গীতবিতান-GITABITAN
আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা--

Book Cover

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ৩ ভাদ্র ১৩১৫ (১৯০৮)
কবির বয়স: ৪৭
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
প্রকাশ: ভাদ্র ১৩১৫ , শারদোৎসব র-র ৭ |
গীতাঞ্জলি ১১ (১৯১০) র-র ১১;গান (বিবিধ); ঋণশোধ (১৩২৮); র-র ১৩
Sheaves
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রকৃতি-শরৎ; ১৪৪/৪৮৩
রাগ / তাল: কালাংড়া-ভৈরবী / একতাল
স্বরলিপি: সঙ্গীত প্রকাশিকা; সঙ্গীতগীতাঞ্জলি;শেফালি; স্বরবিতান ৫০ (শেফালি)
স্বরলিপিকার: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়; ভীমরাও শাস্ত্রী; দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
দ্বিতীয় দৃশ্যের গান।  

আলোচনা

"বর্ষা গেল, খুব ভালো করিয়া শারদোৎসব করিবার জন্য কবি উৎসুক হইলেন। ... কবি লাগিয়া গেলেন শরৎকালের উপযুক্ত সব গান রচনা করিতে। একে একে অনেকগুলি গান রচিত হইল। ক্রমে তাঁহার মনে হইল গানগুলিকে একটি নাট্যসূত্রে বাঁধিতে পারিলে ভালো হয়। তাহার পর তৈয়ারি হইয়া উঠিল শারদোৎসব নাটক।...তখন তিনি প্রকৃতির শুধু আনন্দরূপটিই দেখিতেছেন। ক্রমে তাঁহার মনে আসিল একটি গভীর তত্ত্বকথা। বর্ষায় এই পৃথিবী আকাশ থেকে অজস্র রসধারা পায়, শরতে সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধিতে পৃথিবী তাহা ফিরাইয়া দিয়া ঋণ শোধ করে -- এই কথাই গুরুদেবের মনের মধ্যে তখন ছিল ভরপুর হইয়া। সেই কথাটাই শারদোৎসবের বীজ-সত্য।"  

"আশ্রমে আমার ঠাকুরদাদা নামটি চলিত হইয়া পড়িয়াছিল। কবি ভাবিয়াছিলেন আমি ভালো গাহিতে পারি, সেইজন্য শারদোৎসবে ঠাকুরদার ভূমিকাটি আমাকে দেওয়া হইবে স্থির করিয়া অনেকগুলি গান ভরিয়া দেওয়া হয়। যখন আমি বলিলাম গান আমার দ্বারা চলিবে না ...তখন আমার উপর সন্ন্যাসীর পার্ট করিবার আদেশ করিলেন।. ..ঠিক হইল, গানের সময় বাহিরে আমার অভিনয় চলিলেও ভিতর হইতে রবীন্দ্রনাথ গান করিবেন।...[দর্শকদের] সকলেই বলিলেন এতদিনে এমন একজন লোক পাওয়া গেল যিনি গানে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিতে পারেন।"  
     --ক্ষিতিমোহন সেন, "বেদমন্ত্ররসিক রবীন্দ্রনাথ", বিশ্বভারতী পত্রিকা বৈশাখ, ১৩৫০  



জগদানন্দ রায় [শান্তিনিকেতনের প্রথম যুগের খ্যাতনামা শিক্ষক] জানাচ্ছেন: "১৯০৮ সালের একটি ঘটনার কথা মনে পড়িল। তখন গুরুদেব ছেলেদের সঙ্গে লাইব্রেরির উপরকার দোতালা খড়ের ঘরে [বল্লভী] থাকিতেন। সেই ঘরের ছেলেরা বড় উচ্ছৃঙ্খল হইয়া পড়িয়াছিল। তাই তাঁহাকে সেখানে কিছুকাল থাকিতে হইয়াছিল। হয়ত ছেলেদের মনোরঞ্জন করিয়া সংযত রাখিবার জন্য ওই ঘরে বসিয়া তিনি একখানি নাটক লেখা আরম্ভ করিয়া দিলেন। দিনে দিনে নূতন নূতন সুরে গান রচনা হইতে লাগিল।

সন্ধ্যার পরে সেখানে বসিয়াই ছেলেদের সেইসব গান শিখাইতে লাগিলেন। আনন্দের আর সীমা রহিল না। আশ্রমে যে একটা থমথমে ভাব ছিল তাহা কাটিয়া গেল। ইহাই সেই সুপ্রসিদ্ধ 'শারদোৎসব' নাটক। তখন সবে নাট্যঘরের মাঝের অংশটা নির্মিত হইয়াছে। গুরুদেব সেই ঘরে সভা করিয়া একদিন সন্ধ্যায় 'শারদোৎসব' পড়িয়া শুনাইলেন।" (৮৭)  
     --শান্তিদেব ঘোষ, জীবনের ধ্রুবতারা, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৬  


মনে পড়ে আমাদের 'শারদোৎসব'-এর মহড়া প্রথম দিকে শুরু হয়েছিল দ্বারিক বাড়ির দোতলায়। দিনদা রোজ গানগুলি শেখাতেন-- গানে অভিনয় করতেও প্রথম দিকে তিনিই শেখাতেন। তারপর রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং উপস্থিত থেকে আনন্দের ভাব প্রকাশ করে উঠে দাঁড়িয়ে গানগুলি আমাদের সঙ্গে গাইতেন। ... যখন গাইতাম [ মেঘের কোলে রোদ হেসেছে ]--
    কেয়াপাতার নৌকো গড়ে...  দুলে দুলে
তখন রবীন্দ্রনাথ নিজে গাইতে গাইতে দেখাতেন দু'হাতে কেয়াপাতার নৌকো গড়ার ভঙ্গি, তারপর বাঁ হাতে যেন নৌকোটি ধরে দোলাতে দোলাতে গান গাইছেন 'চলবে দুলে দুলে'। এই ভাবেই অল্প অল্প করে ভাবের নৃত্য শিখেছি আমরা তাঁরই কাছে।... বাউলের ঢং-এ ভাবেরই নাচ করতাম আমরা, কারো নাচের সঙ্গে কারো নাচের মিলের প্রয়োজন হত না. সকলেই যার যার মতো করে আনন্দ প্রকাশ করতাম। রবীন্দ্রনাথ আমাদের সঙ্গে গাইতে গাইতে আনন্দে মেতে উঠতেন।    
     --অমিতা সেন, নৃত্যরচনায় রবীন্দ্রনাথ, শারদীয় যুগান্তর, ১৩৮৮  


রবীন্দ্রনাথ একটানা আঠারো ঘণ্টা লিখে শারদোৎসব নাটকটি সমাপ্ত করেন। রবীন্দ্রনাথের রচনায় যতো পাঠ-সংস্কার দেখা যায়, এই নাটকে তার বাহুল্য একেবারেই নেই।  
     --[র-জী], ৬/২৫  


[১৯১১ সালে শান্তিনিকেতনে] সন্ধ্যার সময় ফিরিয়া আসিয়া, খাওয়া দাওয়া সারিয়া, 'শারদোৎসব' অভিনয় দেখিতে চলিলাম। গিয়া পৌঁছিবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই অভিনয় আরম্ভ হইল। অভিনয় তখনকার দিনে সর্বাঙ্গসুন্দর বলিয়া বোধ হইত, কোনো ত্রুটি তো চোখে পড়িত না। বালকদের গান ও নৃত্য এত সুন্দর লাগিয়াছিল যে ত্রিশ বৎসর পরেও উহা যেন চোখের সম্মুখে দেখিতে পাই। দুইটি গানের কথা বিশেষ করিয়া মনে পড়ে, ' আমার নয়ন-ভুলানো এলে ', এবং ' আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ '। রবীন্দ্রনাথ সন্ন্যাসীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন, সুতরাং এবারেও [অন্যবার 'রাজা' অভিনয়] তাঁহাকে তাঁহার সাধারণ বেশের বিশেষ কিছু পরিবর্তন করিতে হয় নাই, শুধু মাথায় একটি গেরুয়া রঙের পাগড়ি পরিয়া আসিয়াছিলেন।

এইবার লালচে কাগজের উপর ছাপা একটি প্রোগ্রাম পাইলাম। এটি এখনও আমার কাছে আছে। নূতন তিনটি গান রচিত হইয়াছে [উপরের পাদটিকা পশ্য], তাহা উহাতেই প্রথম দেখিলাম। একটি ' ওগো শেফালিবনের কামনা ', দ্বিতীয় ' আজ প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি ', তৃতীয়, ' আমাদের শান্তিনিকেতন '।  [এই তিনটি গানের কোনোটিই বর্তমান রবীন্দ্ররচনাবলীর 'শারদোৎসব' নাটকে নেই।] প্রোগ্রামটি কলিকাতার আদি ব্রাহ্মসমাজ প্রেসে ছাপানো, ইহাতে নাটকের পাত্রদের নামও ছাপা হইয়াছিল। ঠাকুরদা সাজিয়াছিলেন অজিতকুমার চক্রবর্তী, লক্ষেশ্বর শ্রীযুক্ত তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় [দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র]। প্রমথনাথ বিশী [খ্যাতনামা সাহিত্যিক] সাজিয়াছিলেন ধনপতি। বালকদের ভিতরেও অনেকে এখন জনসমাজে সুপরিচিত। (২৮)  
     --সীতা দেবী, পুণ্যস্মৃতি, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৩৯০  


 

 

১৪৪

আমরা  বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা--
       নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা॥
       এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,
এসো   নির্মল নীলপথে,
এসো   ধৌত শ্যামল আলো-ঝলমল বনগিরিপর্বতে--
এসো   মুকুটে পরিয়া শ্বেতশতদল শীতল-শিশির-ঢালা।
       ঝরা মালতীর ফুলে
       আসন বিছানো নিভৃত কুঞ্জে ভরা গঙ্গার কূলে,
       ফিরিছে মরাল ডানা পাতিবারে তোমার চরণমূলে।
       গুঞ্জর তাল তুলিয়ো তোমার সোনার বীণার তারে
       মৃদুমধু ঝঙ্কারে,
       হাসি-ঢালা সুর গলিয়া পড়িবে ক্ষণিক অশ্রুধারে।
       রহিয়া রহিয়া যে পরশমণি ঝলকে অলককোণে
       পলকের তরে সকরুণ করে বুলায়ো বুলায়ো মনে--
       সোনা হয়ে যাবে সকল ভাবনা, আঁধার হইবে আলা॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

The Goddess of Autumn

W E HAVE tied a bunch of white reed flowers,
  We have woven a wreath of sephali blossoms;
  We have filled the tray
  With ears of new corn.
  Come, goddess of autumn, on
  Thy chariot of white cloud,
  Come along the broad, blue road
  On the new washed green hills
  Glittering in the sunlight.
  Come wearing the white lotus sprinkled
  With cool drops of dew in thy crown.
  In the quiet grove on the bank of the full Ganges
  The swan is waiting to spread
  Its wings at thy feet.
  Strike soft thy gold harp, and glad notes
  Will mingle with a touch of sadness;
  Take the magic jewel in thy hair
  And touch our thoughts,
  And all care will turn into gold,
  And darkness will become light!

[sephali =  A small white flower with a yellow stem and a delicate scent.]
  
     --Nagendranath Gupta, Sheaves, Indian Press, Allahabad, 1929  



Another version:

W HITE thistles we have tied in clusters.
White shephali we have woven into garlands.
Our baskets we have garnished
  with sheaves of green paddy.
Come, queen of autumn,
  floating on your chariot of white clouds,
  your head crowned
  with white lotus freshly drenched in dew.
Ah, come tracing a path in the clear blue sky,
  over the hills washed in rain,
  and verdant forests glistening in the sun.
Where the water of the Ganges
  brims over the bank,
  there is a sequestered cove.
Its floor is strewn with
  white petals of malati in your welcome.
The white swan attends nearby' waiting for you
  to land your feet on his outspread wings.
Gently strike the strings of your golden veena
  into the murmur of a song.
Let the happy strains sweetly melt into a sad note,
  for a little while.
Let the touch-stone
  which shines in your hair's darkness,
  shine for a little while on me.
Then, all my gloomy thought will turn golden,
  and all that is dark will become bright again.
  
     --Anon., Anthology.  



১৯০৮ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণ দিলেন বাংলায় -- এই পরিবেশে এই প্রথম। ক্ষিতিমোহন সেন এলেন শান্তিনিকেতনে, শ্রাবণ মাসে বর্ষা উৎসবের সূচনা হোলো তাঁর এবং বিধুশেখরের উৎসাহে। শারোদৎসবের সূচনা, 'শারদোৎসব' রচনা ও অভিনয়। শান্তিনিকেতনে বালিকা বিদ্যালয়ের সূচনা। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের নতুন ভবনের দ্বারোদ্ঘাটন করলেন। পতিসরে কালীমোহন ঘোষ ও আরো কয়েকজন কর্মী নিয়ে পল্লী সংগঠনের কাজ শুরু হোলো। প্রকাশ: প্রজাপতির নির্বন্ধ, প্রহসন, রাজা ও প্রজা, সমূহ, স্বদেশ, সমাজ, শিক্ষা (সবগুলি গদ্যগ্রন্থাবলীর বিভিন্ন খণ্ডরূপে), কথা ও কাহিনী, গান, শারদোৎসব, মুকুট।

বহির্বিশ্বে: ১লা মার্চ টাটা আয়রন অ্যাণ্ড স্টিল কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত। সংবাদপত্রে সরকারের সমালোচনা লেখায় বালগঙ্গাধর টিলক গ্রেপ্তার হলেন। মাণিকতলার বাগানবাড়িতে বোমা তৈরির মশলা পাওয়ায় অন্য অনেকের সঙ্গে বারীন্দ্র ও অরবিন্দ ঘোষ গ্রেপ্তার হলেন।  ১১ই অগাস্ট ক্ষুদিরাম দাসের ফাঁসি। আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলা শুরু-- অরবিন্দ ঘোষ অন্যতম অভিযুক্ত, চিত্তরঞ্জন দাশ আসামী পক্ষের ব্যারিস্টার। সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিলেত থেকে ফিরে 'হিন্দুস্থান কোঅপারেটিভ সোসাইটি'র পরিচালকত্ব গ্রহণ করলেন। টিলককে ৬ বছর মান্দালয় জেলে আবদ্ধ রাখার আদেশ। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের পত্তন। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: ইয়ামা, দি পিট (কুপরিন), লে ইপেভ্‌স (প্রুদ্‌ম)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


রবীন্দ্রনাথের গানে তত্ত্ব আছে, চিত্র আছে অসংখ্য, আছে প্রেম, দেশপ্রেম কি ভক্তির মতো নির্দিষ্ট ভাব কিন্তু আমার মনে হয় সে-সমস্তই উপলক্ষ্য মাত্র, লক্ষ্য নয়। বিশুদ্ধ আবেগের জগতে আমাদের পৌঁছে দেবার নানা রাস্তাই তিনি আবিষ্কার করেছেন, তার মধ্যে যে-পথ সব চেয়ে সরল ও ঋজু তা প্রকৃতি কিংবা ঋতুচক্র। ব্রহ্মসংগীত যেমন সব চাইতে অ-রাবীন্দ্রিক, তেমনি ঋতুর গানগুলো রাবীন্দ্রিক সৌরভে সব্চেযে বেশি ভরপুর, সেখানে প্রতিটি কথার চরম ব্যঞ্জনা নিষ্কাশিত। এই গানগুলো আমাদের সমস্ত জীবন অধিকার করে আছে; প্রতিদিনের জীবনে কতবার যে নতুন ক'রে নানা গানের নানা চরণ মনে পড়ে, নতুন ক'রে তাদের উপলব্ধি করি, তার কি অন্ত আছে। আকাশে মেঘ করে, নদীতে ছায়া পড়ে, একা চাঁদ আকাশ পাড়ি দেয়, হাওয়ায় গাছের পাতা দোলে, হঠাৎ একটু লাল রোদের ফালি ঘরে এসে পড়ে, সূর্যাস্ত আকাশে সোনা ছড়ায়, আবার শীত সন্ধ্যার শূন্যতা আকাশকে রিক্ত করে যায় -- যখন যা কিছু চোখে পড়ে, যা-কিছু মন দিয়ে ছুঁই সে-সমস্তই বয়ে আনে রবীন্দ্রনাথের কত গানের কত বিক্ষিপ্ত চরণ। তাঁর গান মনে না করে আমরা দেখতে, শুনতে, ভালোবাসতে, ব্যথা পেতে পারি না, আমাদের নিগূঢ় মনের বিরাট মহাদেশের কোথায় কী আছে হয়তো স্পষ্ট জানিনে, তবে এটা জানি যে সে-মহাদেশের মানচিত্র আগাগোড়াই তাঁর গানের রঙে রঙিন।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১২  


[শান্তিনিকেতনের] ছাত্রদের 'শিশু' নামক একটি পত্রিকায়, ইংলণ্ড বাসকালীন [১৯১২ সালে, কবির সঙ্গে] বাবার [কালীমোহন ঘোষ, ১৯০৭ সাল থেকে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত ছিলেন] একটি পত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেই পত্রে ইংলণ্ডের খ্রিস্টোৎসবের সময়ে সে দেশের ছোট ছোট শিশুরা কীভাবে আমোদ-প্রমোদ করত তার কথা আছে। চিঠির একস্থানে বাবা লিখছেন-- 'লণ্ডনের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা একত্র হয়ে অদ্ভুত পরীর পোশাক পরে সুন্দরভাবে নাচছে। এক-এক বিদ্যালয়ের এক এক দল। আমাদের শারদীয় উৎসবে তোমরা নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে ডালি সাজিয়ে নেচে নেচে যে গান করেছিলে, এ সেই ধরনের।" বাবা যে গানটির উল্লেখ করেছেন সে গানটির প্রথম পঙ্‌ক্তি হল 'আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ'। (৬৭)  
     --শান্তিদেব ঘোষ, জীবনের ধ্রুবতারা, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৬  


ভৈরবী সুরের মোচড়গুলো কানে এলে জগতের প্রতি এক রকম বিচিত্র ভাবের উদয় হয়... মনে হয় একটা নিয়মের হস্ত অবিশ্রাম আর্গিন যন্ত্রের হাতা ঘোরাচ্ছে এবং সেই ঘর্ষণবেদনায় সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মর্মস্থল হতে একটা গম্ভীর কাতর করুণ রাগিণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে-- সকাল বেলাকার সূর্যের সমস্ত আলো ম্লান হয়ে এসেছে, গাছপালারা নিস্তব্ধ হয়ে কী যেন শুনছে এবং আকাশ একটা বিশ্বব্যাপী অশ্রুর বাষ্পে যেন আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে-- অর্থাৎ, দূর আকাশের দিকে চাইলে মনে হয় যেন একটা অনিমেষ নীল চোখ কেবল ছল্‌ছল্‌ করে চেয়ে আছে।
    কলকাতা, জুন ১৮৮৯  #৩  

অ[বন?] ও বাড়িতে তাদের এক তলার ঘরে বসে এস্‌রাজে ভৈরবী আলাপ করছে, আমি তেতলার কোণের ঘরে বসে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। তোর চিঠিতেও তুই মাটাঙ্গের ভৈরবী আলাপের কথা লিখেছিস। আজকাল সকালে দেখতে দেখতে বেলা দশটা এগারোটা দুপুর হয়ে যায়-- দিনটা যতই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে মনটাও ততই এক রকম উদাসীন হয়ে আসে; তার উপর কানে যখন বারম্বার ভৈরবীর অত্যন্ত করুণ মিনতির খোঁচ লাগতে থাকে তখন আকাশের মধ্যে, রৌদ্রের মধ্যে, একটা প্রকাণ্ড বৈরাগ্য ব্যাপ্ত হয়ে যায়। কর্মক্লিষ্ট সন্দেহপীড়িত বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটিকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে-একটি নিত্যশোক নিত্যভয় নিত্যমিনতির ভাব আছে, আমাদের হৃদয় উদ্‌ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদ্‌ব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। সত্যিই তো আমাদের কিছুই স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রকৃতি কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেই কথাটিই আমাদের সর্বদা ভুলিয়ে রেখেছে-সেইজন্যেই আমরা উৎসাহের সহিত সংসারের কাজ করতে পারি। ভৈরবীতে সেই চিরসত্য সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে; আমাদের এই কথা বলে দেয় যে, আমরা যা-কিছু জানি তার কিছুই থাকবে না এবং যা চিরকাল থাকবে তার আমরা কিছুই জানি নে।
  --কলকাতা, ২১ নভেম্বর ১৮৯৪; ৬.৮.১৩০১ #১৭৭  

[কিন্তু] আজ সকালে একটা সানাইয়েতে ভৈরবী বাজাচ্ছিল, এমনি অতিরিক্ত মিষ্টি লাগছিল যে সে আর কী বলব-- আমার চোখের সামনেকার শূন্য আকাশ এবং বাতাস পর্যন্ত একটা অন্তরা্‌নিরুদ্ধ ক্রন্দনের আবেগে যেন স্ফীত হয়ে উঠছিল-- বড়ো কাতর কিন্তু বড়ো সুন্দর-- সেই সুরটাই গলায় কেন যে তেমন করে আসে না বুঝতে পারি নে। মানুষের গলার চেয়ে কাঁসার নলের ভিতরে কেন এত বেশি ভাব প্রকাশ করে! এখন আবার তারা মুলতান বাজাচ্ছে-- মনটা বড়োই উদাস করে দিয়েছে-- পৃথিবীর এই সমস্ত সবুজ দৃশ্যের উপরে একটি অশ্রুবাষ্পের আবরণ টেনে দিয়েছে-- একপর্দা মুলতান রাগিণীর ভিতর দিয়ে সমস্ত জগৎ দেখা যাচ্ছে। যদি সব সময়েই এইরকম এক-একটা রাগিণীর ভিতর দিয়ে জগৎ দেখা যেত তা হলে বেশ হত। আমার আজকাল ভারী গান শিখতে ইচ্ছে করে-- বেশ অনেকগুলো ভূপালী ... এবং করুণ বর্ষার সুর-- অনেক বেশ ভালো ভালো হিন্দুস্থানী গান-- গান প্রায় কিচ্ছুই জানি নে বললেই হয়।
    সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯২; ২২.৩.১২৯৯ #৬৬  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।