গীতবিতান-GITABITAN
সঘন গহন রাত্রি, ঝরিছে শ্রাবণধারা--

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩৪৬ (১৯৩৯)
কবির বয়স: ৭৮
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রকৃতি-বর্ষা; ১৩৯/৪৮১
রাগ / তাল: মিশ্র বাগেশ্রী-মল্লার / কাহারবা
স্বরলিপি: স্বরবিতান ৫৮
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার

আলোচনা

[লেখার টেবিলে চাপা দিয়ে] কাগজে 'বাগেশ্রী' কথাটি লিখে রেখে এলাম। এটি দেখে গুরুদেব আশ্চর্য হয়ে বলেছিলেন-- বাগেশ্রীতে বর্ষার গান লিখতে বলেছ তুমি, বাগেশ্রীতে বর্ষার গান হয় কি? আমায় বলেছ ভালো, দেখো, আর কেউ যেন এটা না শোনে। আমি বলেছিলাম -- আপনার কাছে এ নিয়মটা একেবারে খাটে না। অসম্ভবও সম্ভব হয়ে যায় আপনার ছোঁয়ায়।... আমার তো মনে হয় 'আনন্দবাজারে'র সম্পাদকীয় স্তম্ভটিও আপনার হাতে দিয়ে সুর তুলে দিতে বললে তারও দেরী হবে না। আর ঝড়ের রাত্রির গান 'বাগেশ্রী'তে আপনি তো আগেই লিখেছেন। এই বলাতে তিনি আপত্তি জানালেন। বলে উঠলেন--কখ্‌খনো না। আমি তখন শেল্‌ফ থেকে গীতবিতান বইটি এনে তাঁকে খুলে দেখিয়ে দিলাম এবং গেয়ে শোনালাম। গানটি 'যে রাতে মোর দুয়ারগুলি'।... পরদিন পেলাম বাগেশ্রীতে 'সঘন গহন রাত্রি'। আমি সুরটি ভাল করে শুনে নিলাম। স্বরলিপি তৈরী করে যথারীতি শোনাবার জন্য আবার যখন গেলাম তখন 'সেথায় বিরহিণীর ... ওই তারা' এই পংক্তিতে সুরটি পরিবর্তন করে কোমল ধৈবত লাগিয়ে এটিকে গুরুদেব অসাধারণ করে তুললেন।  

১৯৩৯ সন। বর্ষামঙ্গলের প্রস্তুতি চলছিল। ... আমি গুরুদেবকে বললাম যে, ছেলেমেয়েরা বলছে নতুন গান চাই, পুরানো গানে ওরা আর বর্ষামঙ্গল করবে না। গুরুদেব বললেন-- এই অল্প সময়ের মধ্যে কি করে আর নতুন গান লেখা যায়? অন্য অনেক কাজও তো আছে। সেদিন এই পর্যন্ত। পরদিন বেলা এগারোটায় গুরুদেব আমাকে ডেকে পাঠালেন। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নতুন লেখা একটি গান হাতে দিলেন। গানটি -- 'ওগো সাঁওতালি ছেলে'। দ্বিতীয় গান 'বাদলদিনের প্রথম কদমফুল' পেলাম তার পরের দিনই। ... [টেবিলে 'বেহাগ' লিখে রেখে আসার পর;   গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য] সেই বেহাগে পেলাম এই গান -- 'আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে'। তার পরের দিন আবার কাগজে লিখে এলাম 'ইমন', পেলামও--'এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও' গানটি। এবার আবার কাগজে লিখে রেখে দিয়ে এলাম-- 'তান দেওয়া গান'। পেয়ে গেলাম-- 'আজ শ্রাবণের গগনের গায়'।

সব শুদ্ধ হল পাঁচটি নতুন গান। ষষ্ঠ গানটি ['আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে',   গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য ] গুরুদেব নিজে থেকে লিখলেন। ছটি নতুন গান লেখার পর গুরুদেব বললেন-- তোমার কাজ তো হয়ে গেল, এবার তুমি থামো। আমি বললাম -- এক ডিজিটের মূল্য কি? অন্তত দুটো ডিজিট করে দিন, একের পাশে অন্তত শূন্য চাই।

পরের গান যেটি পেলাম সেটি 'স্বপ্নে আমার মনে হল [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]। পরের গানটি পেলাম-- 'এসেছিলে তবু আস নাই'। এটি শ্রীমতী অমিতা ঠাকুরের উদ্দেশে লেখা। 'এসেছিনু দ্বারে তব', 'নিবিড় মেঘের ছায়ায় মন দিয়েছি মেলে' এই গান দুটি পর পর পেয়ে গেলাম। এর পরেই কবি বললেন-- একের পরে শূন্য বসে গেল, এবার শেষ। আমি বললাম-- শূন্যের কোন মূল্যই নেই, একের পাশে অন্তত দুই বসিয়ে এক ডজন করে দিন।

পরের দিন আবার কাগজে 'কীর্তন', 'বাউল' কথা দুটি লিখে চাপা দিয়ে রেখে এলাম লেখার টেবিলে। সেই সূত্রে পাওয়া গেল-- 'পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে'। তার পরের বারো নম্বর গানটি হল-- 'শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে'।

এভাবে বারোটি গান শেষ করে গুরুদেব বললেন-- আমাকে অন্য কাজে মন দিতে হবে, এবারে তুমি থামো, তুমি বুঝতে পারছ না তোমার ওপর আশ্রমের অনেকেই অসন্তুষ্ট হচ্ছেন। বর্ষামঙ্গলেরও তো দেরি হয়ে যাচ্ছে।

সেদিন হাতজোড় করে বলেছিলাম--ষোলকলায় পূর্ণ করে দিন, আর চাইব না। 'আজি মেঘ কেটে গেছে' লেখা হল। এরপর আবার গানের অনুরোধ করে সেই একই উপায়ে কাগজে 'বাগেশ্রী' কথাটি লিখে রেখে এলাম।... পরদিন বাগেশ্রীতে পেলাম 'সঘন গহন রাত্রি' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।... পরের গানটি 'ওগো তুমি পঞ্চদশী' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।  

[পরে লাইব্রেরীর বারান্দায় নতুন পনেরোটি গান নিয়ে বর্ষামঙ্গল আরম্ভ হল, কিন্তু অসুস্থতার কারণে মাঝপথে অনুষ্ঠান বন্ধ করে রবীন্দ্রনাথকে চলে যেতে হয়। কয়েকদিন পরে 'বাসি বর্ষামঙ্গল' নাম দিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি করার কথা উঠলো] সেদিন সকালবেলা অনুষ্ঠান-সূচী নিয়ে আমি যখন গুরুদেবের কাছে গেলাম তখন গুরুদেব বললেন-- এখনই যদি আমি তোমাকে একটা নতুন গান শিখিয়ে দিই তাহলে সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের দিয়ে গাওয়াতে পার কি? এটা হলে তোমার প্রস্তাব মত ষোলটি গান হয়ে যায়, ষোলকলা পূর্ণ হয়। আমি তখনই রাজী। সেই নতুন গানটি হল -- 'যবে রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, যাত্রাপথের আনন্দগান, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৮৫  



[আর-- ' শুকনো পাতা কে যে ' পশ্য] একটি বৈশিষ্ট্য হল, একই সুরের উপর কিছুক্ষণ থেমে থাকা। শব্দগুলি যেন বয়ে যেতে থাকে নিস্তরঙ্গ স্রোতে, যেখানে সুর তার গতিময়তা থেকে বিরাম নিয়ে স্তব্ধ সমাহিত। যেমন-- ' মনে হল যেন পেরিয়ে এলেম '। এই গানে, 'দূর হতে আমি দেখেছি তোমার ওই বাতায়নতলে' এবং 'সকরুণ নিবেদনের গন্ধ ঢালা' এই দুটি লাইনে একটি বিশেষ সুরের পর্দায় স্থির হয়ে থেমে থাকার ভাবটি লক্ষ্যণীয়। একটি বিশেষ আবেগের অনুরণনকে ধরে রাখা, আবেগকে ঘনীভূত করে তোলার জন্য।

" সঘন গহন রাত্রি ' গানটিও বিশেষভাবে এই দিক থেকে উল্লেখযোগ্য। এই গানে এক জায়গায় নয়, অনেক স্থলেই একটি সুরে দীর্ঘ অবস্থান। গানটি রাত্রির গান। সুর, ভাষা এবং সুরের চলন গাম্ভীর্যমণ্ডিত, রাত্রির গভীর জমাট বিলম্বিত লয়ে ধ্বনিত। এখানে সুরের চলন ধীর মন্থর, থেমে থেমে, যেন নিশার শূন্য হৃদয়ের অব্যক্ত বেদনায় ভরে রয়েছে। সুরের এই জমাট সংহতির উপরেই গানের অনুভূতি নির্ভর করে। গায়কের কণ্ঠে সেই স্থির অচঞ্চল গাম্ভীর্যটি প্রকাশ হলেই গানের রূপটি ফুটে উঠতে পারে।

' কবে তুমি আসবে বলে ', এই গানের ভাব আধ্যাত্মিক, যদিও প্রকৃতির শোভায় মণ্ডিত। ... এই গানের দ্বিতীয় লাইনে-- 'শুকনো ফুলের পাতাগুলি'-- একটি মাত্র পর্দায় ধরে রাখা হয়েছে। তার পরেই 'আর সময় নাহি রে'-তে 'আর' এই শব্দটিতে সুরের দোলা দিয়ে 'সময় নাহি রে' তে তার কি বিষাদ করুণ ভাব রেখে যায় এই লাইনটি মনের ভিতর। ... বারে বারে প্রতিধ্বনি জাগে, 'আর সময় নাহি রে'।  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, "রবীন্দ্রসংগীতের ভাব ও শিক্ষা", রবীন্দ্র ভাবনা, ২০০০ যুগ্ম সংখ্যা, টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটুট, কলকাতা  (পৃঃ ৪৪)  


রবীন্দ্রসংগীতে মীড়ের ব্যবহার প্রসঙ্গে: তান যদি প্রাণের লীলাচঞ্চল ভাবকে মূর্ত করতে সাহায্য করে মীড় সেখানে আবেগকে টেনে নিয়ে যায় গভীরে-- মর্মের অন্তরালে। সেখানে এক 'তরঙ্গহীন গভীর মৌন' জেগে উঠে হৃদয়-আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। একটি উদাহরণ আছে '   শুধু তোমার বাণী ' গানে। '   দিনান্ত বেলায় শেষের ফসল ' গানটিতে 'সারা' এই শব্দের একটি মীড় পাই যার রূপ প্রশান্তিকর। 'এপারে কৃষি হল সারা, যাব ওপারের ঘাটে'-- 'সারা' এই শব্দে সারা জীবনের একটি কাজ সাঙ্গ হওয়ার সুর কর্মবহুল জীবনপ্রান্তে নিবিড় প্রশান্তির আকাঙ্ক্ষায় মগ্ন মীড়টিতে তা রণিয়ে ওঠে। আরও দুটি গানের উল্লেখ করা যেতে পারে-- '   সঘন গহন রাত্রি '  এবং '   মধুর তোমার শেষ যে না পাই '। এই গান দুটিতে মীড়ের দ্বারা যেভাবে একটি রাত্রির সঘন গহন রূপ এবং অসীমতার ভাবকে ধরবার চেষ্টা হয়েছে তার তুলনা মেলে না। (২৯৪)  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, "রবীন্দ্র সংগীতের মর্মলোকে", রবীন্দ্র প্রসঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ১৯৯৭  


 

 

১৩৯

     সঘন গহন রাত্রি,   ঝরিছে শ্রাবণধারা--
         অন্ধ বিভাবরী সঙ্গপরশহারা॥
        চেয়ে থাকি যে শূন্যে   অন্যমনে
     সেথায় বিরহিণীর অশ্রু   হরণ করেছে ওই তারা॥
অশথপল্লবে বৃষ্টি ঝরিয়া   মর্মরশব্দে
     নিশীথের অনিদ্রা দেয় যে ভরিয়া।
          মায়ালোক হতে ছায়াতরণী
               ভাসায় স্বপ্নপারাবারে --
                    নাহি তার কিনারা॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

T HE night is a deep darkness.
Ceaselessly falls the rain.
Loveless, I grope through the intangible gloom.
I look listlessly to the far horizon,
  where stars lie submerged
  in the dark flood of tears of hopeless love
The rain is a monotone
  of sleepless chant which sighs
  through the sleepless night of rustling leaves.
Out of the deeps of mystery,
  a phantom boat comes floating
  on the dark waves of a dream - undefined.
  
     --Anon., Anthology.  



১৯৩৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  জওহরলাল নেহরু আর সুভাষচন্দ্র বসু শান্তিনিকেতনে এলেন কবির সঙ্গে দেখা করতে। পুরী বেড়াতে গেলেন, পুরীরাজ কবিকে 'পরমগুরু' উপাধি দিলেন। প্রকাশ: প্রহাসিনী (কবিতা), আকাশপ্রদীপ (কবিতা), শ্যামা (নৃত্যনাট্য), পথের সঞ্চয় (পত্রাবলী)

বহির্বিশ্বে: ১৯শে অগাস্ট সুভাষচন্দ্রের পরিকল্পিত মহাজাতি সদনের ভিত্তি স্থাপন করলেন রবীন্দ্রনাথ। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি। ১লা সেপ্টেম্বর যুদ্ধ ঘোষণা না করেই জার্মানির পোল্যাণ্ড আক্রমণ -- অর্থাৎ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরু।  ডিডিটি, পলিথিলিন আবিষ্কার। কবি ইয়েট্‌স ও মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ইন্‌সাইড এশিয়া (গুন্‌থার), হাউ গ্রীন ওয়াজ মাই ভ্যালি (লিউলিন), কালেক্টেড পোয়েম্‌স (হাউসম্যান), ওয়েডিং ফিস্ট (কাম্যু), রোবেস্‌পিয়র (রল্যাঁ), দি ম্যাপ অফ লাভ (ডিলান টমাস), দি ওয়াল (সার্ত্র্‌), ফ্রীডম অ্যাণ্ড কালচার (ডিউই)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


তৃতীয়ত, রবীন্দ্রনাথের গানের আত্মিক বৈশিষ্ট্য হলো এই যে প্রত্যেকটি সুরের কাঠামো এবং প্রত্যেকটি কবিতার কাঠামো একসঙ্গে মিশে একটি ভাব সৃষ্টি করে। আমরা উদাহরণস্বরূপ মল্লার রাগটির কথা উল্লেখ করতে পারি। উচ্চাঙ্গসংগীতে আমরা ছয় থেকে আট রকমের মল্লার পাই। মেঘমল্লার থেকে সুরদাসী মল্লার পর্যন্ত। মাঝে রয়েছে গৌড়মল্লার, সুরঠমল্লার এবং দেশমল্লার। এর প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র মেজাজ; এবং এই মেজাজ হলো বর্ষার। রবীন্দ্রনাথ অন্তত এই রাগের পঞ্চাশ রকম প্রয়োগ করেছেন। প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র ভাব সৃষ্টি করেছে। এখানে কয়েকটির উল্লেখ করবো। বিষণ্ণতা, বৈচিত্র্যহীনতা, স্বাগত, দুঃখ, আকস্মিক আনন্দ, শান্তি, এমনকি আনন্দের ভাবও রয়েছে এই গানগুলিতে। প্রত্যেকটির রূপ স্বতন্ত্র, প্রত্যেকটির পাঁচ-ছয় রকমের বৈচিত্র্য। এক কথায় বলতে গেলে এই প্রত্যেকটি মল্লার সংগীতের নিজস্ব কাব্যগুণ রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের গানের ভাব মূলত ছিল কাব্যিক একথা আমার মতে ঠিক নয়। কথা ও সুরের সুসামঞ্জস্য আরোপেই এই ভাবে সৃষ্টি হয়েছিল।  
     --ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথের গান, সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত রবীন্দ্রসংগীতের চিন্তা, প্রতিভাস, ১৯৯৩  


ঋতু-অনুসারে রাগের সৃষ্টি, একথা বলেছেন প্রাচীন সঙ্গীতকর্তারা। যথা, সোমেশ্বরের মত অনুসারে বসন্তে বসন্ত, গ্রীষ্মে ভৈরব, বর্ষায় মেঘ, শরতে পঞ্চম, হেমন্তে নটনারায়ণ ও শীতে শ্রী রাগ গেয়। সৌম্যেন্দ্রনাথ বলছেন যে রবীন্দ্রনাথ এই সীমা স্বীকার না করে কিছু কিছু অসাধারণ সুরযোজনা করেছেন তাঁর প্রকৃতি-পর্যায়ের গানে, সটিক উদাহরণ দিয়েছেন প্রচুর। যুগপৎ শাস্ত্রীয় ও রবীন্দ্র সঙ্গীতজ্ঞ বলে সৌম্যেন্দ্রনাথের খ্যাতি ছিল। তারই একটি সংক্ষিপ্তসার দেওয়া গেল।

বৈশাখ হে মৌনী তাপস -- হেমন্তের নট আর শীতের কেদার, অর্থাৎ নটকেদার
মধ্যদিনে যবে গান   -- হেমন্তের হাম্বীর
দারুণ অগ্নিবাণে -- হেমন্তের সারং
প্রখর তপনতাপে -- বর্ষার মুলতানী, বেদ্নার আমেজ-ভরা টোড়ি আর ভীমপলশ্রী

প্রাচীন শাস্ত্রকারদের মতে বর্ষা ঋতুর রাগ মেঘ, তার সঙ্গে মল্লার, গান্ধারী, শঙ্করাভরণ, জয়ৎ ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ বর্ষার গানে সাহানা, ইমন, পিলু, সিন্ধু, হাম্বীর, দেশ, পঞ্চম আদি অন্য সব ঋতুর রাগও ব্যবহার করেছেন। যথা,

নীলনবঘনে আষাঢ় গগনে -- হেমন্তের রাগ ইমন
সঘন গহন রাত্রি -- বসন্তের বাহার মিশেছে বর্ষার মল্লারে [শৈলজারঞ্জন বলছেন বাগেশ্রী-মল্লার]
আজি বরিষনমুখরিত -- সোহিনী, বসন্ত ও পঞ্চমের মিশ্রণ
আমার কী বেদনা -- কীর্তনের সুর

শাস্ত্রকাররা বলছেন শরতের রাগ ভৈরব, সঙ্গে আছে রামকেলি, গুর্জরী, মধুমাধবী ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছেন যোগিয়া, বিভাস, বাউল, বিলাওল, দেশ, কামোদ, কেদারা, ভৈরবী, গৌড়সারং আদি বসন্ত ও গ্রীষ্ম ঋতুর সুর।

ওগো শেফালিবনের মনের কামনা -- ভৈরবী
হৃদয়ে ছিলে জেগে -- হেমন্তের গৌড়সারং

শাস্ত্রমতে হেমন্তের রাগ হচ্ছে মালকোষ, টোড়ি, খাম্বাবতী ও হিন্দোল।

হেমন্তে কোন বসন্তেরই বাণী -- গ্রীষ্মের রাগ খাম্বাজ

শীতের রাগ বলে নির্দেশিত আছে শ্রী, মালশ্রী, আশাবরী, পাহাড়ী, ত্রিবেণী প্রভৃতি।

শীতের হাওয়ায় লাগলো নাচন -- হেমন্তের নট রাগ
এল যে শীতের বেলা -- শীতের শ্রীর সঙ্গে মিশলো পূরবী

শাস্ত্র বলে বসন্তের রাগ পঞ্চম, বসন্ত, হিন্দোল, ভূপালী, পটমঞ্জরী। রবীন্দ্রনাথ বর্ষার মল্লার, হেমন্ত বা শরতের হাম্বীর আদি অনেক অন্য ঋতুর রাগ ব্যবহার করেছেন।

মম অন্তর উদাসে -- মেঘমল্লারের সুর
এবার ভাসিয়ে দিতে হবে -- হেমন্তের হাম্বীর
বসন্ত তার গান লিখে যায় -- বর্ষার রাগ মল্লার
ফাগুন হাওয়ায় রঙে রঙে -- শরৎ ঋতুর রাগ কালাংড়ার সঙ্গে পরজ মেশানো

পুরাতনকে বিদায় দিলে না যে -- বেহাগ ও খাম্বাজ মেশানো হয়নি, পৃথকভাবে রেখে ব্যবহার করা হয়েছে: বেহাগ-খাম্বাজ-বেহাগ। (৯৮-১০৮)  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬