গীতবিতান-GITABITAN
ওগো শেফালিবনের মনের কামনা

Book Cover

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১৩১৮ (১৯১১)
কবির বয়স: ৫০
প্রকাশ: আশ্বিন ১৩১৮ , ভারতী |
গীতিমাল্য র-র ৯;শেষবর্ষণ র-র ১৮
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রকৃতি-শরৎ; ১৫০/৪৮৫
রাগ / তাল: ভৈরবী / দাদরা
স্বরলিপি: গীতলিপি ৬; গীতলেখা ৩; শেফালি; স্বরবিতান ৫০ (শেফালি)
স্বরলিপিকার: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়; দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
সীতা দেবী [পুণ্যস্মৃতি] লিখছেন ১৩১৮ আশ্বিনে রচিত ও সেই সময়েই শান্তিনিকেতনে শারদোৎসব অভিনয়কালে প্রথম গীত [নীচে 'আলোচনা' দ্রষ্টব্য]। কিন্তু রবীন্দ্র রচনাবলী মতে রচনাকাল ১৩১৬ আশ্বিন।
দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর-কৃত 'শেফালি'-র স্বরলিপির সঙ্গে সুরভেদ আছে।  

আলোচনা

  

চুম্বক প্রকাশ
   [বাদললক্ষ্মীর প্রবেশ]
রাজা। ও কী হল নটরাজ, সেই বাদলল্ক্ষ্মীই তো ফিরে এলেন; মাথায় সেই অবগুণ্ঠন।...
নটরাজ। চিনতে সময় লাগে মহারাজ। ভোররাত্রিকেও নিশীথরাত্রি বলে ভুল হয়। কিন্তু ভোরের পাখির কাছে কিছুই লুকোনো থাকে না; অন্ধকারের মধ্যেই সে আলোর গান গেয়ে ওঠে। বাদলের ছলনার ভিতর থেকেই কবি শরৎকে চিনেছে, তাই আমন্ত্রণের গান ধরল।

      গান: ওগো শেফালিবনের মনের কামনা

আগের গান (শেষবর্ষণ-১৭): এসো শরতের অমল মহিমা
পরের গান (শেষবর্ষণ-১৯): এবার অবগুণ্ঠন খোলো   


  


   জীবনময় রায় [রবীন্দ্রনাথের প্রাক্তন ছাত্র] লিখছেন: "একবার পুজোর ছুটির সময় দিনুবাবু, অজিত [অজিতকুমার চক্রবর্তী] কেহই আশ্রমে ছিলেন না। সতীশকুটির কী সত্যকুটির ঠিক মনে নাই, তখন নূতন তৈরি হইয়াছে। একটা অর্ধজীর্ণ বৃহৎ টেবল হারমোনিয়ম সেখানে কেন জানিনা পড়িয়া ছিল। শুভ প্রাতঃকাল, আশ্রম জনবিরল জানিয়া নিশ্চিন্তমনে সেইটারই উপর অপটু হস্তে কদর্য অত্যাচার চালাইতেছিলাম। হঠাৎ দেখি কবি প্রবেশ করিলেন, হাতে একখানি ছোট খাতা। আমি উঠিয়া দাঁড়াইতেই তিনি সেই চেয়ারে আসিয়া বসিলেন এবং সেই হারমোনিয়ম বাজাইয়া গাহিতে লাগিলেন-- 'প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি'। বারংবার গাহিয়া গানটি আমার শেখা হইলে আমাকে বারবার করিয়া গাওয়াইলেন। তারপরেও ছুটি পাইলাম না।

'ওগো শেফালিবনের মনের কামনা'-- গানটি ধরিলেন। এই দুইটি গানই সেদিনকার নূতন রচনা। এই গানটিও নয়-দশবার আমার সহিত গাহিয়া এবং বারবার গাওয়াইয়া তবে নিষ্কৃতি দিলেন। (৬৪)  
     --পার্থ বসু, "গায়ক রবীন্দ্রনাথ", আনন্দ - ১৩৯৩-তে উদ্ধৃত  


[১৯১১ সালে শান্তিনিকেতনে] সন্ধ্যার সময় ফিরিয়া আসিয়া, খাওয়া দাওয়া সারিয়া, 'শারদোৎসব' অভিনয় দেখিতে চলিলাম। গিয়া পৌঁছিবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই অভিনয় আরম্ভ হইল। অভিনয় তখনকার দিনে সর্বাঙ্গসুন্দর বলিয়া বোধ হইত, কোনো ত্রুটি তো চোখে পড়িত না। বালকদের গান ও নৃত্য এত সুন্দর লাগিয়াছিল যে ত্রিশ বৎসর পরেও উহা যেন চোখের সম্মুখে দেখিতে পাই। দুইটি গানের কথা বিশেষ করিয়া মনে পড়ে, ' আমার নয়ন-ভুলানো এলে ', এবং ' আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ '। রবীন্দ্রনাথ সন্ন্যাসীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন, সুতরাং এবারেও [অন্যবার 'রাজা' অভিনয়] তাঁহাকে তাঁহার সাধারণ বেশের বিশেষ কিছু পরিবর্তন করিতে হয় নাই, শুধু মাথায় একটি গেরুয়া রঙের পাগড়ি পরিয়া আসিয়াছিলেন।

এইবার লালচে কাগজের উপর ছাপা একটি প্রোগ্রাম পাইলাম। এটি এখনও আমার কাছে আছে। নূতন তিনটি গান রচিত হইয়াছে [উপরের পাদটিকা পশ্য], তাহা উহাতেই প্রথম দেখিলাম। একটি ' ওগো শেফালিবনের কামনা ', দ্বিতীয় ' আজ প্রথম ফুলের পাব প্রসাদখানি ', তৃতীয়, ' আমাদের শান্তিনিকেতন '।  [এই তিনটি গানের কোনোটিই বর্তমান রবীন্দ্ররচনাবলীর 'শারদোৎসব' নাটকে নেই।] প্রোগ্রামটি কলিকাতার আদি ব্রাহ্মসমাজ প্রেসে ছাপানো, ইহাতে নাটকের পাত্রদের নামও ছাপা হইয়াছিল। ঠাকুরদা সাজিয়াছিলেন অজিতকুমার চক্রবর্তী, লক্ষেশ্বর শ্রীযুক্ত তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় [দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র]। প্রমথনাথ বিশী [খ্যাতনামা সাহিত্যিক] সাজিয়াছিলেন ধনপতি। বালকদের ভিতরেও অনেকে এখন জনসমাজে সুপরিচিত। (২৮)  
     --সীতা দেবী, পুণ্যস্মৃতি, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৩৯০  


ভৈরবী সুরের মোচড়গুলো কানে এলে জগতের প্রতি এক রকম বিচিত্র ভাবের উদয় হয়... মনে হয় একটা নিয়মের হস্ত অবিশ্রাম আর্গিন যন্ত্রের হাতা ঘোরাচ্ছে এবং সেই ঘর্ষণবেদনায় সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মর্মস্থল হতে একটা গম্ভীর কাতর করুণ রাগিণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে-- সকাল বেলাকার সূর্যের সমস্ত আলো ম্লান হয়ে এসেছে, গাছপালারা নিস্তব্ধ হয়ে কী যেন শুনছে এবং আকাশ একটা বিশ্বব্যাপী অশ্রুর বাষ্পে যেন আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে-- অর্থাৎ, দূর আকাশের দিকে চাইলে মনে হয় যেন একটা অনিমেষ নীল চোখ কেবল ছল্‌ছল্‌ করে চেয়ে আছে।
    কলকাতা, জুন ১৮৮৯  #৩  

অ[বন?] ও বাড়িতে তাদের এক তলার ঘরে বসে এস্‌রাজে ভৈরবী আলাপ করছে, আমি তেতলার কোণের ঘরে বসে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। তোর চিঠিতেও তুই মাটাঙ্গের ভৈরবী আলাপের কথা লিখেছিস। আজকাল সকালে দেখতে দেখতে বেলা দশটা এগারোটা দুপুর হয়ে যায়-- দিনটা যতই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে মনটাও ততই এক রকম উদাসীন হয়ে আসে; তার উপর কানে যখন বারম্বার ভৈরবীর অত্যন্ত করুণ মিনতির খোঁচ লাগতে থাকে তখন আকাশের মধ্যে, রৌদ্রের মধ্যে, একটা প্রকাণ্ড বৈরাগ্য ব্যাপ্ত হয়ে যায়। কর্মক্লিষ্ট সন্দেহপীড়িত বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটিকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে-একটি নিত্যশোক নিত্যভয় নিত্যমিনতির ভাব আছে, আমাদের হৃদয় উদ্‌ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদ্‌ব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। সত্যিই তো আমাদের কিছুই স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রকৃতি কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেই কথাটিই আমাদের সর্বদা ভুলিয়ে রেখেছে-সেইজন্যেই আমরা উৎসাহের সহিত সংসারের কাজ করতে পারি। ভৈরবীতে সেই চিরসত্য সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে; আমাদের এই কথা বলে দেয় যে, আমরা যা-কিছু জানি তার কিছুই থাকবে না এবং যা চিরকাল থাকবে তার আমরা কিছুই জানি নে।
  --কলকাতা, ২১ নভেম্বর ১৮৯৪; ৬.৮.১৩০১ #১৭৭  

[কিন্তু] আজ সকালে একটা সানাইয়েতে ভৈরবী বাজাচ্ছিল, এমনি অতিরিক্ত মিষ্টি লাগছিল যে সে আর কী বলব-- আমার চোখের সামনেকার শূন্য আকাশ এবং বাতাস পর্যন্ত একটা অন্তরা্‌নিরুদ্ধ ক্রন্দনের আবেগে যেন স্ফীত হয়ে উঠছিল-- বড়ো কাতর কিন্তু বড়ো সুন্দর-- সেই সুরটাই গলায় কেন যে তেমন করে আসে না বুঝতে পারি নে। মানুষের গলার চেয়ে কাঁসার নলের ভিতরে কেন এত বেশি ভাব প্রকাশ করে! এখন আবার তারা মুলতান বাজাচ্ছে-- মনটা বড়োই উদাস করে দিয়েছে-- পৃথিবীর এই সমস্ত সবুজ দৃশ্যের উপরে একটি অশ্রুবাষ্পের আবরণ টেনে দিয়েছে-- একপর্দা মুলতান রাগিণীর ভিতর দিয়ে সমস্ত জগৎ দেখা যাচ্ছে। যদি সব সময়েই এইরকম এক-একটা রাগিণীর ভিতর দিয়ে জগৎ দেখা যেত তা হলে বেশ হত। আমার আজকাল ভারী গান শিখতে ইচ্ছে করে-- বেশ অনেকগুলো ভূপালী ... এবং করুণ বর্ষার সুর-- অনেক বেশ ভালো ভালো হিন্দুস্থানী গান-- গান প্রায় কিচ্ছুই জানি নে বললেই হয়।
    সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯২; ২২.৩.১২৯৯ #৬৬  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  


 

 

১৫০

        ওগো   শেফালিবনের মনের কামনা,
        কেন    সুদূর গগনে গগনে
        আছ    মিলায়ে পবনে পবনে।
        কেন    কিরণে কিরণে ঝলিয়া
        যাও    শিশিরে শিশিরে গলিয়া।
        কেন    চপল আলোতে ছায়াতে
        আছ    লুকায়ে আপন মায়াতে।
        তুমি    মুরতি ধরিয়া চকিতে নামো-না,
        ওগো   শেফালিবনের মনের কামনা॥

        আজি   মাঠে মাঠে চলো বিহরি,
        তৃণ    উঠুক শিহরি শিহরি।
        নামো   তালপল্লববীজনে,
        নামো   জলে ছায়াছবিসৃজনে।
        এসো   সৌরভ ভরি আঁচলে,
        আঁখি   আঁকিয়া সুনীল কাজলে।
        মম    চোখের সমুখে ক্ষণেক থামো-না,
        ওগো   শেফালিবনের মনের কামনা॥

        ওগো   সোনার স্বপন, সাধের সাধনা,
        কত   আকুল হাসি ও রোদনে
        রাতে   দিবসে স্বপনে বোধনে
        জ্বালি   জোনাকি প্রদীপমালিকা,
        ভরি   নিশীথতিমিরথালিকা,
        প্রাতে  কুসুমের সাজি সাজায়ে,
        সাঁজে  ঝিল্লি-ঝাঁঝর বাজায়ে,
        কত   করেছে তোমার স্তুতি-আরাধনা,
        ওগো  সোনার স্বপন, সাধের সাধনা॥

        ওই   বসেছ শুভ্র আসনে
        আজি  নিখিলের সম্‌ভাষণে।
        আহা  শ্বেতচন্দনতিলকে
        আজি  তোমারে সাজায়ে দিল কে।
        আহা  বরিল তোমারে কে আজি
        তার   দুঃখশয়ন তেয়াজি--
        তুমি   ঘুচালে কাহার বিরহকাঁদনা,
        ওগো  সোনার স্বপন, সাধের সাধনা॥

Portrait

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

O   BELOVED of the autumn glade of flowering Sephalika,
  why do you flit away to the far horizon,
  floating on the wandering wind?
Resplendent this moment,
  why do you dissolve into dew drops the next?
Why do you play hide and seek with yourself
  in a rapid chiaroscuro of light and shade?
Why not take form and come down
  to the autumn glade of flowering Sephalika,
  for a brief while?

Why do you not come flitting through the glades
  so that the leaves of grass
  shiver in an ecstasy at the touch of your feet.
Come with the wind which fans the palm-leaves,
  or down the steps of the river
  to hold a mirror up to the trees.
With your anchal loaded with flowers,
  your eyelashes dark with colyrium,
  why do you not take form and come
  to the autumn glade of flowering Sephalika,
  for a brief while?

You are the golden dream,
  the cherished treasure of the autumn glade
Asleep or awake, smiling or weeping,
  he has sung to you and worshipped you
  in many a way, day and night.
The darkest of nights he has illumed
  for you with his garland of glow-worms.
His mornings are given to
  gathering flowers for you.
At dusk all his cicadas sing you a serenade,
  for, you are the golden dream --
  the cherished treasure of the autumn glade.
Oh, the pleasure and the joy.

Today you are seated
  on your chaste and white seat,
   receive the homage of the whole world.
Your brow is painted as the bride's
  with the white paste of scented sandalwood.
Here comes the autumn glade
  to offer you his love--
  his days of loneliness over at last.
No more will he remain away
  from his golden dream, his cherished treasure.
  
     --Anon., Anthology  



১৯১১ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  শান্তিনিকেতনে পঞ্চাশতম জন্মোৎসব। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার (এখন থেকে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের মুখপত্র) সম্পাদনার ভার গ্রহণ। 'অচলায়তন' ও 'ডাকঘর' রচনা। 'জীবনস্মৃতি'র ধারাবাহিক প্রকাশ শুরু। প্রকাশ: শান্তিনিকেতন ১২-১৩, ছোটগল্প (ছোটদের উপযোগী)।

বহির্বিশ্বে: ১২ই ডিসেম্বর পঞ্চম জর্জের অভিষেক এবং সেই উপলক্ষ্যে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। ২৭শে ডিসেম্বর কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে 'জনগণমন" গীত। মোহনবাগান আই. এফ. এ শীল্ড জিতলো ব্রিটিশ দলকে হারিয়ে। মাঞ্চু রাজবংশের পতন ও সান-ইয়াৎ-সেনের উদ্যোগে চীনে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। হলিউডে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মিত। বাইশ খণ্ড বিশ্বকোষ সমাপ্ত। ভগিনী নিবেদিতার মৃত্যু।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


রবীন্দ্রনাথের গানে তত্ত্ব আছে, চিত্র আছে অসংখ্য, আছে প্রেম, দেশপ্রেম কি ভক্তির মতো নির্দিষ্ট ভাব কিন্তু আমার মনে হয় সে-সমস্তই উপলক্ষ্য মাত্র, লক্ষ্য নয়। বিশুদ্ধ আবেগের জগতে আমাদের পৌঁছে দেবার নানা রাস্তাই তিনি আবিষ্কার করেছেন, তার মধ্যে যে-পথ সব চেয়ে সরল ও ঋজু তা প্রকৃতি কিংবা ঋতুচক্র। ব্রহ্মসংগীত যেমন সব চাইতে অ-রাবীন্দ্রিক, তেমনি ঋতুর গানগুলো রাবীন্দ্রিক সৌরভে সব্চেযে বেশি ভরপুর, সেখানে প্রতিটি কথার চরম ব্যঞ্জনা নিষ্কাশিত। এই গানগুলো আমাদের সমস্ত জীবন অধিকার করে আছে; প্রতিদিনের জীবনে কতবার যে নতুন ক'রে নানা গানের নানা চরণ মনে পড়ে, নতুন ক'রে তাদের উপলব্ধি করি, তার কি অন্ত আছে। আকাশে মেঘ করে, নদীতে ছায়া পড়ে, একা চাঁদ আকাশ পাড়ি দেয়, হাওয়ায় গাছের পাতা দোলে, হঠাৎ একটু লাল রোদের ফালি ঘরে এসে পড়ে, সূর্যাস্ত আকাশে সোনা ছড়ায়, আবার শীত সন্ধ্যার শূন্যতা আকাশকে রিক্ত করে যায় -- যখন যা কিছু চোখে পড়ে, যা-কিছু মন দিয়ে ছুঁই সে-সমস্তই বয়ে আনে রবীন্দ্রনাথের কত গানের কত বিক্ষিপ্ত চরণ। তাঁর গান মনে না করে আমরা দেখতে, শুনতে, ভালোবাসতে, ব্যথা পেতে পারি না, আমাদের নিগূঢ় মনের বিরাট মহাদেশের কোথায় কী আছে হয়তো স্পষ্ট জানিনে, তবে এটা জানি যে সে-মহাদেশের মানচিত্র আগাগোড়াই তাঁর গানের রঙে রঙিন।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১২  


গানে রবীন্দ্রনাথের যা একান্ত নিজস্ব সৃষ্টি, প্রচলিত নিয়মে তার জাত নির্ণয় করা চলে না, কারণ রবীন্দ্রনাথ জাতের কথা ভাবেন নি। তাঁর লক্ষ্য ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দিকে, এক-একটি বিশেষ ভাবকে বিশেষ কথা বিশেষ সুর-ছন্দে প্রকাশ করার দিকে। জাতের দোহাই যেখানে দেওয়া চলে না, সেখানে চরিত্র রক্ষা করার প্রশ্নটাই  বড় হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথকেও এই প্রশ্নটাই ভাবিয়ে তুলেছিল।  
     --সত্যজিৎ রায়  "রবীন্দ্রসঙ্গীতে ভাববার কথা", এক্ষণ, পঞ্চম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৭৪।  


ঋতু-অনুসারে রাগের সৃষ্টি, একথা বলেছেন প্রাচীন সঙ্গীতকর্তারা। যথা, সোমেশ্বরের মত অনুসারে বসন্তে বসন্ত, গ্রীষ্মে ভৈরব, বর্ষায় মেঘ, শরতে পঞ্চম, হেমন্তে নটনারায়ণ ও শীতে শ্রী রাগ গেয়। সৌম্যেন্দ্রনাথ বলছেন যে রবীন্দ্রনাথ এই সীমা স্বীকার না করে কিছু কিছু অসাধারণ সুরযোজনা করেছেন তাঁর প্রকৃতি-পর্যায়ের গানে, সটিক উদাহরণ দিয়েছেন প্রচুর। যুগপৎ শাস্ত্রীয় ও রবীন্দ্র সঙ্গীতজ্ঞ বলে সৌম্যেন্দ্রনাথের খ্যাতি ছিল। তারই একটি সংক্ষিপ্তসার দেওয়া গেল।

বৈশাখ হে মৌনী তাপস -- হেমন্তের নট আর শীতের কেদার, অর্থাৎ নটকেদার
মধ্যদিনে যবে গান   -- হেমন্তের হাম্বীর
দারুণ অগ্নিবাণে -- হেমন্তের সারং
প্রখর তপনতাপে -- বর্ষার মুলতানী, বেদ্নার আমেজ-ভরা টোড়ি আর ভীমপলশ্রী

প্রাচীন শাস্ত্রকারদের মতে বর্ষা ঋতুর রাগ মেঘ, তার সঙ্গে মল্লার, গান্ধারী, শঙ্করাভরণ, জয়ৎ ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ বর্ষার গানে সাহানা, ইমন, পিলু, সিন্ধু, হাম্বীর, দেশ, পঞ্চম আদি অন্য সব ঋতুর রাগও ব্যবহার করেছেন। যথা,

নীলনবঘনে আষাঢ় গগনে -- হেমন্তের রাগ ইমন
সঘন গহন রাত্রি -- বসন্তের বাহার মিশেছে বর্ষার মল্লারে [শৈলজারঞ্জন বলছেন বাগেশ্রী-মল্লার]
আজি বরিষনমুখরিত -- সোহিনী, বসন্ত ও পঞ্চমের মিশ্রণ
আমার কী বেদনা -- কীর্তনের সুর

শাস্ত্রকাররা বলছেন শরতের রাগ ভৈরব, সঙ্গে আছে রামকেলি, গুর্জরী, মধুমাধবী ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছেন যোগিয়া, বিভাস, বাউল, বিলাওল, দেশ, কামোদ, কেদারা, ভৈরবী, গৌড়সারং আদি বসন্ত ও গ্রীষ্ম ঋতুর সুর।

ওগো শেফালিবনের মনের কামনা -- ভৈরবী
হৃদয়ে ছিলে জেগে -- হেমন্তের গৌড়সারং

শাস্ত্রমতে হেমন্তের রাগ হচ্ছে মালকোষ, টোড়ি, খাম্বাবতী ও হিন্দোল।

হেমন্তে কোন বসন্তেরই বাণী -- গ্রীষ্মের রাগ খাম্বাজ

শীতের রাগ বলে নির্দেশিত আছে শ্রী, মালশ্রী, আশাবরী, পাহাড়ী, ত্রিবেণী প্রভৃতি।

শীতের হাওয়ায় লাগলো নাচন -- হেমন্তের নট রাগ
এল যে শীতের বেলা -- শীতের শ্রীর সঙ্গে মিশলো পূরবী

শাস্ত্র বলে বসন্তের রাগ পঞ্চম, বসন্ত, হিন্দোল, ভূপালী, পটমঞ্জরী। রবীন্দ্রনাথ বর্ষার মল্লার, হেমন্ত বা শরতের হাম্বীর আদি অনেক অন্য ঋতুর রাগ ব্যবহার করেছেন।

মম অন্তর উদাসে -- মেঘমল্লারের সুর
এবার ভাসিয়ে দিতে হবে -- হেমন্তের হাম্বীর
বসন্ত তার গান লিখে যায় -- বর্ষার রাগ মল্লার
ফাগুন হাওয়ায় রঙে রঙে -- শরৎ ঋতুর রাগ কালাংড়ার সঙ্গে পরজ মেশানো

পুরাতনকে বিদায় দিলে না যে -- বেহাগ ও খাম্বাজ মেশানো হয়নি, পৃথকভাবে রেখে ব্যবহার করা হয়েছে: বেহাগ-খাম্বাজ-বেহাগ। (৯৮-১০৮)  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬  


রবীন্দ্রনাথ নানান সুরে গান বেঁধেছেন, কিন্তু তাঁর সেই সহস্র সহস্র গানগুলির মধ্যে যদি কোনো একটি রাগের সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় তো সেটি হচ্ছে ভৈরবী। সুরসৃষ্টির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ভৈরবী-সিদ্ধ ছিলেন। তিনি প্রাচীন ভৈরবী রাগের অনুভূতি রেখে এক নব রাগ সৃষ্টি করলেন; রাগকর্তার নাম জড়িয়ে রাগের নাম-- যথা মিয়াকি তোড়ি, সুরদাসী মল্লার-- দেবার প্রথা অনুসরণ করে তার নাম দিয়েছি "রাবীন্দ্রী-ভৈরবী"। রবীন্দ্রনাথের সুরমিশ্রণ যেমন ভাবধর্মী, রাগধর্মী নয়, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীও তেমনি ভাব প্রকাশের তাগিদে সৃষ্টি হয়েছে।

রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে আশাবরী, ধানশ্রী ও টোড়ি -- এই তিনটি রাগের আসা যাওয়া কানে বাজে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবী একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাগ, এটি রবীন্দ্রনাথের অভিনব সৃষ্টি। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীর বিশেষত্বগুলি একটু তলিয়ে দেখতে পারলেই ধরা পড়ে যায়। প্রথমত, গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে, ভৈরবীতে এটি হয় না। আর গান্ধার-ন্যাস হচ্ছে বলে রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে কানাড়ার ছায়া পড়েছে, তবে সেটি কিন্তু শুদ্ধ কানাড়ার, দরবারী কানাড়ার নয়। দ্বিতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে যে 'ধা'টি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি হচ্ছে ভৈঁরোর 'ধা'। ভৈরবীর 'ধা'র সঙ্গে তার শ্রুতির পার্থক্য আছে। উদাহরণ স্বরূপ ' হে চিরনূতন ' গানটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। 'চিরনূতন'-এর 'চিরনূ' পর্যন্ত ভৈরোঁর 'ধা'-এ বাঁধা। তৃতীয়ত, রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে নিরঙ্কুশ 'রে', 'গা', 'ধা' ও 'নি' পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় একমাত্র রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীত পর্যায়ের গানগুলিতে। চতুর্থত, এই স্বরব্যবস্থাকে বিকৃত পর্দার উদাহরণ বলে পার পাওয়ার উপায় নেই কেন না, বিকৃত পর্দার একটা সীমা আছে। রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে এই ধরনের পর্দা অনেক বেশি আছে।  এছাড়া রাবীন্দ্রী-ভৈরবীতে শুদ্ধ 'রে', শুদ্ধ 'গা' আর কড়ি 'মা'র ব্যবহার সহজেই ধরা পড়ে।

রবীন্দ্রনাথের প্রায় তিন হাজার [?] গানের মধ্যে এই নতুন রাগে বাঁধা প্রায় তিনশো গান আছে। [এইখানে সৌম্যেন্দ্রনাথ ৫০টি গানের তালিকা দিয়েছেন; আমরা এই আলোচনা খণ্ডটি সব ভৈরবী গানেই প্রয়োগ করলাম]
  
     --সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের গান, বৈতানিক প্রকাশনী, ১৩৯৬