গীতবিতান-GITABITAN
ওগো তুমি পঞ্চদশী

Stamp

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩৪৬ (১৯৩৯)
কবির বয়স: ৭৮
প্রকাশ: আষাঢ় ১৩৪৭ , সানাই-পূর্ণা র-র ২৪
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রকৃতি-বর্ষা; ১৪০/৪৮১
রাগ / তাল: পিলু / কাহারবা
স্বরলিপি: আনদবাজার পত্রিকা; স্বরবিতান ৫৮
স্বরলিপিকার: শৈলজারঞ্জন মজুমদার; ঐ
পাদটিকা:
"বোলপুরে প্রথম টেলিফোনের পত্তন হোল (২৪ জুলাই ১৯৪০)। সেই অনুষ্ঠানে . . .  আমিও গেয়েছিলাম" দেশ সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৮০, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়] । স্বতন্ত্র কাব্যরূপ আছে।  

আলোচনা

[বর্ষামঙ্গলের নতুন গানের চতুর্দশতমটি] 'ওগো তুমি পঞ্চদশী'। রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে টপ্পা আঙ্গিকের গান অসাধারণ ফুটে উঠত। এই আঙ্গিকের গানের প্রতি আমার আকর্ষণের কথা তিনি জানতেনও। তিনি এই গানের প্রথম লাইনের কথায় টপ্পা অলঙ্করণের একটি চমৎকার সুর বসিয়ে দিলেন। কিন্তু আমার গলায় এই সুর প্রথমে ভাল আসছিল না।... প্রায় পঞ্চাশ জনের একটি দলকে এই গান শেখান হয়েছিল। গুরুদেবের সামনে তারা যখন গাইল তখন একটা অদ্ভুত হট্টগোলের মত শোনাল। গানটার এই পরিণতি দেখে তিনি চমকে উঠেছিলেন। সুরটা তখন সোজা করে দিলেন এবং সকলে মিলে গাইল।...[পরে] আমি বললাম প্রথম লাইনটি আরম্ভে দুবার গাইবার রীতি তো আছে। প্রথম সোজা সুরটি গেয়ে দ্বিতীয়বার অন্য সুরটি গাইলেই তো সুরটি থেকে যায়। গুরুদেব খুশী হয়ে সম্মতি দিলেন। পরের বছর বর্ষামঙ্গলে শ্রীমতী কণিকা মুখোপাধ্যায়কে (বিবাহের পূর্বে) গানটি আমি দুই সুরেই গাওয়ালাম। গুরুদেব এবারেও খুব খুশী হয়েছিলেন। তাঁরই প্রস্তাবে এ গানটির গ্রামোফোন রেকর্ড করা হয়েছিল।  

১৯৩৯ সন। বর্ষামঙ্গলের প্রস্তুতি চলছিল। ... আমি গুরুদেবকে বললাম যে, ছেলেমেয়েরা বলছে নতুন গান চাই, পুরানো গানে ওরা আর বর্ষামঙ্গল করবে না। গুরুদেব বললেন-- এই অল্প সময়ের মধ্যে কি করে আর নতুন গান লেখা যায়? অন্য অনেক কাজও তো আছে। সেদিন এই পর্যন্ত। পরদিন বেলা এগারোটায় গুরুদেব আমাকে ডেকে পাঠালেন। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই নতুন লেখা একটি গান হাতে দিলেন। গানটি -- 'ওগো সাঁওতালি ছেলে'। দ্বিতীয় গান 'বাদলদিনের প্রথম কদমফুল' পেলাম তার পরের দিনই। ... [টেবিলে 'বেহাগ' লিখে রেখে আসার পর;   গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য] সেই বেহাগে পেলাম এই গান -- 'আজি তোমায় আবার চাই শুনাবারে'। তার পরের দিন আবার কাগজে লিখে এলাম 'ইমন', পেলামও--'এসো গো জ্বেলে দিয়ে যাও' গানটি। এবার আবার কাগজে লিখে রেখে দিয়ে এলাম-- 'তান দেওয়া গান'। পেয়ে গেলাম-- 'আজ শ্রাবণের গগনের গায়'।

সব শুদ্ধ হল পাঁচটি নতুন গান। ষষ্ঠ গানটি ['আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে',   গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য ] গুরুদেব নিজে থেকে লিখলেন। ছটি নতুন গান লেখার পর গুরুদেব বললেন-- তোমার কাজ তো হয়ে গেল, এবার তুমি থামো। আমি বললাম -- এক ডিজিটের মূল্য কি? অন্তত দুটো ডিজিট করে দিন, একের পাশে অন্তত শূন্য চাই।

পরের গান যেটি পেলাম সেটি 'স্বপ্নে আমার মনে হল [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]। পরের গানটি পেলাম-- 'এসেছিলে তবু আস নাই'। এটি শ্রীমতী অমিতা ঠাকুরের উদ্দেশে লেখা। 'এসেছিনু দ্বারে তব', 'নিবিড় মেঘের ছায়ায় মন দিয়েছি মেলে' এই গান দুটি পর পর পেয়ে গেলাম। এর পরেই কবি বললেন-- একের পরে শূন্য বসে গেল, এবার শেষ। আমি বললাম-- শূন্যের কোন মূল্যই নেই, একের পাশে অন্তত দুই বসিয়ে এক ডজন করে দিন।

পরের দিন আবার কাগজে 'কীর্তন', 'বাউল' কথা দুটি লিখে চাপা দিয়ে রেখে এলাম লেখার টেবিলে। সেই সূত্রে পাওয়া গেল-- 'পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে'। তার পরের বারো নম্বর গানটি হল-- 'শেষ গানেরই রেশ নিয়ে যাও চলে'।

এভাবে বারোটি গান শেষ করে গুরুদেব বললেন-- আমাকে অন্য কাজে মন দিতে হবে, এবারে তুমি থামো, তুমি বুঝতে পারছ না তোমার ওপর আশ্রমের অনেকেই অসন্তুষ্ট হচ্ছেন। বর্ষামঙ্গলেরও তো দেরি হয়ে যাচ্ছে।

সেদিন হাতজোড় করে বলেছিলাম--ষোলকলায় পূর্ণ করে দিন, আর চাইব না। 'আজি মেঘ কেটে গেছে' লেখা হল। এরপর আবার গানের অনুরোধ করে সেই একই উপায়ে কাগজে 'বাগেশ্রী' কথাটি লিখে রেখে এলাম।... পরদিন বাগেশ্রীতে পেলাম 'সঘন গহন রাত্রি' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।... পরের গানটি 'ওগো তুমি পঞ্চদশী' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।  

[পরে লাইব্রেরীর বারান্দায় নতুন পনেরোটি গান নিয়ে বর্ষামঙ্গল আরম্ভ হল, কিন্তু অসুস্থতার কারণে মাঝপথে অনুষ্ঠান বন্ধ করে রবীন্দ্রনাথকে চলে যেতে হয়। কয়েকদিন পরে 'বাসি বর্ষামঙ্গল' নাম দিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি করার কথা উঠলো] সেদিন সকালবেলা অনুষ্ঠান-সূচী নিয়ে আমি যখন গুরুদেবের কাছে গেলাম তখন গুরুদেব বললেন-- এখনই যদি আমি তোমাকে একটা নতুন গান শিখিয়ে দিই তাহলে সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের দিয়ে গাওয়াতে পার কি? এটা হলে তোমার প্রস্তাব মত ষোলটি গান হয়ে যায়, ষোলকলা পূর্ণ হয়। আমি তখনই রাজী। সেই নতুন গানটি হল -- 'যবে রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা' [ গানটির তথ্য পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য]।  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, যাত্রাপথের আনন্দগান, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৮৫  



রবীন্দ্রনাথ গানের ভাষাকে একেবারে ঘরোয়া আটপৌরে করে যখন রচনা করেন তখন তার সুরও আমাদের অত্যন্ত আপন বলে মনে হয়। আমরা বাংলাভাষীরা 'ওগো' কথায় যেন একটু বেশি হৃদয় মিশিয়ে থাকি, খুব গভীর আত্মীয়তার ভাব ফোটাতে চাই। একটি গান-- '   ওগো সাঁওতালী ছেলে '-- এতে ওগো শব্দে একটি দীর্ঘ তান যুক্ত হয়েছে-- ফলে সম্বোধনটি বড় আন্তরিক হয়ে উঠেছে। এর সুরের খেলাতেই যেন সমস্ত গানের আবেগময়তা ফুটে ওঠে। আরেকটি গান '   ওগো তুমি পঞ্চদশী ' এতেও 'ওগো'-তে দুবার দুরকম তান যুক্ত করা হয়েছে। '   ওগো আমার প্রাণের ঠাকুর ' এই গানটির আবেদন 'ওগো' শব্দে শুধু প্রকাশ করা হয়েছে  গ মা -ণা এই মীড়ে, শুরুতেই যা এর ভাবকে প্রকট করে। (২৯২)  
     --শৈলজারঞ্জন মজুমদার, "রবীন্দ্র সংগীতের মর্মলোকে", রবীন্দ্র প্রসঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ১৯৯৭  


 

 

১৪০

             ওগো তুমি পঞ্চদশী,
তুমি      পৌঁছিলে পূর্ণিমাতে।
মৃদুস্মিত স্বপ্নের আভাসে তব বিহ্বল রাতে॥
         ক্বচিৎ জাগরিত বিহঙ্গকাকলী
              তব নবযৌবনে উঠিছে আকুলি ক্ষণে ক্ষণে।
         প্রথম আষাঢ়ের কেতকীসৌরভ তব নিদ্রাতে॥
                      যেন অরণ্যমর্মর
               গুঞ্জরি উঠে তব বক্ষ থরথর।
                 অকারণ বেদনার ছায়া ঘনায় মনের দিগন্তে,
                     ছলোছলো জল এনে দেয় তব নয়নপাতে॥

Group

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯৩৯ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  জওহরলাল নেহরু আর সুভাষচন্দ্র বসু শান্তিনিকেতনে এলেন কবির সঙ্গে দেখা করতে। পুরী বেড়াতে গেলেন, পুরীরাজ কবিকে 'পরমগুরু' উপাধি দিলেন। প্রকাশ: প্রহাসিনী (কবিতা), আকাশপ্রদীপ (কবিতা), শ্যামা (নৃত্যনাট্য), পথের সঞ্চয় (পত্রাবলী)

বহির্বিশ্বে: ১৯শে অগাস্ট সুভাষচন্দ্রের পরিকল্পিত মহাজাতি সদনের ভিত্তি স্থাপন করলেন রবীন্দ্রনাথ। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি। ১লা সেপ্টেম্বর যুদ্ধ ঘোষণা না করেই জার্মানির পোল্যাণ্ড আক্রমণ -- অর্থাৎ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরু।  ডিডিটি, পলিথিলিন আবিষ্কার। কবি ইয়েট্‌স ও মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ইন্‌সাইড এশিয়া (গুন্‌থার), হাউ গ্রীন ওয়াজ মাই ভ্যালি (লিউলিন), কালেক্টেড পোয়েম্‌স (হাউসম্যান), ওয়েডিং ফিস্ট (কাম্যু), রোবেস্‌পিয়র (রল্যাঁ), দি ম্যাপ অফ লাভ (ডিলান টমাস), দি ওয়াল (সার্ত্র্‌), ফ্রীডম অ্যাণ্ড কালচার (ডিউই)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



রবীন্দ্রনাথের গানে তত্ত্ব আছে, চিত্র আছে অসংখ্য, আছে প্রেম, দেশপ্রেম কি ভক্তির মতো নির্দিষ্ট ভাব কিন্তু আমার মনে হয় সে-সমস্তই উপলক্ষ্য মাত্র, লক্ষ্য নয়। বিশুদ্ধ আবেগের জগতে আমাদের পৌঁছে দেবার নানা রাস্তাই তিনি আবিষ্কার করেছেন, তার মধ্যে যে-পথ সব চেয়ে সরল ও ঋজু তা প্রকৃতি কিংবা ঋতুচক্র। ব্রহ্মসংগীত যেমন সব চাইতে অ-রাবীন্দ্রিক, তেমনি ঋতুর গানগুলো রাবীন্দ্রিক সৌরভে সব্চেযে বেশি ভরপুর, সেখানে প্রতিটি কথার চরম ব্যঞ্জনা নিষ্কাশিত। এই গানগুলো আমাদের সমস্ত জীবন অধিকার করে আছে; প্রতিদিনের জীবনে কতবার যে নতুন ক'রে নানা গানের নানা চরণ মনে পড়ে, নতুন ক'রে তাদের উপলব্ধি করি, তার কি অন্ত আছে। আকাশে মেঘ করে, নদীতে ছায়া পড়ে, একা চাঁদ আকাশ পাড়ি দেয়, হাওয়ায় গাছের পাতা দোলে, হঠাৎ একটু লাল রোদের ফালি ঘরে এসে পড়ে, সূর্যাস্ত আকাশে সোনা ছড়ায়, আবার শীত সন্ধ্যার শূন্যতা আকাশকে রিক্ত করে যায় -- যখন যা কিছু চোখে পড়ে, যা-কিছু মন দিয়ে ছুঁই সে-সমস্তই বয়ে আনে রবীন্দ্রনাথের কত গানের কত বিক্ষিপ্ত চরণ। তাঁর গান মনে না করে আমরা দেখতে, শুনতে, ভালোবাসতে, ব্যথা পেতে পারি না, আমাদের নিগূঢ় মনের বিরাট মহাদেশের কোথায় কী আছে হয়তো স্পষ্ট জানিনে, তবে এটা জানি যে সে-মহাদেশের মানচিত্র আগাগোড়াই তাঁর গানের রঙে রঙিন।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১২