গীতবিতান-GITABITAN
ভোরের বেলা কখন এসে পরশ করে গেছ হেসে॥

Book Cover

রচনা পরিচিতি
রচনাকাল:  ৯ ভাদ্র ১৩২০ (২৫ অগাস্ট,১৯১৩)
কবির বয়স: ৫২
রচনাস্থান: লণ্ডন
প্রকাশ: ফাল্গুন ১৩২০ , তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা |
প্রবাসী;গীতিমাল্য ৩৫ (১৯১৪); তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা (১৩২১, পুনর্মুদ্রণ) ।
Fruit Gathering ??
গীতবিতান(পর্যায়;#/পৃ): পূজা-জাগরণ; ২৬৭/১১৫
রাগ / তাল: আশাবরী-ভৈরবী / ত্রিতাল
স্বরলিপি: প্রবাসী; গীতলেখা ১; স্বরবিতান ৩৯
স্বরলিপিকার: দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঐ; ঐ
পাদটিকা:
London সহরের Cheyne Walk-এ থাকাকালীন রচিত। ১৩২০ মাঘোৎসবে গীত।  

আলোচনা

চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 'রবিরশ্মি'তে লিখেছেন:

জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন এক অন্ধ বৃদ্ধ। চারুচন্দ্র শুনলেন কবিকে অভিবাদন জানিয়ে সেই বৃদ্ধটি বলছেন: "আমি অন্ধ, আমার মেয়ে সম্প্রতি বিধবা হয়েছে। কিন্তু বিধবা হয়ে সে কয়েকদিন কান্নাকাটি করে হঠাৎ চুপ করে গেল। আমার কৌতূহল হলো জানতে যে তার কি হলো যে হঠাৎ কান্না বন্ধ হয়ে গেল। তাকে ডেকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম। সে বল্লে-- আমি রবিবাবুর নৈবেদ্য বই পড়ে পরম সান্ত্বনা পেয়েছি. আর আমার শোক দুঃখ কিছু নেই। আমি তাকে বললাম-- দারুণ শোক তাপ দূর হয়ে যায় এমন যে বই তুমি পেয়েছ, তা আমাকেও পড়ে শোনাও। মেয়ে আমাকে সে বই পড়ে পড়ে শোনালে। আমি তা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেছি, আর বড় সান্ত্বনা লাভ করেছি। এই কথাটি বলে আপনাকে আমাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যাবার জন্য আমি কলকাতায় এসেছি"।

কথাগুলি শুনাবার পর আমাদের মনে পড়তে থাকে 'নৈবেদ্য'র সূচনায় বসানো গানগুলির কথা। " যদি এ আমার হৃদয়দুয়ার ", " তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে " কিংবা " অল্প লইয়া থাকি তাই "-এর মতো গানগুলি। আমরা বুঝতে পারি কীভাবে কোন্‌পথে সান্ত্বনা এসে পৌঁছচ্ছিল সেই বৃদ্ধ অথবা তাঁর বিয়োগবিধুরা মেয়েটির মনে। বুঝতে পারি, জীবন যখন এসে দাঁড়ায় ব্যর্থতার বা অপচয়ের বা মৃত্যুর একেবারে মুখোমুখি, তাকে পেরিয়ে আসবার অনেকগুলি পথ কীভাবে রবীন্দ্রনাথ খুলে রাখেন তাঁর গানের মধ্যে, কীভাবে তৈরি হয়ে ওঠে মনে এক শুশ্রূষা।...

রবীন্দ্রনাথের গান বিষয়ে আবু সয়ীদ আইয়ুবের মনে হয়েছিল যে আনন্দেরই গান তাঁর বেশি। তথ্য হিসাবে কথাটা ঠিক নয়, কিন্তু তবু যে আইয়ুবের মনে হয়েছিল একথা, তার সংগত কারণ একটা নিশ্চয় আছে। রবীন্দ্রনাথ কেবলই বলেন দুঃখের কথা, কিন্তু সে দুঃখ তাঁর পথ মাত্র, সে তাঁর পরিণাম নয়। দুঃখের মধ্য দিয়ে আনন্দকে স্পর্শ করবার-- বস্তুত, যাপনের মধ্য দিয়ে সত্তাকে স্পর্শ করবার-- একটা অভিজ্ঞতাকে তিনি নিয়ে আসেন আমাদের সামনে। আর তখন 'অন্তরগ্লানি'র মধ্যে দাঁড়িয়েও, 'ক্ষয়'এর সামনে দাঁড়িয়েও, দুঃখ আর মৃত্যুর অবধারিত অস্তিত্বের মধ্যে দাঁড়িয়েও আমরা বলতে পারি 'তবু প্রাণ নিত্যধারা হাসে সূর্য চন্দ্র তারা' [ আছে দুঃখ আছে মৃত্যু ], মনে হতে পারে 'মনে হলো আকাশ যেন কইল কথা কানে কানে' [ ভোরের বেলা কখন এসে ]। একটা নিরাময় তৈরি হয় তখন। আর তখনই গান হয়ে ওঠে মন্ত্র, হয়ে ওঠে নতুনরকমের এক ধর্ম। (১২০)  
     --শঙ্খ ঘোষ, গান আর ধর্ম, রবীন্দ্রনাথের গান:সঙ্গ অনুষঙ্গ, আলপনা রায় সম্পাদিত, প্যাপিরাস, ২০০২  



অজিতকুমার [চক্রবর্তী] লিখেছেন: "ইংলণ্ডে গুণীসমাজ কবির গলায় যে প্রশংসার মালা পরাইয়া দিয়ছিলেন সে সম্বন্ধে একটিমাত্র গান গীতিমাল্যে আছে-- '   এ মণিহার আমায় নাহি সাজে '।" একটি মাত্র গান? প্রত্যক্ষত হয়তো তাই; কিন্তু একটু ভিতরদিক থেকে দেখলে মনে হবে যে 'গীতিমাল্য'র উত্তরাংশের একটা বড়ো আবেগই আসছে বাইরের মত্ততা থেকে নিজের কেন্দ্রকে বাঁচিয়ে রাখবার এক সতর্ক বোধ থেকে। এভাবে দেখলে বোঝা যায় যে এ গানটি কোনো বিচ্ছিন্ন গান নয়, তার ঠিক ছ-মাস পরে লেখা এসব গানেও আছে ওই একই অনুভব:' সভায় তোমার থাকি সবার শাসনে '।

সভা আর ঘরের এই বিরোধে, সবার আর একার এই বিরোধে যে 'গীতিমাল্য'র অনেকগুলি গান ভরে আছে, তা একেবারে আকস্মিক নয় নিশ্চয়। 'এ মণিহার' গানটির পরদিনই কবি লিখবেন "মনে হল আকাশ যেন কইল কথা কানে কানে" ['   ভোরের বেলা কখন এসে ']। সেই নিভৃত ভোরের সংলাপ থেকে তিনি অর্জন করে নিতে চাইবেন তাঁর জীবনীশক্তি, ঘরকে তিনি করে তুলবেন তাঁর আত্মস্থতার মুদ্রা। তাই জ্যোৎস্নারাতে সবাই যখন বনে চলে যায় তখনো তাঁকে বহু যত্নে সাজিয়ে রাখতে হবে তাঁর নিরালার ঘরখানি, যেন কোনো প্রেরণার মুহূর্তের প্রতীক্ষায়, "যদি আমায় পড়ে তাহার মনে" ['   আজ জ্যোৎস্নারাতে   ']।  একেবারে ভিন্ন দেশের এক আধুনিক কবি জাঁ কক্‌তো, তাঁর সৃষ্টিপ্রেরণার কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে কবি আছেন তাঁর রাত্রির অধিকারে, কোনো এক গহন আবির্ভাবের জন্য তাঁকে ধুয়ে মুছে রাখতে হয় ঘর। অমলেরও সামনে এসে রাজকবিরাজ বলেছিলেন: "এই ঘরটি রাজার আগমনের জন্যে পরিষ্কার করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখো।" এ হলো তবে সেইসব ঘর, যেখানে দাঁড়িয়ে জীব্নকে আর সুন্দরকে তার অন্তঃস্বরূপে দেখতে পাওয়া যায়। এই দেখা থেকে জেগে ওঠে মৃত্যু, মৃত্যুর ভূমিকায় জীবন, এই দেখা থেকেই জেগে ওঠে শিল্প। মৃত্যু আর শিল্প এইভাবে কখনো এক জায়গায় এসে মিলে যায়। আত্মসৃষ্টির সঙ্গে 'গীতিমাল্য'-র গানগুলি সেই শিল্পসৃষ্টিরও নেপথ্য্ঘর। তাই এত বেশি গানের গান ছড়িয়ে আছে এই বইটিতে, তাই এখানে এমন করে তিনি বলতে পারেন যে '   প্রাণে গান নাই ' বা "প্রকাশ করি, আপনি মরি" ['   সে দিনে আপদ আমার ']। (৪৮)  
     --শঙ্খ ঘোষ, এ আমির আবরণ, প্যাপিরাস, ১৯৮২  


ভৈরবী সুরের মোচড়গুলো কানে এলে জগতের প্রতি এক রকম বিচিত্র ভাবের উদয় হয়... মনে হয় একটা নিয়মের হস্ত অবিশ্রাম আর্গিন যন্ত্রের হাতা ঘোরাচ্ছে এবং সেই ঘর্ষণবেদনায় সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মর্মস্থল হতে একটা গম্ভীর কাতর করুণ রাগিণী উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে-- সকাল বেলাকার সূর্যের সমস্ত আলো ম্লান হয়ে এসেছে, গাছপালারা নিস্তব্ধ হয়ে কী যেন শুনছে এবং আকাশ একটা বিশ্বব্যাপী অশ্রুর বাষ্পে যেন আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে-- অর্থাৎ, দূর আকাশের দিকে চাইলে মনে হয় যেন একটা অনিমেষ নীল চোখ কেবল ছল্‌ছল্‌ করে চেয়ে আছে।
    কলকাতা, জুন ১৮৮৯  #৩  

অ[বন?] ও বাড়িতে তাদের এক তলার ঘরে বসে এস্‌রাজে ভৈরবী আলাপ করছে, আমি তেতলার কোণের ঘরে বসে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। তোর চিঠিতেও তুই মাটাঙ্গের ভৈরবী আলাপের কথা লিখেছিস। আজকাল সকালে দেখতে দেখতে বেলা দশটা এগারোটা দুপুর হয়ে যায়-- দিনটা যতই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে থাকে মনটাও ততই এক রকম উদাসীন হয়ে আসে; তার উপর কানে যখন বারম্বার ভৈরবীর অত্যন্ত করুণ মিনতির খোঁচ লাগতে থাকে তখন আকাশের মধ্যে, রৌদ্রের মধ্যে, একটা প্রকাণ্ড বৈরাগ্য ব্যাপ্ত হয়ে যায়। কর্মক্লিষ্ট সন্দেহপীড়িত বিয়োগশোককাতর সংসারের ভিতরকার যে চিরস্থায়ী সুগভীর দুঃখটি, ভৈরবী রাগিণীতে সেইটিকে একেবারে বিগলিত করে বের করে নিয়ে আসে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যে যে-একটি নিত্যশোক নিত্যভয় নিত্যমিনতির ভাব আছে, আমাদের হৃদয় উদ্‌ঘাটন করে ভৈরবী সেই কান্নাকাটি মুক্ত করে দেয়-- আমাদের বেদনার সঙ্গে জগদ্‌ব্যাপী বেদনার সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়। সত্যিই তো আমাদের কিছুই স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রকৃতি কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেই কথাটিই আমাদের সর্বদা ভুলিয়ে রেখেছে-সেইজন্যেই আমরা উৎসাহের সহিত সংসারের কাজ করতে পারি। ভৈরবীতে সেই চিরসত্য সেই মৃত্যুবেদনা প্রকাশ হয়ে পড়ে; আমাদের এই কথা বলে দেয় যে, আমরা যা-কিছু জানি তার কিছুই থাকবে না এবং যা চিরকাল থাকবে তার আমরা কিছুই জানি নে।
  --কলকাতা, ২১ নভেম্বর ১৮৯৪; ৬.৮.১৩০১ #১৭৭  

[কিন্তু] আজ সকালে একটা সানাইয়েতে ভৈরবী বাজাচ্ছিল, এমনি অতিরিক্ত মিষ্টি লাগছিল যে সে আর কী বলব-- আমার চোখের সামনেকার শূন্য আকাশ এবং বাতাস পর্যন্ত একটা অন্তরা্‌নিরুদ্ধ ক্রন্দনের আবেগে যেন স্ফীত হয়ে উঠছিল-- বড়ো কাতর কিন্তু বড়ো সুন্দর-- সেই সুরটাই গলায় কেন যে তেমন করে আসে না বুঝতে পারি নে। মানুষের গলার চেয়ে কাঁসার নলের ভিতরে কেন এত বেশি ভাব প্রকাশ করে! এখন আবার তারা মুলতান বাজাচ্ছে-- মনটা বড়োই উদাস করে দিয়েছে-- পৃথিবীর এই সমস্ত সবুজ দৃশ্যের উপরে একটি অশ্রুবাষ্পের আবরণ টেনে দিয়েছে-- একপর্দা মুলতান রাগিণীর ভিতর দিয়ে সমস্ত জগৎ দেখা যাচ্ছে। যদি সব সময়েই এইরকম এক-একটা রাগিণীর ভিতর দিয়ে জগৎ দেখা যেত তা হলে বেশ হত। আমার আজকাল ভারী গান শিখতে ইচ্ছে করে-- বেশ অনেকগুলো ভূপালী ... এবং করুণ বর্ষার সুর-- অনেক বেশ ভালো ভালো হিন্দুস্থানী গান-- গান প্রায় কিচ্ছুই জানি নে বললেই হয়।
    সাজাদপুর, ৫ জুলাই ১৮৯২; ২২.৩.১২৯৯ #৬৬  
     --রবীন্দ্রনাথ, ছিন্নপত্রাবলী,  বিশ্বভারতী, ১৩১৯  


আমাদের মতে রাগ-রাগিণী বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে নিত্য আছে। সেইজন্য আমাদের কালোয়াতি গানটা ঠিক যেন মানুষের গান নয়, তাহা যেন সমস্ত জগতের। ভৈঁরো যেন ভোরবেলার আকাশেরই প্রথম জাগরণ; পরজ যেন অবসন্ন রাত্রিশেষের নিদ্রাবিহ্বলতা; কানাড়া যেন ঘনান্ধকারে অভিসারিকা নিশীথিনীর পথবিস্মৃতি; ভৈরবী যেন সঙ্গবিহীন অসীমের চিরবিরহবেদনা; মূলতান যেন রৌদ্রতপ্ত দিনান্তের ক্লান্তিনিশ্বাস; পূরবী যেন শূন্যগৃহচারিণী বিধবা সন্ধ্যার অশ্রুমোচন।  
     --রবীন্দ্রনাথ, সঙ্গীতের মুক্তি, সবুজ পত্র, ভাদ্র ১৩২৪; ছন্দ, প্রথম সংস্করণ; কলিকাতায় রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক পঠিত, 'বিচিত্রা' সভায়ও বোধহয় তিনি প্রবন্ধটি পাঠ করেন।  


 

 

২৬৭

ভোরের বেলা কখন এসে   পরশ করে গেছ হেসে॥
আমার ঘুমের দুয়ার ঠেলে   কে সেই খবর দিল মেলে--
জেগে দেখি আমার আঁখি আঁখির জলে গেছে ভেসে॥
মনে হল আকাশ যেন কইল কথা কানে কানে।
মনে হল সকল দেহ পূর্ণ হল গানে গানে।
হৃদয় যেন শিশিরনত   ফুটল পূজার ফুলের মতো--
জীবননদী কুল ছাপিয়ে ছড়িয়ে গেল অসীমদেশে॥

Bust

বিবিধ তথ্য ও আলোচনা

38

I    DID not know that I had thy touch before it was dawn.
  The news has slowly reached me through my sleep, and I open my eyes with its surprise of tears.
  The sky seems full of whispers for me and my limbs are bathed with songs.
  My heart bends in worship like a dew-laden flower, and I feel the flood of my life rushing to the endless.
  

Crossing: Published together with Lover's Gift. Many of the translations are transcreations and paraphrases of the original. Poems have been sourced from Naivedya, Kheya, Gitanjali, Gitimalya and Gitali.[Notes, "The English Writings of Rabindranath Tagore" - vol 1]  
     --Rabindranath Tagore, Lover's Gift and Crossing, Macmillan, London, 1918.  



১৯১৩ সনের পশ্চাৎপট:

রবীন্দ্রনাথের জগৎ:  শিকাগো এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা। ক্যাক্সটন হলে বক্তৃতাগুচ্ছ। দেশে প্রত্যাবর্তন। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি এবং তার সংবাদপ্রাপ্তি। কবি সংবর্ধনা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক 'ডি লিট' উপাধি প্রদান। প্রকাশ: Chitra, The Crescent Moon, The Gardener, Glimpses of Bengal Life, Sadhana.  

বহির্বিশ্বে: প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র (রাজা হরিশচন্দ্র) নির্মাণ করলেন দাদাসাহেব ফাল্‌কে। এডিসনের টকি ফিল্ম আবিষ্কার। হরদয়াল গদর পার্টি স্থাপন করেন, এঁরা পরে আমেরিকার সান্‌ ফ্রান্‌সিস্কো অঞ্চলে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলন শুরু করেন। সিমলায় প্রথম টেলিফোন এক্স্চেঞ্জ। ভারতবর্ষ -- জলধর সেন ও সন্দেশ - উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী প্রকাশ। নিল্‌স বোরের পরমাণু তত্ত্বের প্রচার। উল্লেখযোগ্য সাহিত্য: কুহু ও কেকা (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত), সন্‌স অ্যাণ্ড লাভার্স (লরেন্স), প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা ( হোয়াইটহেড, রাসেল), রিমেম্‌ব্রেন্‌স অফ থিংস পাস্ট ১ (প্রুস্ত)।  
     --প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনকথা, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৩৯২ এবং  
চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদক, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ ৪, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ১৯৯৮  


... বাংলা গান বাণীপ্রধান, আপনি যতই সুরজ্ঞ হন, বাংলা গান শুনতে হ'লে কথার দিকে কিছু মন না দিয়ে উপায় নেই, এবং কথা খারাপ হ'লে উপভোগে কিছু অন্তত ব্যাঘাত যার না হয় বলতেই হবে তার অনুভূতিগুলি সম্পূর্ণ বিকশিত নয়। সেই জন্যে বাংলা গানের ভালো কবিতা হওয়া দরকার। বাংলা গান এমন হওয়া উচিত যা ছাপার অক্ষরে প'ড়েও ভালো লাগে। এ রকম কিছু গান লিখেছেন দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ, নজরুল ইসলাম -- তাঁদের সুখ্যাতি নিশ্চয় করবো; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ গানের ছলে কাব্যের যে চোখ-ধাঁধানো, প্রাণ-কাড়ানো হিসেব-হারানো ঐশ্বর্য আমাদের ঘরের আঙিনায় ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার কথা আমরা কী বলবো? এ-গানগুলি শ্রেষ্ঠ কবিতা, রবীন্দ্রকাব্যের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ। আশ্চর্য এই যে দেড় হাজার দু'হাজার গানের মধ্যে প্রায় প্রতিটিই কবিতা হিসেবে সার্থক, বেশির ভাগই অনিন্দ্য। এ থেকে এটুকু বোঝা যায় যে তিনি নিজের মনে তাঁর গানে ও গীতিকবিতায় জাতের কোনো তফাৎ মানেন না, যদিও এখন পর্যন্ত তাঁর নিজের কোনো কাব্যসংকলনেই এমন কোনো রচনা স্থান পায়নি যা নিছক গান।

... সমালোচককে মুখ খোলবার কোনো সুযোগই দেবে না রবীন্দ্রনাথের গান। গানগুলি যে-কোনো অর্থেই নিখুঁত। এমন একান্ত সরল, ঋজু, জাদুকর ভাষা রবীন্দ্রনাথ আর কোথাও ব্যবহার করেন নি। এত বিচিত্র ছন্দ, এমন চমক-লাগান অভিনব মিল, এমন ললিত মধুর অনুপ্রাস তাঁর কবিতায় নেই। অথচ পড়বার সময় কখনো এমন মনে হয় না যে এগুলো কবির কারিগরি, মনে  হয় সবই সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত, মনে হয় ছন্দ মিল অনুপ্রাস সব নিয়ে সম্পূর্ণ রচনা একটি সম্পূর্ণ ফুলের মতো আপনিই ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের সব গানেই এই একটি আত্মজ ভাব ধরা পড়ে, ওরা যেন একটা জৈব পদার্থ, কারো রচিত নয়; জীবজগত উদ্ভিদজগতের অফুরান বিচিত্রতার মতো ওরা শুধু আছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই, ব্যাখ্যার প্রয়োজনও নেই। কলাকৌশল এত ও এতরকমের যে গুনে শেষ হয় না। মিল, মধ্য-মিল, অর্ধ-মিল, স্বর-মিল -- সদ্যোজাত অপূর্ব সে সব মিল -- শুধু মিলের আলোচনাতেই এক দীর্ঘ প্রবন্ধ দাঁড়িয়ে যায়। আবার মিল নেই এমন গানও অছে; সংস্কৃত-বহুল গাম্ভীর্য থেকে একেবারে মুখের ভাষার স্বচ্ছ সরলতা পর্যন্ত বাংলা ভাষায় সম্ভব এমন-কোনো আলো-ছায়ার খেলা নেই, যা ধরা না পড়েছে তাঁর গানে; চায়ের গানের মতো যেন বাজী ধ'রে লেখা স্রেফ কারিগরির রচনাও আছে, যদিও সংখ্যায় নগণ্য; 'মেঘের পরে মেঘ জমেছে'-র মতো তরল শিশু-ভাষা থেকে 'অহো এ কী নিদারুণ স্পর্ধা, অর্জুনে যে করে অশ্রদ্ধা!'-র মতো অসম্ভব যুক্তাক্ষর পর্যন্ত সব রকম কথা, সব রকম ধ্ব্নিবিন্যাস অনায়াসে বসেছে। ছন্দের বৈচিত্র্যের তো শেষ নেই। যে-তিনমাত্রার ছন্দ রবীন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্য তার নানারকম রূপের ব্যবহার গানে পৌনঃ-পুনিক, আছে ছড়ার ছন্দ, আছে পয়ার, আছে ছন্দের নানা নতুন ঢং। ... মনে হয় বাংলা ভাষায় পদ্যের ছন্দে যত রকম আওয়াজ যত রকম সুর বের করা সম্ভব সব তিনি নিঃশেষ করে দিয়েছেন তাঁর গানে। কলাকৌশল বিস্ময়কর, কিন্তু চায়ের গানের মতো দু'একটি ঈষৎ লঘু রসের রচনা ছাড়া কোথাও মনে হয় না কোনো কৌশল আছে, মনে হয় এরা আপনিই হয়েছে, বিশ্বপ্রকৃতির বিভিন্ন ভঙ্গির মতো একটি আদিম অনির্বচনীয়তা নিয়ে এরা কাছে এসে দাঁড়ায়। আমার মনে হয় এখানেই কবিতার উপর গানের জিৎ। কবিতা যত ভালোই হোক তার কলাকৌশল দেখতে পাই, কলকব্জাগুলোর নামও জানি, কবি কী করতে চেয়েছেন ও কী করেছেন তা বুঝতে পেরে তাঁর দক্ষতার তারিফ করি শত মুখে, কিন্তু গানে -- রবীন্দ্রনাথের গানের মতো গানে -- সমগ্র জিনিষটি এক ধাক্কায় এক সঙ্গে হৃদয়ে এসে ঢোকে, ব্যাপারটা কী হলো তা বোঝবার সময় পাওয়া যায় না। বিশুদ্ধ কবিতা ব'লে কিছু যদি থাকে তা এই গান।  
     --বুদ্ধদেব বসু, রবীন্দ্রনাথের গান,কবিতা রবীন্দ্র-সংখ্যা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অশীতিতম জন্মদিনে প্রকাশিত, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৮ (৮ই মে ১৯৪১)। পুনর্প্রকাশ (ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ) বিকল্প প্রকাশনী, কবিপক্ষ, ১৪১০