। অন্য একটি বিশেষ গানের উদাহরণ দিই। '   স্বপ্নে আমার মনে হলো '- গানটিতে একটি নিবিড় বিহ্বল আনন্দের অপরূপ ভাবমূর্তি ফুটে উঠেছে-- তার ছন্দে, সুরে, ভঙ্গিমায়। এই গানে ছোটোখাটো দু'তিনটি তান লাগানো হয়েছে যা গানের বাণীকে অধীর আবেগে মাতিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে 'বনের চারিধারে' এর 'চারিধারে' শব্দে যে তান তা যেন ছড়িয়ে পড়ার পুলকে আকুল। '   শ্রাবণের গগনের গায় '-- এই গানেও কয়েকটি তানে শ্রাবণের একটি উদ্দাম অধীর আনন্দের রূপকে প্রকাশ করেছেন কবি। কখনও একেবারে খাদের পর্দা থেকে তান ছুটে চলেছে ঊর্ধ্বে, আবার কখনও নেমে গিয়েছে গভীরের দিকে। প্রকৃতির বর্ষণমুখর রূপের সঙ্গে সুর কথা এবং অনুভূতি অপূর্ব ঐকতান সৃষ্টি করেছে। (২৯৩)  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, "রবীন্দ্র সংগীতের মর্মলোকে", রবীন্দ্র প্রসঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ১৯৯৭  


[রবীন্দ্রসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে শৈলজারঞ্জনের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে] তিনিই [শৈলজারঞ্জন] বুঝিয়েছেন দূরব্যবধানের স্বরসমন্বয়ে (স-ন) কীভাবে সূচিত হয় সাগরপারের দূরত্ব ( এবার আমায় ডাকলে দূরে ), কিংবা জলের ধারা উছল গতি কেমন করে প্রাণ পায় অনুরূপ সুরসঞ্চারে। ' স্বপ্নে আমার মনে হল ' গানে 'নদী বহিল বনের পারে' কথাটুকুর সুরবিন্যাস তারই প্রমাণ--

রা গা। হ্মা -পা -ধা-না। সা -Fা। -Fা -Fা -পা -Fা I
পা ০   ০   ০   ০  ০  ০  ০  ০  ০   ০   ০

পিছন পানে ফিরে না তাকিয়ে কবি পাতার ভেলা ভাসান যে চঞ্চলস্রোতে, সেই 'নীরে' কথাটির ব্য্ঞ্জনা: মপা ধ্পা মজ্ঞা -রসা [ পান্থ তুমি পান্থজনের সখা ]।

... রক্তকরবী নাটকের ' ও চাঁদ চোখের জলের লাগল জোয়ার ' গানটির কথাও মনে পড়ছে এ প্রসঙ্গে। সে গানে চাঁদকে সম্বোধন করে বিশুপাগল শোনায় তার অন্তরের গোপনতম দুঃখের পারাবারে চোখের জলের জোয়ার আসার কথা-- চাঁদই যে আনে জোয়ার-ভাঁটা। বিশুর এই সম্বোধন তাই মীড়ের মধ্যে দিয়ে গড়িয়ে তার দুঃখের ব্যাপ্তিকে বিস্তৃত করে। টপ্পার অলংকরণের কোন স্থান নেই 'ও চাঁদ' কথাটুকুর মধ্যে।  
     --বুলবুল সেনগুপ্ত, "ওগো কর্ণধার, তোমারে করি নমস্কার", রবীন্দ্র ভাবনা, ২০০০ যুগ্ম সংখ্যা, টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটুট, কলকাতা  


 

 

১৩১

স্বপ্নে আমার মনে হল   কখন   ঘা দিলে আমার দ্বারে,   হায়।
      আমি   জাগি নাই জাগি নাই গো,
          তুমি  মিলালে অন্ধকারে, হায়॥
            অচেতন মনো-মাঝে   তখন   রিমিঝিমি ধ্বনি বাজে,
          কাঁপিল বনের ছায়া ঝিল্লিঝঙ্কারে।
      আমি   জাগি নাই জাগি নাই গো,   নদী   বহিল বনের পারে॥
          পথিক এলো দুই প্রহরে   পথের আহ্বান আনি ঘরে।
            শিয়রে নীরব বীণা   বেজেছিল কি জানি না--
                  জাগি নাই জাগি নাই গো,
              ঘিরেছিল বনগন্ধ ঘুমের চারি ধারে॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯৩৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  জওহরলাল নেহরু আর সুভাষচন্দ্র বসু শান্তিনিকেতনে এলেন কবির সঙ্গে দেখা করতে। পুরী বেড়াতে গেলেন, পুরীরাজ কবিকে 'পরমগুরু' উপাধি দিলেন। প্রকাশ: প্রহাসিনী (কবিতা), আকাশপ্রদীপ (কবিতা), শ্যামা (নৃত্যনাট্য), পথের সঞ্চয় (পত্রাবলী)

বহির্বিশ্বে: ১৯শে অগাস্ট সুভাষচন্দ্রের পরিকল্পিত মহাজাতি সদনের ভিত্তি স্থাপন করলেন রবীন্দ্রনাথ। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি। ১লা সেপ্টেম্বর যুদ্ধ ঘোষণা না করেই জার্মানির পোল্যাণ্ড আক্রমণ -- অর্থাৎ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরু।  ডিডিটি, পলিথিলিন আবিষ্কার। কবি ইয়েট্‌স ও মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ইন্‌সাইড এশিয়া (গুন্‌থার), হাউ গ্রীন ওয়াজ মাই ভ্যালি (লিউলিন), কালেক্টেড পোয়েম্‌স (হাউসম্যান), ওয়েডিং ফিস্ট (কাম্যু), রোবেস্‌পিয়র (রল্যাঁ), দি ম্যাপ অফ লাভ (ডিলান টমাস), দি ওয়াল (সার্ত্র্‌), ফ্রীডম অ্যাণ্ড কালচার (ডিউই)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



রবীন্দ্রনাথের গানে তত্ত্ব আছে, চিত্র আছে অসংখ্য, আছে প্রেম, দেশপ্রেম কি ভক্তির মতো নির্দিষ্ট ভাব কিন্তু আমার মনে হয় সে-সমস্তই উপলক্ষ্য মাত্র, লক্ষ্য নয়। বিশুদ্ধ আবেগের জগতে আমাদের পৌঁছে দেবার নানা রাস্তাই তিনি আবিষ্কার করেছেন, তার মধ্যে যে-পথ সব চেয়ে সরল ও ঋজু তা প্রকৃতি কিংবা ঋতুচক্র। ব্রহ্মসংগীত যেমন সব চাইতে অ-রাবীন্দ্রিক, তেমনি ঋতুর গানগুলো রাবীন্দ্রিক সৌরভে সব্চেযে বেশি ভরপুর, সেখানে প্রতিটি কথার চরম ব্যঞ্জনা নিষ্কাশিত। এই গানগুলো আমাদের সমস্ত জীবন অধিকার করে আছে; প্রতিদিনের জীবনে কতবার যে নতুন ক'রে নানা গানের নানা চরণ মনে পড়ে, নতুন ক'রে তাদের উপলব্ধি করি, তার কি অন্ত আছে। আকাশে মেঘ করে, নদীতে ছায়া পড়ে, একা চাঁদ আকাশ পাড়ি দেয়, হাওয়ায় গাছের পাতা দোলে, হঠাৎ একটু লাল রোদের ফালি ঘরে এসে পড়ে, সূর্যাস্ত আকাশে সোনা ছড়ায়, আবার শীত সন্ধ্যার শূন্যতা আকাশকে রিক্ত করে যায় -- যখন যা কিছু চোখে পড়ে, যা-কিছু মন দিয়ে ছুঁই সে-সমস্তই বয়ে আনে রবীন্দ্রনাথের কত গানের কত বিক্ষিপ্ত চরণ। তাঁর গান মনে না করে আমরা দেখতে, শুনতে, ভালোবাসতে, ব্যথা পেতে পারি না, আমাদের নিগূঢ় মনের বিরাট মহাদেশের কোথায় কী আছে হয়তো স্পষ্ট জানিনে, তবে এটা জানি যে সে-মহাদেশের মানচিত্র আগাগোড়াই তাঁর গানের রঙে রঙিন।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১২  


গান সম্বন্ধে যে-মতামত তিনি তাঁর প্রথম জীবনেই ব্যক্ত করেছিলেন সেটা প্রায় শেষ জীবন পর্যন্ত অটুট ছিল। বিশ বছর বয়সের একটা লেখায় তিনি বলেছিলেন: '(ওস্তাদেরা) গানের কথার উপর সুর দাঁড় করাইতে চান, আমি গানের কথাগুলিকে সুরের উপর দাঁড় করাইতে চাই। তাঁহার কথা বসাইয়া যান সুর বাহির করিবার জন্য, আমি সুর বসাইয়া যাই কথা বাহির করিবার জন্য।' এই একই কথা -- অর্থাৎ বাণী ও সুরের অর্ধনারীশ্বর সম্পর্ক -- তিনি বহুবার বহুভাবে বলেছেন।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।  


আমার কেন জানি মনে হয়, তাঁর নিজের সৃষ্ট এই ষষ্ঠী তালটি যদিও গুরুদেবের অত্যন্ত প্রিয় ছিল-- এই তালের গানগুলি সাধারণ শ্রোতারা নেবে কিনা এ বিষয়ে তাঁর বরাবর একটা সংশয় দেখেছি। তাই অনেক সময়ই এই গানগুলি বর্জন করতেন। যেমন 'শ্রাবণ গাথা'তে ' ও শ্রাবণের [আষাঢ়ের] পূর্ণিমা আমার ' -- এ গানটি প্রায়ই বাদ পড়ত।...পরেও ১৯৩৯ সনে নতুন গান দিয়ে বর্ষামঙ্গলের বেলায়ও-- ' আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে ' গানটি প্রথম ষষ্ঠী তালে রচনা করে ওই একই কারণে গুরুদেব ওটাকে কাহারবা তালে রূপান্তরিত করেন।  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, যাত্রাপথের আনন্দগান, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৮৫