গীতবিতান-GITABITAN
হে মাধবী, দ্বিধা কেন, আসিবে কি ফিরিবে কি--

Photo

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ১ ফাল্গুন ১৩৩৪ (১৪ ফেব্রুয়ারি,১৯২৮)
কবির বয়স: ৬৬
রচনাস্থান: শান্তিনিকেতন
প্রকাশ: ফাল্গুন ১৩৩৫ , বিচিত্রা
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): প্রকৃতি-বসন্ত; ২৪৩/৫২৩
রাগ / তাল: পিলু-খাম্বাজ / দাদরা
স্বরলিপি: বিচিত্রা (১৩৩৫); স্বরবিতান ৫
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ
পাদটিকা:
নবীন নাটকের প্রথম অভিনয়কালে ব্যবহৃত, র-র ২২-তে মূল নাটকে নেই, পরিশিষ্টে উল্লেখমাত্র আছে।  

আলোচনা

গানের কথা বলতে গিয়ে একটা মজার কথা মনে পড়ল। যেদিন সন্ধ্যাবেলা "হে মাধবী দ্বিধা কেন" শেখাচ্ছিলেন সেদিন হঠাৎ গানের মাঝখানে দেখি কবির পুরাতন ভৃত্য বনমালী কবির জন্যে এক প্লেট আইসক্রিম নিয়ে ঘরে ঢুকবে কিনা ইতস্তত করছে। একবার চৌকাঠের ভিতরে পা দিয়ে উঁকি মেরেই পরক্ষণে পা টেনে নিয়ে বারান্দায় ফিরে যাচ্ছে। বারকতক এইরকম করবার পর হঠাৎ কবির নজরে পড়বামাত্র তিনি বনমালীর দিকে ফিরে হাত নেড়ে গেয়ে উঠলেন, "হে মাধবী দ্বিধা কেন? ভীরু মাধবী তোমার দ্বিধা কেন? আসিবে কি ফিরিবে দ্বিধা কেন?" বনমালী তো ততক্ষণে দে ছুট। আমি আর অমিতা [ঠাকুর] হো হো করে হেসে উঠলাম, কবিরও হাসি থামে না। হাসতে হাসতে বললেন, "আমার লীলমণিকে (বনমালীর উচ্চারণ নকল করে অনেক সময়েই ওকে নীলমণির জায়গায় লীলমণি বলার অভ্যাস ওঁর ছিল) যদিও কবিত্ব করে মাধবী বলা চলে না, তবু বাঁদরটার দ্বিধাটা ঠিক মাধবীরই মতো। দেখছি ওর একটা নাম বাড়ল।  
     --নির্মলকুমারী মহলানবিশ, কবির সঙ্গে দাক্ষিণাত্যে  



[১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ চারবার মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর ও তাঁর স্বামীর আতিথ্যগ্রহণ করে কিছু সময় কাটিয়ে যান। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরভাগে দার্জিলিং ও কালিম্পঙের মাঝামাঝি মংপু একটা ছোটো শহর, মৈত্রেয়ী দেবী "গণ্ডগ্রাম" বলে উল্লেখ করেছেন, সে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যুক্তি বলে বোধ হয় না। হিমালয়ের পাদপর্বতের কোলে নাগরিক জীবনের বাইরে এক শান্ত পরিবেশ, মৈত্রেয়ী দেবীর স্বামী সেখানে ডাক্তারি করতেন। মৈত্রেয়ী দেবী সব মিলিয়ে এই চারবার প্রায় পাঁচমাসের মতো কবির সাহচর্য পেয়েছিলেন, তারই দিনলিপির ধরণে লেখা স্মৃতিচিত্রের বই "মংপুতে রবীন্দ্রনাথ"।]  

[রবীন্দ্রনাথ] " আজ যে এমন সহজে মনকে সাহিত্যের রসে, আনন্দে সিক্ত করতে পারছ, সেজন্য একটু-আধটু ধন্যবাদ দিও কন্যে, আমারও কিছু পাওনা আছে। এখনও অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত কথা শুনতে পাই আমার রচনা সম্বন্ধে, এই যেমন সেদিন -- বললে 'আপনি নাকি বনমালীকে দেখে লিখেছেন,-- হে মাধবী দ্বিধা কেন?'  শুনে এমন মনের অবস্থা হল-- নাহয় সুদিন গেছেই, তাই বলে কি এমনই দুর্দশা হয়েছে যে বনমালীকে দেখে গাইব, -- ভীরু মাধবী, তোমার দ্বিধা কেন?"  
     --মৈত্রেয়ী দেবী, মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, প্রাইমা পাবলিকেশনস্‌, কলকাতা, ১৯৪৩  


তাঁর ভৃত্য বনমালী তাঁর জন্য এক গেলাস শরবৎ এনে দেখে, বাইরের কে বসে আছেন। বনমালী থেমে যাওয়াতে কবি বললেন,"ওগো বনমালী, দ্বিধা কেন?" কবি বলেছিলেন সাধারণ ধুলো-মাটির দৈনন্দিন ভাষাকে একটু মধুরতর করার জন্যে। অথচ এ দুটি তাঁর নিজের মনেও এমনই চাঞ্চল্য তুললো যে, তিনি সে দিনই গান রচনা করলেন-- হে মাধবী দ্বিধা কেন।

    -- সৈয়দ মুজতবা আলি, গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন (১৫৮)  
     --শ্যামসুন্দর মাইতি সম্পাদিত, রবি রেখা, বঙ্গভারতী গ্রন্থালয়, হাওড়া, ১৯৯৭-এ উদ্ধৃত  


 

 

২৪৩

হে মাধবী, দ্বিধা কেন, আসিবে কি ফিরিবে কি--
আঙিনাতে বাহিরিতে মন কেন গেল ঠেকি॥
বাতাসে লুকায়ে থেকে   কে যে তোরে গেছে ডেকে,
পাতায় পাতায় তোরে পত্র সে যে গেছে লেখি।
কখন্‌ দখিন হতে কে দিল দুয়ার ঠেলি,
চমকি উঠিল জাগি চামেলি নয়ন মেলি।
বকুল পেয়েছে ছাড়া,   করবী দিয়েছে সাড়া,
শিরীষ শিহরি উঠে দূর হতে কারে দেখি॥

Bust

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

১৯২৮ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  'মহুয়া' আর 'শেষের কবিতা' লিখলেন। পণ্ডিচেরীতে শ্রীঅরবিন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ। সিংহল ভ্রমণ (দ্বিতীয়বার) প্রকাশ: শেষরক্ষা (প্রহসন),Fireflies, Lectures and Addresses, Letters to a Friend, A Poet's School, The Tagore Birthday Book, Fifteen Poems.

বহির্বিশ্বে: ফেব্রুয়ারিতে কালো পতাকা দেখিয়ে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন। ১লা মার্চ বিদেশী দ্রব্য বয়কট আবার শুরু। ইস্ট ইণ্ডিয়া রেলপথ ও জামশেদপুরে টাটা কারখানায় শ্রমিক ধর্মঘট। ভগৎ  সিং হিন্দুস্থান সোস্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন গঠন করলেন। চীনে গৃহযুদ্ধ শুরু। সোভিয়েট রাশিয়ার প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। প্রথম রঙীন টিভি ও ইস্টম্যান প্রদর্শিত প্রথম রঙীন চলচ্চিত্র। পুলিশের লাঠিতে আহত লালা লাজপৎ রাইয়ের মৃত্যু। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: মারিয়ানা পিনেডা (লোর্কা), স্ট্রেঞ্জ ইণ্টারলুড (ওনীল), পয়েণ্ট কাউণ্টারপয়েণ্ট (হাক্সলি), লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার (লরেন্স), অ্যাণ্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দি ডন (শোলোকভ), দি টাওয়ার (ইয়েট্‌স), সিলেক্টেড পোয়েম্‌স (পাউণ্ড), মাই অটোবায়োগ্রাফি (মুসোলিনি)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  



রবীন্দ্রনাথের গানে তত্ত্ব আছে, চিত্র আছে অসংখ্য, আছে প্রেম, দেশপ্রেম কি ভক্তির মতো নির্দিষ্ট ভাব কিন্তু আমার মনে হয় সে-সমস্তই উপলক্ষ্য মাত্র, লক্ষ্য নয়। বিশুদ্ধ আবেগের জগতে আমাদের পৌঁছে দেবার নানা রাস্তাই তিনি আবিষ্কার করেছেন, তার মধ্যে যে-পথ সব চেয়ে সরল ও ঋজু তা প্রকৃতি কিংবা ঋতুচক্র। ব্রহ্মসংগীত যেমন সব চাইতে অ-রাবীন্দ্রিক, তেমনি ঋতুর গানগুলো রাবীন্দ্রিক সৌরভে সব্চেযে বেশি ভরপুর, সেখানে প্রতিটি কথার চরম ব্যঞ্জনা নিষ্কাশিত। এই গানগুলো আমাদের সমস্ত জীবন অধিকার করে আছে; প্রতিদিনের জীবনে কতবার যে নতুন ক'রে নানা গানের নানা চরণ মনে পড়ে, নতুন ক'রে তাদের উপলব্ধি করি, তার কি অন্ত আছে। আকাশে মেঘ করে, নদীতে ছায়া পড়ে, একা চাঁদ আকাশ পাড়ি দেয়, হাওয়ায় গাছের পাতা দোলে, হঠাৎ একটু লাল রোদের ফালি ঘরে এসে পড়ে, সূর্যাস্ত আকাশে সোনা ছড়ায়, আবার শীত সন্ধ্যার শূন্যতা আকাশকে রিক্ত করে যায় -- যখন যা কিছু চোখে পড়ে, যা-কিছু মন দিয়ে ছুঁই সে-সমস্তই বয়ে আনে রবীন্দ্রনাথের কত গানের কত বিক্ষিপ্ত চরণ। তাঁর গান মনে না করে আমরা দেখতে, শুনতে, ভালোবাসতে, ব্যথা পেতে পারি না, আমাদের নিগূঢ় মনের বিরাট মহাদেশের কোথায় কী আছে হয়তো স্পষ্ট জানিনে, তবে এটা জানি যে সে-মহাদেশের মানচিত্র আগাগোড়াই তাঁর গানের রঙে রঙিন।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১২