গীতবিতান-GITABITAN
আজ প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি, তাই ভোরে উঠেছি।

Book Cover

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩১৮ (১৯১১)
কবির বয়স: ৫০
প্রকাশ: আশ্বিন ১৩১৮ , গীতিমাল্য র-র ১১
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রকৃতি-শরৎ; ১৪৯/৪৮৫
রাগ / তাল: ভৈরব / কাহারবা
স্বরলিপি: গীতলিপি ৬; শেফালি; স্বরবিতান ৫০ (শেফালি)
স্বরলিপিকার: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়; দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
সীতা দেবী লিখছেন [পুণ্যস্মৃতি] ১৩১৮ আশ্বিনে রচিত ও সেই সময়েই শান্তিনিকেতনে শারদোৎসব অভিনয়কালে প্রথম গীত [নীচে 'আলোচনা' দ্রষ্টব্য]। কিন্তু রবীন্দ্র রচনাবলী মতে রচনাকাল ১৩১৬ আশ্বিন।  

আলোচনা

আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  



জীবনময় রায় [রবীন্দ্রনাথের প্রাক্তন ছাত্র] লিখছেন: "একবার পুজোর ছুটির সময় দিনুবাবু, অজিত [অজিতকুমার চক্রবর্তী] কেহই আশ্রমে ছিলেন না। সতীশকুটির কী সত্যকুটির ঠিক মনে নাই, তখন নূতন তৈরি হইয়াছে। একটা অর্ধজীর্ণ বৃহৎ টেবল হারমোনিয়ম সেখানে কেন জানিনা পড়িয়া ছিল। শুভ প্রাতঃকাল, আশ্রম জনবিরল জানিয়া নিশ্চিন্তমনে সেইটারই উপর অপটু হস্তে কদর্য অত্যাচার চালাইতেছিলাম। হঠাৎ দেখি কবি প্রবেশ করিলেন, হাতে একখানি ছোট খাতা। আমি উঠিয়া দাঁড়াইতেই তিনি সেই চেয়ারে আসিয়া বসিলেন এবং সেই হারমোনিয়ম বাজাইয়া গাহিতে লাগিলেন-- 'প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি'। বারংবার গাহিয়া গানটি আমার শেখা হইলে আমাকে বারবার করিয়া গাওয়াইলেন। তারপরেও ছুটি পাইলাম না।

'ওগো শেফালিবনের মনের কামনা'-- গানটি ধরিলেন। এই দুইটি গানই সেদিনকার নূতন রচনা। এই গানটিও নয়-দশবার আমার সহিত গাহিয়া এবং বারবার গাওয়াইয়া তবে নিষ্কৃতি দিলেন। (৬৪)  
     --পার্থ বসু, "গায়ক রবীন্দ্রনাথ", আনন্দ - ১৩৯৩-তে উদ্ধৃত  


[১৯১১ সালে শান্তিনিকেতনে] সন্ধ্যার সময় ফিরিয়া আসিয়া, খাওয়া দাওয়া সারিয়া, 'শারদোৎসব' অভিনয় দেখিতে চলিলাম। গিয়া পৌঁছিবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই অভিনয় আরম্ভ হইল। অভিনয় তখনকার দিনে সর্বাঙ্গসুন্দর বলিয়া বোধ হইত, কোনো ত্রুটি তো চোখে পড়িত না। বালকদের গান ও নৃত্য এত সুন্দর লাগিয়াছিল যে ত্রিশ বৎসর পরেও উহা যেন চোখের সম্মুখে দেখিতে পাই। দুইটি গানের কথা বিশেষ করিয়া মনে পড়ে, ' আমার নয়ন-ভুলানো এলে ', এবং ' আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ '। রবীন্দ্রনাথ সন্ন্যাসীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন, সুতরাং এবারেও [অন্যবার 'রাজা' অভিনয়] তাঁহাকে তাঁহার সাধারণ বেশের বিশেষ কিছু পরিবর্তন করিতে হয় নাই, শুধু মাথায় একটি গেরুয়া রঙের পাগড়ি পরিয়া আসিয়াছিলেন।

এইবার লালচে কাগজের উপর ছাপা একটি প্রোগ্রাম পাইলাম। এটি এখনও আমার কাছে আছে। নূতন তিনটি গান রচিত হইয়াছে [উপরের পাদটিকা পশ্য], তাহা উহাতেই প্রথম দেখিলাম। একটি ' ওগো শেফালিবনের কামনা ', দ্বিতীয় ' আজ প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি ', তৃতীয়, ' আমাদের শান্তিনিকেতন '।  [এই তিনটি গানের কোনোটিই বর্তমান রবীন্দ্ররচনাবলীর 'শারদোৎসব' নাটকে নেই।] প্রোগ্রামটি কলিকাতার আদি ব্রাহ্মসমাজ প্রেসে ছাপানো, ইহাতে নাটকের পাত্রদের নামও ছাপা হইয়াছিল। ঠাকুরদা সাজিয়াছিলেন অজিতকুমার চক্রবর্তী, লক্ষেশ্বর শ্রীযুক্ত তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় [দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র]। প্রমথনাথ বিশী [খ্যাতনামা সাহিত্যিক] সাজিয়াছিলেন ধনপতি। বালকদের ভিতরেও অনেকে এখন জনসমাজে সুপরিচিত। (২৮)  
     --সীতা দেবী, পুণ্যস্মৃতি, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৩৯০  


 

 

১৪৯

আজ   প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি,   তাই   ভোরে উঠেছি।
আজ   শুনতে পাব প্রথম আলোর বাণী,   তাই   বাইরে ছুটেছি॥
   এই   হল মোদের পাওয়া,   তাই   ধরেছি গান-গাওয়া,
   আজ   লুটিয়ে হিরণ-কিরণ-পদ্মদলে   সোনার   রেণু লুটেছি॥
আজ  পারুলদিদির বনে   মোরা   চলব নিমন্ত্রণে,
   চাঁপা-ভায়ের শাখা-ছায়ের তলে    মোরা    সবাই জুটেছি।
   আজ   মনের মধ্যে ছেয়ে   সুনীল   আকাশ ওঠে গেয়ে,
   আজ   সকালবেলায় ছেলেখেলার ছলে   সকল   শিকল টুটেছি॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

41

T   HY gift of the earliest flower came to me this morning, and came the faint tuning of thy light.
  I am a bee that has wallowed in the heart of thy golden dawn,
  My wings are radiant with its pollen.
  I have found my place in the feast of songs in thy April, and I am freed of my fetters like the morning of its mist in a mere play.
  

Crossing: Published together with Lover's Gift. Many of the translations are transcreations and paraphrases of the original. Poems have been sourced from Naivedya, Kheya, Gitanjali, Gitimalya and Gitali.[Notes, "The English Writings of Rabindranath Tagore" - vol 1]  
     --Rabindranath Tagore, Lover's Gift and Crossing, Macmillan, London, 1918.  



১৯১১ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  শান্তিনিকেতনে পঞ্চাশতম জন্মোৎসব। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার (এখন থেকে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের মুখপত্র) সম্পাদনার ভার গ্রহণ। 'অচলায়তন' ও 'ডাকঘর' রচনা। 'জীবনস্মৃতি'র ধারাবাহিক প্রকাশ শুরু। প্রকাশ: শান্তিনিকেতন ১২-১৩, ছোটগল্প (ছোটদের উপযোগী)।

বহির্বিশ্বে: ১২ই ডিসেম্বর পঞ্চম জর্জের অভিষেক এবং সেই উপলক্ষ্যে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। ২৭শে ডিসেম্বর কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে 'জনগণমন" গীত। মোহনবাগান আই. এফ. এ শীল্ড জিতলো ব্রিটিশ দলকে হারিয়ে। মাঞ্চু রাজবংশের পতন ও সান-ইয়াৎ-সেনের উদ্যোগে চীনে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। হলিউডে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত। বাইশ খণ্ড বিশ্বকোষ সমাপ্ত। ভগিনী নিবেদিতার মৃত্যু।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


রবীন্দ্রনাথের গানে তত্ত্ব আছে, চিত্র আছে অসংখ্য, আছে প্রেম, দেশপ্রেম কি ভক্তির মতো নির্দিষ্ট ভাব কিন্তু আমার মনে হয় সে-সমস্তই উপলক্ষ্য মাত্র, লক্ষ্য নয়। বিশুদ্ধ আবেগের জগতে আমাদের পৌঁছে দেবার নানা রাস্তাই তিনি আবিষ্কার করেছেন, তার মধ্যে যে-পথ সব চেয়ে সরল ও ঋজু তা প্রকৃতি কিংবা ঋতুচক্র। ব্রহ্মসংগীত যেমন সব চাইতে অ-রাবীন্দ্রিক, তেমনি ঋতুর গানগুলো রাবীন্দ্রিক সৌরভে সব্চেযে বেশি ভরপুর, সেখানে প্রতিটি কথার চরম ব্যঞ্জনা নিষ্কাশিত। এই গানগুলো আমাদের সমস্ত জীবন অধিকার করে আছে; প্রতিদিনের জীবনে কতবার যে নতুন ক'রে নানা গানের নানা চরণ মনে পড়ে, নতুন ক'রে তাদের উপলব্ধি করি, তার কি অন্ত আছে। আকাশে মেঘ করে, নদীতে ছায়া পড়ে, একা চাঁদ আকাশ পাড়ি দেয়, হাওয়ায় গাছের পাতা দোলে, হঠাৎ একটু লাল রোদের ফালি ঘরে এসে পড়ে, সূর্যাস্ত আকাশে সোনা ছড়ায়, আবার শীত সন্ধ্যার শূন্যতা আকাশকে রিক্ত করে যায় -- যখন যা কিছু চোখে পড়ে, যা-কিছু মন দিয়ে ছুঁই সে-সমস্তই বয়ে আনে রবীন্দ্রনাথের কত গানের কত বিক্ষিপ্ত চরণ। তাঁর গান মনে না করে আমরা দেখতে, শুনতে, ভালোবাসতে, ব্যথা পেতে পারি না, আমাদের নিগূঢ় মনের বিরাট মহাদেশের কোথায় কী আছে হয়তো স্পষ্ট জানিনে, তবে এটা জানি যে সে-মহাদেশের মানচিত্র আগাগোড়াই তাঁর গানের রঙে রঙিন।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১২